আর্জেন্টাইন ফুটবল তারকা লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসি মারা গেছেন। স্থানীয় সময় শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাত ১০টার দিকে আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরের একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন তিনি।
আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ইনফোবায়ের তথ্য অনুযায়ী, হোর্হে ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। একই সঙ্গে তিনি মেসির প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। যদিও তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোন তথ্য পাওয়া যায় নি।
সেলিয়া কুচ্চিত্তিনির স্বামী হোর্হে চার সন্তানের বাবা। তারা হলেন লিওনেল, রদ্রিগো, মাতিয়াস ও মারিয়া সোল। মেসির ফুটবল ক্যারিয়ারে হোর্হে ছিলেন অন্যতম প্রধান সহায়।
পরিবারের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মেসির মাঠের বাইরের বিভিন্ন দায়িত্বও সামলাতেন তিনি। লিওনেল যখন নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের বয়সভিত্তিক দলে খেলতেন, তখন তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হোর্হে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মেসি যখন ইউরোপে ভাগ্য পরীক্ষা করতে বার্সেলোনায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার সঙ্গী হয়েছিলেন বাবাই। এ সময় মেসির মা সেলিয়া রোসারিওতে পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখাশোনা করতেন।
মেসির চারপাশে হোর্হের উপস্থিতি ছিল সব সময়। তবে তিনি ছিলেন অনেকটাই নেপথ্যে। খুব কম কথা বলতেন। বছরের পর বছর ধরে তার সাক্ষাৎকারও খুব বেশি পাওয়া যায়নি।
‘এল গ্রাফিকো’, জার্মানির ‘কিকার’ এবং স্পেনের ‘ইনফোরমে রবিনসন’-এর মতো কয়েকটি গণমাধ্যমে তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। মেসির জীবন নিয়ে প্রকাশিত কিছু বইয়েও তার বক্তব্য নেওয়া হয়েছিল। তবে সামগ্রিকভাবে তিনি প্রচারের আলো থেকে দূরেই থাকতেন।
হোর্হের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টেও নিয়মিত পোস্ট দেখা যেত না। মাঝে মাঝে সেখানে লিওনেলের সাফল্য উদ্যাপনের ছবি পোস্ট করতেন। একই সঙ্গে অন্য সন্তান, নাতি-নাতনি ও ভাতিজা-ভাতিজিদের নিয়েও ছবি দিতেন।
বিশ্বকাপের সময় পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে হোর্হে মেসিকে প্রায়ই দেখা যেত। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রে মেসি পরিবারের অন্যদের তুলনায় হোর্হের অনুপস্থিতি নজর কেড়েছিল। সে সময় মেসির স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জোকে সন্তান থিয়াগো, মাতেও ও সিরোর সঙ্গে দেখা গিয়েছিল।
২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে গোল করার পর মেসির চোখে পানি দেখা গিয়েছিল। পরে হ্যাটট্রিক করার পর তাঁর সেই আবেগের কারণ জানতে চাওয়া হয়।
মেসি তখন বলেছিলেন, এটি খেলাধুলার সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন একটি বিষয়। তিনি কয়েকটি কঠিন ও জটিল সময় পার করেছেন। এ সময় পুরো দলের সমর্থনের জন্য তিনি কৃতজ্ঞ বলেও জানিয়েছিলেন। পরে আর্জেন্টিনার সাবেক খেলোয়াড় হুয়ান পাবলো সোরিন মেসিকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করেন। সোরিন তাঁকে পরিবার এবং জাতীয় দলকে আরেকটি পরিবার হিসেবে উল্লেখ করে আবেগের কারণ জানতে চান।
জবাবে মেসি বলেন, মূলত পরিবারের কারণেই তিনি আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন। পরিবার সব সময় তার পাশে থাকে। তখন তারা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। একই সঙ্গে জাতীয় দলের সতীর্থদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি। দলটি তাঁকে সমর্থন করে এবং সুখী থাকতে সহায়তা করে বলেও জানান মেসি।
