মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের সরকারি গাড়ি ব্যবহারে অনিয়ম ও জ্বালানি তেল বরাদ্দে অস্বচ্ছতার অভিযোগ ঘিরে এলাকায় তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি সম্পদ ব্যবহারে এমন তেলেসমাতি শুধু আর্থিক অপচয়ই নয়, বরং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিহীনতা এবং দপ্তরের প্রশাসনিক দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তোলে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে একটি সরকারি গাড়ির প্রকৃত চলাচল ও জ্বালানী ব্যবহারের হিসাবের মধ্যে যে বিপুল অমিল পাওয়া গেছে, তা সরাসরি সরকারি অর্থ লোপাটের ইঙ্গিত দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে সাবিনা ইয়াসমিন দায়িত্ব নেন ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ঢাকা মেট্রো-ঠ-১৩-৭৫৩৪ নম্বর সরকারি গাড়িটি ব্যবহার হয়ে আসছে দপ্তরের বিভিন্ন নথি-পত্রে। তবে ওই গাড়ির লকবই (খড়মনড়ড়শ) পরীক্ষায় উঠে এসেছে নিতান্ত ভিন্ন তথ্য, যা সরকারি জ্বালানি বরাদ্দের কাগজপত্রের সঙ্গে একেবারেই মেলে না। সরকারি গাড়িটি বাস্তবে মোট ১ হাজার ৮২৩ কিলোমিটার চললেও হিসাব দেখানো হয়েছে ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ প্রকৃত চালনার তুলনায় প্রায় চার গুণেরও বেশি কিলোমিটার দেখিয়ে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে সরকারি জ্বালানি। আর এই বাড়তি কিলোমিটারের সংখ্যার ভিত্তিতে বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৪৪০ লিটার ডিজেল, যার আর্থিক মূল্য লাখ টাকারও বেশি।
দপ্তরের ভেতরের ও বাইরের বহু সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের অসঙ্গতি গত কয়েক মাস নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে হিসাবের অমিল এতটাই প্রকট হয়েছে যে তা নিয়ে দপ্তরের অভ্যন্তরে ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার গাড়িচালনার প্রকৃত তথ্য গোপন রেখে মাসিক চলাচল বাড়িয়ে দেখানোর মতো ঘটনা শুধু অনিয়ম নয়, বরং দণ্ডনীয় অপরাধ বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
গাড়ির লকবই অনুযায়ী অক্টোবর মাসে সরকারি গাড়িটি চলেছে মাত্র ৮৭ কিলোমিটার। নভেম্বর মাসে তার চেয়েও কম—মাত্র ৬৭ কিলোমিটার। ডিসেম্বর মাসে কিছুটা বেশি, ৪৯১ কিলোমিটার, তবে তাতেও মাসিক গড় সর্বোচ্চ ৮০০ কিলোমিটার দেখানোর মতো কোন যৌক্তিকতা পাওয়া যায় না। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গাড়িটি চলেছে ১৫২ কিলোমিটার, ফেব্রুয়ারিতে ১২১ কিলোমিটার, মার্চে ২৯০ কিলোমিটার এবং এপ্রিলে ২৪৪ কিলোমিটার। মে মাসের হিসাবও একইরকম কম ছিল বলে জানা যায়, আর জুন মাস পর্যন্ত মোট চালনা দাঁড়ায় ১ হাজার ৮২৩ কিলোমিটার। অথচ কাগজে-কলমে এই একই গাড়ির চালনা দেখানো হয়েছে মোট ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার, যা প্রতি মাসে গড়ে ৮০০ কিলোমিটার ব্যবহার হিসেবে সরকারি জ্বালানি বরাদ্দের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে।
এ নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, জ্বালানি তেল বরাদ্দের আবেদন ও বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি সরকারি গাড়ির লগবইয়ের ওপর ভিত্তি করে কিলোমিটার হিসাব করা বাধ্যতামূলক। লগবইয়ে মাসিক চালনা যতই হোক না কেন, তার চেয়ে বেশি দেখিয়ে বরাদ্দ নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু শ্রীমঙ্গল প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ক্ষেত্রে দেখা গেছে উল্টো চিত্র—প্রকৃত চালনাকে উপেক্ষা করে অধিক কিলোমিটার দেখিয়ে জ্বালানি উত্তোলনের অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
দপ্তরের একাধিক কর্মচারীর মতে, দপ্তরের সরকারি গাড়িটি বহু সময়ই অফিস চত্বরে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকে। মাঠপর্যায়ে ডাক্তারদের ভেটেরিনারি কার্যক্রমের জন্য গাড়ি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বেশিরভাগ সময়ই গাড়িটি খুব সীমিত পরিসরে ব্যবহৃত হয়। একজন কর্মচারী বলেন, “মাসের পর মাস গাড়ি যধৎফষু বেরোয়। কিন্তু কাগজে দেখা যায় গাড়ি নাকি সারা উপজেলার আনাচে-কানাচে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ঘুরছে। এটা কীভাবে সম্ভব?”
