ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বড়মানিকা ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডে জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে ইয়ানুর (৪০) নামে এক গৃহবধূকে মারধর এবং তার বসতবাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। রবিবার (০৫ এপ্রিল) সন্ধ্যায় জমিদ্দার বাজার সংলগ্ন বৈদ্ধ বাড়িতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে হামলার বিভীষিকাময় চিত্র, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী চাঁন মিয়া ফরাজীর ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে জসিম ও তার চাচার মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। বিষয়টি একাধিকবার স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা হলেও তা স্থায়ী সমাধানে পৌঁছায়নি। এরই জেরে ঘটনার দিন সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। তিনি বলেন, “আমরা তখন বাজারের পাশে বসে ছিলাম। হঠাৎ দেখি কয়েকজন লোক দলবদ্ধ হয়ে ইয়ানুরের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। তাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।”
চাঁন মিয়া আরও জানান, কিছুক্ষণ পরই জসিমসহ তার সহযোগীরা ইয়ানুরের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তারা কোনো কথা না বলে হঠাৎ করেই হামলা শুরু করে। “ইয়ানুর বেগম ও তার সন্তানকে তারা এলোপাতাড়ি মারধর করতে থাকে। আমরা দূর থেকে চিৎকার শুনতে পাই। কাছে গিয়ে দেখি ঘরের ভেতর ভাঙচুর চলছে, আর ইয়ানুর মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে,”—বলেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, হামলাকারীরা শুধু মারধরেই থেমে থাকেনি, বরং বসতঘরের বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলে। ঘরের দরজা-জানালা, আসবাবপত্র ভাঙচুর করা হয়। এতে পরিবারটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয়রা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে হামলাকারীরা তাদেরও ভয়ভীতি দেখায় বলে অভিযোগ করেন চাঁন মিয়া।
ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “আমরা অনেকেই এগিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা খুব উত্তেজিত ছিল। হাতে লাঠিসোঁটা ছিল। তাই কেউ সরাসরি বাধা দিতে সাহস পায়নি। পরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে আমরা গিয়ে আহতদের উদ্ধার করি।”
জানা যায়, নদী ভাঙনের কারণে ইয়ানুর বেগম তার পরিবার নিয়ে কয়েক বছর আগে ওই এলাকায় এসে বসবাস শুরু করেন। তিনি জসিমের চাচার কাছ থেকে প্রায় ৮ শতাংশ জমি ক্রয় করে সেখানে ঘর নির্মাণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করলেও পূর্বের কিছু শত্রুতার জেড় ও জমি নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে এ ঘটনার সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলার সময় জসিম, রিনা, কুলসুম, তামিম, মনির, পারভিন, নাজিম, নিজাম ও মাইনউদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন অংশ নেয়। তারা সংঘবদ্ধভাবে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। ঘটনার পর হামলাকারীরা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।
আহত ইয়ানুরকে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তার প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ভোলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, যেকোনো সময় পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে জমি সংক্রান্ত বিরোধ মীমাংসা না হওয়ায় উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
অভিযুক্ত জসিম গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, “আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমরা কোনো হামলা চালাইনি। বরং আমাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব বলা হচ্ছে।”
তবে স্থানীয়দের একাংশ বলছেন, পূর্ব বিরোধের জেরে এ হামলা পরিকল্পিতভাবেই ঘটানো হয়েছে। তারা দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে বোরহানউদ্দিন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, “এ ঘটনায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এলাকাবাসীর দাবি, এমন ঘটনায় দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তারা মনে করছেন, সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে পুরো এলাকা থমথমে পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন সচেতন মহল।
রিয়াজ ফরাজী(ভোলা) 


