এর কয়েক দিন পর মেসি পরিবারের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। এতে জানানো হয়, হোর্হে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। তিনি চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং তার শারীরিক অবস্থার বিবেচনায় ভালোভাবেই সুস্থ হয়ে উঠছেন। হোর্হে মেসি টেকনিক্যাল কেমিস্ট হিসেবে পড়াশোনা করেছিলেন। ১৯৮০-এর দশকে তিনি আর্জেন্টিনার আকিন্দার কারখানায় যোগ দেন। পরে সেখানে ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে উন্নীত হন বলে মেসির জীবনীকার গিয়েম বালাগের বই ‘মেসি’তে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে হোর্হের নিজেরও ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ছিল। নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের বয়সভিত্তিক দলে তিনি একজন মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতেন। পরে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ফুটবল ছেড়ে দেন। লিওনেলের শৈশবে হোর্হেকে নিউয়েলসের মালভিনাস প্রশিক্ষণ মাঠের পাশে নিয়মিত দেখা যেত। লিওনেল যখন ক্লাবটির বয়সভিত্তিক দলে আলোচনায় আসতে শুরু করেন, তখন তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন হোর্হে।
আর্জেন্টিনায় লিওনেলের হরমোন চিকিৎসার খরচ বহনের ব্যবস্থা করতে তিনি চেষ্টা করেন। তবে নিউয়েলসের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাননি। এরপর লিওনেলকে রিভার প্লেটে ভাগ্য পরীক্ষা করতে উৎসাহ দেন। রিভার প্লেটে যাওয়ার আলোচনা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। এরপর হোর্হে বার্সেলোনায় যাওয়ার পথ তৈরি করেন।
গিয়েম বালাগের বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় এমন একটি চুক্তির ব্যবস্থা করেছিলেন হোর্হে, যা ছিল বেশ বিরল। ১৩ বছর বয়সী একজন বিদেশি খেলোয়াড়কে দলে নেওয়ার পাশাপাশি বার্সেলোনা মেসির প্রয়োজনীয় চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। তাঁকে বার্ষিক বেতন দেওয়া হয়। পরিবারের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। মেসির পরিবারের একজনের জন্য কাজের ব্যবস্থাও করা হয়। এমনকি ভাবমূর্তি-স্বত্ব বাবদ অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল।
বার্সেলোনায় মেসির শুরুটা সহজ ছিল না। ইউরোপের জীবনেও পরিবারটি সহজে মানিয়ে নিতে পারছিল না। তখন হোর্হেই লিওনেলকে স্পেনে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেন। মেসি থেকে যেতে চেয়েছিলেন। হোর্হেও তার সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। গ্রান ভিয়া দে কার্লেস ত্রয়েস এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে থেকে মেসি ফুটবলে নিজের জায়গা তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যান। সেই সিদ্ধান্তই পরে তার ঐতিহাসিক ক্যারিয়ারের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
২০০৭ সালে রেডিও দেল প্লাতার ‘ফুতবল ই আলগো মাস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের কথা স্মরণ করেছিলেন মেসি।
তিনি বলেছিলেন, তার বাবা সব সময় তার পাশে ছিলেন। তারা অনেক কঠিন সময় পার করেছেন। কখনো তিনি একা ঘরে গিয়ে কাঁদতেন। তার বাবাও কখনো একা কাঁদতেন। দুজনেই বাইরে থেকে ভালো থাকার চেষ্টা করতেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাঁরা ভালো ছিলেন না।
মেসি জানান, একপর্যায়ে তার বাবা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি কী করতে চান। স্পেনে থেকে চেষ্টা চালিয়ে যাবেন, নাকি তারা আর্জেন্টিনায় ফিরে যাবেন। মেসি থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর তার বাবা তার সঙ্গে থেকে যান।
ক্রীড়া ডেস্ক 
























