ঢাকার গুলশান থানার ১৮ নং ওয়ার্ড শ্রমিকদলে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও পদোন্নয়নের ইস্যু নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাবেক শ্রমিকলীগ নেতা মিলন, যিনি আগে গুলশান থানা শ্রমিকলীগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের ১৮ নং ওয়ার্ড সভাপতি হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। এই পদোন্নতি এবং তার কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। স্থানীয় কর্মীরা মনে করছেন, আরিফের অসদুপায় অবলম্বনের কারণে পুরো ওয়ার্ডের রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।
মিলনের রাজনৈতিক যাত্রা : মিলনের বিরুদ্ধে ই-অরেঞ্জ কেলেঙ্কারিতে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও তার বিতর্কিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশেষ করে তিনি ই-অরেঞ্জের মালিক সোহেলের সঙ্গে জড়িত থাকায় বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ।
অপর একটি বিষয় হলো, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাসভবনের গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইন কেটে দেওয়ার ঘটনায় মিলনের সখ্যতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ড স্থানীয় রাজনৈতিক পরিবেশে উত্তেজনা সৃষ্টি করছে এবং মিলনের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
গুলশান থানা শ্রমিকদলের একজন অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছেন, “মিলনের কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক সংযোগ নিয়ে দলের সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। কিছু সদস্য মনে করছেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ড দলের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে।
মিলন দীর্ঘদিন ধরে গুলশান শ্রমিক লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে কোটি কোটি টাকা পাচারকারী ই-অরেঞ্জের মালিক সোহেলের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
তার রাজনৈতিক কেরিয়ার শুরু হয়েছিল গুলশান শ্রমিক লীগের সহ-সাংগঠনিক হিসেবে। তবে সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের ১৮ নং ওয়ার্ড সভাপতি হিসেবে দায়ত্বি পেয়েছেন। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ অনুযায়ী, এই দায়িত্ব দলীয় নিয়ম ও প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে করা হয়েছে। বিশেষ করে ১৮ নং ওয়ার্ডের সভাপতি আরিফের অসদুপায় অবলম্বনের কারণে মিলনকে সভাপতি পদে বসানো হয়েছে। শ্রমিকরা মনে করছেন, এই পদোন্নতি ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে প্রণীত একটি সিদ্ধান্ত, যা দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আরিফের বিতর্কিত নেতৃত্ব : সাবেক শ্রমিকলীগ নেতা মিলন, যিনি আগে গুলশান থানা শ্রমিকলীগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি।
স্থানীয় শ্রমিকদলের নেতাদের অভিযোগ-আরিফ টাকা খেয়ে মিলনকে সভাপতি পদে বসিয়েছে, যা দলের অভ্যন্তরে বিভাজন এবং অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। এবং গুলশান থানা শ্রমিকদলের সভাপতি আরিফের রয়েছে বিতর্কিত অনেক কর্মকান্ড। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ, কর্মী ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের উপেক্ষা করেন, এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের আশ্রয় দেন। বিশেষ করে মিলনকে সভাপতি বানাতে তার অসদুপায় অবলম্বন সবার নজরে এসেছে। এই কারণে ওয়ার্ডের অভ্যন্তরে বিভাজন এবং অসন্তোষ বাড়ছে। একাধিক স্থানীয় কর্মী জানিয়েছেন, “আরিফের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পুরো ওয়ার্ডকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। আমরা মনে করি, এমন কর্মকাণ্ড যদি চলতে থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ওয়ার্ডের শ্রমিকদল কার্যক্রম ব্যাহত হবে।”
এবং ৫ আগস্টের আগে শ্রমিকদলের কমিটি বিলুপ্ত না করেই বর্তমানে মিলনকে সভাপতি করে।
