সংবাদ শিরোনাম ::
এলপিজির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সিরাজুল ও জ্বালানি সচিব সাইফুলের সিন্ডিকেটে কোটি টাকা আত্মসাত মনোহরগঞ্জে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি, হাবিবসহ তিন পুলিশের মৃত্যুদণ্ড আত্রাইয়ে ১৯৩ কেন্দ্রে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন শুরু আসাদুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের দাবি মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ‘দুর্নীতির সাম্রাজ্য’ অভিযোগের পাহাড় কাদির ও সহকারী হারিসের বিরুদ্ধে বিজিবি-র‍্যাবের যৌথ অভিযানে কাভার্ড ভ্যানসহ ভারতীয় শাড়ি ও কসমেটিক্স আটক এলেঙ্গাকে উপজেলা করার দাবিতে সংসদে এমপির বক্তব্য, কালিহাতীজুড়ে সমালোচনার ঝড় বিস্তর অনিয়মের অভিযোগের পরও বহাল ডিআইজি (প্রিজন্স) কামাল হোসেন

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হবে আজ

  • অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১২:১০:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৬২৬ বার পড়া হয়েছে

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত তেতসুয়া ইয়ামাগামির রায় ঘোষণা করা হবে আজ বুধবার। ২০২২ সালে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মামলার শুরুতেই ইয়ামাগামি আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছিলেন, তাই তার দোষী হওয়া প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে।

৪৫ বছর বয়সী ইয়ামাগামির কী শাস্তি হওয়া উচিত, তা নিয়ে জাপানে মতভেদ দেখা দিয়েছে।

অনেকেই তাকে ঠাণ্ডা মাথার খুনি হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ তার কঠিন পারিবারিক জীবনের কথা বিবেচনা করে সহানুভূতি প্রকাশ করছেন। রাষ্ট্রপক্ষ এই ‘গুরুতর অপরাধের’ জন্য ইয়ামাগামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দাবি করেছে।

শিনজো আবে জাপানের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন নেতা ছিলেন। জাপানে আগ্নেয়াস্ত্র-সংক্রান্ত অপরাধ প্রায় নেই বললেই চলে, তাই তার হত্যাকাণ্ডে পুরো দেশ হতবাক হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, ইয়ামাগামির আইনজীবীরা শাস্তি কমানোর আবেদন জানিয়েছেন। তাদের দাবি, ‘ইয়ামাগামি ধর্মীয় নির্যাতনের’ শিকার। তার মা ইউনিফিকেশন চার্চের প্রতি অতিরিক্ত অনুগত ছিলেন, যার কারণে পরিবারটি আর্থিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়।

পরে ইয়ামাগামি জানতে পারেন, শিনজো আবের সঙ্গে ওই বিতর্কিত চার্চের সম্পর্ক ছিল। এ থেকেই তার মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় বলে দাবি করেছে প্রতিরক্ষা পক্ষ।
দিনদুপুরে প্রকাশ্য মঞ্চে ভাষণ দেওয়ার সময় শিনজো আবের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তোলে। এই ঘটনার পর ইউনিফিকেশন চার্চ এবং তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে অনুসারীদের কাছ থেকে এমন অনুদান আদায়ের অভিযোগও ছিল, যা অনেক পরিবারকে আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে।

এই মামলার মাধ্যমে জাপানের ক্ষমতাসীন লিবারাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) রাজনীতিকদের সঙ্গে ওই চার্চের সম্পর্কও প্রকাশ্যে আসে। এর জেরে কয়েকজন মন্ত্রিসভার সদস্যকে পদত্যাগ করতে হয়।

স্থানীয় এক সাংবাদিক এইতো সুজুকি বলেন, বিচার চলাকালে ইয়ামাগামি ও তার পরিবারকে সারাক্ষণই ‘চরম হতাশায় ডুবে থাকতে’ দেখা গেছে। সুজুকির ভাষায়, ইয়ামাগামির আচরণে ‘জীবন সম্পর্কে গভীর ক্লান্তি ও সব কিছু মেনে নেওয়ার মানসিকতা’ ফুটে উঠেছিল। উল্লেখ্য, আবের হত্যাকাণ্ডের অনেক আগেই সুজুকি ইউনিফিকেশন চার্চ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন।

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে বিচার শুরুর প্রথম দিন ইয়ামাগামি গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, ‘সব কিছুই সত্য। আমি যে এটা করেছি, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’ দুটি ধাতব পাইপ ও ডাক্ট টেপ দিয়ে তৈরি করা ঘরে বানানো বন্দুক হাতে নিয়ে তিনি ২০২২ সালের ৮ জুলাই পশ্চিম জাপানের নারা শহরে একটি রাজনৈতিক প্রচার অনুষ্ঠানে আবের দিকে দুটি গুলি ছোড়েন।

