সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)-এর ওষুধ তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে চলছে ভয়াবহ রকমের দুর্নীতি-লুটপাট। নানা কারসাজির মাধ্যমে ক্রয় প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে সব কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে একজন মাত্র মালিকের প্রতিষ্ঠান। এক ব্যক্তির বাইরে অন্য কারো কাজ পাওয়ার সুযোগ নেই। কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে অন্য সকল দরপ্রস্তাব বাতিল করা হচ্ছে, এমনকি সবদিক থেকে যোগ্য বিবেচিত হওয়ার পরও। এ রকমের ভয়াবহ কারসাজির কারণে বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে, অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে ওষুধ তৈরির রাসায়নিক কিনতে হচ্ছে ইডিসিএল-কে। একটি বিশেষ আওয়ামী চক্র এর সঙ্গে জড়িত। ইডিসিএল’র কাঁচামাল ক্রয় খাত থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এ চক্রটি। এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানিরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা-কর্মচারী এতে সরাসরি জড়িত রয়েছেন। ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত গত সাত বছরে বিপুল অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে একের পর এক তৈরি করা হচ্ছে নানা রকমের অযৌক্তিক শর্তের বেড়াজাল। জাপানে উৎপাদিত রাসায়নিকের দরপ্রস্তাব বাতিল করে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেনার নজিরও রয়েছে। তাও বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে। পণ্য ক্রয়ের শর্তে কোনো বিশেষ ব্রান্ডের নাম নির্দিষ্টকরণের বিষয়ে সরকারের ক্রয় নীতিমালায় বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু তা এক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না।
জানা গেছে, ইডিসিএল ১৩০ প্রকারের ওষুধ তৈরি ও বিপণন করে। এজন্য বছরে প্রায় ১৬৭ ধরনের রাসায়নিক কাঁচামাল কেনা হয়। ইডিসিএল-এ রাসায়নিক সরবরাহকারী একই মালিকের প্রতিষ্ঠান রয়েছে তিনটি- মার্কস কর্পোরেশন, সানবীম কর্পোরেশন এবং আর কে ট্রেডার্স। ঘুরেফিরে কাজ পাচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানগুলোই। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক আমিনুল ইসলাম রুবেল, বাড়ি শরিয়তপুরে। নিজেকে সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা বাহাদুর বেপারীর আত্মীয় বলে পরিচয় দিতেন। সেই সূত্রে প্রভাব খাটিয়ে ২০১৯ সাল থেকে একচেটিয়াভাবে কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, এমনকি বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও তার প্রভাবের কোনো হেরফের হয়নি। রুবেলের প্রতিষ্ঠান যে উৎস থেকে কাঁচামাল তৈরির দরপ্রস্তাব দিচ্ছে শুধুমাত্র সেটিই রেসপন্সিভ হচ্ছে। এছাড়া অন্য সবগুলো দরপ্রস্তাব কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে বাতিল করা হচ্ছে।
দেখা যাচ্ছে, আমিনুল ইসলাম রুবেল ভারতীয় কোনো উৎপাদনকারীর রাসায়নিক সরবরাহের প্রস্তাব করলে, অন্য যোগ্য এবং ভালো মানের ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের দরপ্রস্তাবও বাতিল করা হচ্ছে। ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও তাই। ইডিসিএল ইতিপূর্বে এক সময় বেলজিয়ামে উৎপাদিত ক্যালসিয়াম লেকটেট প্যান্টাহাইড্রেট ব্যবহার করেছে। কিন্তু সম্প্রতি কারিগরি মূল্যায়নে ‘গন্ধ ভালো নয়’ উল্লেখ করে বেলজিয়ামের এই রাসায়নিক সরবরাহের দরপ্রস্তাব বাতিল করেছে, পরীক্ষাগারে নমুনা (স্যাম্পল) টেস্টে উন্নীত হওয়ার পরও। বেলজিয়ামের রাসায়নিকের দরপ্রস্তাব ছিল প্রতি টন ২ হাজার ৭শ’ ডলার করে। অথচ রুবেলের সরবরাহ করা কাঁচামাল কেনা হয়েছে ৪ হাজার ২শ’ ডলার করে। শুধু এই আইটেমটির ক্ষেত্রেই ইডিসিএল’র বছরে গচ্ছা যাচ্ছে প্রায় ২ কোটি টাকা করে।
