সংবাদ শিরোনাম ::
শাওনের ফেসবুক আইডি উধাও মিয়ানমার সীমা‌ন্তে নজরদা‌রি বা‌ড়ানো হয়েছে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী চলতি সপ্তাহে ৫ জেলায় বন্যার পূর্বাভাস গঙ্গাচড়ায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল এইচএসসি পরীক্ষার্থীর পাথরঘাটায় ৩৫০ শিক্ষার্থীর মাঝে চারা গাছ বিতরণ করলেন জেলা প্রশাসক কুয়েতে অবৈধভাবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো দালাল চক্র নিয়ে দূতাবাসের সতর্কতা সাঁথিয়া থানার ছোন্দাহ গ্রামের মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ মহাপরিচালক রহিমের আর্থিক দুর্নীতিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কেরানীগঞ্জে আনোয়ারের জমি দখলের চেষ্টা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার দাবি ৮০ কোটি টাকার বিআইডব্লিউটিএ টেন্ডারে কবিরস সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

৮০ কোটি টাকার বিআইডব্লিউটিএ টেন্ডারে কবিরস সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন চাঁদপুর যাত্রী টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের একটি বড় টেন্ডারকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়ম, পূর্বনির্ধারিত মূল্যায়ন এবং সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে।
টেন্ডারে অংশ নেওয়া কুমিল্লা ডকইয়ার্ড বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া এক লিখিত অভিযোগে দাবি করেছে, প্রকৃত মূল্যায়ন ছাড়াই মাত্র এক কার্যদিবসের মধ্যে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে এবং সর্বনিম্ন দরদাতাকে উপেক্ষা করে অধিক দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, টেন্ডার নং ১২৯৪৯৯৩ (BRWTP-W3-LOT-02A)-এর দরপত্র খোলা হয় ২৫ জুন ২০২৬ বিকেল ৪টায়। অভিযোগকারীর ভাষ্য, পরদিনই কার্যাদেশ চূড়ান্ত করা হয়। অথচ ৮০ কোটিরও বেশি টাকার একটি অবকাঠামো প্রকল্পের প্রশাসনিক, কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন, যোগ্যতা যাচাই এবং অনুমোদন সম্পন্ন করতে সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে।

অভিযোগকারী যৌথ উদ্যোগের দাবি, এত অল্প সময়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন বাস্তবে সম্ভব নয়। তাদের অভিযোগ, কার্যাদেশের সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা।
টেন্ডার ওপেনিং রিপোর্টের তথ্য উল্লেখ করে অভিযোগে বলা হয়েছে, টিবিইএএল-টিসিএসবিএল-টিইসি যৌথ-এর মূল্যায়িত দর ছিল ৭৬ কোটি ২৩ লাখ ৫৬ হাজার ১১ টাকা, যেখানে মায়ার-কবিরস সিন্ডিকেটের মূল্যায়িত দর ছিল ৮০ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা বেশি দর থাকা সত্ত্বেও তাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানের মতে, সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী কারিগরি দিক থেকে যোগ্য সর্বনিম্ন দরদাতাকেই কার্যাদেশ দেওয়ার কথা। সেই নীতি অনুসরণ করা হলে সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব ছিল। চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অতীত প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছে, পূর্বে বিআইডব্লিউটিএর একাধিক প্রকল্পে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় সময় বাড়াতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও একই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বাধীন যৌথ উদ্যোগকে আবারও বড় প্রকল্প দেওয়া হয়েছে।

