ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ এবং দায়িত্ব পালনকালে নানা অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায় কর্মরত সাব-রেজিস্ট্রার কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় বয়স অপ্রাপ্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাজী নজরুল ইসলামের জন্মসাল ১৯৬৭। সে হিসাবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল আনুমানিক তিন থেকে চার বছর। ইতিহাসবিদ ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষকদের মতে, এই বয়সে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ তো দূরের কথা, যুদ্ধ-সংক্রান্ত কোনো দায়িত্ব পালনের প্রশ্নই ওঠে না। অথচ সরকারি নথিতে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে, যা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কাজী নজরুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা গ্রহণ করে সাব-রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পান। মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে তিনি যে তথ্য ও পরিচয় ব্যবহার করেছেন, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তার অবস্থান ও ভূমিকা সম্পর্কে যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
মুক্তিযোদ্ধা যাচাই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, বয়স ও সময়কাল যাচাই করলেই এ ধরনের সনদের সত্যতা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। তাদের মতে, তিন বা চার বছর বয়সী কোনো শিশুর পক্ষে মুক্তিযুদ্ধকালীন কোনো সংগঠন বা প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ হওয়া ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব।
চাকরিতে যোগদানের পর বিভিন্ন কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দলিল নিবন্ধন ও ভূমি সংক্রান্ত সেবায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি, জমি রেজিস্ট্রেশন ও নামজারির ক্ষেত্রে নির্ধারিত সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হতো। কেউ ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার দলিল কার্যক্রম দীর্ঘদিন আটকে রাখা কিংবা নানা অজুহাতে হয়রানির অভিযোগও করেছেন অনেকে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দলিল নিবন্ধনের সময় জাল বা বিতর্কিত কাগজপত্র গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এতে করে সাধারণ মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তেমনি সরকারও রাজস্ব হারিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ভূমি প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ ধরনের অনিয়ম পুরো ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
চাকরির আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদের মালিকানা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নিজ জেলা ও অন্যান্য এলাকায় তার নামে জমি ও স্থাপনার তথ্য পাওয়া গেছে, যার আর্থিক মূল্য সরকারি বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যদিও এসব সম্পদের উৎস সম্পর্কে এখন পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও দুর্নীতির অভিযোগ একসঙ্গে এলে তা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। জন্মসাল, শিক্ষা সনদ এবং মুক্তিযোদ্ধা তালিকার তথ্য মিলিয়ে দেখলেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব। তবে কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, এতসব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে যদি ভুয়া সনদের অভিযোগ ওঠে এবং তা দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকে, তাহলে তা রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিষয়টি নিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেন, তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করেছেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। অথচ কেউ যদি শিশু বয়সে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে সরকারি চাকরি ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, তাহলে তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে চরম অবিচার।
এ বিষয়ে কাজী নজরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সচেতন মহলের মতে, কাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিয়মের বিষয় নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা, সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভূমি প্রশাসনের স্বচ্ছতার প্রশ্নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















