ঢাকা ১১:৩৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
গাসিকে বৃক্ষরোপণে লুটপাট

৭০ টাকার চারা কেনা হয়েছে ৩৫৭৫ টাকায়

গাজীপুর সিটি করপোরেশনে (গাসিক) বৃক্ষরোপণের নামে হরিলুটের ঘটনা ঘটেছে। বেড়াসহ ৭০ টাকার গাছের চারার মূল্য দেখানো হয়েছে তিন হাজার ৫৭৫ টাকা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতি আর অনিয়মের আঁতুড়ঘর হিসাবে পরিচিত। ইতোমধ্যে কোটি কোটি টাকা লেনদেন নিয়ে সংবাদ চাউর হয়েছে। গণ-শৌচাগার, কোটি কোটি টাকা অর্থ ব্যয়ে বহুতল মার্কেট নির্মাণ করে ফেলে রাখা, হাটবাজার ইজারা না দিয়ে লুটপাট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার টেন্ডার আহ্বান করে গত ছয় মাস পর এসে পে-অর্ডার ফেরত দেওয়া, আরএফকিও’র নামে কাজের ভাগবাঁটোয়ারার অভিযোগও আছে। গাসিক কতৃর্ক ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শহরের মধ্যছায়াবিথী এলাকায় কয়েকশ গজ সিরামিক ইট দিয়ে গাইড ওয়ালসহ ব্লক ইটের হেরিংবল সড়ক ও মহানগরের ভারারুল চৌরাস্তা থেকে ধীরাশ্রম বাজার ও রাজদীঘির পাড়ে বৃক্ষরোপণের জন্য এক কোটি ৯ লাখ টাকার একটি কাজ পায় মেসার্স আল-মাহির এন্টারপ্রাইজ নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সেখানে এক বছরের পরিচর্যা করাসহ ১২ শতাধিক গাছের চারা রোপণের জন্য ব্যয় ধরা হয় ১৯ লাখ ৬৬ হাজার ৪৪০ টাকা। জানা গেছে, ওই সড়কের নিচ থেকে সিরামিক ইটের গাইড ওয়াল করার জন্য প্রতি পিস ইটের দাম ধরা হয় ৩০ টাকা। কিন্তু ঠিকাদার নিচে পূর্বে থাকা বাংলা ইটের ওপরেই সিরামিক ইট বসিয়ে গাইট ওয়াল করেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এছাড়া অদ্ভুত বিষয় হলো, রাজদীঘির পাড় ও ভারারুল চৌরাস্তা থেকে ধীরাশ্রম বাজার পর্যন্ত সড়কের দুপাশে বিভিন্ন ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা লাগাতে সিটি করপোরেশন খরচ দেখিয়েছে চারাপ্রতি তিন হাজার ৫৭৫ টাকা। ওই স্থানে চারা রোপণ করার কথা ১২ শতাধিক কিন্তু রোপণ করা হয়েছে অর্ধেকেরও কম এবং আম, জাম ও মেহগনির মতো কম দামি চারাই বেশি। যেখানে এক বছর পরিচর্যা করার কথা সেখানে সার, পানি কিছুই দেওয়া হয়নি। অযত্ন ও অবহেলায় ধুলাবালুর স্তর জমে কিছু চারা মরে গেছে এবং বাকিগুলোও মরে মরে অবস্থা। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, সড়কের দুপাশে সারি সারি করে চারা রোপণের কথা থাকলেও অনেক জায়গাজুড়েই ফাঁকা। অনেক স্থানে বেড়াসহ খুঁটি দাঁড়িয়ে থাকলেও ভেতরে চারা নেই। মরা, আধমরাসহ একেকটি করে গুণে দেখা যায় সেখানে চারা রয়েছে মাত্র ৫৫০টি। স্থানীয়রা বলছেন, যেখানে ১২০০ চারা লাগাতে সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ হওয়ার কথা সেখানে সিটি করপোরেশন কীভাবে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় করে? স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, চারাগুলো সঠিকভাবে রোপণ করা হয়নি। সিটি কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারকে কাজ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। একদিনের জন্যও তারা দেখতে আসেনি। ভারারুল চৌরাস্তার দোকানি জিয়াউর রহমান জানান, চারা গাছের গোড়ার প্লাস্টিক ব্যাগ রেখেই শ্রমিকরা গাছ রোপণ করে গেছেন। শুধু কোনো রকম মাটিতে গুঁজেছেন। সার, পানি কিছুই দেননি। স্থানীয় মেজবাহ উদ্দিনসহ অনেকে জানান, ঠিকাদারের এক বছর পরিচর্যা করার কথা কিন্তু তারা তা করছেন না। এদিকে জানা গেছে, প্রতিটি চারা আল-মাহির এন্টারপ্রাইজ ৭০ টাকা করে পার্শ্ববর্তী পলাশ উপজেলার মায়ের দোয়া আদর্শ নার্সারি থেকে এনেছে। মায়ের দোয়া আদর্শ নার্সারির মালিক সিরাজুল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আকাশমণি, মেহগনি, আম, জাম, কাঁঠাল, চালতাসহ বিভিন্ন চারা গাছ ৭০ টাকা দরে নিজস্ব পরিবহণে করে এনে দিয়েছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আল-মাহির এন্টারপ্রাইজের মালিক আল আমিন হোসেন জানান, ‘ফাইভ পার্সেন্ট লেসে এক কোটি ৯ লাখ টাকার একটি প্যাকেজ কাজ পৃথক মূল্যে তিনি লটারিতে পেয়েছেন। এর মধ্যে ভারারুল-ধীরাশ্রম সড়কের দুপাশে চারা গাছ রোপণের কাজও রয়েছে। তার দাবি, তিনি সঠিকভাবেই গাছগুলো লাগিয়েছেন। নিয়মিত পরিচর্যাও করা হচ্ছে। কিন্তু কে বা কারা অনেক জায়গায় থেকে গাছগুলো উঠিয়ে ফেলেছে। প্লাস্টিকসহ চারা রোপণের বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে লেবারের গাফিলতি থাকতে পারে, গাছ লাগানোর সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না বলে জানান। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সচিব মো. আল-আমীন পারভেজ বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নলেজে এসেছে। আমরা তদন্ত করে দেখব। কোনো প্রকার অসঙ্গতি পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

