স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কার্যক্রমে দুর্নীতি, ঘুষবাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তীব্রভাবে বেড়েছে। ঠিকাদারদের বক্তব্য অনুযায়ী, উপজেলা প্রকৌশলী জয়শ্রী দে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের নামে এই দুর্নীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, জয়শ্রী দে প্রকল্পের বরাদ্দ, ফাইল চলাচল এবং বিল মঞ্জুর করার ক্ষেত্রে সরাসরি ঘুষ আদায় করছেন। তারা জানান, “ঘুষ না দিলে ফাইল নাড়বে না, বিল ছাড় হবে না।” এর ফলে অনেক ঠিকাদার হিমশিম খাচ্ছেন, আর কেউ কেউ সম্পূর্ণ কাজই বন্ধ করে দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে এলজিইডির অধীনে থাকা সড়ক উন্নয়ন ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে অরাজকতা ও স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে।
ঠিকাদারদের দাবি অনুযায়ী, জয়শ্রী দে প্রায় প্রতিটি প্রকল্প বরাদ্দ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন হাতিয়ে নিচ্ছেন। তবে, এখানেই শেষ নয়। কাজ শেষ হওয়ার পর বিল পেতে গেলে আবারও ‘টেবিলমানি’ হিসেবে অতিরিক্ত ঘুষ দিতে হয়। এমন পরিস্থিতি শুধু এলজিইডির স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে না, বরং প্রকল্পের বরাদ্দের বড় অংশ সড়ক, ভবন এবং অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের পরিবর্তে ঘুষ-সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যাচ্ছে।
একাধিক ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “এলজিইডির যে কোনো কাজই হোক, জয়শ্রী দে’র টেবিলে ঘুষ না দিলে কোনো ফাইল এগোয় না। ফলে প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে এগোছে এবং অনেক উন্নয়ন কাজের বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।”
অভিযোগ রয়েছে যে, জয়শ্রী দে পূর্বে ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক এমপি ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের প্রভাব ব্যবহার করে অনিয়ম করতেন। তবে বর্তমানে তিনি এক উপদেষ্টার ছত্রছায়ায় আগের চেয়েও বেপরোয়া দুর্নীতি এবং ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন। এমনকি নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান আলী অভিযোগগুলো শুনেও নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছেন।
ঠিকাদারদের মতে, এই ধরনের অনিয়ম শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং এলজিইডির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে। অনেক এলাকাবাসী জানেন না যে, এলাকার রাস্তা, ব্রিজ বা অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বরাদ্দের বড় অংশ ঘুষ-সিন্ডিকেটের হাত ধরে যাচ্ছে। ফলে প্রকল্পের প্রকৃত লক্ষ্য এবং জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
জয়শ্রী দে’র দাপট এবং ক্ষমতার অপব্যবহার স্থানীয় প্রশাসন ও ঠিকাদারদের মধ্যে বড় ধরনের হতাশা তৈরি করেছে। একাধিক ঠিকাদার জানান, সরকার বদলালেও জয়শ্রী দে বদলায়নি। তার পদ্ধতি, ঘুষ আদায়ের ফাঁদ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার পূর্বের তুলনায় আরও তীব্র হয়েছে। এমনকি তারা বলেন, “যতবার অভিযোগ করেছি, কোনো প্রতিকার পাইনি।”
এলজিইডির অধীনে সড়ক উন্নয়ন এবং অবকাঠামো প্রকল্পগুলোয় এই ধরনের অনিয়ম যদি চলতে থাকে, তবে প্রভাব শুধুমাত্র ঠিকাদারদের ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং পুরো এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ধীরগতিতে চলবে, এবং দীর্ঘমেয়াদে জনসাধারণের জীবনযাত্রার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এলজিইডির প্রকল্পগুলো সাধারণত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রাম-শহরের উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা হয়। তবে হাটহাজারীর উদাহরণ প্রমাণ করছে যে, প্রাথমিক বরাদ্দ থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নেই। প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন এবং ‘টেবিলমানি’ এর মতো ঘুষ-চক্র প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে বিপর্যস্ত করছে।
একজন স্থানীয় ঠিকাদার বলেন, “প্রকৌশলী জয়শ্রী দে প্রকল্পের বরাদ্দ বুঝে নেওয়ার ফাঁদ তৈরি করেছেন। যদি আমরা তার দাবী মেনে না চলি, ফাইল কোনদিনই এগোবে না। এমন পরিস্থিতিতে অনেক ঠিকাদার ইতিমধ্যেই কাজ থেকে সরে গেছেন।” তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধরনের প্রথা শুধু এলজিইডির সুনামের ক্ষতি করছে না, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে এবং ঠিকাদারদের উপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
ঠিকাদারদের দাবি, সরকারের নজরে এলজিইডির এই অনিয়ম আনা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন এবং তদারকি সংস্থাগুলোকে শক্তিশালীভাবে হস্তক্ষেপ করতে হবে, যাতে এলজিইডির প্রকল্পগুলো স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হয়। তারা বলছেন, “যদি ঠিকাদারদের অভিযোগ এভাবে উপেক্ষা করা হয়, তবে প্রকল্পের বরাদ্দের বড় অংশ ঘুষ-সিন্ডিকেটের হাতে চলে যাবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।”
হাটহাজারী উপজেলার এলজিইডি প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দিত অর্থ মূলত সড়ক, জলপথ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দিত। তবে ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, জয়শ্রী দে’র কারণে প্রকল্পের অর্থের বড় অংশ ঘুষের মাধ্যমে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রকল্পের মান কমে যাচ্ছে এবং জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
একজন স্থানীয় নাগরিক জানান, “আমরা সড়ক এবং অন্যান্য উন্নয়ন কাজের জন্য যে টাকা বরাদ্দ হচ্ছে, তার একটি বড় অংশ যদি ঠিকাদারদের কাছে পৌঁছানো না যায়, তবে আমাদের সেবা কীভাবে উন্নত হবে? প্রকল্পের বরাদ্দ হঠাৎ শেষ হয়ে যায়, অথচ ঠিকাদাররা টাকা নিয়ে শেষ করে।”
এই সমস্যা শুধু ঠিকাদারদের ক্ষতির কারণ নয়, বরং স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের ভাবমূর্তিকেও ক্ষুণ্ন করছে। প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা না হলে হাটহাজারী উপজেলায় এলজিইডি প্রকল্পের কার্যকারিতা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সর্বোপরি, জয়শ্রী দে’র কর্মকাণ্ড শুধু এলজিইডির স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে না, বরং স্থানীয় জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসও ধ্বংস করছে। এটি স্পষ্ট যে, দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া না হলে এলজিইডির উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ধ্বংসাত্মক প্রভাবের মুখোমুখি হবে।
ঠিকাদাররা সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোরালো অনুরোধ জানিয়েছেন যে, তাদের অভিযোগগুলোর দ্রুত তদন্ত এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক। যাতে এলজিইডির প্রকল্পগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং জনগণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়। তারা আশা করছেন, সরকার ও প্রশাসন যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে এলজিইডির ঘুষ-দূর্নীতি নির্মূল করবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















