ঢাকা ০২:২২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
হঠাৎ পরিদর্শনে গিয়ে চিকিৎসকসহ দুই স্বাস্থ্যকর্মীকে বরখাস্ত করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী তরুণ উদ্ভাবকরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ : প্রধানমন্ত্রী কালিয়াকৈরে ৫০ ভিক্ষুক পরিবারের পুনর্বাসনে ২৪ লাখ টাকার বকনা গরু বিতরণ জুলাইয়ে রেমিট্যান্স এলো ২৮৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার ফেনী পাসপোর্ট অফিসের এডি জাহাঙ্গীরকে ঘিরে দালাল সিন্ডিকেটের অভিযোগ সিলেটে দল বদলেছে, দখল বদলায়নি; চাঁদাবাজি চলছে আগের মতোই ডিএনসিসি প্রশাসক ও ঢাকা-১৮ এর এমপির ওপর হামলার চেষ্টার অভিযোগ রায়পুরায় মোমেন মিয়া কে গুলি করে হত্যা, আহত ৩ বরগুনায় ডিবির অভিযানে ৩ কেজি গাঁজাসহ মাদক কারবারি গ্রেফতার চট্টগ্রাম গণপূর্তে প্রকৌশলী মেহেদী ও এনডিইকে ঘিরে ৫০ লাখ টাকার ঘুষের অভিযোগ

ইসলামে রসিকতা: বৈধতা ও সীমারেখা

  • ধর্ম ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৩:৪৯:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৬৬৪ বার পড়া হয়েছে

রাসুল (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা ইসলামের সীমার মধ্যে থেকে রসিকতার রস আহরণ করেছেন। বহু হাদিস থেকে এ সত্যই প্রতীয়মান হয়। যেমন—

ক. একবার এক বৃদ্ধা নারী রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বলল—হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। তিনি বলেন, ওহে, কোনো বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

বর্ণনাকারী বলেন—(তা শুনে) ওই নারী কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। নবী (সা.) বলেন, তাকে এই মর্মে খবর দাও যে তুমি বৃদ্ধাবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবে না। কারণ আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি। আর তাদের করেছি কুমারী।

’ (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ১৭৯)
রাসুল (সা.) বুঝিয়েছেন—প্রত্যেক মুসলিমই তরুণ-তরুণী হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

খ. একবার এক লোক রাসুল (সা.)-কে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে একটি আরোহীর ব্যবস্থা করে দিন। রাসুল (সা.) বলেন, আমি তোমাকে আরোহণের জন্য একটি উষ্ট্রীর বাচ্চা দেব। লোকটি বলল, আমি উষ্ট্রীর বাচ্চা দিয়ে কী করব! নবী (সা.) বলেন, উষ্ট্রীই তো সব উটকে জন্ম দেয়।

(আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৯৮)
গ. জাহির নামের এক বেদুইন কদাকার সাহাবি ছিলেন। রাসুল (সা.) তাঁকে ভালোবাসতেন। একবার জাহির (রা.) মদিনার বাজারে কেনাকাটায় ব্যস্ত ছিলেন। এমন সময় রাসুল (সা.) তাঁর অলক্ষে পেছন থেকে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। জাহির (রা.) বিস্ময়ে সুধালেন—কে তুমি? আমাকে ছেড়ে দাও।

পেছনে তাকাতেই যখন তিনি রাসুল (সা.)-কে দেখতে পেলেন তখন রাসুল (সা.) এর বুকের সঙ্গে তাঁর পিঠকে আরো মিলিয়ে দিলেন। রাসুল (সা.) (রসিকতা করে) বলেন, এ দাসটি কে কেনবে? জাহির (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে বিক্রি করলে আপনি শুধু অচল মুদ্রাই পাবেন। (কারণ আমি মূল্যহীন একজন মানুষ) তিনি বলেন, কিন্তু তুমি আল্লাহর কাছে অচল নও। (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ১৭৮)

এখানে রাসুল (সা.) রসিকতাচ্ছলে জাহির (রা.)-কে জড়িয়ে ধরেন। জাহির (রা.) দাস ছিলেন না। কিন্তু রসিকতার জন্য তিনি তাঁকে বেঁচে দেওয়ার কথা বলেছেন।

এভাবে নববী সিরাতের পরতে পরতে তাঁর পরিমিত রসিকতার বহু উদাহরণ রয়েছে। অনুরূপ উম্মাহর অনুসরণীয় মহান সাহবায়ে কেরামও পরিমিত রসিকতা করতেন। তাঁদের বহু কর্ম ও উক্তির মাধ্যমে তা আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। যেমন—

