সংবাদ শিরোনাম ::
আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ ফিরে দেখা ক্যানভাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকী মাসউদুর রহমানের বিরুদ্ধে যমুনা রেলওয়ে সেতু প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ অভিযোগের পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে কাস্টমস কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম দুর্নীতিবাজ রাজস্ব কর্মকর্তা আজাদের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন নতুন নীতিমালা ঝুলে থাকলেও বিমানবন্দরের সম্পত্তি ইজারা শুরু ডিবি হারুনের ‘ক্যাশিয়ার’ খ্যাত ওসি জুয়েলের শতকোটি টাকার সম্পদ নরসিংদী অধিগ্রহণ দুর্নীতিতে তদন্তপ্রধান আজমল হোসেনের বিরুদ্ধেই গুরুতর অভিযোগ কেরানীগঞ্জের আলোচিত তারানগর-শাক্তা গরুর হাট পরিদর্শনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সন্তোষ প্রকাশ স্বর্ণের সন্ধানে অবৈধ অনুপ্রবেশ, খনিধসে প্রাণ হারালেন ২৮ জন

দুর্নীতিবাজ রাজস্ব কর্মকর্তা আজাদের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম, কর ফাঁকিতে সহযোগিতা এবং নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ ঘুরে বেড়ালেও এসব অভিযোগের কার্যকর তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে অভিযোগ জমা পড়লেও সেগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে রাজস্ব প্রশাসনের একটি অংশ এবং স্থানীয়দের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আবুল কালাম আজাদ গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ, ঘুষ গ্রহণ, কর ফাঁকিতে সহায়তা এবং অবৈধ পণ্য ছাড়করণে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। যদিও এসব অভিযোগ তিনি বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাসীন দলের কিছু প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্ব পায়নি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যায়ে অভিযোগ জমা হলেও তদন্ত প্রক্রিয়া দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়নি। ফলে অভিযোগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে আবুল কালাম আজাদ বিপুল আর্থিক সুবিধা অর্জন করেন। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবসায়ীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভ্যাট ও শুল্ক সংক্রান্ত অনিয়মে জড়িত কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কাস্টমসসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, অবৈধ বা সন্দেহজনক পণ্যের চালান আটকের পর সেগুলো ছাড় করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ছিল। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

গোপালগঞ্জে আবুল কালাম আজাদের নিজ এলাকায় গিয়ে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক বছরে তার পরিবারের নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ও সম্পদ অর্জনের বিষয়টি এলাকায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি নিজ নামে কম এবং স্ত্রী, বাবা ও অন্যান্য স্বজনের নামে বেশি সম্পদ ক্রয় করেছেন। এতে সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের ধারণা।

স্থানীয়দের একজন বলেন, “আমরা দেখেছি কয়েক বছরে তার পরিবারের সম্পদের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন স্থানে জমি কেনা হয়েছে। তবে এসব সম্পদের উৎস কী, তা সাধারণ মানুষ জানে না।”

আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আইনগত জটিলতা এড়াতে অনেকে আত্মীয়-স্বজনের নামে সম্পদ রাখে। আজাদের ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ বহুদিনের। তবে এসব বিষয়ে তদন্ত হলে সত্যতা বের হবে।”

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, গোপালগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি, বসতভিটা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনাময় জমি ক্রয়ের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি শরীয়তপুর জেলাতেও তার পরিবারের নামে সম্পদ থাকার তথ্য স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের আর্থিক মূল্য কয়েক কোটি টাকার বেশি হতে পারে।

এলাকাবাসীর একাংশের মতে, চাকরিজীবনের শুরুতে আবুল কালাম আজাদের আর্থিক অবস্থা বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক সীমিত ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার জীবনযাত্রা, সম্পদ ও ব্যয়ের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের উৎস অনুসন্ধান করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, রাজধানীর মগবাজার এলাকায় একটি অভিজাত ভবনের ফ্ল্যাটে বসবাস করেন আবুল কালাম আজাদ। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, সেখানে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকেন। পাশাপাশি রাজধানীর অন্য একটি এলাকায় তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি আবাসনের তথ্যও পাওয়া গেছে। যদিও এসব সম্পদের মালিকানা ও উৎস সম্পর্কে সরকারি কোনো নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের হিসাব নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা হলে অনেক অভিযোগের সত্যতা সহজেই যাচাই করা সম্ভব। তাদের মতে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের অভিযোগ ওঠে, তখন নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হওয়া জরুরি।

