ঢাকা ০৪:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
শ্রীপুরে সাংবাদিককে মিথ্যা মামলা দেওয়ায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ কুমিল্লায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৬টি ঘর ও ২টি গোডাউন ভস্মীভূত, ক্ষতি প্রায় ১৫ লাখ টাকা ‎বোরহানউদ্দিনে শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাদক বিরোধী সচেতনতামূলক সভা ও র‍্যালি অনুষ্ঠিত রাজবাড়ীতে পাটের গোডাউনে আগুন, ৩ ফায়ার ফাইটার আহত তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম দ্রুত শুরু করতে জাইকার সহযোগিতা কামনা সবাই বলছিল তুমি বড় ম্যাচ জেতাতে যাচ্ছ : অভিষেক অনিয়মের প্রমাণ থাকলেও বহাল তবিয়তে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের এমডি মীর মোফাজ্জল হোসেন ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডে নিলয় পাশাকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ ফৌজদারহাটে বিটিসিএলের শাহ আলম–জয়নাল–উৎপল সিন্ডিকেটের সরকারি গাছ কেটে বিক্রির অভিযোগ টেকসই অংশীদারত্বে অব্যাহত সহযোগিতায় জোর বাংলা‌দেশ-কানাডার

ঈদের ছুটিতে কম বাজেটে ঘুরে আসুন দুর্গাপুর-চন্দ্রডিঙ্গা

ঈদের ছুটি মানেই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে একটু অন্যরকম সময় কাটানোর সুযোগ। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে প্রকৃতির কাছে ছুটে যাওয়ার জন্য এ সময়টা যেন সবচেয়ে উপযুক্ত। পাহাড়, নদী আর নির্মল বাতাসে ভরা সবুজ কোনো শান্ত গন্তব্য খুঁজছেন? তাহলে এবারের ঈদ ভ্রমণের ঠিকানা হতে পারে পাহাড়-নদীর মিলনে গড়া নেত্রকোণার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা। অল্প খরচে পাহাড়, নদী আর ঝর্ণার সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে নেত্রকোণা হতে পারে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য দারুণ এক গন্তব্য।

পাহাড়-নদীর মায়ায় দুর্গাপুর
নেত্রকোণার দুর্গাপুর বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটন এলাকা। অল্প খরচে ১–২ দিনের ভ্রমণে এখানে একই সঙ্গে পাওয়া যায় পাহাড়, নদী ও স্থানীয় সংস্কৃতির এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তাই পরিবার, বন্ধু কিংবা ছোট গ্রুপ নিয়ে ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসার জন্য দুর্গাপুর হতে পারে দারুণ একটি গন্তব্য।

নেত্রকোণা জেলা শহর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা মোটরসাইকেলে করে সহজেই পৌঁছানো যায় দুর্গাপুরে। প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দূরের এই পথ পাড়ি দিতে জনপ্রতি খরচ হতে পারে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।

দুর্গাপুরে পৌঁছানোর পর সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে ঘুরে দেখা যায় আশপাশের পর্যটন স্পটগুলো। পরিবার নিয়ে ঘুরতে স্থানীয় যাতায়াতে খরচ হতে পারে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা। পাশাপাশি বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় নৌকায় করে জিরো পয়েন্ট ঘুরে দেখার সুযোগও রয়েছে। নৌকা ভ্রমণে খরচ হতে পারে ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা। দুর্গাপুরের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে-

সাদামাটির পাহাড় : নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় অবস্থিত বিজয়পুরের সাদা মাটির পাহাড়টি বাংলাদেশের একমাত্র চীনা মাটির পাহাড়। বর্তমানে এটি দেশের অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান।

পাহাড়টি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে অনন্য। এর একেক অংশে মাটির রং একেক রকম। কোথাও লাল, কোথাও সাদা আবার কোথাও নীলাভ। দেখে মনে হবে যেন নানা রঙের খেলা। পাহাড়ের পাদদেশেই একটি লেক। লেকের পানির রঙেও ভিন্নতা দেখা যায়। পাহাড়ের ছায়া ও আকাশের রঙের ওপর ভিত্তি করে লেকের পানির রং পরিবর্তন হয়। পাহাড় আর লেকের অপরুপ সৌন্দর্য কে কারো মন কেড়ে নেবে।

