ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদের ঘনিষ্ঠ এবং তার ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত বলে বিভিন্ন মহলে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা ওসি মাহমুদুল হাসান জুয়েলের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে তার নিজ এলাকা নেত্রকোনার মদন উপজেলা থেকে শুরু করে ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও ঢাকায় একাধিক স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্র, ভূমি-সংশ্লিষ্ট তথ্য, এলাকাবাসীর বক্তব্য এবং অনুসন্ধানে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিকানার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন ওসি মাহমুদুল হাসান জুয়েল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নেত্রকোনার মদন উপজেলার নিজ গ্রামে গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে জমি ও সম্পত্তি ক্রয় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরিজীবনের শুরুতে তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল সাধারণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার সম্পদের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। বর্তমানে নিজ এলাকায় তিনি অন্যতম প্রভাবশালী সম্পদশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত বলে দাবি করেন স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মদন উপজেলায় তার বা তার ঘনিষ্ঠজনদের নামে অন্তত ৮৭ শতক আয়তনের একটি বড় পুকুরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এলাকাবাসীর দাবি, পুকুরটি শান বাঁধানো এবং বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়। স্থানীয় বাজারদর অনুযায়ী এই পুকুরের বর্তমান মূল্য কয়েক কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এলাকায় এ ধরনের বড় আকারের জলাশয় বর্তমানে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এছাড়া একই এলাকায় একটি তিনতলা ভবনের তথ্য পাওয়া গেছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। ভবনটি আধুনিক নকশায় নির্মিত এবং এলাকায় এটি অন্যতম দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভবনটির নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। বাড়িটির চারপাশে উন্নত অবকাঠামো, আধুনিক ডিজাইনের গেট এবং উন্নত মানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
মদন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্লটের তথ্যও পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই প্লটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। এলাকাটির বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং জমির চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এর মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, ওই স্থানে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা হলে আরও বেশি আয় করা সম্ভব।
এছাড়া ৫৭ শতক আয়তনের একটি প্লটের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৪৫ লাখ টাকা। একই উপজেলার আরেকটি এলাকায় ২০ শতক জমির একটি প্লট রয়েছে, যার মূল্য ধরা হচ্ছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। আরও একটি ৩৯ শতকের প্লটের তথ্য পাওয়া গেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫৮ লাখ টাকা বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুধু এসব সম্পদই নয়, এর বাইরেও আরও বেশ কিছু জমি ও সম্পত্তি আত্মীয়-স্বজন এবং ঘনিষ্ঠজনদের নামে রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ প্রকাশ্যে আসা তথ্যের চেয়েও বেশি হতে পারে। তাদের মতে, অনেক সম্পদ সরাসরি নিজের নামে না রেখে অন্যদের নামে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, গত এক দশকে মাহমুদুল হাসান জুয়েলের আর্থিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন হয়েছে। একসময় সীমিত আয়ের পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে তার পরিবারের সদস্যদের জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এলাকায় জমি কেনাবেচা, ভবন নির্মাণ এবং বিভিন্ন বিনিয়োগ কার্যক্রমে তার পরিবারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ময়মনসিংহে একাধিক আবাসিক সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও এসব সম্পত্তির দলিল ও মালিকানা সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো যাচাই প্রক্রিয়ায় রয়েছে, তবে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করছে যে তার পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক মূল্যবান সম্পদ রয়েছে। একইভাবে গাজীপুরেও জমি ও বাড়ির মালিকানার অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানী ঢাকায়ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ফ্ল্যাট ও আবাসিক সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এসব সম্পদের অবস্থান নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সম্পদের প্রকৃত মূল্য হিসাব করলে মোট সম্পদের পরিমাণ শতকোটি টাকা অতিক্রম করতে পারে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ওসি মাহমুদুল হাসান জুয়েলের স্ত্রীর নামে পরিচালিত ‘মারিহা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাব এবং আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে এসব লেনদেনের উৎস ও প্রকৃতি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে তার বেতন-ভাতার সঙ্গে সম্পদের পরিমাণের সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, একজন পুলিশ কর্মকর্তার বৈধ আয়ের মাধ্যমে এত বিপুল সম্পদ অর্জন কতটা সম্ভব। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দুর্নীতি দমন ও আর্থিক অপরাধ নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠলে তার সম্পদের উৎস, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বিবরণী, জমি ক্রয়ের কাগজপত্র এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করা হয়। এসব তথ্য পর্যালোচনার মাধ্যমেই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।
মদন উপজেলার কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা জানান, এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মাহমুদুল হাসান জুয়েলের সম্পদ নিয়ে আলোচনা করছেন। তাদের দাবি, চাকরিজীবনের শুরুতে তার পরিবারের এত সম্পদ ছিল না। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ জমি, পুকুর, বাড়ি ও বাণিজ্যিক সম্পত্তির মালিক হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, সম্পদের কিছু অংশ আত্মীয়-স্বজন এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নামে রাখা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরাসরি মালিকানা যাচাই করা গেলে প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখনো প্রকাশ্যে কোনো আদালতস্বীকৃত প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী অবস্থানের সুযোগ নিয়ে তিনি বিভিন্ন সময়ে আর্থিক সুবিধা অর্জন করেছেন। তবে এসব অভিযোগেরও আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে ওসি মাহমুদুল হাসান জুয়েল তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, যে সম্পদগুলোর কথা বলা হচ্ছে তার অধিকাংশই পারিবারিকভাবে অর্জিত অথবা বৈধ উৎস থেকে কেনা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, অতীতে বিভিন্ন সংস্থা তার আর্থিক বিষয়াদি পর্যালোচনা করেছে এবং কোনো অনিয়ম পায়নি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য থেকে একটি মহল তাকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, সেগুলোর অনেকগুলোই অতিরঞ্জিত এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অভিযোগগুলোর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত অনুসন্ধান করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে আলোচনায় থাকা সম্পদের মধ্যে রয়েছে ৮৭ শতক আয়তনের একটি পুকুর, আনুমানিক ২ কোটি টাকা মূল্যের একটি তিনতলা বাড়ি, প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি বাণিজ্যিক প্লট, ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের ৫৭ শতক জমি, ৩০ লাখ টাকা মূল্যের ২০ শতক জমি এবং ৫৮ লাখ টাকা মূল্যের ৩৯ শতক জমি। এর বাইরে ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ির তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এছাড়া ‘মারিহা এন্টারপ্রাইজ’-এর আর্থিক লেনদেন নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে অভিযোগ, অনুসন্ধান ও স্থানীয়দের বক্তব্য একদিকে থাকলেও অন্যদিকে ওসি মাহমুদুল হাসান জুয়েল সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এখন সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার অনুসন্ধান, প্রাপ্ত নথিপত্র এবং প্রয়োজনে আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করছে। অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে এবং চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















