রাজধানীর বাড্ডা ভূমি অফিস, যেখানে সাধারণ মানুষের জমি সংক্রান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধান হওয়ার কথা, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে এক অঘোষিত ঘুষ ও দুর্নীতির সাম্রাজ্য। সরকার নির্ধারিত ফি মাত্র ১১৫০ টাকা হলেও নামজারি বা খারিজ করতে গেলে সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। অভিযোগ, এই বিশাল ঘুষ ও দুর্নীতির সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দু খোদ সহকারী কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ভূমি কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় মহাসচিব আসাদুজ্জামান লেবু।
লেবুর নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে ১০-১২ জনের একটি শক্তিশালী দালাল দল। এই দালালরা প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট ‘রেট’ নির্ধারণ করে রাখে। অনুসন্ধানকারীরা জানিয়েছেন, বাড্ডা ভূমি অফিসে যোগদানের পর থেকেই লেবু চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সরকারি ফি মাত্র ১১৫০ টাকা হলেও দালালদের মাধ্যমে সাধারণ নামজারির ক্ষেত্রে ২০–২৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। বিশেষ এলএ কেইস জমি, যা অধিগ্রহণমুক্ত, তার নামজারির জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। কাগজপত্রে সামান্য ত্রুটি থাকলেও দাবিকৃত টাকার পরিমাণ পাঁচগুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এই অফিসে টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না। অনেক সময় ঘুষ দেওয়ার পরও কাজ সম্পন্ন হয় না। জাল দলিলে অন্যের নামে জমি নামজারি করা এবং সেবাগ্রহীতাদের মূল নথিপত্র গায়েব করার মতো গুরুতর অপরাধও ঘটছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় ভূমি মালিক জানিয়েছেন, ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের নানা টালবাহানায় দিনের পর দিন ঘুরানো হয়। তিন নারী ভুক্তভোগী বলেন, “আমরা দুই মাস ধরে নাম খারিজের জন্য ঘুরছি। কয়েকবার আবেদন করেছি, কিন্তু তারা প্রতিবার কোনো না কোনো ভুল ধরে। এর উপায় জানতে চাইলে একজন অফিসকর্মী জানিয়েছেন, ২০ হাজার টাকা দিলে কাজ করা যাবে।” অফিসের ভেতরের এক ওমেদার অভিযোগ করেছেন, সহকারী কর্মকর্তা আসাদের বেঁধে দেওয়া মাসিক টার্গেট অনুযায়ী নামজারির কাজ আনতে না পারলে তাদের অফিসে কাজ করতে দেওয়া হবে না।
সাংবাদিকরা যখন সরেজমিন তদন্তে যান, তখন দেখা যায় দালালরা রেকর্ডরুমে অনায়াসে ঢুকে নথিপত্র নাড়াচাড়া করছে। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা তড়িঘড়ি রেকর্ডরুমটি বন্ধ করে দেন এবং দালালদের দ্রুত বের করে দেওয়া হয়। আসাদুজ্জামান লেবুর কাছে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের সরাসরি বাধা প্রদান করেন। নিজের প্রভাব খাটিয়ে তিনি সাংবাদিকদের ভয় দেখাতে তার লালিত গুন্ডাবাহিনী ডেকে আনে, যদিও সাংবাদিকরা কোনো ত্রুটি না পেয়ে তারা পরে পিছু হটতে বাধ্য হন।
অভিযুক্ত লেবু সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আমাদের এখানে অনেক লোক সেবা নিতে আসে। সবার পেছনে একজন সময় দিতে পারে না, তাই বহিরাগত লোক দিয়েও কাজ করাতে হয়।” দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ গড়ার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, লেবুর নেতৃত্বে দালালরা সরকারি নথিপত্রের নিয়মিত অপব্যবহার করছে। তারা রেকর্ডরুমে অনায়াসে প্রবেশ করে নথি নাড়াচাড়া করছে এবং কখনো কখনো মূল দলিলগুলো নিয়ে হারিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। এমনকি ঘুষের টাকা দেওয়ার পরও কখনো কাজ সম্পন্ন হয় না। সেবাগ্রহীতারা জানান, অফিসের অভ্যন্তরীণ কর্মচারীরা প্রায়শই নথিপত্রে ছোটখাটো ত্রুটি খুঁজে বের করে এবং ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্রের জন্য অতিরিক্ত ঘুষ দাবি করে।
