ঢাকা ০৬:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নাটোরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে চারা বিতরণ ভোলাহাটে উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটিসহ বিভিন্ন সভা অনুষ্ঠিত! আগামী সপ্তাহ থেকে কিছুটা গ্যাস সংকট কেটে যাবে : জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ভারতজুড়ে এখন একটিই স্লোগান ‘এবার মোদির পালা’ চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৯ বিজিবির উদ্যোগে যুবকদের মোবাইল সার্ভিসিং প্রশিক্ষণের উদ্বোধন বিমানের ওভারটাইমে ‘ওভার’ অনিয়মের অভিযোগ সিলেট সীমান্তে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চোরাচালান চক্র নওগাঁয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে স্বামীর ছুরিকাঘাতে স্ত্রীর মৃত্যু শক্তিশালী পাসপোর্টের তালিকায় আরও ২ ধাপ পেছাল বাংলাদেশ অনিয়মে সংকটগ্রস্ত পূবালী ব্যাংক

বিমানের ওভারটাইমে ‘ওভার’ অনিয়মের অভিযোগ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গারের গেট-সংলগ্ন জামে মসজিদে মুসল্লিদের আনগোনা থাকে সবসময়। নামাজ শেষ করে যে যার মতো চলে যান। কিন্তু বেশকিছু লোক না গিয়ে মসজিদে শুয়ে থাকেন। সপ্তাহখানেক আগে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ধরা পড়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কয়েকজন কর্মকর্তা আরামে ঘুমিয়ে আছেন। অথচ ওই সময় তাদের ডিউটিতে থাকার কথা। এ ঘটনার মতোই সংস্থাটিতে কর্মরত কর্মীরা ওভারটাইমের নামে ফাঁকি দিচ্ছেন। এসব বিষয় কর্তৃপক্ষের নজরে আসায় তদন্ত হচ্ছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

বিমান কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হয়েছে, ওভারটাইম ডিউটি করতে এসে কেউ ঘুমাচ্ছেন রেস্ট রুমে, আবার কেউ মসজিদে। অনেকে আবার উপস্থিতির স্বাক্ষর করেই চলে যাচ্ছেন বাসাবাড়িতে। নজরদারির বালাই না থাকায় বছরের পর বছর ধরে হচ্ছে এসব অপকর্ম। এমনকি ওভারটাইম ডিউটির নামে মাসে অতিরিক্ত প্রায় দেড় কোটি টাকার মতো গচ্চা দিতে হচ্ছে বিমানকে। ওভারটাইম কমিয়ে আনার পাশাপাশি নজরদারি ও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া লন্ডন, কানাডা, দুবাইসহ সব আউট স্টেশনের সার্বিক কর্মকাণ্ডের ওপরও নজরদারি করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই এসব স্টেশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদের মোবাইলে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি জনসংযোগ শাখায় দায়িত্বরত কর্মকর্তাও ফোন ধরেননি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী আকাশ পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠা করা হয়। তারপর টানা ৩৫ বছর বিমান ছিল সরকারের করপোরেশনভুক্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এ সময়ের মধ্যে বিমান বরবরাই ছিল লোকসানের কবলে। যদিও আশির দশক ছিল বিমানের জন্য সোনালি সময়। ওই সময়ের আলোচিত ব্র্যান্ডনিউ ৫টি ডিসি-১০ উড়োজাহাজ দিয়ে বিমান দাপিয়ে বেড়িয়েছে প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে। জাপানের নারিতা থেকে শুরু করে আটলান্টিকের ওপারে নিউইয়র্কসহ ২৯টি গন্তব্যে ছিল বিমানের নিয়মিত ফ্লাইট। কিন্তু নানা জটিলতায় নিউইয়র্কসহ কয়েকটি রুট বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া নানা অনিয়ম আছেই। এরই মধ্যে সরকার চেষ্টা করছে বিমানকে লাভজনক সংস্থায় পরিণত করতে। এ জন্য রুটের পাশাপাশি উড়োজাহাজের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি করেছে।

সিসি ফুটেজ নিয়ে তোলপাড় : বিমান সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিমানের হ্যাঙ্গারের প্রকৌশল বিভাগের সিসিটিভির মনিটরিং ফুটেজে ঘুমের দৃশ্য আসার পর ফাঁস হয় ওভারটাইমের অনিয়ম। এ নিয়ে বিমানে চলছে তোলপাড়। গত জুন মাসের ওভারটাইমের বেশি বিল দেখে ক্ষোভ ঝাড়েন বিমানের উপমহাব্যবস্থাপক ও পরিচালক চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার সৈয়দ মইন উদ্দীন। তার আপত্তির কারণে বিল কমাতে বাধ্য করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে তিন শিফটে আসা কর্মীরা বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটান। আবার কেউ হাজিরা দিয়ে চলে যান। বিষয়টি কেউ খোঁজও রাখেন না।

প্রায় শতাধিক কর্মী ‘ওভারটাইম সিস্টেমে’র সুবিধা নিচ্ছেন প্রতিদিন। এমনকি বিমানে নানা সংস্কারের বুলি আওড়ানোর মধ্যেও ভেতরে রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেকে বসা দুর্নীতি ও হরিলুট বন্ধ হচ্ছে না।

বছরে গচ্ছা ১৮ কোটি : বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, মোটর পরিবহন (এমটি), ট্রাফিক এবং প্রকৌশল শাখার ওভারটাইম (অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা) বিল নিয়ে চলছে নজিরবিহীন জালিয়াতি। কোনো কোনো বিভাগে মাসে ডিউটি না করেই ভুয়া রোস্টার দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে বিমানকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় দেড় কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে, যা বছরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ১৮ কোটি টাকায়। বিমানের ওভারটাইম জালিয়াতির সবচেয়ে বড় খাত হলো ‘কাজ না করে ঘরে বসে বিল তোলা’। বিমানে ডিজিটাল বা বায়োমেট্রিক হাজিরার নিয়ম থাকলেও তা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ডিউটি অফিসারদের ম্যানেজ করে ম্যানুয়াল শিট বা খাতায় সই দিয়ে হাজিরা দিচ্ছেন কেউ। ফলে একজন কর্মী একই সময়ে দুটি ভিন্ন ডিউটি দেখিয়ে দ্বিগুণ ওভারটাইম তুলে নিচ্ছেন। সাধারণ সরকারি ছুটির দিনগুলোয় বিমানের শিফট ডিউটিতে অতিরিক্ত কর্মীর প্রয়োজন পড়ে। এসব দিনে অনেক কর্মচারী বাসায় অবস্থান করলেও হাজিরা খাতায় তাদের নাম ‘অন ডিউটি’ হিসেবে নথিভুক্ত থাকে। মাস শেষে তারা শতভাগ উৎসব ও ছুটির দিনের ওভারটাইম ভাতা উত্তোলন করেন।

বেতনের চেয়ে ওভারটাইমের বিল বেশি : নাম প্রকাশ না করে বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সম্প্রতি সিসিটিভি ফুটেজের ঘটনায় সর্বত্র তোলপাড় চলছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা গভীরে গিয়ে তদন্ত করি। তদন্তে দেখা গেছে, হ্যাঙ্গার ইউনিটসহ আরও কয়েকটি ইউনিটের একাধিক শিফটে ২৫ থেকে ৩০ জন করে স্টাফ ওভারটাইম করেন। রাতের বেলায় এসে কাজ না করে তারা কেউ রেস্ট রুমে, কেউবা মসজিদে ঘুমিয়ে সময় পার করে দেন। বিশেষ করে রাতের শিফটে হ্যাঙ্গারের ৮ নম্বর গেট দিয়ে বিমানের গাড়িতে করে প্রবেশ করেন তারা। এরপর কেউ কেউ শুধু ফিঙ্গার দিয়ে ওই গাড়িতেই চলে যান। আবার অনেকে ঘুমিয়ে সময় কাটিয়ে দেন। ওই এলাকায় পাঁচটি রেস্টরুম ও একটি মসজিদ রয়েছে। তারা সেখানে ঘুমান।’ তিনি বলেন, ‘একেকজনের মাসে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা ওভারটাইমের বিল আসে। বিমানের টাকা কীভাবে অপচয় হচ্ছে, ওভারটাইম তার জ্বলন্ত প্রমাণ। সরকার যখন কৃচ্ছ্রসাধনের দিকে যাচ্ছে, তখন এ অনিয়ম চলতে দেওয়া যায় না।’

অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি : গত ৩ বছরে বিমানের ওভারটাইম খাতের ব্যয় জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল আংশিক চালু হওয়ার অজুহাত এবং উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজের চাপ বাড়ার অজুহাতে ওভারটাইম বিল দ্বিগুণ করা হচ্ছে। প্রতি মাসে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কার্গো সার্ভিসে ওভারটাইম খাতের প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যয় হয় এ বিভাগে। কারিগরি কাজের অজুহাতে অস্বাভাবিক ওভারটাইম দেখানো হয়, যা মোট ব্যয়ের ২০ শতাংশ। বিমানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ বেশ কয়েকবার এ অস্বাভাবিক খরচের ওপর আপত্তি জানিয়ে প্রতিবেদন জমা দিলেও রহস্যজনক কারণে সেসবের ওপর কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ আছে।

সিণ্ডিকেটের দৌরাত্ম্য : বিমানের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, এ চক্রের খুঁটির জোর গভীরে। অতীতে বেশ কয়েকজন সৎ প্রশাসন কর্মকর্তা ওভারটাইমে বায়োমেট্রিক হাজিরা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিলেও ’সুবিধাভোগী গ্রুপটি’ বিরোধিতা করে। ফলে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারাও ‘ওভারটাইম বাণিজ্য’ দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ওভারটাইমে অনিয়ম বন্ধ করতে হলে ১০০ শতাংশ বায়োমেট্রিক হাজিরা চালু করতেই হবে’। ম্যানুয়াল বা রেজিস্টার খাতায় সই করার পদ্ধতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই একজন যাতে কর্মী মাসে তার বেসিক কর্মঘণ্টার ৩০ শতাংশের বেশি অতিরিক্ত কাজ করতে না পারেন, তা সিস্টেমে লক করে দিতে হবে। অফিসে কাজের চাপ বেশি থাকলে প্রয়োজনে চুক্তিভিত্তিক দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে।’

লন্ডন, কানাডা, দুবাইসহ আউট স্টেশনগুলোয় চোখ : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের লন্ডন, কানাডা, দুবাইসহ সব আউট স্টেশনের সার্বিক কর্মকাণ্ডের ওপর চোখ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি গোয়েন্দারাও শুরু করেছে নজরদারি। এসব স্টেশনে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কতটুকু দায়িত্ব পালন করছেন, আবার কারা অনিয়ম দুর্নীতির পাশাপাশি সরকারের ভাবমর্যাদা ক্ষুন্নের সঙ্গে কমবেশি জড়িত, এসব রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। বিমানের বিদেশে পূর্ব এবং পশ্চিম জোন মিলিয়ে ১৯টি আউট স্টেশন রয়েছে। স্টেশনগুলো হচ্ছে সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, কলকাতা, দিল্লি, কাঠমান্ডু, মাস্কাট, আবুধাবি, দোহা, শারজাহ, কুয়েত, দুবাই, জেদ্দা, মদিনা, দাম্মাম, রিয়াদ, হিথ্রো-ম্যানচেস্টার, ইতালির রোম ও কানাডা। এসব স্টেশনে ওভারটাইম নিয়েও কারসাজি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী : এভিয়েশন বিশ্লেষক ও বিমানের সাবেক এক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী। লোকসান হলেও সেটা বিকল্প কায়দায় চালু রাখলে আজকে পরিস্থিতি হতো ভিন্ন। কিন্তু কালের ব্যবধানে আজ এটা প্রমাণিত নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট বন্ধ করে কফিনে সর্বশেষ পেরেক মারা হয়েছে। একদিকে আমলাতান্ত্রিক দাপট অন্যদিকে হটকারি সিদ্ধান্তের কারণে বিমানের যখন মুখ থুবড়ে পড়ার অবস্থা তখন বিমানকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও পুনর্গঠন করার লক্ষ্যে ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই বিমানকে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা হয়, যা সম্পূর্ণভাবে সরকারি মালিকানাধীন এবং এটি ১৩ সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, নানা অনিয়মের মধ্যে পার করছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটি। দীর্ঘদিন ধরেই ওভারটাইম নিয়ে চলছে হরিলুট। ওভারটাইম যারা করেন, তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না। হাজিরা দিয়েই কেউ কেউ চলে যান বাসায়। নেই কোনো জবাবদিহি। এখন সময় এসেছে ঊর্ধ্বতন থেকে শুরু করে অফিস সহকারীদেরও নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার। নানা কৌশল নিয়ে হলেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে বিমানকে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নাটোরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে চারা বিতরণ

