পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার সদর ইউনিয়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কাগজে-কলমে উন্নয়নের চিত্র উজ্জ্বল হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন দেখা গেছে।
রাঙ্গাবালী উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে উপজেলার গঙ্গিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সামুদাফৎ সড়ক হয়ে বটতলা পর্যন্ত ৬ দশমিক ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নাজমুল শাহাদাৎ ট্রেডার্স।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের সিডিউল অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে না। নকশা অনুযায়ী সড়কের প্রস্থ ১০ ফুট এবং কার্পেটিংয়ের পুরুত্ব ১ ইঞ্চি হওয়ার কথা থাকলেও সরেজমিনে দেখা গেছে কিছু স্থানে পুরুত্ব কম দেওয়া হয়েছে। কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ হওয়ার তিন থেকে চার দিন পরও সড়কের ভেতরের অংশ শক্ত হয়নি। এতে নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়ে সন্দেহ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সুজন ডাক্তার অভিযোগ করে বলেন, নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ না করে কাজ করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, যথাযথভাবে বিটুমিন ব্যবহার না করেই পেভিং (কার্পেটিং) দেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প অনুযায়ী ১ ইঞ্চি পুরুত্বে ঢালাই দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না; কেবল ইট ঢেকে দায়সারা কাজ করা হচ্ছে।
আরেক বাসিন্দা জব্বার খন্দকার বলেন, পুরো সড়কজুড়েই অনিয়ম চলছে। ব্যবহৃত ইট নিম্নমানের, যা ঝুরা মাটির মতো; হাতে চাপ দিলেই গুঁড়া হয়ে যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, ঢালাইয়ের পুরুত্ব মাত্র দুই ‘সুতা’ পরিমাণ; সামান্য টান দিলেই উঠে আসছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে অটোরিকশা চালক কামাল মাদবর বলেন, অনেক স্থানে আধা ইঞ্চিরও কম ঢালাই দেওয়া হচ্ছে, যা টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা কম। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কের উপরিভাগ উঠে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে যানবাহন চলাচলের সময় ব্রেক করলেই ওপরের অংশ উঠে আসছে বলেও তিনি জানান।
এ বিষয়ে জানতে উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যালয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দাবি করেন, উক্ত সড়কের কাজটি স্টিমেট অনুযায়ী করা হচ্ছে এবং কোনো গড়মিল থাকার সম্ভাবনা নেই। তিনি আরও বলেন, কেবল প্রতিবেদন প্রকাশে সমস্যার সমাধান হয় না; স্থায়ী সমাধানই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় তিনি দপ্তরের এক কর্মচারীকে নির্মাণস্থলে গিয়ে স্টিমেট অনুযায়ী কাঠামো বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
তবে মাঠপর্যায়ে মাপজোখের সময় প্রাথমিক স্টিমেটের সঙ্গে বাস্তব পরিমাপের অমিল পাওয়া গেছে। এতে প্রকল্পের মান ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাহিন বলেন, স্টিমেট অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। তবে কিছু স্থানে কার্পেটিংয়ের পুরুত্বে গড়মিল হয়েছে স্বীকার করেন তিনি বলেন, যে জায়গায় সমস্যা আছে সেটি আমি ঠিক করে দিব।
উপজেলা প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে মুঠোফোনে মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি। এ বিষয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ ভূঞা বলেন, অভিযোগের বিষয়ে আমি খোঁজখবর নিচ্ছি। সত্যতা পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ৬ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ চলাচল করেন। নির্মাণকাজের শুরুতেই অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় জনমনে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাঁদের দাবি, তদারকি কর্মকর্তাদের সক্রিয় নজরদারির অভাব এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতার কারণে সরকারের বিপুল অঙ্কের অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় দ্রুত প্রকল্পের কাজ তদারকি করে সিডিউল অনুযায়ী টেকসই ও মানসম্মত সড়ক নির্মাণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