ক. বকর বিন আব্দুল্লাহ আল মুজানি বলেন, ‘সাহাবারা একে অপরের সঙ্গে রসিকতায় তরমুজ নিক্ষেপ করতেন। কিন্তু তারা কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হলে যোগ্য পুরুষরূপে প্রতিপন্ন হতেন।’ (আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ২৬৫)

খ. আলী (রা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করো এবং এ জন্য তোমরা চটকদার জ্ঞান আহরণ করো। কারণ দেহের মতো অন্তঃকরণও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।’ (আল মিরাহ ফিল মিযাহ)

গ. আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করো। কারণ অন্তঃকরণ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তা অন্ধ হয়ে যায়।’ (শাবাকাতু আলুকাহ)

তবে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। এখানে সীমা লঙ্ঘনের কোনো প্রশ্রয় নেই। তাই ইসলাম রসিকতা ও বিনোদনে অনুমোদনের পাশাপাশি তাতে কতগুলো শর্ত বেঁধে দিয়েছে। যথা—

এক. রসিকতা সত্যাশ্রয়ী হওয়া। মিথ্যা রসিকতা ইসলামে অনুমোদিত নয়। একবার সাহাবারা রাসুল (সা.) কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনিও আমাদের সঙ্গে রসিকতা করেন! প্রতি উত্তরে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তবে আমি শুধু সত্যই বলে থাকি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৯০)

অপর একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘ধবংস হোক সে ব্যক্তি, যে লোকদের হাসানোর জন্য মিথ্যে বলে, সে ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৭১৩৬)

রসিকতা বিষয়ে মূলনীতি

এক. রসিকতায় মিথ্যা বলা যাবে না। আজকাল মিথ্যা বলে জোকস করা একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি পরিহারযোগ্য।

দুই. স্বল্পমাত্রায় রসিকতা করা। রসিকতাকে অভ্যাসে পরিণত না করা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘অধিক হাসাহাসি কোরো না; কারণ তা অন্তরকে মেরে ফেলে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৭৩১২)

তিন. মানুষের রুচিবোধ বিবেচনায় স্থান-কাল-পাত্রভেদে রসিকতা করা।

চার. রসিকতায় কারো গিবত বা পরনিন্দ না করা। কাউকে নিয়ে উপহাস ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করা।

পাঁচ. শরিয়তের কোনো বিধি-বিধান নিয়ে উপহাস না করা। এটি একটি কুফুরি কর্ম।

ছয়. রসিকতায় অশ্লীলতাকে প্রশ্রয় না দেওয়া।

সাত. বাচ্চাদের সঙ্গে এমনভাবে রসিকতা না করা, যাতে রসিকের ব্যক্তিত্ব আহত হয় অথবা বাচ্চারা অনৈতিক শিক্ষা পায়।

আট. রসিকতায় কাউকে ভয় না দেখানো। এতে হাসির ছলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপদও হতে পারে।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

হঠাৎ পরিদর্শনে গিয়ে চিকিৎসকসহ দুই স্বাস্থ্যকর্মীকে বরখাস্ত করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ইসলামে রসিকতা: বৈধতা ও সীমারেখা

আপডেট সময় ০৩:৪৯:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

রাসুল (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা ইসলামের সীমার মধ্যে থেকে রসিকতার রস আহরণ করেছেন। বহু হাদিস থেকে এ সত্যই প্রতীয়মান হয়। যেমন—

ক. একবার এক বৃদ্ধা নারী রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বলল—হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। তিনি বলেন, ওহে, কোনো বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।

বর্ণনাকারী বলেন—(তা শুনে) ওই নারী কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। নবী (সা.) বলেন, তাকে এই মর্মে খবর দাও যে তুমি বৃদ্ধাবস্থায় জান্নাতে প্রবেশ করবে না। কারণ আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি। আর তাদের করেছি কুমারী।

’ (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ১৭৯)
রাসুল (সা.) বুঝিয়েছেন—প্রত্যেক মুসলিমই তরুণ-তরুণী হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

খ. একবার এক লোক রাসুল (সা.)-কে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে একটি আরোহীর ব্যবস্থা করে দিন। রাসুল (সা.) বলেন, আমি তোমাকে আরোহণের জন্য একটি উষ্ট্রীর বাচ্চা দেব। লোকটি বলল, আমি উষ্ট্রীর বাচ্চা দিয়ে কী করব! নবী (সা.) বলেন, উষ্ট্রীই তো সব উটকে জন্ম দেয়।

(আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৯৮)
গ. জাহির নামের এক বেদুইন কদাকার সাহাবি ছিলেন। রাসুল (সা.) তাঁকে ভালোবাসতেন। একবার জাহির (রা.) মদিনার বাজারে কেনাকাটায় ব্যস্ত ছিলেন। এমন সময় রাসুল (সা.) তাঁর অলক্ষে পেছন থেকে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। জাহির (রা.) বিস্ময়ে সুধালেন—কে তুমি? আমাকে ছেড়ে দাও।

পেছনে তাকাতেই যখন তিনি রাসুল (সা.)-কে দেখতে পেলেন তখন রাসুল (সা.) এর বুকের সঙ্গে তাঁর পিঠকে আরো মিলিয়ে দিলেন। রাসুল (সা.) (রসিকতা করে) বলেন, এ দাসটি কে কেনবে? জাহির (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমাকে বিক্রি করলে আপনি শুধু অচল মুদ্রাই পাবেন। (কারণ আমি মূল্যহীন একজন মানুষ) তিনি বলেন, কিন্তু তুমি আল্লাহর কাছে অচল নও। (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ১৭৮)

এখানে রাসুল (সা.) রসিকতাচ্ছলে জাহির (রা.)-কে জড়িয়ে ধরেন। জাহির (রা.) দাস ছিলেন না। কিন্তু রসিকতার জন্য তিনি তাঁকে বেঁচে দেওয়ার কথা বলেছেন।

এভাবে নববী সিরাতের পরতে পরতে তাঁর পরিমিত রসিকতার বহু উদাহরণ রয়েছে। অনুরূপ উম্মাহর অনুসরণীয় মহান সাহবায়ে কেরামও পরিমিত রসিকতা করতেন। তাঁদের বহু কর্ম ও উক্তির মাধ্যমে তা আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। যেমন—

ক. বকর বিন আব্দুল্লাহ আল মুজানি বলেন, ‘সাহাবারা একে অপরের সঙ্গে রসিকতায় তরমুজ নিক্ষেপ করতেন। কিন্তু তারা কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হলে যোগ্য পুরুষরূপে প্রতিপন্ন হতেন।’ (আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ২৬৫)

খ. আলী (রা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করো এবং এ জন্য তোমরা চটকদার জ্ঞান আহরণ করো। কারণ দেহের মতো অন্তঃকরণও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।’ (আল মিরাহ ফিল মিযাহ)

গ. আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা করো। কারণ অন্তঃকরণ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তা অন্ধ হয়ে যায়।’ (শাবাকাতু আলুকাহ)

তবে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। এখানে সীমা লঙ্ঘনের কোনো প্রশ্রয় নেই। তাই ইসলাম রসিকতা ও বিনোদনে অনুমোদনের পাশাপাশি তাতে কতগুলো শর্ত বেঁধে দিয়েছে। যথা—

এক. রসিকতা সত্যাশ্রয়ী হওয়া। মিথ্যা রসিকতা ইসলামে অনুমোদিত নয়। একবার সাহাবারা রাসুল (সা.) কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনিও আমাদের সঙ্গে রসিকতা করেন! প্রতি উত্তরে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তবে আমি শুধু সত্যই বলে থাকি।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৯০)

অপর একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘ধবংস হোক সে ব্যক্তি, যে লোকদের হাসানোর জন্য মিথ্যে বলে, সে ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৭১৩৬)

রসিকতা বিষয়ে মূলনীতি

এক. রসিকতায় মিথ্যা বলা যাবে না। আজকাল মিথ্যা বলে জোকস করা একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি পরিহারযোগ্য।

দুই. স্বল্পমাত্রায় রসিকতা করা। রসিকতাকে অভ্যাসে পরিণত না করা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘অধিক হাসাহাসি কোরো না; কারণ তা অন্তরকে মেরে ফেলে।’ (সহিহুল জামে, হাদিস : ৭৩১২)

তিন. মানুষের রুচিবোধ বিবেচনায় স্থান-কাল-পাত্রভেদে রসিকতা করা।

চার. রসিকতায় কারো গিবত বা পরনিন্দ না করা। কাউকে নিয়ে উপহাস ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করা।

পাঁচ. শরিয়তের কোনো বিধি-বিধান নিয়ে উপহাস না করা। এটি একটি কুফুরি কর্ম।

ছয়. রসিকতায় অশ্লীলতাকে প্রশ্রয় না দেওয়া।

সাত. বাচ্চাদের সঙ্গে এমনভাবে রসিকতা না করা, যাতে রসিকের ব্যক্তিত্ব আহত হয় অথবা বাচ্চারা অনৈতিক শিক্ষা পায়।

আট. রসিকতায় কাউকে ভয় না দেখানো। এতে হাসির ছলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপদও হতে পারে।