তৎকালীন সময়ে জাপানের সবচেয়ে পরিচিত জনসম্মুখ ব্যক্তিত্বের এই হত্যাকাণ্ড সারা বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। শিনজো আবে জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী।

ইয়ামাগামির আইনজীবীরা সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ডের আবেদন জানিয়ে যুক্তি দেন যে তিনি ‘ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার’। আদালতে জানানো হয়, ইয়ামাগামির মা তার প্রয়াত বাবার জীবন বীমার অর্থসহ অন্যান্য সম্পদ ইউনিফিকেশন চার্চে দান করেছিলেন, যার মোট পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ইয়েন (প্রায় ৮ লাখ ২৮ হাজার ৭৫০ সিঙ্গাপুর ডলার)। এ কারণেই ইয়ামাগামির মনে চার্চের প্রতি গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়।

ইয়ামাগামি জানান, ২০২১ সালে চার্চ-সংশ্লিষ্ট একটি অনুষ্ঠানে আবের ভিডিও বার্তা দেখার পর তার মধ্যে আবের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়। তবে তিনি বলেন, শুরুতে তার লক্ষ্য ছিলেন চার্চের শীর্ষ কর্মকর্তারা, আবে নন। সাংবাদিক সুজুকি স্মরণ করেন, ইয়ামাগামি যখন বলেন যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবে তার প্রধান লক্ষ্য ছিলেন না, তখন আবের স্ত্রী আকিয়ে আবের মুখে অবিশ্বাসের ছাপ ফুটে ওঠে। সুজুকির ভাষায়, সেই অভিব্যক্তি ‘আজও তার মনে স্পষ্টভাবে গেঁথে আছে।’

শিনজো আবের স্ত্রী আকিয়ে আবের মুখের অভিব্যক্তিতে তখন গভীর বিস্ময় ও ধাক্কার ছাপ ছিল। সাংবাদিকদের মতে, তার চোখেমুখে যেন একটি প্রশ্ন ভেসে উঠেছিল— ‘আমার স্বামী কি কেবল একটি ধর্মীয় সংগঠনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ মেটানোর হাতিয়ার ছিলেন? বিষয়টি কি শুধু এতটুকুই?’

আদালতে আবেগঘন এক বিবৃতিতে আকিয়ে আবে বলেন, স্বামীকে হারানোর শোক কোনো দিনই লাঘব হবে না। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু চেয়েছিলাম, সে যেন বেঁচে থাকে।’ দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিষ্ঠিত ইউনিফিকেশন চার্চ ১৯৬০-এর দশকে জাপানে কার্যক্রম শুরু করে। গবেষকদের মতে, অনুসারী বাড়াতে তারা বিভিন্ন রাজনীতিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে।

শিনজো আবে এই চার্চের সদস্য না হলেও, অন্যান্য অনেক জাপানি রাজনীতিকের মতো তিনিও মাঝেমধ্যে চার্চ-সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন। তার দাদা নোবুসুকে কিশিও কমিউনিজমবিরোধী অবস্থানের কারণে এই সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে জানা যায়।

গত বছরের মার্চ মাসে টোকিওর একটি আদালত ইউনিফিকেশন চার্চের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বাতিল করে দেয়। আদালতের রায়ে বলা হয়, চার্চটি অনুসারীদের আধ্যাত্মিক ভয়কে কাজে লাগিয়ে জোরপূর্বক দামি পণ্য কিনতে বাধ্য করত। এ ছাড়া হাজার হাজার দম্পতিকে একসঙ্গে বিয়ে দেওয়ার বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করায়ও চার্চটি দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের মুখে রয়েছে।

ইয়ামাগামির বিচার চলাকালে তার বোন একজন আত্মপক্ষের সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির হন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি জানান, মায়ের চার্চে গভীর সম্পৃক্ততার কারণে তিনি ও তার ভাইবোনেরা কী ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। সাংবাদিক সুজুকির ভাষায়, ‘সেটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্ত। দর্শকসারিতে উপস্থিত প্রায় সবাই তখন কাঁদছিল।’

তবে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা যুক্তি দেন, ইয়ামাগামি কেন চার্চের প্রতি নিজের ক্ষোভ শিনজো আবের ওপর চাপালেন, তার ব্যাখ্যায় ‘যুক্তির বড় ধরনের ফাঁক’ রয়েছে। বিচার চলাকালে বিচারকরাও এমন প্রশ্ন তোলেন, যা থেকে বোঝা যায়—এই যুক্তি তারা সহজে গ্রহণ করতে পারছেন না। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইয়ামাগামির ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট তার শাস্তি কমানোর কারণ হতে পারে কি না— এ নিয়ে সাধারণ মানুষ ও বিশ্লেষকদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে।

