স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদন নথির তথ্য অনুসারে, সার্কেল ৭ অডিট আপত্তিতে জানানো হয়- নগরীর ৩৬নং ওয়ার্ডের হোল্ডিং নং ২১৭২/২৪২২ থ্রি স্টার মানের আগ্রাবাদ হোটেল লিমিটেডের বার্ষিক গৃহকর নির্ধারণ করা হয় আট কোটি টাকা। এই হোল্ডিংয়ে কর কর্মকর্তা নিজ হাতে লিখে জালিয়াতির মাধ্যমে আপিল ফরমে বার্ষিক গৃহকর নির্ধারণ করা হয় ৮৫ লাখ টাকা। কমানো হয় সাত কোটি ১৫ লাখ টাকা। একই সার্কেলে নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার আরেক তিন তারকা মানের হোটেল ‘সেন্ট মার্টিন লিমিটেডে’র গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছিল তিন কোটি ৩০ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে সাদা ফ্লুইড দিয়ে মুছে সেই কর নির্ধারণ করা হয় ১৮ লাখ টাকা। এছাড়া ‘চিটাগং কনটেইনার ট্রান্সপোর্টেশন কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছিল এক কোটি ৮৯ লাখ টাকা। কিন্তু কর কর্মকর্তারা ওই হোল্ডিংয়ের গৃহকর চূড়ান্ত করেন ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
একইভাবে চসিকের ৮নং সার্কেলের অডিট আপত্তিতে জানানো হয়, নগরীর ৩১৮/৩৩১ হোল্ডিংয়ে ইসাক অ্যান্ড ব্রাদার্সের ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছিল ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ১৯ হাজার ২৫০ টাকা। পরে প্রথম সংখ্যা ২ মুছে চূড়ান্ত করা হয় ছয় কোটি ৩৮ লাখ ১৯ হাজার ২৫০ টাকা। একই সার্কেলে ৫১৫/এ/৬৯৪ হোল্ডিংয়ে ইন কনন্ট্রেড নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের ২৫ কোটি ৬৭ লাখ চার হাজার ৫০ টাকা রাজস্ব নির্ধারণ করলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে আবারও দুই সংখ্যাটি মুছে করা হয় পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ চার হাজার ৫০ টাকা। আপিল করে করা হয় ৬৭ লাখ চার হাজার টাকা। এতে করপোরেশনের ক্ষতি হয়েছে আট কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার ৮০ টাকা।
এই কথার সত্যতা পাওয়া যায় কেন্দ্রীয় অডিট কমিটির প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, The City Corporation Taxation Rules 1986 11 & 12 মোতাবেক আপিল শুনানির মাধ্যমে কর নিরূপণের ক্ষেত্রে একটি রিভিউ কমিটি থাকবে এবং ওই কমিটির প্রধান হবেন মেয়র। ওই সার্কেলে তিনজনের মধ্যে একজন আপিল ফরমে স্বাক্ষর করলেও অন্য সদস্যরা এবং মেয়র স্বাক্ষর করেননি। অডিট কোডের বিধি ৫৯-এর নির্দেশনা অনুযায়ী জবাব প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও উক্ত কর কর্মকর্তারা জবাব প্রদানে বিরত ছিলেন।
নগর ভবনে সেবা নিতে আসা অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি কর্মকর্তা আসহাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, নগরীর রাস্তা ভাঙা, ড্রেন বন্ধ। এ ব্যাপারে চসিক বলছে, এসব ঠিক করার টাকা নেই। এখন দেখি টাকা ঠিকই ছিল, পর্দার আড়ালে তারা নিজেদের মধ্যেই জনগণের টাকা ভাগ করে নিত। আসলে টাকার বিনিময়ে কর কমিয়ে দেওয়ার চক্রটি দীর্ঘদিনের একটি প্রশিক্ষিত চক্র। ১৭৫ কোটি টাকা উধাও হওয়া কোনো সংবাদ নয়, এটি নগরবাসীর প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা। এখন দেখার বিষয়, মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন কি এই চক্রের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন, নাকি আগের মেয়রদের মতো এই চক্রের সঙ্গে সমঝোতা করে চসিকের লাল বাতি জ্বালাবেন!
চসিকের সংস্থাপন বিভাগের তথ্যমতে যারা ছিলেন নেপথ্যে : রাজস্ব বিভাগের তথ্যমতে, এই কর্মকাণ্ডের পেছনে ছিলেন মো. শাহ আলম (ভারপ্রাপ্ত) প্রধান কার্যালয়; চসিকের রাজস্ব বিভাগের কর অঞ্চল-১-এর দায়িত্বে ছিলেন কর কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মহিউদ্দিন আহমেদ সরওয়ার চৌধুরী, সার্কেল-২-এর কর কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ছাবের আহমদ, সার্কেল-৩-এর কর কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সেলিম উদ্দিন সিকদার, সার্কেল-৪-এর নুরুল আলম, সার্কেল-৫-এর কর কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সার্কেল-৬-এর কর কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) রাজেশ চৌধুরী, সার্কেল-৭-এর কর কর্মকর্তা রূপন কান্তি চৌধুরী, মো. মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী ও জানে আলম এবং সার্কেল-৮-এর কর কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আবদুল মজিদ।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে সার্কেল-৭-এর রাজস্ব কর্মকর্তা রূপন কান্তি চৌধুরী বলেন, আমার জানামতে আমি নিয়ম মেনে সব করেছি। আমার মনে হয় না যে আমি ভুল করেছি। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি যা জানতে চেয়েছে, তা-ই বলেছি।
অপর রাজস্ব কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন বলেন, দুই বছর আগে আমি অবসরে গেছি। তাই এ মুহূর্তে আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ব্যাপারে কিছু বলতে চাই না।
চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এসএম সরওয়ার আলম বলেন, এই ব্যাপারে তদন্ত কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে আলাপ করে জেনে নিন।
এদিকে তদন্ত কমিটির প্রধান মহিউদ্দিন মুরাদ বলেন, এরই মধ্যে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। তবে রিপোর্টে কী আছে, তা জানাতে চাননি তিনি।
চসিক সচিব মো. আশরাফুল আমিন বলেন, আমরা তদন্ত রিপোর্ট পেয়েছি। সিটি করপোরেশনের বিধি-বিধানমতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
নগরবাসীর প্রশ্ন, চসিক কি আদৌ সাহস দেখাবে এই শক্তিশালী চক্রের বিরুদ্ধে? নাকি তদন্তের দোহাই দিয়ে গোপন সমঝোতায় দিনশেষে লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে যাবে প্রহসনের তদন্তের নাটক? তবে চসিক কর্তৃপক্ষ বলছে, এবার তারা কঠোর হবেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, করপোরেশনের এ রকম একাধিক রাজস্ব বিভাগের অনিয়ম হয়েছে সাবেক মেয়রদের আমলে। এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে, যারা দোষী সাব্যস্ত হবেন, তাদের ব্যাপারে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে কাউকে ন্যূনতম ছাড় দেওয়া হবে না।
মেয়র আরও বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজস্ব বিভাগে যাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছি, তাদের বিরুদ্ধে একাধিক ব্যবস্থা নিয়েছি। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার দায়ে চসিকের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করিনি। মূলত আমার ক্লিয়ার মেসেজ, অতীতে যারা দুর্নীতি করেছেন কিংবা এখনো কেউ যদি এ অপরাধ করেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, কারণ আমি দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