বিমানের ওভারটাইমে ‘ওভার’ অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট সময় ০৫:১৪:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গারের গেট-সংলগ্ন জামে মসজিদে মুসল্লিদের আনগোনা থাকে সবসময়। নামাজ শেষ করে যে যার মতো চলে যান। কিন্তু বেশকিছু লোক না গিয়ে মসজিদে শুয়ে থাকেন। সপ্তাহখানেক আগে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ধরা পড়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কয়েকজন কর্মকর্তা আরামে ঘুমিয়ে আছেন। অথচ ওই সময় তাদের ডিউটিতে থাকার কথা। এ ঘটনার মতোই সংস্থাটিতে কর্মরত কর্মীরা ওভারটাইমের নামে ফাঁকি দিচ্ছেন। এসব বিষয় কর্তৃপক্ষের নজরে আসায় তদন্ত হচ্ছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

বিমান কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হয়েছে, ওভারটাইম ডিউটি করতে এসে কেউ ঘুমাচ্ছেন রেস্ট রুমে, আবার কেউ মসজিদে। অনেকে আবার উপস্থিতির স্বাক্ষর করেই চলে যাচ্ছেন বাসাবাড়িতে। নজরদারির বালাই না থাকায় বছরের পর বছর ধরে হচ্ছে এসব অপকর্ম। এমনকি ওভারটাইম ডিউটির নামে মাসে অতিরিক্ত প্রায় দেড় কোটি টাকার মতো গচ্চা দিতে হচ্ছে বিমানকে। ওভারটাইম কমিয়ে আনার পাশাপাশি নজরদারি ও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া লন্ডন, কানাডা, দুবাইসহ সব আউট স্টেশনের সার্বিক কর্মকাণ্ডের ওপরও নজরদারি করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই এসব স্টেশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদের মোবাইলে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি জনসংযোগ শাখায় দায়িত্বরত কর্মকর্তাও ফোন ধরেননি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী আকাশ পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠা করা হয়। তারপর টানা ৩৫ বছর বিমান ছিল সরকারের করপোরেশনভুক্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এ সময়ের মধ্যে বিমান বরবরাই ছিল লোকসানের কবলে। যদিও আশির দশক ছিল বিমানের জন্য সোনালি সময়। ওই সময়ের আলোচিত ব্র্যান্ডনিউ ৫টি ডিসি-১০ উড়োজাহাজ দিয়ে বিমান দাপিয়ে বেড়িয়েছে প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে। জাপানের নারিতা থেকে শুরু করে আটলান্টিকের ওপারে নিউইয়র্কসহ ২৯টি গন্তব্যে ছিল বিমানের নিয়মিত ফ্লাইট। কিন্তু নানা জটিলতায় নিউইয়র্কসহ কয়েকটি রুট বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া নানা অনিয়ম আছেই। এরই মধ্যে সরকার চেষ্টা করছে বিমানকে লাভজনক সংস্থায় পরিণত করতে। এ জন্য রুটের পাশাপাশি উড়োজাহাজের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ১৪টি বোয়িং কেনার চুক্তি করেছে।

সিসি ফুটেজ নিয়ে তোলপাড় : বিমান সূত্র জানায়, সম্প্রতি বিমানের হ্যাঙ্গারের প্রকৌশল বিভাগের সিসিটিভির মনিটরিং ফুটেজে ঘুমের দৃশ্য আসার পর ফাঁস হয় ওভারটাইমের অনিয়ম। এ নিয়ে বিমানে চলছে তোলপাড়। গত জুন মাসের ওভারটাইমের বেশি বিল দেখে ক্ষোভ ঝাড়েন বিমানের উপমহাব্যবস্থাপক ও পরিচালক চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার সৈয়দ মইন উদ্দীন। তার আপত্তির কারণে বিল কমাতে বাধ্য করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে তিন শিফটে আসা কর্মীরা বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটান। আবার কেউ হাজিরা দিয়ে চলে যান। বিষয়টি কেউ খোঁজও রাখেন না।

