গাজীপুর শহরের উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ঘিরে সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন গাজীপুর উন্নয়ন করপোরেশনের (গাউক) ইমারত পরিদর্শক মো. মুরাদ আলী খান। তার বিরুদ্ধে স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গোপনের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের বিস্তার, বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট, বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং উচ্চমূল্যের জমির মালিকানা—সব মিলিয়ে বিষয়টি নগরজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মো. মুরাদ আলী খানের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ তার ঘোষিত আয়-উৎসের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি। স্থানীয়দের দাবি, তিনি নিজ নামে সরাসরি সম্পদ রাখার পাশাপাশি স্ত্রী, বোন এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুর নামে সম্পত্তি নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রকৃত মালিকানা আড়াল করার একটি কৌশলগত পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন।
তার স্ত্রী রোকসানা পারভীন, যিনি ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট)-এর সহকারী অধ্যাপক, তাকেও এই অভিযোগের পরোক্ষ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, সম্পদ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার করে একাধিক স্থাবর সম্পত্তি নিবন্ধন করা হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্যে উঠে এসেছে, মো. মুরাদ আলী খানের বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতির কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এখনো দায়ের না হলেও তার সম্পদ বৃদ্ধির ধরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ছিল। সম্প্রতি কিছু নথি ও তথ্য সামনে আসার পর বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়।
অভিযোগকারীরা বলছেন, সম্পদ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে একটি সুপরিকল্পিত প্যাটার্ন অনুসরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় জমি ও ভবন ক্রয়ের ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকৃত মালিকানা গোপন রাখা সহজ হয় এবং ভবিষ্যতে কোনো অনুসন্ধান বা জবাবদিহির ক্ষেত্রে দায় এড়ানো সম্ভব হয়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চৌরাস্তা-নলজানি এলাকায় গাজীপুর সিটি করপোরেশন-এর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে গ্রেটওয়াল সিটি বাজারের বিপরীতে নির্মাণাধীন একটি ১০ তলা ভবনের দুটি ফ্ল্যাট তার পরিবারের সদস্যদের নামে নিবন্ধিত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি ফ্ল্যাট দ্বিতীয় তলায় এবং অন্যটি পঞ্চম তলায় অবস্থিত।
এছাড়া পালের মাঠ, শহীদ বরকত সরণী এলাকায় একটি ৬ তলা ভবনের মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভবনটি স্ত্রী রোকসানা পারভীন, তার পিতা আশরাফুল আলম খান এবং এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আনিসুর রহমানের নামে নিবন্ধিত রয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, ভবনটির প্রকৃত অর্থায়ন মো. মুরাদ আলী খান নিজেই করেছেন।
একই এলাকায় আরও দুটি ১০ তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে, যেগুলোর মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধান বলছে, এসব স্থাপনার সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে।
নলজানি ৭ নম্বর রোডের সি-ব্লকে গণসেবা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশে নির্মাণাধীন দুটি ১০ তলা ভবনের পৃথক ফ্লোরে তার মালিকানা রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও এসব তথ্যের আনুষ্ঠানিক যাচাই এখনো হয়নি।
সানরাইজ টাওয়ার সংলগ্ন এলাকায় ২৯ শতাংশ জমি পার্টনারশিপে কেনা হলেও সেটি তার বোনের নামে দলিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দলিল নম্বর ৬৯৫/২৫ অনুযায়ী জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ৪ কোটি টাকা বলে স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানে বর্তমানে একটি কাপড়ের গুদাম রয়েছে।
ডুয়েট সংলগ্ন পশ্চিম ভুরুলিয়া, সাত্তার সরণীতে একটি ৫ তলা ভবনে মো. মুরাদ আলী খান পরিবারসহ বসবাস করেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। একই এলাকায় ‘মিতালি ভবন’-এর দ্বিতীয় তলায় প্রায় ২,৫০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট তার নিজের নামে রয়েছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।
শিমুলতলী, চক্ষু হাসপাতাল রোড সংলগ্ন সেলিম ভিলা রোডে ‘বন্ধন ভিউ’ ভবনের একটি ফ্ল্যাটও তার নামে রয়েছে বলে তথ্য উঠে এসেছে। প্রায় ২,০০০ বর্গফুট আয়তনের এই ফ্ল্যাটটি হাউজ নং ৪৭৭/১ (সাউথ চত্বর)-এ অবস্থিত।
স্থানীয়দের মতে, নির্মাণ অনুমোদন, তদারকি ও পরিদর্শনের মতো সংবেদনশীল দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার এ ধরনের বিপুল সম্পদের মালিকানা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তারা বলছেন, একজন ইমারত পরিদর্শকের দায়িত্ব হচ্ছে আইনসম্মতভাবে নির্মাণ কার্যক্রম তদারকি করা। কিন্তু তার নিজের সম্পদ বৃদ্ধির ধরণ নিয়ে যদি প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তা জনআস্থার জন্য উদ্বেগজনক।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ বলছেন, বিষয়টি নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত হওয়া জরুরি। তারা মনে করেন, সম্পদের উৎস, আয়কর বিবরণী এবং সম্পদ ঘোষণাপত্র যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. মুরাদ আলী খানের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার স্ত্রী রোকসানা পারভীন ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, “আমি কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলব না,” এবং ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই এখনো সম্পন্ন হয়নি। তবে স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু করা হলে জনমনে সৃষ্টি হওয়া সন্দেহ ও আলোচনার অবসান ঘটতে পারে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