সোমেশ্বরী নদী : ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের বিঞ্চুরীছড়া, বাঙাছড়া প্রভৃতি ঝর্ণাধারা ও পশ্চিম দিক থেকে রমফা নদীর স্রোতধারা একত্রিত হয়ে সোমেশ্বরীর সৃষ্টি। দুর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুর ও ভবানীপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রাণীখং পাহাড়ের পাশ দিয়ে দক্ষিণ দিকে শিবগঞ্জ বাজারের কাছে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয় এটি। একসময় সমগ্র নদী ‘সুমসাং’ নামে পরিচিত ছিল। পাহাড়ের গা ঘেঁষে বয়ে চলা সোমেশ্বরীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য স্বচ্ছ পানি। হাঁটু পানি বা এর চেয়ে বেশি পানিতে অনায়াসে নিচের বালি দেখা যায়। নৌকা নিয়ে মাঝিরা নদীতে ঘুরে বেড়ায়। কেউ মাছ শিকার করে। কেউবা ঘুরে ঘুরে পর্যটকদের নদীর সৌন্দর্য দেখায়। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও কম। পাহাড়ের ঢাল থেকে বয়ে আসা ঝরনার পানিই এই নদীর মূল উৎস। ঝরনার পানি হওয়ায় এর পানি অতি স্বচ্ছ ও ঠান্ডা। দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজ ছাড়াও নানাভাবে এই নদীকে ব্যবহার করে স্থানীয়রা।

সোমেশ্বরী নদীতে ঘুরে বেড়ালেই চোখে পড়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেঁষে সবুজঘেরা ও লাল চীনামাটির অসংখ্য পাহাড়। খেয়া নৌকা নিয়ে নদীতে ভ্রমণ করলে দেখা যায় গভীরে ছুটে চলছে মাছ। এছাড়া নদীর তলদেশে বালির ওপর অসংখ্য ঝিনুক আর নুড়ি পাথর পড়ে থাকতে দেখবেন। নদী পারাপারের জন্য বাঁশ ও কাঠের সাঁকো তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে মানুষের পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও অন্যান্য ছোট যানবাহন চলাচল করে।

রানীখং ঐতিহাসিক ক্যাথলিক গির্জা : দুর্গাপুর থানায় আদিবাসী হাজং সম্প্রদায় এবং গারো সম্প্রদায়ের বসবাসের কারণে এখানে বেশ কিছু গির্জা রয়েছে। বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্পে যাওয়ার পথে রানীখং গির্জা আপনার চোখে পরবে। সম্ভবত ১৯১০ সাল থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে এই গির্জাটি নির্মিত হয়েছিল। এখান থেকে কিছু মানুষ ঢাকায় বিশপের কাছে গিয়ে তাদের গ্রামে মিশনারিজ চেয়ে অনুরোধ করেছিল। তবে দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য কারনে বিশপ তাদের অনুরোধ রক্ষা করতে পারেননি। তবে তিনি কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যেকারনে পরবর্তী বিশপ এখানে সফলতার সাথে গির্জা স্থাপনে সমর্থ হন। সোমেশ্বরী নদীর পাশে একটি ছোট পাহাড়ের উপর এই গির্জাটি অবস্থিত। এখানকার শান্ত পরিবেশে পাহাড়ের পাদদেশে নদীর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবে।

হাজং ও গারো আদিবাসী গ্রাম : নেত্রকোণার সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা এলাকার পাহাড় ও সমতল ভুমিতে বাস করছেন বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়। এর মধ্যে গারো, হাজং, হদি উল্লেখযোগ্য। হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নালিতাবাড়ী, কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরের মতো সুসং দুর্গাপুর, বিরিশিরি ও সূর্যপুর গ্রামের মতো স্থানগুলোতে এই দুই সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় মাতৃতান্ত্রিক ও কৃষিভিত্তিক সমাজ ও সংস্কৃতি বিদ্যমান

দুই দিনের একটি সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে দুর্গাপুর ঘুরে দেখতে জনপ্রতি মোটামুটি ২৭০০ থেকে ৪৮০০ টাকার মতো খরচ হতে পারে। এর মধ্যে নেত্রকোণা থেকে দুর্গাপুর যাওয়া-আসায় প্রায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, স্থানীয় যাতায়াতে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং এক রাতের আবাসনে ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা ব্যয় হতে পারে। এছাড়া খাবারের জন্য ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে আরও প্রায় এক হাজার টাকা ধরে নিলে পুরো ভ্রমণটি সহজেই এ বাজেটের মধ্যেই সম্পন্ন করা সম্ভব।

সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ের টানে চন্দ্রডিঙ্গা
ঈদের ছুটিতে আরেকটি চমৎকার গন্তব্য হতে পারে নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলার চন্দ্রডিঙ্গা। এখানে দাঁড়ালে বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারেই চোখে পড়বে ভারতের মেঘালয়ের সারি সারি পাহাড় যা মুহূর্তেই মুগ্ধ করে ভ্রমণপিপাসুদের।

কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের পাঁচগাঁও এলাকায় অবস্থিত এই পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্রটি স্থানীয়দের কাছে ‘চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়’ বা ‘পাঁচগাঁও টিলা’ নামেও পরিচিত।

জনশ্রুতি রয়েছে, অতীতে কোনো এক সময়ে চাঁদ সওদাগরের একটি নৌকা এখানে ডুবে গিয়েছিল। সেই গল্প থেকেই পাহাড়টির নাম হয়েছে ‘চন্দ্রডিঙ্গা’।

চারপাশে পাহাড়, ছোট নদী আর সবুজ বনভূমিতে ঘেরা এই এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। বর্ষাকালে এখানে মেঘ ও কুয়াশার আবরণে তৈরি হয় অন্যরকম এক পরিবেশ, আর শুষ্ক মৌসুমে দেখা যায় সবুজে ঘেরা পাহাড়ি দৃশ্য। কোথাও কোথাও ছোট জলপ্রপাতও দেখা যায়, যা ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

নেত্রকোণা থেকে কলমাকান্দা পর্যন্ত বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা মোটরসাইকেলে যাওয়া যায়। প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পথের জন্য খরচ হতে পারে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা। এরপর পাঁচগাঁওয়ের চন্দ্রডিঙ্গা পর্যন্ত মোটরসাইকেলে যেতে খরচ পড়তে পারে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে কলমাকান্দা থেকে সারাদিনের জন্য মোটরসাইকেল ভাড়া করলে সব স্পট ঘুরে দেখা সহজ হয়। চন্দ্রডিঙ্গার প্রধান আকর্ষণগুলো হলো-

চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড় : লোকগাথা অনুযায়ী, চাঁদ সওদাগরের নৌকা এখানে ডুবে যায়। তাই পাহাড়টির নাম হয়েছে চন্দ্রডিঙ্গা। এই পাহাড়ে উঠে চারপাশের পাহাড়, নদী আর সবুজ প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

ঝর্ণা ও ঝিরি : চন্দ্রডিঙ্গা এলাকায় দেখা মেলে ছোট ছোট ঝর্ণা ও ঝিরির। তবে বর্ষাকালে এসব ঝর্ণায় পানির প্রবাহ বেশি থাকে এবং ঝিরির স্বচ্ছ পানিতে পা ভিজিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা ভ্রমণকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে।

পাতলা বন : মেঘালয় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে রংছাতি ইউনিয়নে অবস্থিত এই বনাঞ্চল। দূরের পাহাড়, নদী, সবুজ ধানের ক্ষেত ও টিলার সমন্বয়ে এখানে তৈরি হয়েছে অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য।

সাত শহীদের মাজার : লেংগুরা সীমান্তের নো-ম্যানস জোন এলাকায় অবস্থিত এই মাজারে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সমাহিত করা হয়েছে। মাজারের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গনেশ্বরী নদী।

মমিনের টিলা : সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বড় টিলাগুলোর একটি। সিঁড়ি বা টিলা বেয়ে ওপরে উঠলে মেঘ, পাহাড়, নদী আর সবুজ প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ে।

এক দিনের একটি সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে কলমাকান্দার চন্দ্রডিঙ্গা ঘুরে দেখতে জনপ্রতি প্রায় ১৭০০ থেকে ৩৫০০ টাকার মতো খরচ হতে পারে। এর মধ্যে নেত্রকোণা থেকে কলমাকান্দা যাওয়া-আসায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, স্থানীয় যাতায়াতে ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা এবং খাবারের জন্য ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা ব্যয় হতে পারে। পাশাপাশি অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রায় ৫০০ টাকা ধরলে স্বল্প বাজেটেই এই ভ্রমণ সম্পন্ন করা সম্ভব।