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের মাঠপর্যায়ের কাঠামো অনুযায়ী, এই গাড়িটি মূলত ভেটেরিনারি চিকিৎসা, রোগ-ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, পর্যবেক্ষণ ও প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এত কম কিলোমিটার চালনা হলে বোঝাই যায় গাড়িটির মাঠে কার্যক্রম চালানোর মাত্রা অত্যন্ত কম। এতে সরকারি সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি বরাদ্দের নামে সরকারি অর্থ অপচয়ের সম্ভাবনা বেশি হয়।
অভিযোগ রয়েছে যে জ্বালানির বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে ‘মাসিক গড়’ হিসেবে একটি নির্দিষ্ট কিলোমিটার দেখানো হয়, যাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পুরো বরাদ্দ একবারে তুলতে পারেন। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় লকবইয়ের প্রকৃত তথ্যকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়। এতে শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, বরং সরকারি নথিতে মিথ্যা তথ্য সংস্থান এবং জ্বালানি ব্যবহারে প্রতারণার অভিযোগও প্রযোজ্য হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হিসাব জমা দেওয়ার সময় এসব অমিল কি ধরা পড়ে না—সেই প্রশ্নও উঠেছে। দপ্তর সূত্র বলছে, তদারকি দুর্বলতার কারণেই এমন অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে।
সরকারি গাড়ি পরিচালনায় যেসব নিয়ম রয়েছে, সেখানে প্রতিটি যাত্রার শুরু ও শেষের কিলোমিটার লকবইতে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। গাড়ির চালক, ব্যবহারকারী কর্মকর্তা এবং দপ্তরপ্রধান সবাইকে লকবইয়ের তথ্য সত্যায়িত করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে লকবইয়ের হিসাব যখন প্রকৃত চালনার সঙ্গে মেলে না, তখন পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিয়ম না মানলে শুধু বরাদ্দই নয়, সরকারি গাড়ির অপব্যবহারও ধামাচাপা পড়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি গাড়ি ব্যবহারে অনিয়মের এমন অভিযোগ নতুন নয়। দেশের বিভিন্ন দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি গাড়ির জ্বালানি, মেরামত, যন্ত্রাংশ ও চালনা হিসাবকে কেন্দ্র করে ব্যাপক দুর্নীতি চলে আসছে। শ্রীমঙ্গলের ঘটনাও সেই দীর্ঘমেয়াদি অনিয়মের আরেকটি প্রতিচ্ছবি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, যে দপ্তর একদিকে সরকারি সেবা প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিত, সেই দপ্তরই যদি সরকারি সম্পদ লোপাটে ‘হিসাব কারসাজি’র মাধ্যমে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে মাঠপর্যায়ে সেবার মান কোনভাবেই উন্নত হতে পারে না।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নজরদারির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে স্থানীয়রা বলেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যক্রমে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত। সরকারি অর্থ কিভাবে ব্যয় হচ্ছে, কোন কর্মকর্তা কীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন, এবং সরকারি গাড়ি কোন সময়ে, কোন রুটে, কত কিলোমিটার চলেছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রাণিসম্পদ দপ্তরটি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (উখঝ) আওতাভুক্ত হওয়ায় জেলা ও বিভাগীয় দপ্তর থেকেও বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে একটি গাড়ির প্রকৃত চালনা ১ হাজার ৮২৩ কিলোমিটার হলেও ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার দেখানো—এমন অমিল কোনোভাবেই ‘ভুল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের বক্তব্য, এটা পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসাবভিত্তিক অনিয়ম। একটি দপ্তর যদি মাসে ১৭০ কিলোমিটার চালানো গাড়ির জন্য ৮০০ কিলোমিটারের তেল উত্তোলন করে, তাহলে সরাসরি সরকারি তহবিল অপচয় হয়, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
