জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) শিক্ষার অন্যতম গুরত্বপূর্ণ দপ্তর। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই বিতরণের কাজটি এই প্রতিষ্ঠানই করে থাকে। আওয়ামী লীগ আমলে অধ্যাপক শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী কর্মকর্তা। তিনি একাধিক মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করে নিম্নমানের বই ছাপান। এ সংক্রান্ত অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত করছে। অথচ বিতর্কিত এ কর্মকর্তাকেই এনসিটিবির সচিব পদে পদায়ন করা হয়েছে। শুধু এই কর্মকর্তাই নন, সরকারের হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ পদে ঘুরেফিরে পদায়ন করা হয়েছে আরও কয়েক কর্মকর্তাকে। এ সিন্ডিকেট এবারও কয়েকটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমাঝোতা করে অধিকাংশ কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অপতৎপরতা করছে। এতে সরকারের বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসম্মত বই বিতরণ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এনসিটিবির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদায়নের পেছনে প্রভাবশালী কয়েকজন প্রেস মালিক ও এক শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা সক্রিয় ছিলেন। তারা আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই মুদ্রণের দরপত্রে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে সরকারি টাকা লুটপাট করার পাঁয়তারা করছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে ৩০ কোটির বেশি বই ছাপানোর কথা রয়েছে। ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এত বড় প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।
নতুন শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ এখনো শুরু হয়নি। ১২ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌসকে পুনরায় এনসিটিবির সচিব পদে পদায়ন করা হয়। রাজনৈতিক ভোল পালটে গুরুত্বপূর্ণ এ পদ বাগিয়ে নেন তিনি। তার এ নিয়োগ নিয়ে শিক্ষা বিভাগে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি একাধিকবার এনসিটিবির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তার এ নিয়োগ নিয়ে জাতীয় সংসদে আপত্তি তোলেন কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ-সদস্য সাবেক শিক্ষকনেতা সেলিম ভূঁইয়া। তারপরও ফিরোজ আল ফেরদৌসের পদায়ন বাতিল করা হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস বলেন, ‘এসব অভিযোগ সত্য নয়। আমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।’
একাধিক প্রেস মালিক জানান, এবার বই ছাপানোর দরপত্রের লট বড় করা হয়েছে। একই সময়ে একাধিক দরপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। জমা দেওয়ার সময়ও তুলনামূলক কম রাখা হয়েছে। এতে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সুবিধা পেলেও ছোট ও মাঝারি প্রেসের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে দরপত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
এনসিটিবির সূত্রে জানা যায়, এবার দরপত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) মূল্যায়ন পদ্ধতি যুক্ত করা হলেও সেটি পাশ কাটাতে সমঝোতার কৌশল নেওয়া হচ্ছে। একই গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠান ভিন্ন নামে দরপত্রে অংশ নিয়ে কাজ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার পাশাপাশি দর নিয়ন্ত্রণের সুযোগও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৩ এপ্রিল এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাছের টুকু। এর আগে তিনি উৎপাদন নিয়ন্ত্রক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনের সময় প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের নিম্নমানের বই দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া অনিয়মে জড়িত বেশকিছু মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এরপরও তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়। যদিও এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। এছাড়া এনসিটিবির বর্তমান বিতরণ নিন্ত্রয়ক মতিউর রহমান পাঠানের বিরুদ্ধে দপ্তর থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল, দরপত্র শিডিউল ও প্রাক্কলিত দর ফাঁসেরও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই।
৭ জুন অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলাকে এনসিটিবির চেয়ারম্যান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পূর্বের কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই শিক্ষার এমন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে হঠাৎ তার নিয়োগ নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রভাবশালী মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের মালিক ও শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাবশালী এক কর্মকর্তা তার নিয়োগে বড় ভূমিকা পালন করেছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, আমরা এবার শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে ভালো বই উপহার দেওয়ার জন্য কাজ করছি। এক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। নভেম্বরের শেষের দিকে সব বই প্রস্তুত হয়ে যাবে। কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, এটা আমার জন্য কঠিন বিষয় নয়। তবে সতর্ক থাকার পাশাপাশি জটিল বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করার চেষ্টা করছি।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, এনসিটিবির মতো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা, সততা ও নিরপেক্ষতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পাঠ্যবই মুদ্রণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও বিতরণের পুরো প্রক্রিয়া এসব কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত ও তদারকির ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, দরপত্র আহ্বানের পর থেকেই ছোট ও মাঝারি প্রেসগুলোকে সমঝোতায় আনতে একটা চক্র কাজ করছে। বড় কয়েকটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন প্রেস মালিকের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং কম দর দিয়ে প্রতিযোগিতা না করার জন্য মৌখিক চাপ দিচ্ছেন। এমনকি দরপত্রে অংশ নিলেও পরে কাজ বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। নতুন সরকারের সময় আমরা আগের মতো সিন্ডিকেট দেখতে চাই না। তিনি বলেন, এনসিটিবির গুরুত্বপূর্ণ পদে আগের কর্মকর্তাদের সরিয়ে নতুন পদায়নে প্রেস মালিকদেরও বেশ ভূমিকা রয়েছে।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, জুনের শুরুতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত বই ছাপার দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও ইবতেদায়ির দরপত্র যথাক্রমে ২৪ ও ২৫ জুন উন্মুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে আজ নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির দরপত্র ২৯ ও ৩০ জুনের পরিবর্তে ৫ জুলাই উন্মুক্ত করা হবে। ১৬ জুলাই উম্মুক্ত করা হবে অষ্টম শ্রেণির দরপত্র। নবম শ্রেণির দরপত্রের তারিখ এখনো নির্ধারণ হয়নি। যদিও যৌক্তিক কারণ ছাড়াই দরপত্রের সময় পেছানো হয়েছে বলেও সূত্রে জানা গেছে।
সম্প্রতি চলতি বছরের পাঠ্যবই ছাপায় অনিয়মের অভিযোগে সাতটি প্রেসকে এক বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করেছিল এনসিটিবি। পরে তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এক মাসের মধ্যেই শর্তসাপেক্ষে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। এর আগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিম্নমানের বই ছাপানোসহ নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে অর্ধশতাধিক মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের তথ্য চেয়েছিল দুদক। একই অভিযোগে গত বছর ২৯ প্রতিষ্ঠানকে নামমাত্র জরিমানা করা হয়। শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক বলেন, আমরা আগের মতো শিক্ষার্থীদের বই ছাপানোর কাজে কোনো অনিয়ম সহ্য করব না। এবার যথাসময়ে মানসম্মত বই প্রস্তুত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