সব মিলিয়ে ঈদের ছুটিতে আপনার পছন্দই ঠিক করে দেবে গন্তব্য। পরিবার নিয়ে স্বচ্ছ নদী, সাদামাটির পাহাড় আর পরিচিত পর্যটন স্পট ঘুরে নিশ্চিন্ত সময় কাটাতে চাইলে দুর্গাপুর হতে পারে সেরা পছন্দ। আর একটু নির্জনতা, সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে মেঘ-কুয়াশার অন্যরকম অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে চন্দ্রডিঙ্গা ডাকছে আপনাকে।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রীপুরে সাংবাদিককে মিথ্যা মামলা দেওয়ায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ

ঈদের ছুটিতে কম বাজেটে ঘুরে আসুন দুর্গাপুর-চন্দ্রডিঙ্গা

আপডেট সময় ০২:৩১:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬

ঈদের ছুটি মানেই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে একটু অন্যরকম সময় কাটানোর সুযোগ। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে প্রকৃতির কাছে ছুটে যাওয়ার জন্য এ সময়টা যেন সবচেয়ে উপযুক্ত। পাহাড়, নদী আর নির্মল বাতাসে ভরা সবুজ কোনো শান্ত গন্তব্য খুঁজছেন? তাহলে এবারের ঈদ ভ্রমণের ঠিকানা হতে পারে পাহাড়-নদীর মিলনে গড়া নেত্রকোণার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা। অল্প খরচে পাহাড়, নদী আর ঝর্ণার সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে নেত্রকোণা হতে পারে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য দারুণ এক গন্তব্য।

পাহাড়-নদীর মায়ায় দুর্গাপুর
নেত্রকোণার দুর্গাপুর বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটন এলাকা। অল্প খরচে ১–২ দিনের ভ্রমণে এখানে একই সঙ্গে পাওয়া যায় পাহাড়, নদী ও স্থানীয় সংস্কৃতির এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তাই পরিবার, বন্ধু কিংবা ছোট গ্রুপ নিয়ে ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসার জন্য দুর্গাপুর হতে পারে দারুণ একটি গন্তব্য।

নেত্রকোণা জেলা শহর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা মোটরসাইকেলে করে সহজেই পৌঁছানো যায় দুর্গাপুরে। প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দূরের এই পথ পাড়ি দিতে জনপ্রতি খরচ হতে পারে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা।

দুর্গাপুরে পৌঁছানোর পর সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে ঘুরে দেখা যায় আশপাশের পর্যটন স্পটগুলো। পরিবার নিয়ে ঘুরতে স্থানীয় যাতায়াতে খরচ হতে পারে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা। পাশাপাশি বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় নৌকায় করে জিরো পয়েন্ট ঘুরে দেখার সুযোগও রয়েছে। নৌকা ভ্রমণে খরচ হতে পারে ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা। দুর্গাপুরের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে-

সাদামাটির পাহাড় : নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় অবস্থিত বিজয়পুরের সাদা মাটির পাহাড়টি বাংলাদেশের একমাত্র চীনা মাটির পাহাড়। বর্তমানে এটি দেশের অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান।

পাহাড়টি তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে অনন্য। এর একেক অংশে মাটির রং একেক রকম। কোথাও লাল, কোথাও সাদা আবার কোথাও নীলাভ। দেখে মনে হবে যেন নানা রঙের খেলা। পাহাড়ের পাদদেশেই একটি লেক। লেকের পানির রঙেও ভিন্নতা দেখা যায়। পাহাড়ের ছায়া ও আকাশের রঙের ওপর ভিত্তি করে লেকের পানির রং পরিবর্তন হয়। পাহাড় আর লেকের অপরুপ সৌন্দর্য কে কারো মন কেড়ে নেবে।

