ঢাকা ০৭:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশন (বিএফএ) এর নির্বাচন ২০২৬-২৮ অনুষ্ঠিত গ্রেডভিত্তিক বিভাজন শিক্ষার্থীদের মানসিক কারাগারে বন্দি করে: তথ্যমন্ত্রী ভোটের ২৫ দিন আগেই চূড়ান্ত হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব ভোটকেন্দ্র বাবার দাফনের পর প্রথমবার মুখ খুললেন মোজতবা বাঞ্ছারামপুর যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাকরির নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ বিমানে শাজাহান-শামিমা দম্পতির বিরুদ্ধে দাপটের অভিযোগ ট্রাম্পের সঙ্গে গলফ খেলাকে ‘অবাস্তব অনুভূতি’ বললেন হ্যারি কেইন প্রকল্পের নির্মাণ শুরুর আগেই পরামর্শে ২৩১ কোটি টাকার ব্যয় দক্ষ শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার্থীরা আলোকিত হতে পারে না: রিজভী শিল্পায়ন হবে, তবে পরিবেশের ক্ষতি করে নয়: পরিবেশমন্ত্রী

প্রকল্পের নির্মাণ শুরুর আগেই পরামর্শে ২৩১ কোটি টাকার ব্যয়

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ ছিল এক ধরনের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনি ইশতেহার, উন্নয়ন পরিকল্পনা, মন্ত্রী-এমপিদের ঘোষণায় বারবার এসেছে প্রকল্পটির নাম। হয়েছে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, অনুমোদন পেয়েছে একনেকে, কয়েক দফা বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়। কিন্তু বাস্তবে এক ইঞ্চি রেললাইনও বসেনি। দীর্ঘ সময় ধরে তাই অনেকেই একে বলতে শুরু করেন ‘কাগজের রেলপথ’।

তবে এবার সেই চিত্র কিছুটা বদলাতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন পরিকল্পনার টেবিলে আটকে থাকা প্রকল্পটি এখন মাঠপর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, অর্থাৎ ভূমি অধিগ্রহণে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখছে। বগুড়া অংশের চার উপজেলার ৫৬টি মৌজায় যৌথ তদন্ত (জয়েন্ট ভেরিফিকেশন) শেষ হয়েছে। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে প্রায় এক হাজার ৯৬৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ছাড় করেছে। এরইমধ্যে চেক বিতরণও শুরু হয়েছে।

কিন্তু এই অগ্রগতির মধ্যেই সামনে এসেছে আরেকটি বড় প্রশ্ন। প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি। অথচ শুধু পরামর্শক (কনসালটেন্সি) খাতের ব্যয়ই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। প্রথম অনুমোদনের সময় যেখানে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, সেখানে সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ পরামর্শক ব্যয় বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশনও।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেলপথ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে পরামর্শক ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের যৌক্তিকতা জানতে চান কমিশনের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে কেন পরামর্শক ব্যয় এত বেশি বাড়ানো হয়েছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের অর্থায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন, বিদেশি ঋণদাতা সংস্থার শর্ত, অতিরিক্ত কারিগরি তদারকি এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে যাওয়ার কারণে পরামর্শক ব্যয় বেড়েছে। তবে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ব্যয়ের প্রতিটি খাতের যৌক্তিকতা নতুন করে যাচাই করা প্রয়োজন।

এক নজরে প্রকল্প
প্রকল্প: বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেলপথ
দৈর্ঘ্য: প্রায় ৮৬.২ কিলোমিটার
প্রস্তাবিত স্টেশন: ৯টি
বগুড়ায় অধিগ্রহণযোগ্য জমি: ৪৮১.০৯ একর
যৌথ তদন্ত শেষ: ৫৬টি মৌজা
ভূমি অধিগ্রহণে বরাদ্দ: ১,৯৬৯.১০ কোটি টাকা
২০১৮ সালের ব্যয়: ৫,৫৭৯.৭০ কোটি টাকা
বর্তমান সংশোধিত প্রস্তাব: প্রায় ১২,৫০০ কোটি টাকা
ঢাকার সঙ্গে রেল দূরত্ব কমবে: প্রায় ১১২ কিলোমিটার
যাত্রাসময় সাশ্রয়: প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা

দীর্ঘ ৮ বছরেও শুরু হয়নি নির্মাণকাজ
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন হয় ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়। তখন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সেই সময় পরিকল্পনা ছিল ২০২৩ সালের জুনের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করার।

কিন্তু বাস্তবে সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেছে প্রায় তিন বছর আগে। এই সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ তো দূরের কথা, ভূমি অধিগ্রহণও সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘসূত্রতা, জমির মূল্যবৃদ্ধি, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, নতুন অবকাঠামো সংযোজন এবং অর্থায়নের ধরন পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ অনুমোদনের সময়ের তুলনায় ব্যয় প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির অর্থায়নেও বড় পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে ভারতীয় ঋণের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে প্রকল্পের নকশা, অর্থায়ন কাঠামো এবং কিছু কারিগরি বিষয়ও নতুন করে পর্যালোচনা করতে হয়েছে।

৫৬ মৌজায় শেষ যৌথ তদন্ত
বগুড়া জেলা প্রশাসনের নথি অনুযায়ী, বগুড়া সদর, শাজাহানপুর, শেরপুর ও কাহালু উপজেলার মোট ৪৮১ দশমিক ০৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এরইমধ্যে ৫৬টি মৌজার যৌথ তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। মাঠ জরিপ, ভিডিও ধারণ, দাগ নম্বর যাচাই, মালিকানা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষার কাজও শেষ হয়েছে।

গত ২২ জুন ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ এক হাজার ৯৬৯ কোটি ১০ লাখ টাকার চেক বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পৌঁছায়। এখন পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের মধ্যে ক্ষতিপূরণের অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে জটিল অংশ হচ্ছে মালিকানা যাচাই ও আপত্তি নিষ্পত্তি। এই ধাপ শেষ হওয়ায় এখন জমি বুঝে নেওয়ার কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পি. এম. ইমরুল কায়েস বলেন, সরকার থেকে অর্থ পাওয়া গেছে। আইন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। ভূমি অধিগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে।

কেন বাড়লো শুধু পরামর্শক ব্যয়?
প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে পরামর্শক ব্যয়। পরিকল্পনা কমিশনের নথি বলছে, মূল অনুমোদনের সময় পরামর্শক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এখন সেই ব্যয় বাড়িয়ে ২৩১ কোটি ৭১ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু এই একটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৬৩ কোটি টাকা।

পিইসি সভায় কমিশনের কর্মকর্তারা জানতে চান, এত বড় অঙ্কের অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় হবে এবং এই মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা কী?

প্রকল্প পরিচালক আর জাহাঙ্গীর মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, পরামর্শক খাতে অর্থ রাখা হয়েছে যাতে বাস্তবায়নের সময় কোনো কারিগরি ঘাটতি না থাকে। পিইসি সভায় যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে ব্যয়ের যৌক্তিকতা আরও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হবে।

তিনি বলেন, ভারতীয় ঋণের পরিবর্তে এআইআইবির অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী অতিরিক্ত কিছু কারিগরি পরামর্শক, নকশা যাচাই এবং তদারকির প্রয়োজন হয়েছে। এসব কারণেও ব্যয় বেড়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই রেলপথ
সংশ্লিষ্টদের মতে, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেলপথ শুধু একটি নতুন রেললাইন নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি বিকল্প পরিবহন করিডোর। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত প্রায় ৮৬ কিলোমিটার নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ হবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সেতু, কালভার্ট, নতুন স্টেশন, লুপলাইন, সিগন্যালিং ও রেল অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

