চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েও অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার সাবেক নার্সিং সুপারভাইজার মো. মতিউল ইসলাম। জেলা সিভিল সার্জনের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে অবসরকালীন ফাইল প্রসেসিং আটকে আছে দুই বছরের বেশি সময় ধরে। ফলে শেষ বয়সে এসে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাকে। তার অবস্থা দেখে মনে হয়, অনৈতিক আবদার ও কার্যকলাপই এখন বড় হয়ে উঠছে মানবতার চেয়েও।
অভিযোগ উঠেছে, ফাইল প্রসেসিং করতে নার্সিং সুপারভাইজার মতিউল ইসলামের কাছে ২ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন জেলা সিভিল সার্জন। কিন্তু ঘুষ দিতে রাজি হননি মতিউল ইসলাম। এর পর থেকেই শুরু হয় নানা বিপত্তি। ফাইল আটকে রাখায় মতিউল ইসলামকে নানাভাবে হয়রানি শুরু করেন জেলা সিভিল সার্জন। এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে তিন দফা চিঠি পাঠিয়ে ফাইল পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও ফাইল আটকে রাখেন জেলা সিভিল সার্জন। ফলে দুই বছরের বেশি সময় ধরে অবসরকালীন সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত মতিউল ইসলাম। সম্প্রতি এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী মতিউল।
মতিউল ইসলাম অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালের ১ অক্টেবার থেকে ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ১২ মাসের অবসরোত্তর ছুটিসহ ১৮ মাসের লাম্পগ্রান্ড মঞ্জুরির জন্য নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে একটি লিখিত আবেদন করেন তিনি। তিনি তখন সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নার্সিং সুপারভাইজার পদে কর্মরত ছিলেন। আর দুই মাস পরই তার অবসরে যাওয়ার কথা। ওই আবেদনের সময় তিনি একটি সরকারি সফরে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের ডিজির সঙ্গে দেশের বাইরে যান। যাওয়ার দুই মাস আগেই তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার আবেদন করেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সর্বশেষ যে কর্মস্থলে চাকরিতে থাকেন, সেখান থেকেই বিষয়টির প্রস্তাব তৈরি করে ডিজি হেলথের দপ্তরে পাঠানোর কথা। কিন্তু তিনি দেশে এসে এ বিষয়ে যখন জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন, তখন তার কাছে লোকমাধ্যমে ২ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। ঘুষ দিতে রাজি না হওয়ায় তার ফাইল আটকে দেওয়া হয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে মৌখিকভাবে অভিযোগ করা হয়। আর এর পর থেকে গত দুই বছর ধরে তিনি দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
দুদকে করা অভিযোগে বলা হয়েছে, মতিউল ইসলামের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর তার পিআরএলের সব কাগজপত্র নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরে পাঠানোর জন্য দক্ষিণ সুনামগঞ্জ (বর্তমানে শান্তিগঞ্জ উপজেলা) স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বরাবর নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয় অধিদপ্তরের এক স্মারক চিঠিতে। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও কোনো কাগজপত্র পাঠানো হচ্ছে না। কাগজপত্র পাঠাতে ২ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হলে দিতে অস্বীকার করায় হয়রানি করা হচ্ছে। পিআরএলের কাগজপত্র অধিদপ্তরে পাঠানোর জন্য তিনি গত এক বছরের বেশি সময় ধরে সিভিল সার্জনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। গত আড়াই বছর ধরে তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এ বিষয়ে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম জানান, অভিযোগটি দুদকের যাচাই-বাছাই সেলে পাঠানো হয়েছে। দুদকের তপশিলভুক্ত অপরাধ হওয়ায় অভিযোগটির অনুসন্ধান হবে। যাচাই-বাছাই সেলের সুপারিশের ভিত্তিতে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে কমিশন থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ইকবাল হাসান জানান, নার্সিং সুপারভাইজার হিসেবে মতিউল ইসলাম একটি প্রশিক্ষণে আমেরিকায় যান। আমেরিকায় ট্রেনিংয়ে যাওয়ার পর আর ফেরেননি। পরে তিনি যে অধিদপ্তরের আন্ডারে চাকরি করেন, তারা একটি শোকজ করেন। আমরা ওনার পক্ষ হয়ে জবাব দিলেও ফিরতি জবাব আসেনি। কিছুদিন আগে অধিদপ্তর থেকে ওনার অবসরজনিত নথিপত্র ঢাকায় পাঠানোর জন্য একটি চিঠি এসেছিল। তখন নির্বাচনি ঝামেলার কারণে বিষয়টি নিয়ে কাজ করা যায়নি। এখন আমরা কিছুদিনের মধ্যে এ বিষয়ে জবাব দেব।
জানতে চাইলে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. জসিম উদ্দিন জানান, নার্স সুপারভাইজার মতিউল সরকারিভাবে ট্রেনিংয়ে গিয়ে ৯ মাস পলাতক ছিলের। ৯ মাস পর দেশে ফিরলেও অনুপস্থিত থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়। সেই তদন্ত কার্যক্রম এখনো চলমান। তিনি অবসরে যাওয়ার আবেদন করলেও তার কোনো আবেদন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা পাননি বলে জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, কেউ যদি অভিযোগ করে তাকে ঘুষ না দেওয়ায় তার ফাইল আটকে রাখা হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