স্থানীয়রা আরও জানান, সিন্ডিকেটটি দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন জমি প্রক্রিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ রাখে। নামজারি বা খারিজের জন্য আবেদনকারী যে কোনো ভুক্তভোগী এই দালালদের হাতে পড়ে যায়। তারা প্রতিনিয়ত তদারকি করে যে কেউ অফিসের নিয়ম অনুযায়ী কাজ না করলে তার ওপর চাপ প্রয়োগ করা হবে। এই সিন্ডিকেটের কাছে ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে অফিসের অভ্যন্তরীণ কর্মচারীরা প্রায়শই দিনদিন ভুক্তভোগীকে ঘোরাচ্ছে।
অভিযোগ, লেবুর নেতৃত্বে দালালরা নিয়মিত সাংবাদিকদের হুমকি দিয়ে থাকে। সাংবাদিকরা উপস্থিতি টের পেয়ে নথিপত্রের রেকর্ডরুমে প্রবেশ করলে দালালরা রেকর্ডরুম বন্ধ করে দেয়। একাধিক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন যে অফিসের ভেতরের কর্মচারীরা লেবুর নির্দেশে দালালদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। তারা বলেন, দালালরা অফিসে ঢুকে নথিপত্র চুরি ও নষ্ট করার চেষ্টা করে এবং প্রয়োজন হলে ঘুষ না দিলে কোনো কাজ সম্পন্ন হয় না।
এমনকি অনেক ভুক্তভোগী বলেছেন, তারা অনবরত অফিসের ভেতর থেকে টালবাহানা সহ্য করছে এবং যে কোনো ত্রুটির জন্য অতিরিক্ত ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছে। লেবুর নেতৃত্বে দালালরা প্রতিনিয়ত এই পরিস্থিতি পরিচালনা করছে। এভাবে এই অফিসে সেবা প্রক্রিয়া প্রায় সম্পূর্ণভাবে দালালদের হাতে চলে গেছে।
ভুক্তভোগীরা মনে করছেন, এই দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা সমাধানের জন্য দ্রুত এবং কঠোর হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন। তারা আশা করছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই অফিসের অবৈধ কার্যক্রমের তদন্ত করবে এবং লেবু ও তার সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। জনগণ বলছে, সাধারণ মানুষ যেন আর এমন চরম হয়রানি এবং আর্থিক শোষণের শিকার না হয়, তার জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
বাড্ডা ভূমি অফিসের এই দুর্নীতি এখন ওপেন সিক্রেট। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের লাগাম টানতে দুদকের দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ অপরিহার্য বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তারা আরও জানান, এ ধরনের সিন্ডিকেটে দীর্ঘদিন পর্যন্ত কোনো হস্তক্ষেপ না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশাসনের ওপর আস্থা ক্ষুণ্ণ হবে এবং আইনের প্রতি অবমাননা বৃদ্ধি পাবে।
এই সিন্ডিকেটের কারণে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ মানসিক চাপে ভুগছে। অনেক মানুষ বলেছেন, তারা এমন দুর্ভোগে পড়েছেন যে একমাত্র উপায় হলো ঘুষ প্রদান করা। প্রায়শই তারা বলছেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আইনগতভাবে প্রতিকার পাওয়ার আগেই তাদের প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় কিছু ভুক্তভোগী আরও জানান, লেবু এবং তার দালালরা কখনো কখনো জাল দলিলে অন্যের নামে জমি নামজারি করছে। অনেক সময় তারা মূল নথিপত্র গায়েব করার চেষ্টা করে, যাতে পরবর্তীতে দাবি করা যায় যে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ অর্থ ও সময় উভয়ই নষ্ট করছে।
সাংবাদিকদের মতে, বাড্ডা ভূমি অফিসের দুর্নীতি প্রায় সার্বক্ষণিক। যখনই তারা প্রায়শই অফিসে প্রবেশ করেন, দালালরা নথিপত্রের নিয়মিত অপব্যবহার করছে। অনেক সময় তারা নথিপত্র চুরি বা নষ্ট করে দেয়। এমনকি অফিসে কাজ করতে গেলে প্রায়শই ভুক্তভোগীরা হয়রানির শিকার হয় এবং টাকা না দিলে কোনো কাজ সম্পন্ন হয় না।
ভুক্তভোগীরা আশা করছেন, দুদক এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে। তারা মনে করছেন, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের আটকাতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য।
মোঃ মামুন হোসেন 
