ইডিসিএল’র এন্টাসিড ওষুধ তৈরির রাসায়নিক ‘ম্যাগনেসিয়াম’ প্রয়োজন হয় বছরে প্রায় ৩৫০ টন। এর বাজারদর গড়ে প্রতি টন ১৭৮০ ডলার থেকে ১৮০০ ডলার করে। কিন্তু কেনা হচ্ছে ৩১৫০ থেকে ৩২০০ ডলার করে। এই দামে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘পারড্রাগস কেমিক্যালস’ এর উৎপাদিত ম্যাগনেসিয়াম সরবরাহ করেছে রুবেলের প্রতিষ্ঠান। এই একটি আইটেমেই বছরে ৪ কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিচ্ছে দুর্নীতিবাজ চক্র। এক্ষেত্রে ভারতীয় অন্যান্য যোগ্য বা ভালো মানের প্রতিষ্ঠান এমনকি জাপানে উৎপাদিত রাসায়নিকের দরপ্রস্তাবও বাতিল করা হচ্ছে ‘ফার্মাকোপিয়া’র তারতম্যের কথা উল্লেখ করে। ‘ফার্মাকোপিয়া’ হলো ওষুধ তৈরির মান সংক্রান্ত আইনি নির্দেশিকা। বিশ^ব্যাপী এ ধরনের নির্দেশিকা হিসেবে ইউনাইটেড স্টেটস ফার্মাকোপিয়া- ইউএসপি, বৃটিশ ফার্মাকোপিয়া- বিপি, ইউরোপিয়ান ফার্মাকোপিয়া- ইপি প্রভৃতি বেশ কয়েকটি প্রচলতি থাকলে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে ইউএসপি। এরপরেই রয়েছে বিপি’র স্থান। স্কয়ার, বেক্সিমকোসহ বাংলাদেশের নামকরা ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণতঃ ইউএসপি নির্দেশিকার রাসায়নিক ব্যবহার করে থাকে। ইডিসিএল ইতিপূর্বে দুটো উৎসই ব্যবহার করতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এন্টাসিড তৈরির কাঁচামাল ম্যাগনেসিয়াম ক্রয়ের ক্ষেত্রে ইডিসিএল শুধুমাত্র বিপি গ্রহণ করছে। আমিনুল ইসলাম রুবেল ভারতীয় যে উৎপাদনকারীর ম্যাগনেসিয়াম সরবরাহ করছে সেটি বিপি, তাই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। জাপানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দরপ্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে ইউএসপি’র যুক্তি দেখিয়ে। যদিও এই রাসায়নিক পরীক্ষাগারে নমূনা টেস্টে ভালো মানের বলে বিবেচিত হয়েছে। জাপানি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত ম্যাগনেসিয়ামের দরপ্রস্তাব ছিল প্রতি টন ১৭৮০ ডলার করে। অন্যদিকে রুবেলের সরবরাহ করা ভারতীয় ‘পারড্রাগস কেমিক্যালস’র উৎপাদিত ম্যাগনেসিয়াম কেনা হয়েছে ৩১৫০ ডলার করে। জানা গেছে, এক্ষেত্রে বিপি নির্দেশিকায় তৈরি ভারতীয় অন্যান্য যোগ্য প্রতিষ্ঠানের দরপ্রস্তাবও বাতিল করা হয়েছে অন্য ভুয়া কারণ দেখিয়ে।
জানা গেছে, এভাবে প্রতিটি রাসায়নিক আইটেমই কেনা হচ্ছে বাজারমূল্যের চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি দামে। বছরে ইডিসিএল’র এমোনিয়া হাইড্রোক্সাইড প্রয়োজন হয় ২২০-২৩০ টন। এর বাজারমূল্য গড়ে প্রতি টন ২ হাজার ডলার অথবা এর কাছাকাছি। অথচ রুবেল চক্রের কাছ থেকে ইডিসিএল কিনেছে প্রতি টন ৩৩২০ ডলার করে। অর্থাৎ প্রতি টনে দামের পার্থক্য প্রায় ১৩০০ ডলার। সোডিয়াম ক্লোরাইড প্রয়োজন হয় বছরে প্রায় ৩শ’ টন। এর বাজারমূল্য গড়ে প্রতি টন ১৬০-১৭০ ডলার, কিন্তু কেনা হয়েছে ৫৭০ ডলার করে। ডক্সি সাইক্লিন, এ্যম্পল (১০ মিলি) প্রভৃতি প্রত্যেকটি আইটেম ক্রয়ের ক্ষেত্রেই এরকমের ভয়াবহ অনিয়ম চলছে। ডক্সি সাইক্লিন প্রতি কেজির বাজারমূল্য ৪৩ ডলার, কেনা হয়েছে প্রতি কেজি ৬৮ থেকে ৭৯ ডলার পর্যন্ত। প্রতি বছর প্রায় ৬০০০ কেজি ডক্সি সাইক্লিন কেনা হয়ে থাকে। এ্যম্পল (১০ মিলি)-এর বাজারমূল্য প্রতি হাজারে ৯০ ডলার, কেনা হয়েছে ২২৫ ডলার করে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ এ্যম্পল ক্রয় করে ইডিসিএল। কেনাকাটায় এভাবে ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ইডিসিএল’র পরিচালক (কোয়ালিটি এস্যুরেন্স) মোহাম্মদ ইসমাইল, মহাব্যবস্থাপক (উন্নয়ন) মো. নজরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব অনিয়মে সরাসরি জড়িত রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পদ অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে যখন-যিনি আসছেন তিনিও এই চক্রের হয়ে কাজ করছেন।
অবাক ব্যাপার হলো, ফ্যাসিস্ট-লুটেরা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও এই চক্রের প্রভাবের কোনো নড়চড় হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, দুর্নীতিবাজ নূরজাহান বেগমকে ম্যানেজ করে ওই আমলেও একচেটিয়াভাবে হাতিয়ে নিয়েছে কাঁচামাল আমদানির কাজ। বিনিময়ে লাভবান হয়েছেন উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম নিজেও। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দেওয়া হয়েছিল মো. আ. সামাদ মৃধাকে। তিনিও আগের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের মতো একই পথে হেঁটেছেন। গত ২১ মে আ. কা. মো. আশরাফুজ্জামানকে ইডিসিএল’র নতুন এমডি হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর নিয়োগ নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে আশরাফুজ্জামানের সামনের দিনগুলোতে বোঝা যাবে, তিনি কোন পথে হাঁটছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