দপ্তরের কিছু কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ চাপ বা ‘অপ্রকাশ্য নির্দেশনা’ থেকে অনেক সময় কর্মকর্তারা ভুল হিসাব দিতে বাধ্য হন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব প্রশাসনের। তদন্ত ছাড়া কোন পক্ষের বক্তব্যই পুরোপুরি প্রমাণসাপেক্ষ নয়। কিন্তু লকবই ও বরাদ্দ অনুমোদনের মধ্যকার এই বিশাল অমিলই প্রধান প্রমাণ হিসেবে নজর কেড়েছে।
স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে যেভাবে সরকারি গাড়ির হিসাব কারসাজি হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হলে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এচঝ-ভিত্তিক গাড়ি মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অতি সহজেই প্রতিটি গাড়ির গতিবিধি, মাসিক চালনা, জ্বালানি ব্যয় এবং রুট নির্ধারণ করা সম্ভব। এতে কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা কমবে এবং অনিয়ম ধরা পড়বে দ্রুত। কিন্তু সরকারি অনেক দপ্তরই এখনো এই ব্যবস্থার বাইরে। যার ফলে পুরোনো কাগজ-কলমের হিসাব কারসাজি করার সুযোগ থেকেই যায়।
জ্বালানি তেল বরাদ্দের এই অনিয়ম নিয়ে দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও কেউই মুখ খুলতে চাননি। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, বাহিরে প্রকাশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত এমন হিসাব কারসাজি অধিকাংশ সময়েই দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়। শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ক্ষেত্রে তা আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলছিল।
সরকারি গাড়ির অপব্যবহার, লকবইয়ের তথ্য বিকৃতকরণ, জ্বালানি বরাদ্দের অনিয়ম ও দুর্নীতি—এসব অনিয়মের কঠোর তদন্ত না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি সেবার মানও ক্রমশ নিম্নগামী হবে। শ্রীমঙ্গলের এই ঘটনাটি তাই কেবল একটি দপ্তরের হিসাব-নিকাশের বিতর্ক নয়; বরং দেশের সামগ্রিক সরকারি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও নজরদারিহীনতার আরেকটি উদাহরণ।
সচেতন মহলের প্রশ্ন—একটি সরকারি গাড়ির প্রকৃত চালনা ১ হাজার ৮২৩ কিলোমিটার হলেও কাগজে কীভাবে ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার ‘উদ্ভাবিত’ হলো? কে বা কারা এই বাড়তি কিলোমিটারের হিসাব দেখিয়ে ১ হাজার ৪৪০ লিটার তেলের বরাদ্দ তুলে নিলেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত শ্রীমঙ্গল প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে ঘিরে থাকা এই বড় ধরনের অনিয়মের জট খুলবে না। সরকারি তহবিলের টাকা যে জনগণের করের টাকা—সেই বোধ প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
সরকারি গাড়ির জ্বালানী তেলে এমন তেলেসমাতি বন্ধ করতে হলে শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কঠোর তদারকি, প্রযুক্তি নির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা এবং জবাবদিহির আওতায় আনা। অন্যথায় এই ধরনের অনিয়ম এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ছড়িয়ে পড়বে এবং সরকারি সম্পদের অপচয় থামানো যাবে না।
সংবাদ শিরোনাম ::
১,৮২৩ কিলোমিটারের জায়গায় দেখানো ৭,২০০
সাবিনা ইয়াসমিনের ব্যবহৃত সরকারি গাড়িতে তেলেসমাতি
-
স্টাফ রিপোর্টার - আপডেট সময় ১০:৪০:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০২৫
- ৬৪৪ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ























