কুমিল্লার দাউদকান্দি, তিতাস ও মেঘনা উপজেলাকে বিচ্ছিন্ন করেছে গোমতী নদী। দুই পারের অন্তত ৩০টি গ্রামকে সড়কপথে সংযুক্ত করতে ২০২০ সালে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। তবে কভিডের কারণে ওই বছরের জুন পর্যন্ত কাজটি বন্ধ ছিল। জুলাই থেকে কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গত পাঁচ বছরে দুই দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। চলতি বছরের জুনে বর্ধিত মেয়াদ শেষ হবে। তবে এখনো ৫১ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সেতুটি দাউদকান্দি, তিতাস ও মেঘনা উপজেলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলায় একাধিকবার সময় বাড়ানো সত্ত্বেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে তিনটি উপজেলার মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে গোমতী নদীর ওপর ৫৭০ মিটার দীর্ঘ কদমতলী-হাসনাবাদ সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। দাউদকান্দি উপজেলার সদর উত্তর ইউনিয়নে নির্মীয়মাণ সেতুটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৮ কোটি ৭৪ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩১ টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মঈনউদ্দিন বাশী লিমিটেড ও মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ যৌথভাবে সেতু নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায়। তবে ২০২০ সালে কভিড শুরু হলে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কাজটি বন্ধ ছিল। জুলাই থেকে কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। দরপত্রের চুক্তি অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের মে মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে শেষ না হওয়ায় এক দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। বর্ধিত মেয়াদে কাজ শেষ না হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে সেতুর কাজ শেষ করার জন্য ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়। মেয়াদ শেষ হতে মাসখানেক বাকি থাকলেও কাজ হয়েছে ৪৯ শতাংশ।
সরজমিনে দেখা গেছে, সেতুর ১৫২টি পাইলের মধ্যে ১৪১টির কাজ শেষ হয়েছে। এখনো ১১টি পাইল নির্মাণসহ সেতুর অবকাঠামো অনেক কাজ বাকি। সেতুর দক্ষিণাংশে দুই পিলারের মধ্যে বিম স্থাপনা ছাড়া দৃশ্যমান তেমন কোনো কাজ দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মালিকদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে সেতু নির্মাণে বিলম্ব প্রসঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী নাঈমুর রহমান বলেন, ‘কদমতলী-হাসনাবাদ সেতুর কাজ শুরু হওয়ার প্রায় দেড় বছর পর আমি প্রকল্পে যোগদান করেছি। জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, বন্যা এবং কভিড মহামারীর কারণে প্রায় আড়াই বছর কাজ বন্ধ ছিল। আমাদের ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না। আমরা সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করব।’
এ বিষয়ে দাউদকান্দি উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত যে ওয়ার্ক প্ল্যান জমা দিয়েছে, তার কোনোটিই সঠিক হয়নি। তারা যদি সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করে, তাহলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে। তবে তারা যদি কাজ না করতে চায়, তাহলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী জরিমানা আরোপ করে কার্যাদেশ বাতিল করার বিধান রয়েছে।’
এদিকে সেতুর কাজ সময়মতো শেষ না হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দাউদকান্দি, তিতাস ও মেঘনা উপজেলার অন্তত ৩০ গ্রামের মানুষ। সেতুটি চালু না থাকায় তাদের নৌকায় নদী পার হতে হচ্ছে। দাউদকান্দি উপজেলার হাসনাবাদ, ভিটিকান্দি, কান্দারগাঁও, ভাজরা, বাহেরচর, গঙ্গাপ্রসাদ ও বটতলী, তিতাস উপজেলার দুধঘাটা, দড়িগাঁও, কাকিয়ালী, চরকাঁঠালিয়া, উজিরাকান্দি, মোহনপুর, সাতানী, চারআনি, নন্দীরচর, বারকাউনিয়া, মঙ্গলকান্দি, কালীরবাজার, ভূঁইয়ার বাজার, নন্দনপুর, বালুয়াকান্দি, জগতপুর ও চরকুমারিয়া এবং মেঘনা উপজেলার আলীপুর, বিনোদপুর, চরবিনোদপুর ও হিজলতলী গ্রামের বাসিন্দারা নৌকা দিয়ে নদী পার হচ্ছেন।
দাউদকান্দির হাসনাবাদ ও ভিটিকান্দি গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল, কামাল ও রফিক জানান, যথাসময়ে কাজ শুরু ও সঠিকভাবে পরিচালিত হলে সেতু নির্মাণ অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত। এখন উপজেলা সদর কিংবা পাশের ইউনিয়নে যেতে সময় ও শ্রম দুটোই অপচয় হচ্ছে।
বাহেরচর ফজলুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল আলিম বলেন, ‘সেতুটি শিক্ষার্থীসহ এলাকার মানুষের চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত নির্মাণ শেষ না হলে শিক্ষা ও বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত ব্যক্তিদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
নদীপারের বাসিন্দারা বলছেন, সেতু না থাকায় নৌকায় নদী পার হতে হয়। এতে সময় লাগে অনেক বেশি। অনেক সময় নৌকা পাওয়াও যায় না।
মেঘনা উপজেলার রাকিব উদ্দিন বলেন, ‘ঢাকায় আমার ব্যবসা রয়েছে। বাড়িতে আসতে দেরি হলে কিংবা রাত হয়ে গেলে এখানে নৌকা পাওয়া যায় না। সেতুটি নির্মাণ হলে আমার বাড়ি যেতে সময় লাগবে ১৫ মিনিট। সেতুটি চালু হলে উত্তর ইউনিয়ন ও আশপাশের প্রায় ৩০টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে। এতে অর্থ ও সময় সাশ্রয় হবে।’
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















