টাঙ্গাইল জেলা এলজিইডি অফিসে বছরের পর বছর ধরে চলছে দুর্নীতির রমরমা ব্যবসা। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বর্তমান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পশ্চিম আগারগাঁও কার্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ইঞ্জিনিয়ার মো. রফিকুল ইসলাম। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আসামি হয়েও তিনি আজ বহাল তবিয়তে চাকরিতে, আর ঘুষের টাকায় গড়ে তুলেছেন কোটি টাকার সাম্রাজ্য। তথ্য অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভয়ংকর চিত্র ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ও নাগরপুর উপজেলার ১০-১২টি সড়ক প্রকল্প কাগজে সম্পন্ন দেখিয়ে সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ঠিকাদারদের ঘুষ না দিলে কাজের বিল আটকে দেওয়া, আর ঘুষ দিলে কাজ না করেও বিল ছাড়-এমন নিয়মই চালু ছিল রফিকুল ইসলামের আমলে।
টাঙ্গাইল এলজিইডির সড়ক প্রকল্পে হাওয়া টাকা : টাঙ্গাইলের এলজিইডি দপ্তরের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, মির্জাপুর ও নাগরপুর উপজেলার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রকল্পের কাজ মাঠে এক ইঞ্চিও হয়নি। অথচ কাগজে সব কাজ শতভাগ সম্পন্ন দেখিয়ে টাকা তোলা হয়েছে সম্পূর্ণভাবে। অভিযোগ অনুসারে, সেই টাকা ভাগ হয়েছে রফিকুল ইসলাম ও তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন প্রকৌশলীর মধ্যে। টাঙ্গাইলের একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান- “রফিকুল ইসলাম টাকা ছাড়া কোনো কাজ হতে দিতেন না। ১০ লাখ টাকার বিল পেতে হলে কমপক্ষে ২ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হতো। কেউ না দিলে কাজ বন্ধ থাকত, বিল আটকে যেত।” তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, এইভাবে প্রায় ২০০ কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দের বড় অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এমনকি কিছু প্রকল্পে সাইট ইনস্পেকশন না করেই কাগজে কাজ শেষ দেখিয়ে বিল ছাড় করা হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের টাঙ্গাইল কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ফখরুদ্দিন বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “রফিকুল ইসলামের দুর্নীতির কিছু প্রমাণ আমরা ইতিমধ্যে পেয়েছি। নাগরপুরের তিনটি প্রকল্পে কাজ না করেই টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। তদন্ত চলছে, শিগগিরই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ-দুদকের তদন্ত শুরু হতেই রফিকুল ইসলাম ঘুষের টাকায় কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ফেলেন। এরপর হঠাৎ করেই তিনি পদোন্নতি পেয়ে ঢাকা এলজিইডির পশ্চিম আগারগাঁও অফিসে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। জনমনে প্রশ্ন-একজন দুর্নীতির অভিযুক্ত কর্মকর্তা দুদক মামলা চলাকালীন কীভাবে পদোন্নতি পেলেন?
রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে যখন তদন্ত চলছিল, তখনই তার বিরুদ্ধে ওঠে ঘুষ দিয়ে পদোন্নতির অভিযোগ। সূত্র জানায়, তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন উপদেষ্টাকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে নিজের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ “নিষ্পত্তি” করিয়ে নেন। নিজেই এই প্রতিবেদকের প্রশ্নের উত্তরে ফোনে বলেন, “দুদক আমার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করেছে, কিন্তু আমার কিছু হবে না। স্থানীয় সরকার উপদেষ্টাকে আমি ম্যানেজ করেছি। আপনি লিখলে কিছুই হবে না।”
এই সংলাপই তার বেপরোয়া মনোভাবের প্রমাণ বহন করে। দুদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে তিনি এখন আবারও ঘুষ ও অনিয়মের রাজত্ব কায়েম করেছেন আগারগাঁও এলজিইডি অফিসে।
ঘুষের লেনদেনের প্রধান সেনাপতি আব্দুল আজিজ : টাঙ্গাইল এলজিইডিতে রফিকুল ইসলামের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন আব্দুল আজিজ, যিনি চাকরির পদে মালি হলেও বাস্তবে কম্পিউটার অপারেটর ও হিসাব রক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। রফিকুল ইসলামের ঘুষ লেনদেন, ঠিকাদারদের হয়রানি, বিল অনুমোদন-সবকিছুই আজিজের হাত দিয়েই সম্পন্ন হতো। টাঙ্গাইলের ঠিকাদারদের ভাষায়, “আজিজ গ্যাং” এলজিইডিকে করেছে ঘুষের স্বর্ণরাজ্য। এক ঠিকাদার বলেন, “আজিজ টাকা না পেলে কোনো ফাইল এগোয় না। তার কথার বাইরে কেউ কথা বললে রফিকুল ইসলাম বিল আটকে দিতেন।” বর্তমানে রফিকুল ইসলাম ঢাকায় বদলি হলেও আজিজ এখনো টাঙ্গাইলে থেকে ঘুষ লেনদেনের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন। স্থানীয়রা বলছেন, এলজিইডি যদি দুর্নীতিমুক্ত করতে হয়, তবে আজিজকে প্রত্যাহার করতে হবে প্রথমে।
২০০ কোটি টাকার ‘ঘুষ সাম্রাজ্য’ : তদন্তে দেখা গেছে, রফিকুল ইসলাম টাঙ্গাইলে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দের বিপরীতে ২০০ কোটিরও বেশি টাকা ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন। প্রতিটি প্রকল্পের মূল্যায়ন, সাইট পরিদর্শন, বিল অনুমোদন-সব জায়গাতেই ছিল ঘুষের প্রভাব। তিনি শুধুমাত্র ঘুষের টাকায়ই এখন হাজার কোটি টাকার মালিক, এমন দাবি করেছে স্থানীয় সূত্র। তার নামে ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়িতে প্রাসাদোপম ভবন, বিলাসবহুল গাড়ি এবং ব্যাংকে অগণিত টাকা-সবকিছুই গড়ে উঠেছে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ হিসেবে। একটি স্থানীয় সূত্র জানায়, “তিনি শুধু নিজের নয়, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও ভাগ দেন। তাই কেউ কিছু বলতে পারে না।”
রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনীত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন তাকে এখনো বহাল রাখা হলো-এ প্রশ্ন ঘুরছে প্রশাসনিক মহলে।
দুদকের অভিযোগের পর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো পদোন্নতি দেওয়াকে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক প্রাক্তন সিনিয়র প্রকৌশলী মন্তব্য করেন: “এলজিইডিতে এখন যোগ্যতার চেয়ে ঘুষই মূল যোগ্যতা। রফিকুল ইসলাম তার জীবন্ত উদাহরণ।”
দুদকের সহকারী পরিচালক ফখরুদ্দিনের বক্তব্যে দেখা যায়-প্রাথমিক তদন্তে রফিকুল ইসলামের দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। কিন্তু কয়েক মাস পার হয়ে গেলেও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। এ প্রসঙ্গে দুদকের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “রফিকুল ইসলাম ঘুষে এমন এক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে যেখানে দুদকের স্থানীয় কর্মকর্তারাও তার প্রভাবে কাজ করেন না।” ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা জন্মেছে, ‘দুদক মানেই ম্যানেজযোগ্য সংস্থা’।
যখন তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি গর্বভরে বলেন- “আমাকে কিছু করতে পারবে না কেউ। আমি প্রধান প্রকৌশলীর লোক।” প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিম এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে প্রশাসনিক ফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে, এখনো পর্যন্ত রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় তদন্তের নথি খোলা হয়নি।