গাসিকে বৃক্ষরোপণে লুটপাট

৭০ টাকার চারা কেনা হয়েছে ৩৫৭৫ টাকায়

আপডেট সময় ১২:৩৫:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

গাজীপুর সিটি করপোরেশনে (গাসিক) বৃক্ষরোপণের নামে হরিলুটের ঘটনা ঘটেছে। বেড়াসহ ৭০ টাকার গাছের চারার মূল্য দেখানো হয়েছে তিন হাজার ৫৭৫ টাকা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতি আর অনিয়মের আঁতুড়ঘর হিসাবে পরিচিত। ইতোমধ্যে কোটি কোটি টাকা লেনদেন নিয়ে সংবাদ চাউর হয়েছে। গণ-শৌচাগার, কোটি কোটি টাকা অর্থ ব্যয়ে বহুতল মার্কেট নির্মাণ করে ফেলে রাখা, হাটবাজার ইজারা না দিয়ে লুটপাট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার টেন্ডার আহ্বান করে গত ছয় মাস পর এসে পে-অর্ডার ফেরত দেওয়া, আরএফকিও’র নামে কাজের ভাগবাঁটোয়ারার অভিযোগও আছে। গাসিক কতৃর্ক ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শহরের মধ্যছায়াবিথী এলাকায় কয়েকশ গজ সিরামিক ইট দিয়ে গাইড ওয়ালসহ ব্লক ইটের হেরিংবল সড়ক ও মহানগরের ভারারুল চৌরাস্তা থেকে ধীরাশ্রম বাজার ও রাজদীঘির পাড়ে বৃক্ষরোপণের জন্য এক কোটি ৯ লাখ টাকার একটি কাজ পায় মেসার্স আল-মাহির এন্টারপ্রাইজ নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সেখানে এক বছরের পরিচর্যা করাসহ ১২ শতাধিক গাছের চারা রোপণের জন্য ব্যয় ধরা হয় ১৯ লাখ ৬৬ হাজার ৪৪০ টাকা। জানা গেছে, ওই সড়কের নিচ থেকে সিরামিক ইটের গাইড ওয়াল করার জন্য প্রতি পিস ইটের দাম ধরা হয় ৩০ টাকা। কিন্তু ঠিকাদার নিচে পূর্বে থাকা বাংলা ইটের ওপরেই সিরামিক ইট বসিয়ে গাইট ওয়াল করেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এছাড়া অদ্ভুত বিষয় হলো, রাজদীঘির পাড় ও ভারারুল চৌরাস্তা থেকে ধীরাশ্রম বাজার পর্যন্ত সড়কের দুপাশে বিভিন্ন ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা লাগাতে সিটি করপোরেশন খরচ দেখিয়েছে চারাপ্রতি তিন হাজার ৫৭৫ টাকা। ওই স্থানে চারা রোপণ করার কথা ১২ শতাধিক কিন্তু রোপণ করা হয়েছে অর্ধেকেরও কম এবং আম, জাম ও মেহগনির মতো কম দামি চারাই বেশি। যেখানে এক বছর পরিচর্যা করার কথা সেখানে সার, পানি কিছুই দেওয়া হয়নি। অযত্ন ও অবহেলায় ধুলাবালুর স্তর জমে কিছু চারা মরে গেছে এবং বাকিগুলোও মরে মরে অবস্থা। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, সড়কের দুপাশে সারি সারি করে চারা রোপণের কথা থাকলেও অনেক জায়গাজুড়েই ফাঁকা। অনেক স্থানে বেড়াসহ খুঁটি দাঁড়িয়ে থাকলেও ভেতরে চারা নেই। মরা, আধমরাসহ একেকটি করে গুণে দেখা যায় সেখানে চারা রয়েছে মাত্র ৫৫০টি। স্থানীয়রা বলছেন, যেখানে ১২০০ চারা লাগাতে সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ হওয়ার কথা সেখানে সিটি করপোরেশন কীভাবে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় করে? স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, চারাগুলো সঠিকভাবে রোপণ করা হয়নি। সিটি কর্তৃপক্ষ ঠিকাদারকে কাজ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। একদিনের জন্যও তারা দেখতে আসেনি। ভারারুল চৌরাস্তার দোকানি জিয়াউর রহমান জানান, চারা গাছের গোড়ার প্লাস্টিক ব্যাগ রেখেই শ্রমিকরা গাছ রোপণ করে গেছেন। শুধু কোনো রকম মাটিতে গুঁজেছেন। সার, পানি কিছুই দেননি। স্থানীয় মেজবাহ উদ্দিনসহ অনেকে জানান, ঠিকাদারের এক বছর পরিচর্যা করার কথা কিন্তু তারা তা করছেন না। এদিকে জানা গেছে, প্রতিটি চারা আল-মাহির এন্টারপ্রাইজ ৭০ টাকা করে পার্শ্ববর্তী পলাশ উপজেলার মায়ের দোয়া আদর্শ নার্সারি থেকে এনেছে। মায়ের দোয়া আদর্শ নার্সারির মালিক সিরাজুল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আকাশমণি, মেহগনি, আম, জাম, কাঁঠাল, চালতাসহ বিভিন্ন চারা গাছ ৭০ টাকা দরে নিজস্ব পরিবহণে করে এনে দিয়েছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আল-মাহির এন্টারপ্রাইজের মালিক আল আমিন হোসেন জানান, ‘ফাইভ পার্সেন্ট লেসে এক কোটি ৯ লাখ টাকার একটি প্যাকেজ কাজ পৃথক মূল্যে তিনি লটারিতে পেয়েছেন। এর মধ্যে ভারারুল-ধীরাশ্রম সড়কের দুপাশে চারা গাছ রোপণের কাজও রয়েছে। তার দাবি, তিনি সঠিকভাবেই গাছগুলো লাগিয়েছেন। নিয়মিত পরিচর্যাও করা হচ্ছে। কিন্তু কে বা কারা অনেক জায়গায় থেকে গাছগুলো উঠিয়ে ফেলেছে। প্লাস্টিকসহ চারা রোপণের বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে লেবারের গাফিলতি থাকতে পারে, গাছ লাগানোর সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না বলে জানান। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সচিব মো. আল-আমীন পারভেজ বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নলেজে এসেছে। আমরা তদন্ত করে দেখব। কোনো প্রকার অসঙ্গতি পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’