রাজধানীর খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস—একসময় সাধারণ মানুষের জমি-জমার দলিল রেজিস্ট্রির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত ছিল এই দপ্তর। কিন্তু এখন এটি পরিণত হয়েছে দুর্নীতি, জুলুম এবং দালালচক্রের অভয়ারণ্যে। আর এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাব-রেজিস্ট্রার মাইনুদ্দিন, যিনি এলাকায় মাইকেল মহিউদ্দিন নামে পরিচিত। সরকারি এই পদকে ব্যবহার করে তিনি গড়ে তুলেছেন ব্যক্তিগত ক্ষমতার এক বেপরোয়া সাম্রাজ্য, যার ভয়ে কাঁপে সেবাগ্রহীতা, অফিসকর্মী, এমনকি স্থানীয় দালালরাও।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—মাইকেল মহিউদ্দিন শুধু ঘুষগ্রহণ কিংবা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত নন; তিনি পুরো দপ্তরটিকে ব্যক্তিগত বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করেছেন। দলিল রেজিস্ট্রি থেকে শুরু করে নকল উত্তোলন, বিবাহ নিবন্ধন সুপারিশ, নামজারির কাগজপত্র যাচাই—কোনো কিছুই তার অনুমতি ছাড়া সম্পন্ন হয় না। দপ্তরটি কার্যত তাঁর একক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে চলে।
খিলগাঁওয়ের স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, সাব-রেজিস্ট্রার পদে যোগদানের পর থেকেই মাইকেল মহিউদ্দিন আচরণে বদলে যান। আগে নিরহঙ্কার, সাধারণ পোশাকে চলাফেরা করলেও এখন তিনি চকচকে গাড়িতে অফিসে আসেন, সঙ্গে থাকে একাধিক সহযোগী। অফিসে প্রবেশের পর তার আশপাশে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হয় যেন তিনি সরকারি কর্মকর্তা নন—দপ্তরের “গডফাদার”।
দলিল লেখকরা জানান, প্রতিদিন সকালে অফিস খোলার পর দালালদের ভিড় লেগে যায় সাব-রেজিস্ট্রারের খাস কক্ষের সামনে। সেখানে প্রবেশের সুযোগ শুধু তার অনুমোদিত লোকদের জন্য। সাধারণ মানুষ কিংবা দলিল প্রস্তুতকারীরা সেখানে ঢুকতে চান, কিন্তু প্রবেশ করতে পারেন না। কক্ষের ভেতরে চলে অঘোষিত দরদাম—কোন দলিল কত টাকায় পাস হবে, কোন ফাইল আটকে রাখা হবে, কোন আবেদন “জরুরি” হিসেবে দেখিয়ে দ্রুত শেষ করা হবে।
এক সহকারী দলিল লেখক অভিযোগ করেন, “এখানে বৈধ দলিল প্রমাণ করার চেয়ে টাকা দেওয়া বেশি জরুরি। টাকা না দিলে সই হবে না, সই না হলে দলিল রেজিস্ট্রিও হবে না।” তিনি আরও বলেন, “মাইকেল ভাইয়ের ‘ডান হাত’ আছে, তার নির্দেশ ছাড়া কোনো ফাইল নড়াচড়া করে না।”
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ডান হাতকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে এক ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট। অফিসের আশপাশে থাকা দালাল থেকে শুরু করে কিছু অসাধু কর্মচারী—সবাই এই সিন্ডিকেটের অংশ। তারা সবাই মাইকেল মহিউদ্দিনের চোখের ইশারা বোঝেন। সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাজ তিনটি—ভুক্তভোগী খুঁজে বের করা, ঘুষ ঠিক করা এবং টাকার বিনিময়ে দলিল পাস করিয়ে দেওয়া। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা হাতবদল হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে যেখানে সরকারি ফি নির্ধারিত, সেখানে ঘুষ হিসেবে দিতে হয় আরও কয়েক গুণ টাকা। কারও দলিলে সামান্য ভুল থাকলে তা সংশোধনের নামে নেওয়া হয় ‘বিশেষ চার্জ’। দলিল সঠিক থাকলেও ইচ্ছা করেই ভুল দেখানো হয় যাতে সেবাগ্রহীতা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দেয়।
অনেক ভুক্তভোগী জানান, দলিল সই করানোর জন্য যদি কেউ সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রারের কক্ষে যেতে চান, তাকে প্রথমেই বলা হয়—“দালালের মাধ্যমে আসেন।” এতে বোঝা যায়, মাইকেল মহিউদ্দিন পুরো দালাল চক্রকেই নিজের আর্থিক উৎস হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফলে ভুক্তভোগীরা দালালের কাছে না গেলে কাজই হয় না।
অভিযোগ উঠেছে, বড় অঙ্কের লেনদেন হলে সরাসরি মাইকেল মহিউদ্দিন নিজেই দর কষাকষি করেন। এমনকি অফিসের নির্দিষ্ট কয়েকটি অন্ধ অঞ্চল ব্যবহার করা হয় ঘুষের টাকা লেনদেনে—যেখানে সিসিটিভির নজরদারি নেই। এই স্থানগুলোই এখন খিলগাঁও অফিসের “সেফ জোন ফর কালেকশন” হিসেবে পরিচিত।
টাকার বিনিময়ে তিনি ত্রুটিপূর্ণ দলিলে সই করেন—এমন অভিযোগ বহুদিনের। একাধিক দলিল লেখক ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি জানিয়েছেন, “মাইকেল ভাইয়ের কোড আছে—টাকা ঠিক হলে ত্রুটি কোনো ত্রুটি থাকে না, টাকা ঠিক না হলে বৈধ দলিলেও সমস্যা বের হয়।”
একজন ভুক্তভোগী জানান, তিনি ৩ মাস ধরে দলিল করাতে আসছেন, কিন্তু কোনোভাবে তার কাজ হচ্ছে না। কিন্তু যখন তিনি দালালের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা দেন, তখন ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার কাজ শেষ হয়ে যায়। তার ভাষায়, “আমি বুঝলাম—এখানে আইন নাই, টাকাই আইন।”
সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন শুধু দুর্নীতি করেই থেমে নেই, তার বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে—তিনি উচ্চপর্যায়ে নিজের অবস্থান মজবুত করতে সাব-রেজিস্ট্রারদের সমিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করেছেন। এই পদ তাকে আরও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে। সমিতির নেতৃত্বে থাকা অবস্থায় তিনি অভিযোগ উঠলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথে বাধা দেন। ফলে দুর্নীতির অভিযোগ জমতে থাকে, কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
সরকারি বেতনভুক্ত কর্মকর্তা হয়েও কীভাবে তিনি একাধিক ফ্ল্যাট, গাড়ি ও বাড়ির মালিক হলেন—এমন প্রশ্নের উত্তর তিনি কখনোই দিতে পারেননি। বরং সাংবাদিকরা এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি প্রসঙ্গ পাল্টে বলেন, “এসব বাদ দেন, আগে চা খান।” এই আচরণ প্রমাণ করে, তিনি অভিযোগকে গুরুত্ব দেন না কিংবা তিনি ভাবেন—তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারবে না।
অফিসের ভেতরেও তার আচরণ ত্রাসসৃষ্টিকারী। কর্মচারীরা বলেন, তিনি যে কাউকে কারণ ছাড়াই বকা দেন, আবার যাকে পছন্দ করেন তাকে দিয়ে লেনদেনের বড় বড় দায়িত্ব দেন। যারা তার দুর্নীতিতে সহযোগিতা করেন না, তাদের হয়রানি করা হয়। অনেককে ইচ্ছা করে বদলি করা হয়, আবার কারও ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ দিয়ে শাস্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা হয়।
দপ্তরের বাইরে স্থানীয়রা বারবার অভিযোগ করলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনেকেই বলেন, “মাইকেল মহিউদ্দিন এতটাই শক্তিশালী যে তাকে কেউ কিছু বলতে পারে না। উপরের লোকজনকে হাত করে রেখেছেন।”
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, খিলগাঁও অফিসে জমা হওয়া সরকারি রাজস্বের হিসাব নিয়েও রয়েছে নানা অনিয়ম। ঘুষের কারণে আসল লেনদেনকে অনেক সময় ঢেকে রাখা হয়, যার ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দলিল রেজিস্ট্রির পর সরকারি ফি জমা দিতে দেরি করা হয় বা কখনো কখনো সেই অর্থ দেরিতে ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়—যা সরাসরি রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অফিসে অভিযোগ করার সুযোগ থাকলেও তা কার্যত নিষ্ক্রিয়। অভিযোগ বাক্সে দেওয়া অভিযোগ কখনো খোলা হয় না। যারা অভিযোগ করেন, তাদের ফাইল আটকে দিয়ে আরও হয়রানি করা হয়। ফলে কেউই প্রকাশ্যে নাম বলতে চান না।
এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ, ভূমি মালিক, দলিল লেখক, এমনকি সেবাদানকারী কর্মচারীরাও দাবি করেছেন—মাইকেল মহিউদ্দিন ও তার সিন্ডিকেটকে দ্রুত অপসারণ করে খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে দুর্নীতিমুক্ত করা হোক। তারা আরও বলেছেন, তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধান, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ঘুষের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত জরুরি।
এখন প্রশ্ন—একজন সাব-রেজিস্ট্রার কীভাবে পুরো দপ্তরকে নিজের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে পরিণত করলেন? তার পিছনে কি আরও প্রভাবশালী কেউ রয়েছে? তিনি কি একা নন, আরও বড় কোনো নেটওয়ার্কের অংশ? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে অবশ্যই প্রয়োজন উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নজরদারি।
ভুক্তভোগীরা মনে করেন, মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে দেশের অন্যান্য সাব-রেজিস্ট্রি অফিসেও একই ধরনের দুর্নীতির বিস্তার ঘটবে। কারণ, একজন কর্মকর্তা যদি খোলাখুলি কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেও বহাল তবিয়তে থাকতে পারেন—তাহলে তা অন্যদের জন্যও উৎসাহ যোগায়।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মাইকেল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। জনগণের প্রত্যাশা—খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দুর্নীতির নেপথ্যে থাকা এই ‘একক ক্ষমতার অধিপতি’কে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।
(বি: দ্র: মাইকেল মহিউদ্দিনের সম্পদ, সিন্ডিকেটের সদস্যদের নাম, আর্থিক লেনদেনের পথ ও প্রমাণসহ আরও বিস্তৃত তথ্য পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশিত হবে।)
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