প্রায় শতাধিক কর্মী ‘ওভারটাইম সিস্টেমে’র সুবিধা নিচ্ছেন প্রতিদিন। এমনকি বিমানে নানা সংস্কারের বুলি আওড়ানোর মধ্যেও ভেতরে রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেকে বসা দুর্নীতি ও হরিলুট বন্ধ হচ্ছে না।

বছরে গচ্ছা ১৮ কোটি : বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, মোটর পরিবহন (এমটি), ট্রাফিক এবং প্রকৌশল শাখার ওভারটাইম (অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা) বিল নিয়ে চলছে নজিরবিহীন জালিয়াতি। কোনো কোনো বিভাগে মাসে ডিউটি না করেই ভুয়া রোস্টার দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে বিমানকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় দেড় কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে, যা বছরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ১৮ কোটি টাকায়। বিমানের ওভারটাইম জালিয়াতির সবচেয়ে বড় খাত হলো ‘কাজ না করে ঘরে বসে বিল তোলা’। বিমানে ডিজিটাল বা বায়োমেট্রিক হাজিরার নিয়ম থাকলেও তা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ডিউটি অফিসারদের ম্যানেজ করে ম্যানুয়াল শিট বা খাতায় সই দিয়ে হাজিরা দিচ্ছেন কেউ। ফলে একজন কর্মী একই সময়ে দুটি ভিন্ন ডিউটি দেখিয়ে দ্বিগুণ ওভারটাইম তুলে নিচ্ছেন। সাধারণ সরকারি ছুটির দিনগুলোয় বিমানের শিফট ডিউটিতে অতিরিক্ত কর্মীর প্রয়োজন পড়ে। এসব দিনে অনেক কর্মচারী বাসায় অবস্থান করলেও হাজিরা খাতায় তাদের নাম ‘অন ডিউটি’ হিসেবে নথিভুক্ত থাকে। মাস শেষে তারা শতভাগ উৎসব ও ছুটির দিনের ওভারটাইম ভাতা উত্তোলন করেন।

বেতনের চেয়ে ওভারটাইমের বিল বেশি : নাম প্রকাশ না করে বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সম্প্রতি সিসিটিভি ফুটেজের ঘটনায় সর্বত্র তোলপাড় চলছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা গভীরে গিয়ে তদন্ত করি। তদন্তে দেখা গেছে, হ্যাঙ্গার ইউনিটসহ আরও কয়েকটি ইউনিটের একাধিক শিফটে ২৫ থেকে ৩০ জন করে স্টাফ ওভারটাইম করেন। রাতের বেলায় এসে কাজ না করে তারা কেউ রেস্ট রুমে, কেউবা মসজিদে ঘুমিয়ে সময় পার করে দেন। বিশেষ করে রাতের শিফটে হ্যাঙ্গারের ৮ নম্বর গেট দিয়ে বিমানের গাড়িতে করে প্রবেশ করেন তারা। এরপর কেউ কেউ শুধু ফিঙ্গার দিয়ে ওই গাড়িতেই চলে যান। আবার অনেকে ঘুমিয়ে সময় কাটিয়ে দেন। ওই এলাকায় পাঁচটি রেস্টরুম ও একটি মসজিদ রয়েছে। তারা সেখানে ঘুমান।’ তিনি বলেন, ‘একেকজনের মাসে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা ওভারটাইমের বিল আসে। বিমানের টাকা কীভাবে অপচয় হচ্ছে, ওভারটাইম তার জ্বলন্ত প্রমাণ। সরকার যখন কৃচ্ছ্রসাধনের দিকে যাচ্ছে, তখন এ অনিয়ম চলতে দেওয়া যায় না।’

অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি : গত ৩ বছরে বিমানের ওভারটাইম খাতের ব্যয় জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল আংশিক চালু হওয়ার অজুহাত এবং উড়োজাহাজের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজের চাপ বাড়ার অজুহাতে ওভারটাইম বিল দ্বিগুণ করা হচ্ছে। প্রতি মাসে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কার্গো সার্ভিসে ওভারটাইম খাতের প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যয় হয় এ বিভাগে। কারিগরি কাজের অজুহাতে অস্বাভাবিক ওভারটাইম দেখানো হয়, যা মোট ব্যয়ের ২০ শতাংশ। বিমানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ বেশ কয়েকবার এ অস্বাভাবিক খরচের ওপর আপত্তি জানিয়ে প্রতিবেদন জমা দিলেও রহস্যজনক কারণে সেসবের ওপর কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ আছে।

সিণ্ডিকেটের দৌরাত্ম্য : বিমানের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, এ চক্রের খুঁটির জোর গভীরে। অতীতে বেশ কয়েকজন সৎ প্রশাসন কর্মকর্তা ওভারটাইমে বায়োমেট্রিক হাজিরা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিলেও ’সুবিধাভোগী গ্রুপটি’ বিরোধিতা করে। ফলে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারাও ‘ওভারটাইম বাণিজ্য’ দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ওভারটাইমে অনিয়ম বন্ধ করতে হলে ১০০ শতাংশ বায়োমেট্রিক হাজিরা চালু করতেই হবে’। ম্যানুয়াল বা রেজিস্টার খাতায় সই করার পদ্ধতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই একজন যাতে কর্মী মাসে তার বেসিক কর্মঘণ্টার ৩০ শতাংশের বেশি অতিরিক্ত কাজ করতে না পারেন, তা সিস্টেমে লক করে দিতে হবে। অফিসে কাজের চাপ বেশি থাকলে প্রয়োজনে চুক্তিভিত্তিক দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে।’

লন্ডন, কানাডা, দুবাইসহ আউট স্টেশনগুলোয় চোখ : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের লন্ডন, কানাডা, দুবাইসহ সব আউট স্টেশনের সার্বিক কর্মকাণ্ডের ওপর চোখ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি গোয়েন্দারাও শুরু করেছে নজরদারি। এসব স্টেশনে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কতটুকু দায়িত্ব পালন করছেন, আবার কারা অনিয়ম দুর্নীতির পাশাপাশি সরকারের ভাবমর্যাদা ক্ষুন্নের সঙ্গে কমবেশি জড়িত, এসব রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। বিমানের বিদেশে পূর্ব এবং পশ্চিম জোন মিলিয়ে ১৯টি আউট স্টেশন রয়েছে। স্টেশনগুলো হচ্ছে সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, কলকাতা, দিল্লি, কাঠমান্ডু, মাস্কাট, আবুধাবি, দোহা, শারজাহ, কুয়েত, দুবাই, জেদ্দা, মদিনা, দাম্মাম, রিয়াদ, হিথ্রো-ম্যানচেস্টার, ইতালির রোম ও কানাডা। এসব স্টেশনে ওভারটাইম নিয়েও কারসাজি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী : এভিয়েশন বিশ্লেষক ও বিমানের সাবেক এক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী। লোকসান হলেও সেটা বিকল্প কায়দায় চালু রাখলে আজকে পরিস্থিতি হতো ভিন্ন। কিন্তু কালের ব্যবধানে আজ এটা প্রমাণিত নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট বন্ধ করে কফিনে সর্বশেষ পেরেক মারা হয়েছে। একদিকে আমলাতান্ত্রিক দাপট অন্যদিকে হটকারি সিদ্ধান্তের কারণে বিমানের যখন মুখ থুবড়ে পড়ার অবস্থা তখন বিমানকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও পুনর্গঠন করার লক্ষ্যে ২০০৭ সালের ২৩ জুলাই বিমানকে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা হয়, যা সম্পূর্ণভাবে সরকারি মালিকানাধীন এবং এটি ১৩ সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, নানা অনিয়মের মধ্যে পার করছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটি। দীর্ঘদিন ধরেই ওভারটাইম নিয়ে চলছে হরিলুট। ওভারটাইম যারা করেন, তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না। হাজিরা দিয়েই কেউ কেউ চলে যান বাসায়। নেই কোনো জবাবদিহি। এখন সময় এসেছে ঊর্ধ্বতন থেকে শুরু করে অফিস সহকারীদেরও নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার। নানা কৌশল নিয়ে হলেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে বিমানকে।