সাংবাদিক সুজুকি বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষের এই যুক্তি খণ্ডন করা কঠিন যে আবে সরাসরি ইয়ামাগামি বা তার পরিবারের কোনো ক্ষতি করেননি।’ তবে তার মতে, ইয়ামাগামির ঘটনা দেখায়— কিভাবে সামাজিক সমস্যার শিকার মানুষ কখনো কখনো ভয়াবহ অপরাধের পথে ঠেলে দেওয়া হয়।

সূত্র : বিবিসি

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

এলপিজির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সিরাজুল ও জ্বালানি সচিব সাইফুলের সিন্ডিকেটে কোটি টাকা আত্মসাত

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হবে আজ

আপডেট সময় ১২:১০:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবেকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত তেতসুয়া ইয়ামাগামির রায় ঘোষণা করা হবে আজ বুধবার। ২০২২ সালে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মামলার শুরুতেই ইয়ামাগামি আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছিলেন, তাই তার দোষী হওয়া প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে।

৪৫ বছর বয়সী ইয়ামাগামির কী শাস্তি হওয়া উচিত, তা নিয়ে জাপানে মতভেদ দেখা দিয়েছে।

অনেকেই তাকে ঠাণ্ডা মাথার খুনি হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ তার কঠিন পারিবারিক জীবনের কথা বিবেচনা করে সহানুভূতি প্রকাশ করছেন। রাষ্ট্রপক্ষ এই ‘গুরুতর অপরাধের’ জন্য ইয়ামাগামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দাবি করেছে।

শিনজো আবে জাপানের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন নেতা ছিলেন। জাপানে আগ্নেয়াস্ত্র-সংক্রান্ত অপরাধ প্রায় নেই বললেই চলে, তাই তার হত্যাকাণ্ডে পুরো দেশ হতবাক হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, ইয়ামাগামির আইনজীবীরা শাস্তি কমানোর আবেদন জানিয়েছেন। তাদের দাবি, ‘ইয়ামাগামি ধর্মীয় নির্যাতনের’ শিকার। তার মা ইউনিফিকেশন চার্চের প্রতি অতিরিক্ত অনুগত ছিলেন, যার কারণে পরিবারটি আর্থিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়।

পরে ইয়ামাগামি জানতে পারেন, শিনজো আবের সঙ্গে ওই বিতর্কিত চার্চের সম্পর্ক ছিল। এ থেকেই তার মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় বলে দাবি করেছে প্রতিরক্ষা পক্ষ।
দিনদুপুরে প্রকাশ্য মঞ্চে ভাষণ দেওয়ার সময় শিনজো আবের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তোলে। এই ঘটনার পর ইউনিফিকেশন চার্চ এবং তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে অনুসারীদের কাছ থেকে এমন অনুদান আদায়ের অভিযোগও ছিল, যা অনেক পরিবারকে আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে।

এই মামলার মাধ্যমে জাপানের ক্ষমতাসীন লিবারাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) রাজনীতিকদের সঙ্গে ওই চার্চের সম্পর্কও প্রকাশ্যে আসে। এর জেরে কয়েকজন মন্ত্রিসভার সদস্যকে পদত্যাগ করতে হয়।

স্থানীয় এক সাংবাদিক এইতো সুজুকি বলেন, বিচার চলাকালে ইয়ামাগামি ও তার পরিবারকে সারাক্ষণই ‘চরম হতাশায় ডুবে থাকতে’ দেখা গেছে। সুজুকির ভাষায়, ইয়ামাগামির আচরণে ‘জীবন সম্পর্কে গভীর ক্লান্তি ও সব কিছু মেনে নেওয়ার মানসিকতা’ ফুটে উঠেছিল। উল্লেখ্য, আবের হত্যাকাণ্ডের অনেক আগেই সুজুকি ইউনিফিকেশন চার্চ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছিলেন।

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে বিচার শুরুর প্রথম দিন ইয়ামাগামি গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, ‘সব কিছুই সত্য। আমি যে এটা করেছি, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’ দুটি ধাতব পাইপ ও ডাক্ট টেপ দিয়ে তৈরি করা ঘরে বানানো বন্দুক হাতে নিয়ে তিনি ২০২২ সালের ৮ জুলাই পশ্চিম জাপানের নারা শহরে একটি রাজনৈতিক প্রচার অনুষ্ঠানে আবের দিকে দুটি গুলি ছোড়েন।

তৎকালীন সময়ে জাপানের সবচেয়ে পরিচিত জনসম্মুখ ব্যক্তিত্বের এই হত্যাকাণ্ড সারা বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। শিনজো আবে জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী।