কমিটি বিলুপ্ত না করে নতুন কমিটি দেয়ায় ১৮ নং ওয়ার্ড শ্রমিকদলের তৎকালীন সভাপতি সবুজ মোল্লা ও সচিব আনোয়ার হোসেন রুবেল তার কাছে জানতে চাইলে আরিফ ২৪ অক্টোবর ২০২৫-এ শাহজাদপুরের মরিয়ম টাওয়ার-২-এ ডেকে নিয়ে তাদের উপর হামলা চালায়। এতে রক্তাক্ত হয় আনোয়ার হোসেন রুবেল সবুজ মোল্লা। গত ফ্যাসিস্ট আমলে জাতীয়তাবাদী আদর্শ অনুসরণের কারণে আনোয়ার হোসেন রুবেল বারবার নির্যাতিত হন ও জেলে যান। হামলার পর আনোয়ার হোসেন রুবেল বাদী হয়ে একটি হত্যা চেষ্ট মামলা দায়ের করেন।
একজন সিনিয়র শ্রমিকদল নেতা বলেন, “যারা দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের ওপর হামলা এবং বিতর্কিত নেতাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সংগঠনকে দুর্বল করছে। আরিফের অসদুপায় ব্যবহারের কারণে মিলনের পদোন্নতি ও সংঘর্ষ আরও জটিলতা সৃষ্টি করেছে।” নেতারা মনে করছেন, ওয়ার্ডের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য সঠিক তদন্ত, নেতৃত্বের পুনর্গঠন এবং বিতর্কিত নেতাদের নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।
গুলশান শ্রমিকদলের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে বলেছেন, “মিলনের পদোন্নতি এবং আরিফের বিতর্কিত সকল কর্মকাণ্ড আমাদের কর্মক্ষমতা এবং মনোবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমরা চাই, নেতৃত্ব এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় থাকুক।” এক অভিজ্ঞ শ্রমিক মন্তব্য করেছেন, “দলীয় শৃঙ্খলা ও নীতি অনুযায়ী পদোন্নতি হওয়া উচিত। কিন্তু এখানে আরিফের ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ড পুরো ওয়ার্ডকে অস্থিতিশীল করেছে। নতুন নেতৃত্বের স্বচ্ছতা না হলে সমস্যা বাড়বে।”
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ১৮ নং ওয়ার্ড শ্রমিকদলের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নেতৃত্ব পুনর্গঠন এবং বিতর্কিত নেতাদের নিয়ন্ত্রণ। মিলনকে কেন্দ্র করে ওয়ার্ডের নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আরিফের অসদুপায় অবলম্বন, পুরনো নেতাদের উপেক্ষা এবং দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা-এই সব মিলিয়ে পুরো ওয়ার্ডকে অস্থিতিশীল করেছে। শ্রমিকদলের সিনিয়ররা মন্তব্য করেছেন, “সঠিক তদন্ত এবং নেতৃত্বের স্বচ্ছ পুনর্গঠন ছাড়া এই ওয়ার্ডে স্থায়ী শান্তি আসবে না। কেন্দ্রীয় নেতাদের এখনই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। না হলে এই অস্থিরতা শুধু ১৮ নং ওয়ার্ড নয়, পুরো গুলশান থানার শ্রমিকদলকে প্রভাবিত করতে পারে।”
শেখ হাসিনার সরকারে আমলে অনেক নির্যাতিত হন আনোয়ার হোসেন রুবেল। তিনি বহুবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কিন্তু কোনো প্রলোভন বা হুমকির সামনে তিনি কখনও ন্যায়ের পথে দাঁড়ানো থেকে সরে আসেননি।
২৪ অক্টোবর ২০১৫ সালে শাহজাদপুর মরিয়ম টাওয়ার-২-এ তিনি ও অন্যান্য নেতাকর্মীরা সহিংসতার শিকার হলেও রুবেল সাহসীভাবে দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এই ঘটনায় তার দৃঢ়তা এবং ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকার স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, রুবেলের এই সাহসিকতা শ্রমিকদলে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উদাহরণ হিসেবে কাজ করছে।
মিলনের শ্রমিকদলে পদোন্নতি এবং আরিফের অসদুপায় অবলম্বন ১৮ নং ওয়ার্ডে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা বৃদ্ধি করেছে। হামলা, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং পুরনো নেতাদের উপেক্ষা পুরো ওয়ার্ডকে অস্থিতিশীল করেছে। শ্রমিকদলের সিনিয়ররা মনে করছেন, সঠিক তদন্ত, নেতৃত্ব পুনর্গঠন এবং বিতর্কিত নেতাদের নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ওয়ার্ডের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
১৮ নং ওয়ার্ড শ্রমিকদলের ভবিষ্যৎ এখন অস্থিরতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপ, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়বিচারের আশ্বাসই একমাত্র উপায় এই রাজনৈতিক সংকট নিরসনের।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