ভারতে পলাতক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের সাবেক সংসদ সদস্যে ও ছাত্রলীগ সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন এখনও বিআইডব্লিউটিএর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে নিজের কোম্পানিকে ৮০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দিয়েছে
অভিযোগপত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বার্থের সংঘাতের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের সাবেক সংসদ সদস্যে ও ছাত্রলীগ সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপনের সরাসরি পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা ও মালিকানা রয়েছে এবং সেই সম্পর্ক টেন্ডার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে। মাহমুদ হাসান রিপনের স্ত্রী মারিয়াম জামান নামমাত্র চেয়ারম্যান মায়ারের। এই পরিচয়ের আড়ালে রিপনই আসল মালিক। সুত্রমতে, বর্তমানে পলাতক রিপন ভারতে বসেই বিআইডব্লিউটিএর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে নিজের কোম্পানিকে পাইয়ে দিচ্ছে।

অভিযোগকারী যৌথ উদ্যোগ বিআইডব্লিউটিএর কাছে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—কার্যাদেশ অবিলম্বে স্থগিত করা, পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ, স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন, সরকারি বিধি অনুসারে পুনর্মূল্যায়ন এবং অভিযোগ উত্থাপনের কারণে কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প হওয়ায় অভিযোগপত্রের অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিশ্বব্যাংক, কেন্দ্রীয় ক্রয় কারিগরি ইউনিট (CPTU), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থায় পাঠানো হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক কর্ণেল ফেরদৌস বলেন, এই প্রজেক্টটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এবং এর মেয়াদ ২৯শে জুন পর্যন্ত ছিল। যদি এই সময়ের মধ্যে প্রকিউরমেন্ট নিশ্চিত করা না যেত, তবে ভবিষ্যতে এটি নতুন প্রকল্পের অধীনে চলে যেত। বিশ্বব্যাংকের প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন পরিবর্তন হয়ে যেত, যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও ৬ থেকে ৮ মাস পিছিয়ে দিত।
চাঁদপুরের প্রজেক্টটি প্রায় ১০ বছরের পুরনো এবং এর আগের ঠিকাদার তমা কনস্ট্রকশন কাজ ফেলে চলে গেছে। এবার তৃতীয়বারের মতো টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল। আগেরবার লিকুইড অ্যাসেট এবং টার্নওভারের সমস্যার কারণে প্রকিউরমেন্ট সফল হয়নি। এবার যখন ১০ই জুন পুনরায় টেন্ডার দেওয়া হয়, তখন হাতে সময় ছিল মাত্র ২১ দিন। জনগণের স্বার্থে এবং প্রকল্পের টাকা যাতে ফেরত না যায়, সে জন্য দ্রুততম সময়ে অর্থাৎ ১৪ দিনের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

ইজিপি (e-GP) সিস্টেমে গত ২৫শে জুন টেন্ডার ওপেন করা হয়। মূল্যায়ন কমিটির মাধ্যমে দেখা যায় যে, সর্বনিম্ন দরদাতা (lowest bidder) কোম্পানিটি ভুয়া অডিট রিপোর্ট এবং কাগজপত্র দাখিল করেছে । ফলে তারা অযোগ্য (technically non-responsive) হয়ে যায়। ২৯শে জুনের ডেডলাইন ধরার জন্য একদিনের মধ্যে সমস্ত মূল্যায়ন শেষ করে মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নিয়ে বিশ্বব্যাংকে সাবমিট করা হয়। তিনি বলেন, ইজিপি সিস্টেমে রাজনৈতিক পরিচয় বা অন্য কোনো প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই। কারণ এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাণিতিক হিসাব এবং দলিলের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে খুব কম দর দিলে সিস্টেম সেটিকে ‘সিগনিফিকেন্টলি লো টেন্ডার’ (SLT) হিসেবে চিহ্নিত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে দেয়।

প্রকল্প পরিচালক আরও জানান যে, তিনি সেনাবাহিনী থেকে প্রজেক্টটিকে সফল করার জন্য এসেছেন এবং দেশের স্বার্থে ২৯শে জুনের ডেডলাইন রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কোনো কোম্পানি যদি সরকারি কাজে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে বাধা সৃষ্টি করে, তবে তাদের ব্ল্যাকলিস্টেড হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শেষ পর্যন্ত প্রজেক্টটি সময়মতো সিকিউর করা সম্ভব হয়েছে এবং এটি এখন বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে।
অন্যদিকে মায়ার- কবিরস সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ এই পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