ইয়ামাগামির আইনজীবীরা সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ডের আবেদন জানিয়ে যুক্তি দেন যে তিনি ‘ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার’। আদালতে জানানো হয়, ইয়ামাগামির মা তার প্রয়াত বাবার জীবন বীমার অর্থসহ অন্যান্য সম্পদ ইউনিফিকেশন চার্চে দান করেছিলেন, যার মোট পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ইয়েন (প্রায় ৮ লাখ ২৮ হাজার ৭৫০ সিঙ্গাপুর ডলার)। এ কারণেই ইয়ামাগামির মনে চার্চের প্রতি গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়।

ইয়ামাগামি জানান, ২০২১ সালে চার্চ-সংশ্লিষ্ট একটি অনুষ্ঠানে আবের ভিডিও বার্তা দেখার পর তার মধ্যে আবের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়। তবে তিনি বলেন, শুরুতে তার লক্ষ্য ছিলেন চার্চের শীর্ষ কর্মকর্তারা, আবে নন। সাংবাদিক সুজুকি স্মরণ করেন, ইয়ামাগামি যখন বলেন যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবে তার প্রধান লক্ষ্য ছিলেন না, তখন আবের স্ত্রী আকিয়ে আবের মুখে অবিশ্বাসের ছাপ ফুটে ওঠে। সুজুকির ভাষায়, সেই অভিব্যক্তি ‘আজও তার মনে স্পষ্টভাবে গেঁথে আছে।’

শিনজো আবের স্ত্রী আকিয়ে আবের মুখের অভিব্যক্তিতে তখন গভীর বিস্ময় ও ধাক্কার ছাপ ছিল। সাংবাদিকদের মতে, তার চোখেমুখে যেন একটি প্রশ্ন ভেসে উঠেছিল— ‘আমার স্বামী কি কেবল একটি ধর্মীয় সংগঠনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ মেটানোর হাতিয়ার ছিলেন? বিষয়টি কি শুধু এতটুকুই?’

আদালতে আবেগঘন এক বিবৃতিতে আকিয়ে আবে বলেন, স্বামীকে হারানোর শোক কোনো দিনই লাঘব হবে না। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু চেয়েছিলাম, সে যেন বেঁচে থাকে।’ দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিষ্ঠিত ইউনিফিকেশন চার্চ ১৯৬০-এর দশকে জাপানে কার্যক্রম শুরু করে। গবেষকদের মতে, অনুসারী বাড়াতে তারা বিভিন্ন রাজনীতিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে।

শিনজো আবে এই চার্চের সদস্য না হলেও, অন্যান্য অনেক জাপানি রাজনীতিকের মতো তিনিও মাঝেমধ্যে চার্চ-সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেন। তার দাদা নোবুসুকে কিশিও কমিউনিজমবিরোধী অবস্থানের কারণে এই সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে জানা যায়।

গত বছরের মার্চ মাসে টোকিওর একটি আদালত ইউনিফিকেশন চার্চের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বাতিল করে দেয়। আদালতের রায়ে বলা হয়, চার্চটি অনুসারীদের আধ্যাত্মিক ভয়কে কাজে লাগিয়ে জোরপূর্বক দামি পণ্য কিনতে বাধ্য করত। এ ছাড়া হাজার হাজার দম্পতিকে একসঙ্গে বিয়ে দেওয়ার বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করায়ও চার্চটি দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের মুখে রয়েছে।

ইয়ামাগামির বিচার চলাকালে তার বোন একজন আত্মপক্ষের সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির হন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি জানান, মায়ের চার্চে গভীর সম্পৃক্ততার কারণে তিনি ও তার ভাইবোনেরা কী ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। সাংবাদিক সুজুকির ভাষায়, ‘সেটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্ত। দর্শকসারিতে উপস্থিত প্রায় সবাই তখন কাঁদছিল।’

তবে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা যুক্তি দেন, ইয়ামাগামি কেন চার্চের প্রতি নিজের ক্ষোভ শিনজো আবের ওপর চাপালেন, তার ব্যাখ্যায় ‘যুক্তির বড় ধরনের ফাঁক’ রয়েছে। বিচার চলাকালে বিচারকরাও এমন প্রশ্ন তোলেন, যা থেকে বোঝা যায়—এই যুক্তি তারা সহজে গ্রহণ করতে পারছেন না। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ইয়ামাগামির ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট তার শাস্তি কমানোর কারণ হতে পারে কি না— এ নিয়ে সাধারণ মানুষ ও বিশ্লেষকদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে।

সাংবাদিক সুজুকি বলেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষের এই যুক্তি খণ্ডন করা কঠিন যে আবে সরাসরি ইয়ামাগামি বা তার পরিবারের কোনো ক্ষতি করেননি।’ তবে তার মতে, ইয়ামাগামির ঘটনা দেখায়— কিভাবে সামাজিক সমস্যার শিকার মানুষ কখনো কখনো ভয়াবহ অপরাধের পথে ঠেলে দেওয়া হয়।

সূত্র : বিবিসি