পটুয়াখালীতে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ তরমুজ চাষ হওয়ায় জেলার গ্রাম থেকে শহরের প্রায় সব বাজারেই এখন রসালো তরমুজের ছড়াছড়ি। প্রতি পিস তরমুজ ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে আগের বছরের তুলনায় তরমুজ বিক্রি কমলেও উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে তীব্র গরম এবং আবহাওয়াজনিত নানা কারণে ন্যায্য দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষিরা।
আমতলী উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের কুলেরচর গ্রামের চাষি মোশাররফ মৃধা (৫৫) নিজের উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি করতে এসেছেন পটুয়াখালীর বড় চৌরাস্তায়।
চোখেমুখে হতাশার ছাপ নিয়ে তিনি বলেন, দেড় লাখ টাকা খরচ করছি, আইজগো তরমুজ নিয়া আইছি ব্যাচতে। ত্রিশ-পয়ত্রিশ হাজার টাকাও ব্যাচতে পারিনাই। স্বপ্ন ছিল এইয়া দিয়া অনেক কিছু হইবে, ধার-দেনা করে- স্ত্রীর গহনা বন্ধ করে রেখে তরমুজ চাষ করছিলাম। ভাবছিলাম এইয়া দিয়া দেনা পরিশোধ করমু, কিন্তু কিছুই হইলো না আরও ঋণী হইয়া গেলাম। যেরম হউক খাটুনী করে এগুলা দেওয়া লাগবে। এরকম শত শত কৃষক এ বছর লাভের বদলে লোকসানের হিসেব কষছেন।
একইভাবে লোকসানের শঙ্কায় আছেন পটুয়াখালী নিউ মার্কেটের কসমেটিক্স ব্যবসায়ী জুয়েল (৩৫)। ব্যবসায় মন্দা থাকায় তিনি তরমুজ চাষে বিনিয়োগ করেন। সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নে ৮ কানি জমিতে প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে তরমুজ চাষ করেছেন তিনি। কিন্তু প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় হতাশ তিনি। জুয়েল বলেন, ওদিকে যে ব্যবসা-বাণিজ্য করি তার অবস্থা খুব খারাপ। তাই তরমুজ চাষের দিকে আসছিলাম। গত বছরের তুলনায় এ বছর বাজারে তরমুজের পরিমাণ চার গুণ বেশি। কিন্তু ন্যায্য দাম নিয়ে আমরা শঙ্কায় আছি। অনেক চাষি এ বছর চালান নিতে পারেনি অনেকে ক্ষেত রেখে চলে গেছে। এরপর ফেলে রাখা তরমুজ গরু ছাগলে খেয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবারের অবস্থা খুবই খারাপ।
গলাচিপার গোলখালী ইউনিয়নের অভিজ্ঞ তরমুজ চাষি মাহবুব আলম বলেন, আমি ২০০৫ সাল থেকে তরমমুজ চাষ করি। এ বছরের মত এমন কম বাজারমূল্য আর কখনো হয়নি। ২০১৬ সালেও কম দাম হয়েছিল একবার, কিন্তু এতটা না। আগাম যারা চাষ করেছে তারা মোটামুটি লাভবান ছিল, কিন্তু এখন যারা আমাদের মত চাষি তাদের লোকসান হবে আর আমাদের পেছনের ধাপে যারা চাষ করেছে তারা আরও লসের ভাগিদার হবে। কারণ, আমাদের তরমুজের উত্তরাঞ্চলের যে বাজার মূল্য তাও কম।

বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহকে দায়ী করে তিনি আরও বলেন, তরমুজ চাষ মূলত ছিল চাষিদের কাজ কিন্তু এখন যারা চাকরি করে বা অন্য ব্যবসা করে তারাও লোক রেখে তরমুজ চাষ করছে। তারা ভাবে, এক কানি জমিতে ২ লাখ টাকা খরচ করে ৭-৮ লাখ টাকা লাভ পাবে এমন লোভে পড়ে অনেকেই তরমুজ চাষ করছে। দেখেন, আশপাশের জমিতে যেখানে আগে মুগডাল, বাদাম-মরিচ চাষ হত সেখানেও এখন তরমুজ। এ কারণে, বাজারে তরমুজ সরবরাহ বেশী হওয়ায় তেমন দাম নাই।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) পটুয়াখালী শহরের হেতালিয়া বাঁধঘাট, বড় চৌরাস্তা, নিউ মার্কেট, নতুন বাজার, শিয়ালী বাজার, বদরপুর বাজার ও লাউকাঠী বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি বাজারেই তরমুজ বিক্রি হচ্ছে। তবে ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম।
হেতালিয়া বাঁধঘাটে তরমুজ বিক্রেতা জসিম মোল্লা (৪০) বলেন, গতবার এখানে এতগুলা দোকান ছিল না, আমরা মাত্র ৫-৭ জন দোকানদার ছিলাম। অনেকেই নতুন বসছে এটা ভেবে যে তরমুজে অনেক ব্যবসা। দোকান নিয়ে বসে তো এরা লসে আছে। এই তরমুজ টা আমরা গতবছর সাড়ে ৪ শ টাকায় বিক্রি করছি (একটি বড় সাইজের তরমু হাতে নিয়ে) তবুও কাস্টমার ছিল । কিন্তু এ বছর দুইশো আড়াইশো টাকায় বিক্রি করি তবুও কাস্টমার নাই। দাম শুনলেই কাস্টমার চলে যায়।
একই এলাকার আরেক ব্যবসায়ী সজিব (২৬) বলেন, ২ লাখ টাকার তরমুজ তুলছি দোকানে কিন্তু কাস্টমার নাই। যেখানে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ তরমুজ বিক্রি হওয়ার কথা সেখানে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০ টা তরমুজ। এগুলো বেশীদিন রাখাও যায় না, পেকে ঝোল হয়ে যায় তারপর ফালাইয়া দেই।
চাষি ও ব্যবসায়ীদের মতে, স্থানীয় বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে তরমুজ দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ফলে দাম কমে যাচ্ছে এবং চাষিরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এ বছর জেলায় প্রায় ৩৫ হাজার ৫৭ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৭ হাজার হেক্টর বেশি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. আমানুল ইসলাম বলেন, জেলায় এ বছর তরমুজের চাষ গতবারের তুলনায় রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। অধিক পাঁকার কারণে অনেক সময় তরমুজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তরমুজের ম্যাচুরিটি পিরিয়ডের দুই থেকে তিন দিন আগে কাটায় তা বাজার ঘুরতে ঘুরতে আরও ৪-৫ দিন লেগে যায় এতে ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রির আগেই কিছু সংখ্যক তরমুজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । এজন্য সর্বোচ্চ ম্যাচুরিটির ১২-২৩ দিন আগেই তরমুজ ক্ষেত থেকে কেটে ফেলা উচিত। আবার অনেকেই দাম পাবে ভেবে তরমুজ বেশি দিন ক্ষেতে রাখে এতে তরমুজ ক্ষেতেই পচন ধরা শুরু হয়ে যায়।
তিনি আরও জানান, তরমুজ উৎপাদনে চাষিদের প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
ন্যায্য দাম নিশ্চিতের বিষয়ে জেলা সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, এখানে উৎপাদন করে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছেই যারা তরমুজ বিক্রি করেন তারা ওইভাবে দাম পান না। দূর-দূরান্তের মার্কেটগুলোর সাথে আমরা যাদের লিংক আপ ( সংযুক্ত করা) করে দিচ্ছি তারা ভালো দাম পাচ্ছে। আমাদের কাছে আসলে আমরা চাষিদের সহযোগিতা করছি। তাদেরকে দেখিয়ে দিচ্ছি যে আপনাদের তরমুজ ওমক জায়গায় দেন, এই নাম্বারে ফোন দেন, এই বাজারে যান। কাছাকাছি বিক্রি হলে, বাজারে যখন সরবরাহ বেড়ে যায় তখন দাম কমে যায়। ন্যায্য মূল্য তরমুজ বিক্রির বিষয়ে আমরা কৃষকদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে যাচ্ছি। আমরা সরকারকে একটি প্রস্তাবনা দিয়েছি যে তরমুজ থেকে আরও বিকল্প কী কী উৎপাদন করা যায়। জুস উৎপাদন করা যায় কি না এ বিষয়েও আমরা কথা বলছি।
জেলা প্রতিনিধি, পটুয়াখালী 



