অযোগ্যতা ও শর্ত শিথিল:
বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মায়ার লিমিটেড দুই মাস আগে এই একই টেন্ডারেই অযোগ্য বা ‘নন-রেসপন্সিভ’ বিবেচিত হয়েছিল। কাজটি করার জন্য টেন্ডারে সাবমিট করা মায়ারের ট্রানওভার অপ্রতুল হওয়ায় তখন অযোগ্য বিবেচিত হয়েছিলো। সেই মায়ারকেই পরবর্তীতে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে তাদের আগের শর্তগুলো শিথিল করা হয়। এমনকি আগে ৭৩ কোটি টাকার টেন্ডার থাকলেও মায়ার লিমিটেডকে বেশি টাকা দেওয়ার সুবিধার্থে সেটি ৭৭ কোটি টাকা করে রি-টেন্ডার করানো হয়। একই টেন্ডারে দু’মাস আগে অযোগ্য বিবেচিত হওয়া নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপনের কোম্পানি মায়ার দু’মাস পরে কেমন করে যোগ্য হয়ে উঠলো তা নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ ও ঠিকাদার মহলে ব্যপক চাঞ্চল্যে ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সময় ও প্রক্রিয়া নিয়ে জালিয়াতি: এবারের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বলা হয়েছে, টাকা ফেরত যাবে এমন অজুহাত দেখিয়ে তাড়াহুড়ো করে ২৯ তারিখের আগে মাত্র তিন দিন হাতে রেখে (২৫ তারিখ) টেন্ডার ড্রপিং করানো হয়, অথচ সিপিটিইউ (CPTU) বিধান অনুযায়ী ন্যূনতম ১৪ দিন সময় প্রয়োজন। টাকা ফেরত যাওয়ার দাবিটিকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কারণ এটি একটি নতুন প্রজেক্ট ছিল। এছাড়াও ২৯শে জুনের ডেডলাইন অনুযায়ী আরও আগে থেকে টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করা যেতো – এমনটাই বলছেন ঠিকাদাররা।

মায়ার-কবীর সিন্ডিকেট:
মায়ার লিমিটেডের এককভাবে কাজ করার যোগ্যতা না থাকায় তারা ‘কবীর’ নামক অন্য একটি কোম্পানিকে সাথে নিয়ে ‘মায়ার-কবীর সিন্ডিকেট’ গঠন করে। এই সিন্ডিকেটকে মাত্র একদিনের মধ্যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

মালিকানা ও রাজনৈতিক সংযোগ: কোম্পানিটির মূল বিনিয়োগকারী হলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদুর রহমান রিপন, যিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। তার স্ত্রী কোম্পানির নামমাত্র চেয়ারম্যান এবং ইয়াসির রাব্বি নামের একজন ব্যক্তি এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রিপন ভারত থেকে বসেই তার স্ত্রীর মাধ্যমে এই কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন। আর এমডির দায়িত্ব পালন করছেন ইয়াসির রাব্বি।

কাজের অতীত রেকর্ড:
মায়ার লিমিটেড বিগত সরকারের আমল থেকে বিআইডব্লিউটিএ-তে ড্রেজিংসহ প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার কাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে যে, আওয়ামী লীগ আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত তারা একটি কাজও সঠিকভাবে হস্তান্তর করেনি। সেই কোম্পানিকেই আবার নতুন করে ৮০ কোটি টাকার কাজ দেয়ায় বিতর্ক সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক।