টাঙ্গাইলের স্থানীয় ঠিকাদার, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন“টাঙ্গাইল এলজিইডিকে আজিজ-রফিকুল গ্যাংয়ের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে। ই দুইজন থাকলে উন্নয়ন নয়, চলবে শুধু ঘুষের ব্যবসা।” তাদের অভিযোগ, আজিজ দীর্ঘদিন চাকরি করার সুবাদে এখন “অঘোষিত নিয়ন্ত্রক” হয়ে উঠেছেন। প্রতিটি প্রকল্পে তিনি ঘুষের হার নির্ধারণ করেন-যেন সরকারি অফিস নয়, কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। টাঙ্গাইলের কয়েকটি অসম্পূর্ণ সড়ক প্রকল্প পরিদর্শনে দেখা যায়, কোথাও সড়ক খনন হয়েছে, কিন্তু পিচ ঢালাই হয়নি। কোথাও মাটি ফেলে রেখেই কাজ বন্ধ। তবুও ফাইলে উল্লেখ আছে-“কাজ শতভাগ সম্পন্ন।” এমন অনিয়মের কারণে সরকারি অর্থে নির্মিত সড়কগুলো ব্যবহারের আগেই নষ্ট হচ্ছে। ঠিকাদারদের অভিযোগ- “রফিকুল ইসলাম ঘুষ নিতেন কাজের গুণগত মানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে। ফলে টাকার অপচয় হয়েছে, উন্নয়ন হয়নি।”
রফিকুল ইসলাম শুধু টাঙ্গাইলেই নয়, তার আশ্রয়ে গড়ে উঠেছে একটি দুর্নীতিবাজ নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষক, অফিস সহকারী-সবাই তার প্রভাবের আওতায়। তারা নিয়মিত ঘুষের টাকা “উর্ধ্বতনদের” নামে পাঠান বলে অভিযোগ রয়েছে। এই নেটওয়ার্কের মূল উদ্দেশ্য-প্রকল্পে কাজ না করে সরকারি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং ঘুষের মাধ্যমে পদোন্নতি নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে ‘ম্যানেজ রাজনীতি’ একটি ওপেন সিক্রেট। রফিকুল ইসলামের ঘটনা সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। দুদক, এলজিইডি বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়-সব জায়গায় ঘুষের প্রবেশে আইন প্রয়োগ যেন কেবল কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ।
প্রশাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. মিজানুর রহমান বলেন, “যখন দুর্নীতির অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তির বদলে পদোন্নতি দেওয়া হয়, তখন সেটি রাষ্ট্রীয়ভাবে দুর্নীতিকে বৈধতা দেওয়া হয়। রফিকুল ইসলামের কেসটি ক্লাসিক উদাহরণ।” স্থানীয় ঠিকাদার ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দাবি জানিয়েছেন- রফিকুল ইসলামকে অবিলম্বে ওএসডি (বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করে দুর্নীতির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালাতে হবে। একই সঙ্গে টাঙ্গাইল এলজিইডি অফিস থেকে আব্দুল আজিজকে প্রত্যাহার করতে হবে। তাদের ভাষায়- “আজিজকে সরালেই টাঙ্গাইল এলজিইডি বাঁচবে।” দুর্নীতি রুখতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন রফিকুল ইসলাম ও আব্দুল আজিজের মতো কর্মকর্তারা শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, প্রতিষ্ঠানিকভাবেও এলজিইডিকে কলুষিত করছেন। কজন দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী ঘুষের টাকায় যখন প্রকল্প পরিচালক হন, তখন উন্নয়ন নয়, ধ্বংসই নিশ্চিত হয়।
দুদক যদি সত্যিকার অর্থে স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারে, তবে রফিকুল ইসলামের সম্পদ ও ঘুষের লেনদেনের চেইন বের করা কঠিন হবে না। কিন্তু তার জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক সাহস। টাঙ্গাইলবাসী এখন চায়-দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। নয়তো “ঘুষের টাকায় উন্নয়ন” কথাটা আরও একবার প্রমাণ করবে, বাংলাদেশে ঘুষই আজ সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রা।
পর্ব-২ এ আসছে: “রফিকুল ইসলামের গোপন সম্পদ সাম্রাজ্য: ব্যাংক লেনদেন, জমি, ফ্ল্যাট ও আত্মীয়দের নামে সম্পদের গল্প।”
সংবাদ শিরোনাম ::
১২টি সড়ক নির্মাণ ছাড়াই কোটি টাকা আত্মসাৎ রফিকুল ইসলামের
-
স্টাফ রিপোর্টার - আপডেট সময় ০১:১৯:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ নভেম্বর ২০২৫
- ৫৬৬ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ























