ঢাকা ০৯:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ নিয়ম ভেঙে ১০৮ কোটি টাকার দরপত্র অনুমোদনের অভিযোগ ভিসির বিরুদ্ধে বড়লেখায় সিএনজি-পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৩ খালেদা জিয়া শিখিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে: বিমানমন্ত্রী বাউফলে ডাঃ নাসির উদ্দিনের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন যৌন হয়রানির অভিযোগে শিক্ষককে জুতার মালা পরিয়ে গণধোলাই দিল শিক্ষার্থীরা ​কুকুর হত্যা মামলায় দুজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পটুয়াখালীতে বাংলাদেশ দৈনিক মজুরি ভিত্তিক কর্মচারী সমিতির মানববন্ধন ব্রাহ্মণপাড়ার সীমান্তে নারী-শিশুসসহ ৪ জনের অনুপ্রবেশ চেষ্টা রুখে দিল বিজিবি ব্যাংক কর্মীদের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে হবে দুই মাসে

নিয়ম ভেঙে ১০৮ কোটি টাকার দরপত্র অনুমোদনের অভিযোগ ভিসির বিরুদ্ধে

সরকারি নিয়ম ভেঙে ১০৮ কোটি টাকার দরপত্র অনুমোদন দিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। যদিও এই অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার কেবল সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির। জাতীয় প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কেনাকাটা ও নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ারও প্রমাণ মিলেছে। তবে প্রতিবেদন জমা হওয়ার এক বছর পার হলেও এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তদন্তে ভিসি ছাড়াও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এ টি এম জাফরুল আজম ও প্রধান প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। একই সঙ্গে দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড ও প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের বিরুদ্ধেও আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন।

গত বছরের ১৪ জুলাই জমা হওয়া প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, দরপত্র প্রক্রিয়া এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়। কিন্তু এ সংক্রান্ত বিধানের লঙ্ঘন স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

প্রতিযোগিতা কমিশন সূত্রে জানা যায়, কমিশনের মামলা নং–০৩/২০২৫-এর অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বিড রিগিং বা টেন্ডার কারসাজি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এরপরও অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে।

কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে দায়মুক্তি বা লিনিয়েন্সি (লঘুদণ্ড বা ক্ষমা) কেবল একটি নির্দিষ্ট নিয়মে দেওয়া হয়। তা হলো, তদন্ত শুরুর আগেই স্বপ্রণোদিত হয়ে অপরাধ স্বীকার করতে হবে এবং পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপীয় কমিশন এই নীতি অনুসরণ করে।

বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ অনুযায়ী, এ ধরনের দায়মুক্তির কোনো বিধান নেই। ফলে স্বাধীন তদন্তে অনিয়ম প্রমাণের পর অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বেআইনি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

কারসাজির অভিযোগ তুলে কমিশনে আবেদন
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি লিথোকোড ও কিউআর কোডযুক্ত ওএমআর ফরম এবং উত্তরপত্র সরবরাহের জন্য দুটি লটে দরপত্র আহ্বান করে। এই প্রক্রিয়ায় কারসাজির অভিযোগ এনে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনে আবেদন করেন বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সচিব এ. কে. এম. নওশেরুল আলম।

অভিযোগে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড এবং প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং পারস্পরিক যোগসাজশে দরপত্র প্রভাবিত করেছে। এর মাধ্যমে আসল প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান দুটিকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়।

কমিশনের তদন্তে দেখা যায়, দরপত্রের লট-১-এ মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড ৫৪ কোটি ৩৪ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকায় এবং লট-২-এ প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড ৫৪ কোটি ২৫ লাখ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকায় কার্যাদেশ পায়। দুটি লট মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১০৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

মন্ত্রিসভা কমিটিকে পাস কাটিয়ে অনুমোদন
দরপত্র অনুমোদনের বিষয়টি তদন্তে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে উঠে এসেছে। সরকারের আর্থিক ক্ষমতা অর্পণসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, অ-উন্নয়ন বাজেটের আওতায় উপাচার্য সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূল্যের ক্রয়চুক্তি অনুমোদন করতে পারেন।

৩০-৫০ কোটি টাকা মূল্যের ক্রয়চুক্তি অনুমোদনের ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নির্বাহী প্রধান তথা সচিবের। এ ছাড়া অ-উন্নয়ন বাজেটের ৫০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের যে কোনো ক্রয়চুক্তি অনুমোদনের ক্ষমতা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিধান অনুসরণ না করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিজেই ১০৮ কোটি টাকার দরপত্র অনুমোদন করেছেন। এতে চুক্তিভুক্ত পক্ষগুলোর জন্য একটি সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে এবং সরকারি ক্রয়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।

একই অভিযোগে অন্য প্রতিষ্ঠানে গ্রেপ্তার
ক্রয়ক্ষমতা লঙ্ঘনের একই ধরনের অভিযোগে গত বছরের ১৮ জুন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ কে এম নূর-উন-নবী এবং আরেক সাবেক উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

এজাহারে বলা হয়, তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি উপেক্ষা করে নকশা পরিবর্তন করেন এবং ৩০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের চুক্তি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই সম্পন্ন করেন। ওই বছরের ৭ আগস্ট দুদকের মামলায় উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ গ্রেপ্তার হন।

একই ধরনের ক্ষমতা লঙ্ঘনের অভিযোগে যেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য গ্রেপ্তার পর্যন্ত হয়েছেন, সেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

একই ক্রয়কার্যে তিন পদ্ধতি
দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ক্রয়কার্য হবে ওপেন টেন্ডারিং মেথডে (ওটিএম)। কিন্তু বাস্তবে ব্যবহার করা হয়েছে ওয়ান স্টেজ টু এনভেলপস টেন্ডারিং মেথডের স্ট্যান্ডার্ড টেন্ডার ডকুমেন্ট (এসটিডি), যা সাধারণত টার্ন-কি প্রকল্প বা বৃহৎ শিল্প স্থাপনের জন্য ব্যবহৃত হয়।

ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করার সময় সেটিকে আবার ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ একই ক্রয়কার্যে তিনটি ভিন্ন পদ্ধতির উল্লেখ পাওয়া গেছে।

কমিশনের মতে, এ ধরনের অসামঞ্জস্য পুরো দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি এখনও পণ্য কেনার জন্য ওয়ান স্টেজ টু এনভেলপস পদ্ধতির কোনো অনুমোদিত স্ট্যান্ডার্ড ডকুমেন্ট প্রকাশ করেনি। ফলে শুরু থেকেই এই দরপত্র প্রক্রিয়া বিধিসম্মত ছিল না।

শর্তের কারসাজিতে বাদ পড়ে তিন প্রতিষ্ঠান
এসটিডি অনুযায়ী একই ধরনের একটি কাজ সম্পন্নের অভিজ্ঞতা থাকলেই যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ ছিল। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অতিরিক্ত শর্ত হিসেবে গত তিন বছরে অন্তত দুটি ৪০ কোটি টাকার চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করে।

অন্যদিকে সম্ভাব্য দরদাতার বার্ষিক টার্নওভার, চলতি মূলধন বা নগদ অর্থের মতো আর্থিক সক্ষমতার কোনো শর্ত ছিল না।

কমিশনের মতে, এ ধরনের শর্ত প্রকৃত প্রতিযোগিতা সীমিত করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আরোপ করা হয়। এ ছাড়া মূল্যায়ন কমিটি মাস্টার সিমেক্স পেপার ও প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং ছাড়া অংশ নেওয়া অন্য তিন প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ মনোস্পুল পেপার লিমিটেড এবং এলিট প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজেস লিমিটেডকে টেকনিক্যালি নন-রেসপনসিভ ঘোষণা করে। তবে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কেন তাদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

কাজ ভাগাভাগির সমঝোতা
তদন্তে দরপত্র জালিয়াতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দরদাতাদের অবস্থান। একটি লটে মাস্টার সিমেক্স পেপার সর্বনিম্ন দরদাতা এবং প্রিন্ট মাস্টার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। অন্য লটে ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায়, প্রিন্ট মাস্টার সর্বনিম্ন এবং মাস্টার সিমেক্স দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা।

কমিশনের মতে, এই বিন্যাস স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার ফল নয়; বরং পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগির স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। গত পাঁচ বছর ধরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ধরনের কাজ ধারাবাহিকভাবে মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড পেয়ে আসছে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান এই কাজ পায়নি। এটি ওই প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া অবস্থান তৈরির ইঙ্গিত।

যা বলছেন অভিযুক্তরা
দরপত্রের এই অনিয়মের তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক তোফায়েল আহমেদ খান দাবি করেন, তাদের প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে এবং সব শর্ত পূরণ করেই কাজ পেয়েছে। মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেডের পরিচালক (বিপণন ও প্রশাসন) শেখ ইমরান হোসেন অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান ভিসির অনুমোদনক্রমে কমিশনকে জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জরুরিভিত্তিতে পরীক্ষা নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কাজটি প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় সরল বিশ্বাসে ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এতে কোনো অস্বচ্ছতা ছিল না।

মামলার বাদী বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন গত ৩ আগস্ট অভিযোগ প্রত্যাহারের আবেদন করে। তবে সেই আবেদন গ্রহণ না করে প্রতিযোগিতা কমিশন জানায়, তারা স্বাধীনভাবে সংগৃহীত নথি, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত অব্যাহত রাখে।

কমিশনের সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দরপত্রে যোগসাজশ ও আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। এতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যাল্যের উপাচার্য, ট্রেজারার, প্রধান প্রকৌশলী এবং অভিযুক্ত দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে কমিশনের সিদ্ধান্তে জানানো হয়।

ভবিষ্যতে অনিয়ম রোধে কমিশন সরকারি সব কেনাকাটা ই-জিপি ব্যবস্থায় আনা ও আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি ব্লকচেইন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে টেন্ডার কারসাজি শনাক্তের প্রযুক্তি চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন।

কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের উপপরিচালক ও তদন্ত কর্মকর্তা মো. নাজিম উদ্দীন হোসেন বলেন, ‘আমি এখন প্রতিযোগিতা কমিশনে নেই। সে সময় তদন্তের পর প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। পরবর্তী সিদ্ধান্ত কমিশন নেবে। এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।’

জাতীয় প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন এ এইচ এম আহসান বলেন, ‘এই মামলায় তদন্তের পর কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেটি আমাকে কাগজপত্র দেখে বলতে হবে।’ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশ্ন শুনে এই বিষয়ে উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং সচিব আবদুল খালেককে একাধিকবার কল করে ও মেসেজ দিয়েও পাওয়া যায়নি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রয় খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি দীর্ঘদিনের আলোচিত সমস্যা। প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম চিহ্নিত করে উপাচার্য, ট্রেজারার ও প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার সুপারিশ করলেও কমিশন অথবা বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে বর্তমান সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান থেকে অনতিবিলম্বে এ সুপারিশ বাস্তবায়ন করা উচিত। শুধু বিভাগীয় পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, দুদক আইন অনুযায়ী তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ

নিয়ম ভেঙে ১০৮ কোটি টাকার দরপত্র অনুমোদনের অভিযোগ ভিসির বিরুদ্ধে

আপডেট সময় ০৮:১৭:৫০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

সরকারি নিয়ম ভেঙে ১০৮ কোটি টাকার দরপত্র অনুমোদন দিয়েছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। যদিও এই অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার কেবল সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির। জাতীয় প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কেনাকাটা ও নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ারও প্রমাণ মিলেছে। তবে প্রতিবেদন জমা হওয়ার এক বছর পার হলেও এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তদন্তে ভিসি ছাড়াও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. এ টি এম জাফরুল আজম ও প্রধান প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। একই সঙ্গে দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড ও প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের বিরুদ্ধেও আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন।

গত বছরের ১৪ জুলাই জমা হওয়া প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, দরপত্র প্রক্রিয়া এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন নির্দিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়। কিন্তু এ সংক্রান্ত বিধানের লঙ্ঘন স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

প্রতিযোগিতা কমিশন সূত্রে জানা যায়, কমিশনের মামলা নং–০৩/২০২৫-এর অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বিড রিগিং বা টেন্ডার কারসাজি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এরপরও অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে।

কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে দায়মুক্তি বা লিনিয়েন্সি (লঘুদণ্ড বা ক্ষমা) কেবল একটি নির্দিষ্ট নিয়মে দেওয়া হয়। তা হলো, তদন্ত শুরুর আগেই স্বপ্রণোদিত হয়ে অপরাধ স্বীকার করতে হবে এবং পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপীয় কমিশন এই নীতি অনুসরণ করে।

বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২ অনুযায়ী, এ ধরনের দায়মুক্তির কোনো বিধান নেই। ফলে স্বাধীন তদন্তে অনিয়ম প্রমাণের পর অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বেআইনি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

কারসাজির অভিযোগ তুলে কমিশনে আবেদন
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি লিথোকোড ও কিউআর কোডযুক্ত ওএমআর ফরম এবং উত্তরপত্র সরবরাহের জন্য দুটি লটে দরপত্র আহ্বান করে। এই প্রক্রিয়ায় কারসাজির অভিযোগ এনে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনে আবেদন করেন বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সচিব এ. কে. এম. নওশেরুল আলম।

অভিযোগে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড এবং প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং পারস্পরিক যোগসাজশে দরপত্র প্রভাবিত করেছে। এর মাধ্যমে আসল প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান দুটিকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়।

কমিশনের তদন্তে দেখা যায়, দরপত্রের লট-১-এ মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড ৫৪ কোটি ৩৪ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকায় এবং লট-২-এ প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড ৫৪ কোটি ২৫ লাখ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকায় কার্যাদেশ পায়। দুটি লট মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১০৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

মন্ত্রিসভা কমিটিকে পাস কাটিয়ে অনুমোদন
দরপত্র অনুমোদনের বিষয়টি তদন্তে গুরুতর অনিয়ম হিসেবে উঠে এসেছে। সরকারের আর্থিক ক্ষমতা অর্পণসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, অ-উন্নয়ন বাজেটের আওতায় উপাচার্য সর্বোচ্চ ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূল্যের ক্রয়চুক্তি অনুমোদন করতে পারেন।

৩০-৫০ কোটি টাকা মূল্যের ক্রয়চুক্তি অনুমোদনের ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নির্বাহী প্রধান তথা সচিবের। এ ছাড়া অ-উন্নয়ন বাজেটের ৫০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের যে কোনো ক্রয়চুক্তি অনুমোদনের ক্ষমতা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিধান অনুসরণ না করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিজেই ১০৮ কোটি টাকার দরপত্র অনুমোদন করেছেন। এতে চুক্তিভুক্ত পক্ষগুলোর জন্য একটি সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে এবং সরকারি ক্রয়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।

একই অভিযোগে অন্য প্রতিষ্ঠানে গ্রেপ্তার
ক্রয়ক্ষমতা লঙ্ঘনের একই ধরনের অভিযোগে গত বছরের ১৮ জুন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ কে এম নূর-উন-নবী এবং আরেক সাবেক উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

এজাহারে বলা হয়, তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি উপেক্ষা করে নকশা পরিবর্তন করেন এবং ৩০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের চুক্তি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই সম্পন্ন করেন। ওই বছরের ৭ আগস্ট দুদকের মামলায় উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ গ্রেপ্তার হন।

একই ধরনের ক্ষমতা লঙ্ঘনের অভিযোগে যেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য গ্রেপ্তার পর্যন্ত হয়েছেন, সেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

একই ক্রয়কার্যে তিন পদ্ধতি
দরপত্র বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, ক্রয়কার্য হবে ওপেন টেন্ডারিং মেথডে (ওটিএম)। কিন্তু বাস্তবে ব্যবহার করা হয়েছে ওয়ান স্টেজ টু এনভেলপস টেন্ডারিং মেথডের স্ট্যান্ডার্ড টেন্ডার ডকুমেন্ট (এসটিডি), যা সাধারণত টার্ন-কি প্রকল্প বা বৃহৎ শিল্প স্থাপনের জন্য ব্যবহৃত হয়।

ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করার সময় সেটিকে আবার ফ্রেমওয়ার্ক কন্ট্রাক্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ একই ক্রয়কার্যে তিনটি ভিন্ন পদ্ধতির উল্লেখ পাওয়া গেছে।

কমিশনের মতে, এ ধরনের অসামঞ্জস্য পুরো দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি এখনও পণ্য কেনার জন্য ওয়ান স্টেজ টু এনভেলপস পদ্ধতির কোনো অনুমোদিত স্ট্যান্ডার্ড ডকুমেন্ট প্রকাশ করেনি। ফলে শুরু থেকেই এই দরপত্র প্রক্রিয়া বিধিসম্মত ছিল না।

শর্তের কারসাজিতে বাদ পড়ে তিন প্রতিষ্ঠান
এসটিডি অনুযায়ী একই ধরনের একটি কাজ সম্পন্নের অভিজ্ঞতা থাকলেই যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ ছিল। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অতিরিক্ত শর্ত হিসেবে গত তিন বছরে অন্তত দুটি ৪০ কোটি টাকার চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করে।

অন্যদিকে সম্ভাব্য দরদাতার বার্ষিক টার্নওভার, চলতি মূলধন বা নগদ অর্থের মতো আর্থিক সক্ষমতার কোনো শর্ত ছিল না।

কমিশনের মতে, এ ধরনের শর্ত প্রকৃত প্রতিযোগিতা সীমিত করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আরোপ করা হয়। এ ছাড়া মূল্যায়ন কমিটি মাস্টার সিমেক্স পেপার ও প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং ছাড়া অংশ নেওয়া অন্য তিন প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ মনোস্পুল পেপার লিমিটেড এবং এলিট প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজেস লিমিটেডকে টেকনিক্যালি নন-রেসপনসিভ ঘোষণা করে। তবে মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কেন তাদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

কাজ ভাগাভাগির সমঝোতা
তদন্তে দরপত্র জালিয়াতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দরদাতাদের অবস্থান। একটি লটে মাস্টার সিমেক্স পেপার সর্বনিম্ন দরদাতা এবং প্রিন্ট মাস্টার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। অন্য লটে ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায়, প্রিন্ট মাস্টার সর্বনিম্ন এবং মাস্টার সিমেক্স দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা।

কমিশনের মতে, এই বিন্যাস স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার ফল নয়; বরং পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগির স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। গত পাঁচ বছর ধরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ধরনের কাজ ধারাবাহিকভাবে মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেড পেয়ে আসছে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান এই কাজ পায়নি। এটি ওই প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া অবস্থান তৈরির ইঙ্গিত।

যা বলছেন অভিযুক্তরা
দরপত্রের এই অনিয়মের তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। প্রিন্ট মাস্টার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক তোফায়েল আহমেদ খান দাবি করেন, তাদের প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে এবং সব শর্ত পূরণ করেই কাজ পেয়েছে। মাস্টার সিমেক্স পেপার লিমিটেডের পরিচালক (বিপণন ও প্রশাসন) শেখ ইমরান হোসেন অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান ভিসির অনুমোদনক্রমে কমিশনকে জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জরুরিভিত্তিতে পরীক্ষা নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কাজটি প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় সরল বিশ্বাসে ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এতে কোনো অস্বচ্ছতা ছিল না।

মামলার বাদী বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশন গত ৩ আগস্ট অভিযোগ প্রত্যাহারের আবেদন করে। তবে সেই আবেদন গ্রহণ না করে প্রতিযোগিতা কমিশন জানায়, তারা স্বাধীনভাবে সংগৃহীত নথি, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত অব্যাহত রাখে।

কমিশনের সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দরপত্রে যোগসাজশ ও আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পেয়েছে কমিশন। এতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যাল্যের উপাচার্য, ট্রেজারার, প্রধান প্রকৌশলী এবং অভিযুক্ত দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে কমিশনের সিদ্ধান্তে জানানো হয়।

ভবিষ্যতে অনিয়ম রোধে কমিশন সরকারি সব কেনাকাটা ই-জিপি ব্যবস্থায় আনা ও আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি ব্লকচেইন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে টেন্ডার কারসাজি শনাক্তের প্রযুক্তি চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন।

কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের উপপরিচালক ও তদন্ত কর্মকর্তা মো. নাজিম উদ্দীন হোসেন বলেন, ‘আমি এখন প্রতিযোগিতা কমিশনে নেই। সে সময় তদন্তের পর প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। পরবর্তী সিদ্ধান্ত কমিশন নেবে। এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই।’

জাতীয় প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন এ এইচ এম আহসান বলেন, ‘এই মামলায় তদন্তের পর কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেটি আমাকে কাগজপত্র দেখে বলতে হবে।’ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রশ্ন শুনে এই বিষয়ে উত্তর দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং সচিব আবদুল খালেককে একাধিকবার কল করে ও মেসেজ দিয়েও পাওয়া যায়নি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রয় খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি দীর্ঘদিনের আলোচিত সমস্যা। প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম চিহ্নিত করে উপাচার্য, ট্রেজারার ও প্রধান প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার সুপারিশ করলেও কমিশন অথবা বিগত অন্তর্বর্তী সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে বর্তমান সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান থেকে অনতিবিলম্বে এ সুপারিশ বাস্তবায়ন করা উচিত। শুধু বিভাগীয় পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, দুদক আইন অনুযায়ী তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রীয় অর্থে পরিচালিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।