সর্বশেষ সর্বনিম্ন দরদাতা কোম্পানিটি বাদ পড়ার প্রধান কারণ তাদের দাখিলকৃত ট্রানওভারের অসঙ্গতি-এমনটাই জানিয়েছিলেন পিডি কর্ণেল ফেরদৌস ও সদস্য (প্রকৌশল) রাকিবুল ইসলাম তালুকদার। তবে সর্বনিম্ন দরদাতা কোম্পানি কুমিল্লা ডকইয়ার্ডের পক্ষে জানানো হয়েছে যে, তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত বেসরকারি কিছু ট্রানওভারের ডকুমেন্টস সাবমিট করেছিল। সেসব ছাড়াই টেন্ডারের ডিমান্ড অনুযায়ী দাখিলকৃত ট্রানওভার কাজ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শাওনের ফেসবুক আইডি উধাও

৮০ কোটি টাকার বিআইডব্লিউটিএ টেন্ডারে কবিরস সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট সময় ০৫:১৭:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন চাঁদপুর যাত্রী টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের একটি বড় টেন্ডারকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়ম, পূর্বনির্ধারিত মূল্যায়ন এবং সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে।
টেন্ডারে অংশ নেওয়া কুমিল্লা ডকইয়ার্ড বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া এক লিখিত অভিযোগে দাবি করেছে, প্রকৃত মূল্যায়ন ছাড়াই মাত্র এক কার্যদিবসের মধ্যে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে এবং সর্বনিম্ন দরদাতাকে উপেক্ষা করে অধিক দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, টেন্ডার নং ১২৯৪৯৯৩ (BRWTP-W3-LOT-02A)-এর দরপত্র খোলা হয় ২৫ জুন ২০২৬ বিকেল ৪টায়। অভিযোগকারীর ভাষ্য, পরদিনই কার্যাদেশ চূড়ান্ত করা হয়। অথচ ৮০ কোটিরও বেশি টাকার একটি অবকাঠামো প্রকল্পের প্রশাসনিক, কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন, যোগ্যতা যাচাই এবং অনুমোদন সম্পন্ন করতে সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে।

অভিযোগকারী যৌথ উদ্যোগের দাবি, এত অল্প সময়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন বাস্তবে সম্ভব নয়। তাদের অভিযোগ, কার্যাদেশের সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা।
টেন্ডার ওপেনিং রিপোর্টের তথ্য উল্লেখ করে অভিযোগে বলা হয়েছে, টিবিইএএল-টিসিএসবিএল-টিইসি যৌথ-এর মূল্যায়িত দর ছিল ৭৬ কোটি ২৩ লাখ ৫৬ হাজার ১১ টাকা, যেখানে মায়ার-কবিরস সিন্ডিকেটের মূল্যায়িত দর ছিল ৮০ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা বেশি দর থাকা সত্ত্বেও তাদের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানের মতে, সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী কারিগরি দিক থেকে যোগ্য সর্বনিম্ন দরদাতাকেই কার্যাদেশ দেওয়ার কথা। সেই নীতি অনুসরণ করা হলে সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় সম্ভব ছিল। চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অতীত প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছে, পূর্বে বিআইডব্লিউটিএর একাধিক প্রকল্পে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় সময় বাড়াতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও একই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বাধীন যৌথ উদ্যোগকে আবারও বড় প্রকল্প দেওয়া হয়েছে।

ভারতে পলাতক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের সাবেক সংসদ সদস্যে ও ছাত্রলীগ সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন এখনও বিআইডব্লিউটিএর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে নিজের কোম্পানিকে ৮০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দিয়েছে
অভিযোগপত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বার্থের সংঘাতের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের সাবেক সংসদ সদস্যে ও ছাত্রলীগ সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপনের সরাসরি পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা ও মালিকানা রয়েছে এবং সেই সম্পর্ক টেন্ডার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে। মাহমুদ হাসান রিপনের স্ত্রী মারিয়াম জামান নামমাত্র চেয়ারম্যান মায়ারের। এই পরিচয়ের আড়ালে রিপনই আসল মালিক। সুত্রমতে, বর্তমানে পলাতক রিপন ভারতে বসেই বিআইডব্লিউটিএর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে নিজের কোম্পানিকে পাইয়ে দিচ্ছে।