সুশাসনবিষয়ক বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী বলা যায় না। তবে অভিযোগগুলো যদি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহল থেকে উঠে আসে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। এতে একদিকে যেমন নির্দোষ ব্যক্তি অভিযোগমুক্ত হওয়ার সুযোগ পান, অন্যদিকে অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।

রাজস্ব প্রশাসনের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, কাস্টমস ও কর প্রশাসন এমন একটি খাত যেখানে বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়। ফলে এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মনে করেন, যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের সম্পদের উৎস যাচাইয়ের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

দুদক সূত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে সেসব অভিযোগের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য জানা যায়নি। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনা রয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অতীতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকায় আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্ব পায়নি বলে অনেকে মনে করেন। যদিও এই দাবির পক্ষে কোনো সরকারি নথি বা আদালতের রায় পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি এখনো অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে।

এদিকে রাজস্ব খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী আরও কার্যকরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে সম্পদের ঘোষণা দেওয়া হলেও তার প্রকৃত উৎস যাচাই হয় না। ফলে অভিযোগ থাকলেও সেগুলো প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা, আয়কর নথি যাচাই এবং ভূমি রেকর্ড বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তার প্রকৃত সম্পদ চিহ্নিত করা সম্ভব। এ ধরনের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে দুর্নীতি প্রতিরোধে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুরে আবুল কালাম আজাদ ও তার পরিবারের নামে থাকা সম্পদের পরিমাণ এবং বাজারমূল্য নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য প্রচলিত রয়েছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা ও অর্থের উৎস নির্ধারণ ছাড়া অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

অভিযোগকারীদের মতে, যদি নিরপেক্ষ তদন্ত হয় তাহলে রাজস্ব কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের সম্পদের উৎস, আর্থিক লেনদেন এবং চাকরিকালীন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে। অন্যদিকে তার সমর্থকদের দাবি, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের কারণেও অনেক সময় সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ আনা হয়। ফলে তদন্ত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

এ বিষয়ে আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ প্রচার করা হচ্ছে সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। তিনি দাবি করেন, চাকরিজীবনে তিনি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করেছেন এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সত্য নয়।

এনবিআরের গণমাধ্যম শাখার এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অভিযোগের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজস্ব প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার স্বার্থে আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অভিযোগমুক্ত হবেন, আর অভিযোগ সত্য হলে আইনের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা যেকোনো দুর্নীতির অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং তা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গেও জড়িত। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আদ্-দ্বীন হাসপাতালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ

দুর্নীতিবাজ রাজস্ব কর্মকর্তা আজাদের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট সময় ০১:১৯:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম, কর ফাঁকিতে সহযোগিতা এবং নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ ঘুরে বেড়ালেও এসব অভিযোগের কার্যকর তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে অভিযোগ জমা পড়লেও সেগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে রাজস্ব প্রশাসনের একটি অংশ এবং স্থানীয়দের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আবুল কালাম আজাদ গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ, ঘুষ গ্রহণ, কর ফাঁকিতে সহায়তা এবং অবৈধ পণ্য ছাড়করণে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। যদিও এসব অভিযোগ তিনি বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন।

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাসীন দলের কিছু প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্ব পায়নি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যায়ে অভিযোগ জমা হলেও তদন্ত প্রক্রিয়া দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়নি। ফলে অভিযোগকারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে আবুল কালাম আজাদ বিপুল আর্থিক সুবিধা অর্জন করেন। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, আমদানি-রপ্তানিসংশ্লিষ্ট কিছু ব্যবসায়ীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভ্যাট ও শুল্ক সংক্রান্ত অনিয়মে জড়িত কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কাস্টমসসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, অবৈধ বা সন্দেহজনক পণ্যের চালান আটকের পর সেগুলো ছাড় করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ছিল। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

গোপালগঞ্জে আবুল কালাম আজাদের নিজ এলাকায় গিয়ে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক বছরে তার পরিবারের নামে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ও সম্পদ অর্জনের বিষয়টি এলাকায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি নিজ নামে কম এবং স্ত্রী, বাবা ও অন্যান্য স্বজনের নামে বেশি সম্পদ ক্রয় করেছেন। এতে সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের ধারণা।

স্থানীয়দের একজন বলেন, “আমরা দেখেছি কয়েক বছরে তার পরিবারের সম্পদের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন স্থানে জমি কেনা হয়েছে। তবে এসব সম্পদের উৎস কী, তা সাধারণ মানুষ জানে না।”

আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “আইনগত জটিলতা এড়াতে অনেকে আত্মীয়-স্বজনের নামে সম্পদ রাখে। আজাদের ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ বহুদিনের। তবে এসব বিষয়ে তদন্ত হলে সত্যতা বের হবে।”

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, গোপালগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি, বসতভিটা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনাময় জমি ক্রয়ের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি শরীয়তপুর জেলাতেও তার পরিবারের নামে সম্পদ থাকার তথ্য স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের আর্থিক মূল্য কয়েক কোটি টাকার বেশি হতে পারে।

এলাকাবাসীর একাংশের মতে, চাকরিজীবনের শুরুতে আবুল কালাম আজাদের আর্থিক অবস্থা বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক সীমিত ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার জীবনযাত্রা, সম্পদ ও ব্যয়ের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তনের উৎস অনুসন্ধান করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, রাজধানীর মগবাজার এলাকায় একটি অভিজাত ভবনের ফ্ল্যাটে বসবাস করেন আবুল কালাম আজাদ। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, সেখানে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকেন। পাশাপাশি রাজধানীর অন্য একটি এলাকায় তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি আবাসনের তথ্যও পাওয়া গেছে। যদিও এসব সম্পদের মালিকানা ও উৎস সম্পর্কে সরকারি কোনো নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের হিসাব নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা হলে অনেক অভিযোগের সত্যতা সহজেই যাচাই করা সম্ভব। তাদের মতে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের অভিযোগ ওঠে, তখন নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হওয়া জরুরি।

সুশাসনবিষয়ক বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী বলা যায় না। তবে অভিযোগগুলো যদি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহল থেকে উঠে আসে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। এতে একদিকে যেমন নির্দোষ ব্যক্তি অভিযোগমুক্ত হওয়ার সুযোগ পান, অন্যদিকে অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।

রাজস্ব প্রশাসনের সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, কাস্টমস ও কর প্রশাসন এমন একটি খাত যেখানে বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়। ফলে এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা মনে করেন, যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের সম্পদের উৎস যাচাইয়ের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

দুদক সূত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে সেসব অভিযোগের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য জানা যায়নি। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনা রয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অতীতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকায় আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্ব পায়নি বলে অনেকে মনে করেন। যদিও এই দাবির পক্ষে কোনো সরকারি নথি বা আদালতের রায় পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি এখনো অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে।

এদিকে রাজস্ব খাতের স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী আরও কার্যকরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে সম্পদের ঘোষণা দেওয়া হলেও তার প্রকৃত উৎস যাচাই হয় না। ফলে অভিযোগ থাকলেও সেগুলো প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা, আয়কর নথি যাচাই এবং ভূমি রেকর্ড বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোনো কর্মকর্তার প্রকৃত সম্পদ চিহ্নিত করা সম্ভব। এ ধরনের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে দুর্নীতি প্রতিরোধে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুরে আবুল কালাম আজাদ ও তার পরিবারের নামে থাকা সম্পদের পরিমাণ এবং বাজারমূল্য নিয়ে বিভিন্ন ধরনের তথ্য প্রচলিত রয়েছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা ও অর্থের উৎস নির্ধারণ ছাড়া অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

অভিযোগকারীদের মতে, যদি নিরপেক্ষ তদন্ত হয় তাহলে রাজস্ব কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের সম্পদের উৎস, আর্থিক লেনদেন এবং চাকরিকালীন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে। অন্যদিকে তার সমর্থকদের দাবি, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের কারণেও অনেক সময় সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ আনা হয়। ফলে তদন্ত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

এ বিষয়ে আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ প্রচার করা হচ্ছে সেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। তিনি দাবি করেন, চাকরিজীবনে তিনি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করেছেন এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সত্য নয়।

এনবিআরের গণমাধ্যম শাখার এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অভিযোগের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজস্ব প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার স্বার্থে আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অভিযোগমুক্ত হবেন, আর অভিযোগ সত্য হলে আইনের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা যেকোনো দুর্নীতির অভিযোগ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং তা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্গেও জড়িত। তাই অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।