প্রকল্পের আওতায় করতোয়া নদীর ওপর প্রায় ২৪৬ মিটার দীর্ঘ একটি বড় সেতু, ইছামতী নদীর ওপর প্রায় ২০৫ মিটার দীর্ঘ আরেকটি সেতু, শতাধিক ছোট-বড় কালভার্ট, নতুন স্টেশন ভবন, রেলওয়ে ওভারপাস এবং প্রয়োজনীয় অপারেশনাল অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগে একটি নতুন করিডোর যুক্ত হবে।

রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই রেললাইন চালু হলে উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকার সঙ্গে একটি বিকল্প রেলপথ তৈরি হবে। বর্তমানে যেসব ট্রেন যমুনা সেতু হয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে রাজধানীতে যায়, ভবিষ্যতে এই করিডোর ব্যবহার করলে রেলপথের দূরত্ব প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমে আসবে। এতে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী উভয় ট্রেনের যাত্রাসময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
বগুড়া, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষি অর্থনীতি এখনো অনেকটাই সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল। এই অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আলু, ধান, ভুট্টা, সবজি, মাছ, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। কিন্তু পরিবহনের বড় অংশই হয় মহাসড়ক দিয়ে। যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া এবং দীর্ঘ যাত্রার কারণে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় বাড়ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন রেলপথ চালু হলে একই সঙ্গে বেশি পরিমাণ কৃষিপণ্য কম খরচে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো সম্ভব হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে, বাজারজাতকরণ সহজ হবে এবং কৃষকে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি সাইরুল ইসলাম বলেন, এটি শুধু বগুড়ার প্রকল্প নয়। উত্তরাঞ্চলের অন্তত আট থেকে দশটি জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। রেলপথ চালু হলে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং শিল্প বিনিয়োগও বাড়বে।

মহাসড়কের ওপর চাপ কমবে
ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক বর্তমানে দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক করিডোর। ঈদ, পূজা কিংবা সরকারি ছুটির সময় কয়েকশ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট এখন প্রায় নিয়মিত চিত্র। অনেক সময় বগুড়া থেকে ঢাকায় যেতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টাও লেগে যায়।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের একটি বড় অংশ যদি রেলপথে স্থানান্তর করা যায় তাহলে মহাসড়কের ওপর চাপ অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে কমবে জ্বালানি ব্যয়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং যানজটজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি।

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেল প্রকল্প / ভূমি অধিগ্রহণের এক হাজার ৯২০ কোটি টাকা ছাড়
পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহম্মেদ বলেন, এটি শুধু একটি নতুন রেললাইন নয়, উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি বিকল্প পরিবহন করিডোর। দীর্ঘমেয়াদে সড়কপথের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে
যদিও ভূমি অধিগ্রহণে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে, তবুও প্রকল্পটির সামনে এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাকি। ভূমি অধিগ্রহণ শেষে জমি বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এরপর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান, ঠিকাদার নিয়োগ, পূর্ণাঙ্গ অর্থায়নের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং নির্মাণকাজ শুরু করতে হবে। অতীতে একাধিকবার সময়সীমা পেছানো এবং ব্যয় বৃদ্ধির অভিজ্ঞতা থাকায় সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এসব ধাপে আবারও বিলম্ব হলে প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

এদিকে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাবে শুধু পরামর্শক ব্যয় নয়, বিভিন্ন খাতেই মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় পরিকল্পনা কমিশন খাতভিত্তিক ব্যয়ের যৌক্তিকতা পুনরায় যাচাই করছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুরু থেকেই কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

প্রকল্প পরিচালক আর জাহাঙ্গীর মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন পর প্রকল্পটি বাস্তব অগ্রগতির মুখ দেখছে। বগুড়া অংশে যৌথ তদন্তসহ প্রয়োজনীয় প্রাথমিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। ক্ষতিপূরণ প্রদান চলমান। জমি বুঝে পাওয়া গেলে দরপত্র আহ্বান এবং মূল নির্মাণকাজ শুরুর প্রশাসনিক প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে।

বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, সরকারের বরাদ্দ পাওয়া অর্থ থেকে পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের লক্ষ্য হলো আইনানুগ, স্বচ্ছ ও দ্রুত প্রক্রিয়ায় ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে নির্ধারিত জমি বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে হস্তান্তর করা।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশন (বিএফএ) এর নির্বাচন ২০২৬-২৮ অনুষ্ঠিত

প্রকল্পের নির্মাণ শুরুর আগেই পরামর্শে ২৩১ কোটি টাকার ব্যয়

আপডেট সময় ০৫:৫২:৫৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ ছিল এক ধরনের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনি ইশতেহার, উন্নয়ন পরিকল্পনা, মন্ত্রী-এমপিদের ঘোষণায় বারবার এসেছে প্রকল্পটির নাম। হয়েছে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, অনুমোদন পেয়েছে একনেকে, কয়েক দফা বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়। কিন্তু বাস্তবে এক ইঞ্চি রেললাইনও বসেনি। দীর্ঘ সময় ধরে তাই অনেকেই একে বলতে শুরু করেন ‘কাগজের রেলপথ’।

তবে এবার সেই চিত্র কিছুটা বদলাতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন পরিকল্পনার টেবিলে আটকে থাকা প্রকল্পটি এখন মাঠপর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, অর্থাৎ ভূমি অধিগ্রহণে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখছে। বগুড়া অংশের চার উপজেলার ৫৬টি মৌজায় যৌথ তদন্ত (জয়েন্ট ভেরিফিকেশন) শেষ হয়েছে। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে প্রায় এক হাজার ৯৬৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ছাড় করেছে। এরইমধ্যে চেক বিতরণও শুরু হয়েছে।

কিন্তু এই অগ্রগতির মধ্যেই সামনে এসেছে আরেকটি বড় প্রশ্ন। প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি। অথচ শুধু পরামর্শক (কনসালটেন্সি) খাতের ব্যয়ই বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। প্রথম অনুমোদনের সময় যেখানে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, সেখানে সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ পরামর্শক ব্যয় বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশনও।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেলপথ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে পরামর্শক ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের যৌক্তিকতা জানতে চান কমিশনের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে কেন পরামর্শক ব্যয় এত বেশি বাড়ানো হয়েছে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের অর্থায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন, বিদেশি ঋণদাতা সংস্থার শর্ত, অতিরিক্ত কারিগরি তদারকি এবং দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে যাওয়ার কারণে পরামর্শক ব্যয় বেড়েছে। তবে পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ব্যয়ের প্রতিটি খাতের যৌক্তিকতা নতুন করে যাচাই করা প্রয়োজন।

এক নজরে প্রকল্প
প্রকল্প: বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেলপথ
দৈর্ঘ্য: প্রায় ৮৬.২ কিলোমিটার
প্রস্তাবিত স্টেশন: ৯টি
বগুড়ায় অধিগ্রহণযোগ্য জমি: ৪৮১.০৯ একর
যৌথ তদন্ত শেষ: ৫৬টি মৌজা
ভূমি অধিগ্রহণে বরাদ্দ: ১,৯৬৯.১০ কোটি টাকা
২০১৮ সালের ব্যয়: ৫,৫৭৯.৭০ কোটি টাকা
বর্তমান সংশোধিত প্রস্তাব: প্রায় ১২,৫০০ কোটি টাকা
ঢাকার সঙ্গে রেল দূরত্ব কমবে: প্রায় ১১২ কিলোমিটার
যাত্রাসময় সাশ্রয়: প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা

দীর্ঘ ৮ বছরেও শুরু হয়নি নির্মাণকাজ
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন হয় ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায়। তখন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সেই সময় পরিকল্পনা ছিল ২০২৩ সালের জুনের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করার।

