ক্ষুধা মেটাতে সাধারণ মানুষ চায় ডাল-ভাত। এর সঙ্গে তাদের প্রোটিনের শেষ আশ্রয় একটি ডিম ও ব্রয়লার মুরগি। কিন্তু সাধারণ মানুষের এই খাবারেও বসছে কর। করের বোঝা এবং প্রাণিখাদ্যের (ফিড) আকাশচুম্বী দামের চাপে পোলট্রি শিল্প এখন ধ্বংসের মুখে। প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। এই খাত ভেঙে পড়লে একটি প্রজন্ম পুষ্টিহীনতায় ভুগতে পারে। গত পাঁচ বছরে দেশে পোলট্রি খাতে উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যার মধ্যে চলতি বছরেই সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি ঘটেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে তৃণমূলের খামারগুলোতে। ব্যয় ও আয়ের সমন্বয় না হওয়ায় হাজার হাজার খামারি খামার বন্ধ করে বেকার হয়ে পড়ছেন।
চলতি বাজেটে করপোরেট কর এক লাফে ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সব ধরনের কর ও শুল্ক বাড়ানোয় পোলট্রির খাদ্যসহ অন্যান্য উপকরণের দাম দফায় দফায় বেড়েছে। ফলে দেশের উদীয়মান এই শিল্প বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পোলট্রি খাতে করপোরেট কর এখন সবচেয়ে বেশি। ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী পাকিস্তান, নেপাল, ভারত, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পোলট্রি ও পশুখাদ্য খাতে কর ও শুল্ক সুবিধার দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
আসন্ন বাজেটে পোলট্রি শিল্পের ওপর করের বোঝা অর্ধেকে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো পোলট্রি খাতের জন্য বিশেষ বরাদ্দ ও কর অব্যাহতি নিশ্চিত করা। আয়কর, আমদানি শুল্ক ও অগ্রিম আয়করে (এআইটি) ছাড় দেওয়ার পাশাপাশি প্রান্তিক খামারিদের জন্য সহায়ক বাজেট ব্যবস্থাপনা জরুরি। তারা সতর্ক করে বলেন, যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সহজলভ্য প্রোটিনের সবচেয়ে বড় উৎস পোলট্রি শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। তখন ডিম ও মুরগি দ্বিগুণ দামে কিনতে হতে পারে।
খামারিদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ হয় সাড়ে ১০ থেকে ১১ টাকা, অথচ পাইকারি বাজারে অনেক সময় তা সাড়ে ৭ থেকে সাড়ে ৮ টাকায় বিক্রি করতে হয়। অন্যদিকে, প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১৪৬ টাকা, যেখানে পাইকারি দাম থাকে ১৪৫ থেকে ১৪৮ টাকার মধ্যে। এই অবস্থায় উৎপাদন খরচ কমানো ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
দুই যুগের বেশি সময় ধরে খামার পরিচালনা করে আসা টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর উপজেলার খামারি আলমগীর হোসেন বলেন, গত এক বছরে যেভাবে খাদ্যের দাম বেড়েছে, অতীতে এমন পরিস্থিতি তিনি কখনো দেখেননি। প্রতিদিন তিনি নিজে এবং হাজার হাজার খামারি লোকসান গুনছেন। উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ডিম ও মুরগি বিক্রি করতে হচ্ছে। তার চোখের সামনে শত শত খামারি নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। খাদ্যের দাম কমানো না গেলে প্রান্তিক পর্যায়ের কোনো খামারিই টিকে থাকতে পারবেন না বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, পোলট্রি শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে প্রথমেই খাদ্যের দাম কমাতে হবে, কারণ খামারির মোট খরচের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই খাদ্যে ব্যয় হয়। খাদ্যের দাম কমাতে হলে উৎপাদন খরচ কমাতে হবে, আর যেহেতু খাদ্য উৎপাদনের উপকরণ আমদানিনির্ভর, তাই আয়কর ও শুল্ক কমানো জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে করের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশীয় খাদ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তা তৈরি করে তাদের যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কছাড়সহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের এটিই একমাত্র উপায়। তা না হলে সহজলভ্য প্রাণিজ আমিষের এই উৎসটি গভীর সংকটে পড়বে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, বিশ্বের কোথাও খাদ্য উৎপাদন খাতে এত উচ্চ কর আরোপ করা হয় না। বরং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কর অব্যাহতির মাধ্যমে উদ্যোক্তা ও খামারিদের সহায়তা দেওয়া হয়। অথচ কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও বাংলাদেশ উল্টো পথে হাঁটছে।