অভিযোগকারী যৌথ উদ্যোগ বিআইডব্লিউটিএর কাছে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—কার্যাদেশ অবিলম্বে স্থগিত করা, পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ, স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন, সরকারি বিধি অনুসারে পুনর্মূল্যায়ন এবং অভিযোগ উত্থাপনের কারণে কোনো প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প হওয়ায় অভিযোগপত্রের অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিশ্বব্যাংক, কেন্দ্রীয় ক্রয় কারিগরি ইউনিট (CPTU), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থায় পাঠানো হয়েছে।

এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক কর্ণেল ফেরদৌস বলেন, এই প্রজেক্টটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এবং এর মেয়াদ ২৯শে জুন পর্যন্ত ছিল। যদি এই সময়ের মধ্যে প্রকিউরমেন্ট নিশ্চিত করা না যেত, তবে ভবিষ্যতে এটি নতুন প্রকল্পের অধীনে চলে যেত। বিশ্বব্যাংকের প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন পরিবর্তন হয়ে যেত, যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও ৬ থেকে ৮ মাস পিছিয়ে দিত।
চাঁদপুরের প্রজেক্টটি প্রায় ১০ বছরের পুরনো এবং এর আগের ঠিকাদার তমা কনস্ট্রকশন কাজ ফেলে চলে গেছে। এবার তৃতীয়বারের মতো টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল। আগেরবার লিকুইড অ্যাসেট এবং টার্নওভারের সমস্যার কারণে প্রকিউরমেন্ট সফল হয়নি। এবার যখন ১০ই জুন পুনরায় টেন্ডার দেওয়া হয়, তখন হাতে সময় ছিল মাত্র ২১ দিন। জনগণের স্বার্থে এবং প্রকল্পের টাকা যাতে ফেরত না যায়, সে জন্য দ্রুততম সময়ে অর্থাৎ ১৪ দিনের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

ইজিপি (e-GP) সিস্টেমে গত ২৫শে জুন টেন্ডার ওপেন করা হয়। মূল্যায়ন কমিটির মাধ্যমে দেখা যায় যে, সর্বনিম্ন দরদাতা (lowest bidder) কোম্পানিটি ভুয়া অডিট রিপোর্ট এবং কাগজপত্র দাখিল করেছে । ফলে তারা অযোগ্য (technically non-responsive) হয়ে যায়। ২৯শে জুনের ডেডলাইন ধরার জন্য একদিনের মধ্যে সমস্ত মূল্যায়ন শেষ করে মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নিয়ে বিশ্বব্যাংকে সাবমিট করা হয়। তিনি বলেন, ইজিপি সিস্টেমে রাজনৈতিক পরিচয় বা অন্য কোনো প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই। কারণ এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাণিতিক হিসাব এবং দলিলের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে খুব কম দর দিলে সিস্টেম সেটিকে ‘সিগনিফিকেন্টলি লো টেন্ডার’ (SLT) হিসেবে চিহ্নিত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে দেয়।

প্রকল্প পরিচালক আরও জানান যে, তিনি সেনাবাহিনী থেকে প্রজেক্টটিকে সফল করার জন্য এসেছেন এবং দেশের স্বার্থে ২৯শে জুনের ডেডলাইন রক্ষা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কোনো কোম্পানি যদি সরকারি কাজে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে বাধা সৃষ্টি করে, তবে তাদের ব্ল্যাকলিস্টেড হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শেষ পর্যন্ত প্রজেক্টটি সময়মতো সিকিউর করা সম্ভব হয়েছে এবং এটি এখন বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে।
অন্যদিকে মায়ার- কবিরস সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ এই পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