কিন্তু বাস্তবে সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেছে প্রায় তিন বছর আগে। এই সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ তো দূরের কথা, ভূমি অধিগ্রহণও সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘসূত্রতা, জমির মূল্যবৃদ্ধি, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, নতুন অবকাঠামো সংযোজন এবং অর্থায়নের ধরন পরিবর্তনের কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ অনুমোদনের সময়ের তুলনায় ব্যয় প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির অর্থায়নেও বড় পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে ভারতীয় ঋণের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও পরে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে প্রকল্পের নকশা, অর্থায়ন কাঠামো এবং কিছু কারিগরি বিষয়ও নতুন করে পর্যালোচনা করতে হয়েছে।

৫৬ মৌজায় শেষ যৌথ তদন্ত
বগুড়া জেলা প্রশাসনের নথি অনুযায়ী, বগুড়া সদর, শাজাহানপুর, শেরপুর ও কাহালু উপজেলার মোট ৪৮১ দশমিক ০৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এরইমধ্যে ৫৬টি মৌজার যৌথ তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। মাঠ জরিপ, ভিডিও ধারণ, দাগ নম্বর যাচাই, মালিকানা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষার কাজও শেষ হয়েছে।

গত ২২ জুন ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ এক হাজার ৯৬৯ কোটি ১০ লাখ টাকার চেক বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পৌঁছায়। এখন পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের মধ্যে ক্ষতিপূরণের অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে জটিল অংশ হচ্ছে মালিকানা যাচাই ও আপত্তি নিষ্পত্তি। এই ধাপ শেষ হওয়ায় এখন জমি বুঝে নেওয়ার কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পি. এম. ইমরুল কায়েস বলেন, সরকার থেকে অর্থ পাওয়া গেছে। আইন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। ভূমি অধিগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে।

কেন বাড়লো শুধু পরামর্শক ব্যয়?
প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে পরামর্শক ব্যয়। পরিকল্পনা কমিশনের নথি বলছে, মূল অনুমোদনের সময় পরামর্শক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এখন সেই ব্যয় বাড়িয়ে ২৩১ কোটি ৭১ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু এই একটি খাতেই ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৬৩ কোটি টাকা।

পিইসি সভায় কমিশনের কর্মকর্তারা জানতে চান, এত বড় অঙ্কের অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় হবে এবং এই মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা কী?

প্রকল্প পরিচালক আর জাহাঙ্গীর মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, পরামর্শক খাতে অর্থ রাখা হয়েছে যাতে বাস্তবায়নের সময় কোনো কারিগরি ঘাটতি না থাকে। পিইসি সভায় যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে ব্যয়ের যৌক্তিকতা আরও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হবে।

তিনি বলেন, ভারতীয় ঋণের পরিবর্তে এআইআইবির অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী অতিরিক্ত কিছু কারিগরি পরামর্শক, নকশা যাচাই এবং তদারকির প্রয়োজন হয়েছে। এসব কারণেও ব্যয় বেড়েছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই রেলপথ
সংশ্লিষ্টদের মতে, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেলপথ শুধু একটি নতুন রেললাইন নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি বিকল্প পরিবহন করিডোর। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত প্রায় ৮৬ কিলোমিটার নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ হবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সেতু, কালভার্ট, নতুন স্টেশন, লুপলাইন, সিগন্যালিং ও রেল অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।

প্রকল্পের আওতায় করতোয়া নদীর ওপর প্রায় ২৪৬ মিটার দীর্ঘ একটি বড় সেতু, ইছামতী নদীর ওপর প্রায় ২০৫ মিটার দীর্ঘ আরেকটি সেতু, শতাধিক ছোট-বড় কালভার্ট, নতুন স্টেশন ভবন, রেলওয়ে ওভারপাস এবং প্রয়োজনীয় অপারেশনাল অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগে একটি নতুন করিডোর যুক্ত হবে।

রেলওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই রেললাইন চালু হলে উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকার সঙ্গে একটি বিকল্প রেলপথ তৈরি হবে। বর্তমানে যেসব ট্রেন যমুনা সেতু হয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে রাজধানীতে যায়, ভবিষ্যতে এই করিডোর ব্যবহার করলে রেলপথের দূরত্ব প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমে আসবে। এতে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী উভয় ট্রেনের যাত্রাসময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
বগুড়া, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষি অর্থনীতি এখনো অনেকটাই সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল। এই অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আলু, ধান, ভুট্টা, সবজি, মাছ, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। কিন্তু পরিবহনের বড় অংশই হয় মহাসড়ক দিয়ে। যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া এবং দীর্ঘ যাত্রার কারণে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পরিবহন ব্যয় বাড়ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন রেলপথ চালু হলে একই সঙ্গে বেশি পরিমাণ কৃষিপণ্য কম খরচে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো সম্ভব হবে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে, বাজারজাতকরণ সহজ হবে এবং কৃষকে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি সাইরুল ইসলাম বলেন, এটি শুধু বগুড়ার প্রকল্প নয়। উত্তরাঞ্চলের অন্তত আট থেকে দশটি জেলার ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। রেলপথ চালু হলে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে, পরিবহন ব্যয় কমবে এবং শিল্প বিনিয়োগও বাড়বে।

মহাসড়কের ওপর চাপ কমবে
ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক বর্তমানে দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক করিডোর। ঈদ, পূজা কিংবা সরকারি ছুটির সময় কয়েকশ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট এখন প্রায় নিয়মিত চিত্র। অনেক সময় বগুড়া থেকে ঢাকায় যেতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টাও লেগে যায়।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের একটি বড় অংশ যদি রেলপথে স্থানান্তর করা যায় তাহলে মহাসড়কের ওপর চাপ অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে কমবে জ্বালানি ব্যয়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং যানজটজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি।

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেল প্রকল্প / ভূমি অধিগ্রহণের এক হাজার ৯২০ কোটি টাকা ছাড়
পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহম্মেদ বলেন, এটি শুধু একটি নতুন রেললাইন নয়, উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি বিকল্প পরিবহন করিডোর। দীর্ঘমেয়াদে সড়কপথের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে
যদিও ভূমি অধিগ্রহণে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে, তবুও প্রকল্পটির সামনে এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাকি। ভূমি অধিগ্রহণ শেষে জমি বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এরপর আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান, ঠিকাদার নিয়োগ, পূর্ণাঙ্গ অর্থায়নের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং নির্মাণকাজ শুরু করতে হবে। অতীতে একাধিকবার সময়সীমা পেছানো এবং ব্যয় বৃদ্ধির অভিজ্ঞতা থাকায় সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এসব ধাপে আবারও বিলম্ব হলে প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

এদিকে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাবে শুধু পরামর্শক ব্যয় নয়, বিভিন্ন খাতেই মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় পরিকল্পনা কমিশন খাতভিত্তিক ব্যয়ের যৌক্তিকতা পুনরায় যাচাই করছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুরু থেকেই কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

প্রকল্প পরিচালক আর জাহাঙ্গীর মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন পর প্রকল্পটি বাস্তব অগ্রগতির মুখ দেখছে। বগুড়া অংশে যৌথ তদন্তসহ প্রয়োজনীয় প্রাথমিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। ক্ষতিপূরণ প্রদান চলমান। জমি বুঝে পাওয়া গেলে দরপত্র আহ্বান এবং মূল নির্মাণকাজ শুরুর প্রশাসনিক প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে।

বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, সরকারের বরাদ্দ পাওয়া অর্থ থেকে পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের লক্ষ্য হলো আইনানুগ, স্বচ্ছ ও দ্রুত প্রক্রিয়ায় ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে নির্ধারিত জমি বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে হস্তান্তর করা।