তিনি জানান, এর প্রভাব ইতোমধ্যে উৎপাদনকারীদের ওপর পড়তে শুরু করেছে এবং ধীরে ধীরে তা বাজার ও ভোক্তাদের ওপরও পড়বে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের সুরক্ষা এবং পোলট্রি শিল্পের উন্নয়নের জন্য কর ও শুল্ক অর্ধেকে নামিয়ে আনা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। তা না হলে প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না এবং পুরো শিল্প বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তখন নির্ধারিত উচ্চ মূল্যে ভোক্তাদের ডিম, মুরগি ও মাংস কিনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, গত পাঁচ বছরে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে পোলট্রি শিল্প টিকে ছিল। কিন্তু করোনা-পরবর্তী বৈশ্বিক পরিস্থিতি এই খাতকে আরও কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। এর মধ্যে চলতি বছরে কর ও শুল্ক প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে। করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা অযৌক্তিক বলে তিনি মন্তব্য করেন। এ ছাড়া এআইটি ১ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ এবং টার্নওভার কর শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াছ হোসেন বলেন, চলতি অর্থবছরে পোলট্রি খাতে সব ধরনের কর ও শুল্ক বাড়ানো হয়েছে, যার প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারকে কর ও শুল্ক ব্যবস্থায় নমনীয় হতে হবে।
তার মতে, টার্নওভার কর শূন্য দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে এনে মুনাফার সঙ্গে সমন্বয় করা উচিত এবং করপোরেট কর ১০ শতাংশে নামালে বড় উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়বে। পাশাপাশি এআইটি ১ শতাংশে নামানো, টাকা ফেরতের জটিলতা দূর করা এবং টিডিএস কমানো প্রয়োজন।
বিপিআইএর মহাসচিব ও তরুণ উদ্যোক্তা মো. সাফির রহমান বলেন, আগামী বাজেটে পোলট্রি শিল্পে বিশেষ সুবিধা না দিলে এ খাতে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে না এবং বর্তমান উদ্যোক্তারাও অন্য খাতে চলে যেতে পারেন। ফলে ডিম ও মুরগি উচ্চ মূল্যে কিনতে হবে এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোলট্রি শিল্পকে শুধু একটি ব্যবসা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। আগামী বাজেটে করের বোঝা কমানো না হলে ডিম ও মুরগি কেবল ধনীদের খাবারে পরিণত হতে পারে, যা একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য কাম্য নয়।
পশুখাদ্য ও পোলট্রি খাতে বিভিন্ন দেশে কর ও শুল্ক সুবিধা বিষয়ে ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ফিড মিলগুলো টার্নওভারের ভিত্তিতে মাত্র সাড়ে ৭ থেকে ১৫ শতাংশ কর দেয়। থাইল্যান্ডে বিনিয়োগ বোর্ডের অধীনে পশুখাদ্য শিল্প পাঁচ থেকে আট বছর পর্যন্ত শতভাগ কর অব্যাহতি পায়। মালয়েশিয়া পশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে সেলস ট্যাক্স সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করেছে এবং নতুন ফিড শিল্পকে ১০ বছর পর্যন্ত শতভাগ কর অব্যাহতি দেয়।
নেপাল পশুখাদ্যের ভিটামিন, অ্যামিনো অ্যাসিড ও খনিজ উপাদান আমদানিতে পাঁচ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিয়েছে। ভারতে সাধারণ আমদানিতে কোনো অগ্রিম আয়কর নেই এবং ২০২৬ সালে কৃষিযন্ত্রপাতির ওপর থেকে টিসিএস সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে পশুখাদ্য আমদানিতে এখনো পাঁচ শতাংশ অগ্রিম কর বহাল রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিষয়ে দ্রুত নজর দেওয়া জরুরি।
পোলট্রি খাতের সংগঠন ও খামারিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিকে ১০০ ভিত্তি ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, ২০২২ সালে তা বেড়েছে ১১৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১৪৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ১৭০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ১৯০ শতাংশে পৌঁছেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