সোমেশ্বরী নদী : ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের বিঞ্চুরীছড়া, বাঙাছড়া প্রভৃতি ঝর্ণাধারা ও পশ্চিম দিক থেকে রমফা নদীর স্রোতধারা একত্রিত হয়ে সোমেশ্বরীর সৃষ্টি। দুর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুর ও ভবানীপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রাণীখং পাহাড়ের পাশ দিয়ে দক্ষিণ দিকে শিবগঞ্জ বাজারের কাছে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয় এটি। একসময় সমগ্র নদী ‘সুমসাং’ নামে পরিচিত ছিল। পাহাড়ের গা ঘেঁষে বয়ে চলা সোমেশ্বরীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য স্বচ্ছ পানি। হাঁটু পানি বা এর চেয়ে বেশি পানিতে অনায়াসে নিচের বালি দেখা যায়। নৌকা নিয়ে মাঝিরা নদীতে ঘুরে বেড়ায়। কেউ মাছ শিকার করে। কেউবা ঘুরে ঘুরে পর্যটকদের নদীর সৌন্দর্য দেখায়। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও কম। পাহাড়ের ঢাল থেকে বয়ে আসা ঝরনার পানিই এই নদীর মূল উৎস। ঝরনার পানি হওয়ায় এর পানি অতি স্বচ্ছ ও ঠান্ডা। দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজ ছাড়াও নানাভাবে এই নদীকে ব্যবহার করে স্থানীয়রা।

সোমেশ্বরী নদীতে ঘুরে বেড়ালেই চোখে পড়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেঁষে সবুজঘেরা ও লাল চীনামাটির অসংখ্য পাহাড়। খেয়া নৌকা নিয়ে নদীতে ভ্রমণ করলে দেখা যায় গভীরে ছুটে চলছে মাছ। এছাড়া নদীর তলদেশে বালির ওপর অসংখ্য ঝিনুক আর নুড়ি পাথর পড়ে থাকতে দেখবেন। নদী পারাপারের জন্য বাঁশ ও কাঠের সাঁকো তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে মানুষের পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও অন্যান্য ছোট যানবাহন চলাচল করে।

রানীখং ঐতিহাসিক ক্যাথলিক গির্জা : দুর্গাপুর থানায় আদিবাসী হাজং সম্প্রদায় এবং গারো সম্প্রদায়ের বসবাসের কারণে এখানে বেশ কিছু গির্জা রয়েছে। বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্পে যাওয়ার পথে রানীখং গির্জা আপনার চোখে পরবে। সম্ভবত ১৯১০ সাল থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে এই গির্জাটি নির্মিত হয়েছিল। এখান থেকে কিছু মানুষ ঢাকায় বিশপের কাছে গিয়ে তাদের গ্রামে মিশনারিজ চেয়ে অনুরোধ করেছিল। তবে দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য কারনে বিশপ তাদের অনুরোধ রক্ষা করতে পারেননি। তবে তিনি কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যেকারনে পরবর্তী বিশপ এখানে সফলতার সাথে গির্জা স্থাপনে সমর্থ হন। সোমেশ্বরী নদীর পাশে একটি ছোট পাহাড়ের উপর এই গির্জাটি অবস্থিত। এখানকার শান্ত পরিবেশে পাহাড়ের পাদদেশে নদীর নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবে।

হাজং ও গারো আদিবাসী গ্রাম : নেত্রকোণার সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা এলাকার পাহাড় ও সমতল ভুমিতে বাস করছেন বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়। এর মধ্যে গারো, হাজং, হদি উল্লেখযোগ্য। হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, নালিতাবাড়ী, কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরের মতো সুসং দুর্গাপুর, বিরিশিরি ও সূর্যপুর গ্রামের মতো স্থানগুলোতে এই দুই সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় মাতৃতান্ত্রিক ও কৃষিভিত্তিক সমাজ ও সংস্কৃতি বিদ্যমান

দুই দিনের একটি সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে দুর্গাপুর ঘুরে দেখতে জনপ্রতি মোটামুটি ২৭০০ থেকে ৪৮০০ টাকার মতো খরচ হতে পারে। এর মধ্যে নেত্রকোণা থেকে দুর্গাপুর যাওয়া-আসায় প্রায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, স্থানীয় যাতায়াতে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং এক রাতের আবাসনে ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা ব্যয় হতে পারে। এছাড়া খাবারের জন্য ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে আরও প্রায় এক হাজার টাকা ধরে নিলে পুরো ভ্রমণটি সহজেই এ বাজেটের মধ্যেই সম্পন্ন করা সম্ভব।

সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ের টানে চন্দ্রডিঙ্গা
ঈদের ছুটিতে আরেকটি চমৎকার গন্তব্য হতে পারে নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলার চন্দ্রডিঙ্গা। এখানে দাঁড়ালে বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারেই চোখে পড়বে ভারতের মেঘালয়ের সারি সারি পাহাড় যা মুহূর্তেই মুগ্ধ করে ভ্রমণপিপাসুদের।

কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের পাঁচগাঁও এলাকায় অবস্থিত এই পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্রটি স্থানীয়দের কাছে ‘চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়’ বা ‘পাঁচগাঁও টিলা’ নামেও পরিচিত।

জনশ্রুতি রয়েছে, অতীতে কোনো এক সময়ে চাঁদ সওদাগরের একটি নৌকা এখানে ডুবে গিয়েছিল। সেই গল্প থেকেই পাহাড়টির নাম হয়েছে ‘চন্দ্রডিঙ্গা’।

চারপাশে পাহাড়, ছোট নদী আর সবুজ বনভূমিতে ঘেরা এই এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই মনোমুগ্ধকর। বর্ষাকালে এখানে মেঘ ও কুয়াশার আবরণে তৈরি হয় অন্যরকম এক পরিবেশ, আর শুষ্ক মৌসুমে দেখা যায় সবুজে ঘেরা পাহাড়ি দৃশ্য। কোথাও কোথাও ছোট জলপ্রপাতও দেখা যায়, যা ভ্রমণকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।

নেত্রকোণা থেকে কলমাকান্দা পর্যন্ত বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা মোটরসাইকেলে যাওয়া যায়। প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পথের জন্য খরচ হতে পারে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা। এরপর পাঁচগাঁওয়ের চন্দ্রডিঙ্গা পর্যন্ত মোটরসাইকেলে যেতে খরচ পড়তে পারে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে কলমাকান্দা থেকে সারাদিনের জন্য মোটরসাইকেল ভাড়া করলে সব স্পট ঘুরে দেখা সহজ হয়। চন্দ্রডিঙ্গার প্রধান আকর্ষণগুলো হলো-

চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড় : লোকগাথা অনুযায়ী, চাঁদ সওদাগরের নৌকা এখানে ডুবে যায়। তাই পাহাড়টির নাম হয়েছে চন্দ্রডিঙ্গা। এই পাহাড়ে উঠে চারপাশের পাহাড়, নদী আর সবুজ প্রকৃতির মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

ঝর্ণা ও ঝিরি : চন্দ্রডিঙ্গা এলাকায় দেখা মেলে ছোট ছোট ঝর্ণা ও ঝিরির। তবে বর্ষাকালে এসব ঝর্ণায় পানির প্রবাহ বেশি থাকে এবং ঝিরির স্বচ্ছ পানিতে পা ভিজিয়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা ভ্রমণকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে।

পাতলা বন : মেঘালয় পাহাড়ের কোল ঘেঁষে রংছাতি ইউনিয়নে অবস্থিত এই বনাঞ্চল। দূরের পাহাড়, নদী, সবুজ ধানের ক্ষেত ও টিলার সমন্বয়ে এখানে তৈরি হয়েছে অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য।

সাত শহীদের মাজার : লেংগুরা সীমান্তের নো-ম্যানস জোন এলাকায় অবস্থিত এই মাজারে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সমাহিত করা হয়েছে। মাজারের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গনেশ্বরী নদী।

মমিনের টিলা : সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বড় টিলাগুলোর একটি। সিঁড়ি বা টিলা বেয়ে ওপরে উঠলে মেঘ, পাহাড়, নদী আর সবুজ প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ে।

এক দিনের একটি সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে কলমাকান্দার চন্দ্রডিঙ্গা ঘুরে দেখতে জনপ্রতি প্রায় ১৭০০ থেকে ৩৫০০ টাকার মতো খরচ হতে পারে। এর মধ্যে নেত্রকোণা থেকে কলমাকান্দা যাওয়া-আসায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, স্থানীয় যাতায়াতে ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা এবং খাবারের জন্য ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা ব্যয় হতে পারে। পাশাপাশি অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রায় ৫০০ টাকা ধরলে স্বল্প বাজেটেই এই ভ্রমণ সম্পন্ন করা সম্ভব।

সব মিলিয়ে ঈদের ছুটিতে আপনার পছন্দই ঠিক করে দেবে গন্তব্য। পরিবার নিয়ে স্বচ্ছ নদী, সাদামাটির পাহাড় আর পরিচিত পর্যটন স্পট ঘুরে নিশ্চিন্ত সময় কাটাতে চাইলে দুর্গাপুর হতে পারে সেরা পছন্দ। আর একটু নির্জনতা, সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে মেঘ-কুয়াশার অন্যরকম অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে চন্দ্রডিঙ্গা ডাকছে আপনাকে।