অযোগ্যতা ও শর্ত শিথিল:
বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মায়ার লিমিটেড দুই মাস আগে এই একই টেন্ডারেই অযোগ্য বা ‘নন-রেসপন্সিভ’ বিবেচিত হয়েছিল। কাজটি করার জন্য টেন্ডারে সাবমিট করা মায়ারের ট্রানওভার অপ্রতুল হওয়ায় তখন অযোগ্য বিবেচিত হয়েছিলো। সেই মায়ারকেই পরবর্তীতে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে তাদের আগের শর্তগুলো শিথিল করা হয়। এমনকি আগে ৭৩ কোটি টাকার টেন্ডার থাকলেও মায়ার লিমিটেডকে বেশি টাকা দেওয়ার সুবিধার্থে সেটি ৭৭ কোটি টাকা করে রি-টেন্ডার করানো হয়। একই টেন্ডারে দু’মাস আগে অযোগ্য বিবেচিত হওয়া নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপনের কোম্পানি মায়ার দু’মাস পরে কেমন করে যোগ্য হয়ে উঠলো তা নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ ও ঠিকাদার মহলে ব্যপক চাঞ্চল্যে ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সময় ও প্রক্রিয়া নিয়ে জালিয়াতি: এবারের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বলা হয়েছে, টাকা ফেরত যাবে এমন অজুহাত দেখিয়ে তাড়াহুড়ো করে ২৯ তারিখের আগে মাত্র তিন দিন হাতে রেখে (২৫ তারিখ) টেন্ডার ড্রপিং করানো হয়, অথচ সিপিটিইউ (CPTU) বিধান অনুযায়ী ন্যূনতম ১৪ দিন সময় প্রয়োজন। টাকা ফেরত যাওয়ার দাবিটিকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে কারণ এটি একটি নতুন প্রজেক্ট ছিল। এছাড়াও ২৯শে জুনের ডেডলাইন অনুযায়ী আরও আগে থেকে টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করা যেতো – এমনটাই বলছেন ঠিকাদাররা।

মায়ার-কবীর সিন্ডিকেট:
মায়ার লিমিটেডের এককভাবে কাজ করার যোগ্যতা না থাকায় তারা ‘কবীর’ নামক অন্য একটি কোম্পানিকে সাথে নিয়ে ‘মায়ার-কবীর সিন্ডিকেট’ গঠন করে। এই সিন্ডিকেটকে মাত্র একদিনের মধ্যে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

মালিকানা ও রাজনৈতিক সংযোগ: কোম্পানিটির মূল বিনিয়োগকারী হলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদুর রহমান রিপন, যিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। তার স্ত্রী কোম্পানির নামমাত্র চেয়ারম্যান এবং ইয়াসির রাব্বি নামের একজন ব্যক্তি এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রিপন ভারত থেকে বসেই তার স্ত্রীর মাধ্যমে এই কাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন। আর এমডির দায়িত্ব পালন করছেন ইয়াসির রাব্বি।

কাজের অতীত রেকর্ড:
মায়ার লিমিটেড বিগত সরকারের আমল থেকে বিআইডব্লিউটিএ-তে ড্রেজিংসহ প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার কাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে যে, আওয়ামী লীগ আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত তারা একটি কাজও সঠিকভাবে হস্তান্তর করেনি। সেই কোম্পানিকেই আবার নতুন করে ৮০ কোটি টাকার কাজ দেয়ায় বিতর্ক সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক।

সর্বশেষ সর্বনিম্ন দরদাতা কোম্পানিটি বাদ পড়ার প্রধান কারণ তাদের দাখিলকৃত ট্রানওভারের অসঙ্গতি-এমনটাই জানিয়েছিলেন পিডি কর্ণেল ফেরদৌস ও সদস্য (প্রকৌশল) রাকিবুল ইসলাম তালুকদার। তবে সর্বনিম্ন দরদাতা কোম্পানি কুমিল্লা ডকইয়ার্ডের পক্ষে জানানো হয়েছে যে, তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত বেসরকারি কিছু ট্রানওভারের ডকুমেন্টস সাবমিট করেছিল। সেসব ছাড়াই টেন্ডারের ডিমান্ড অনুযায়ী দাখিলকৃত ট্রানওভার কাজ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলো।