স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বরাদ্দকৃত কোটি টাকার মেরামত ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন না করেই বিল পরিশোধ করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ-এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। গণপূর্ত অধিদফতরের ভেতরে ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মহলে গুঞ্জন চলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হাসপাতালগুলোর কাজের নামে কয়েক কোটি টাকার সরকারি অর্থ বেপরোয়াভাবে লুটপাট করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগ, ঢাকা-স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ৫ কোটি ২ লাখ ৯২ হাজার টাকা বরাদ্দ পায়। কিন্তু অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না করেই প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম ঠিকাদারদের পুরো বিল পরিশোধ করে দেন। সূত্র জানায়, পরে সেই বিলের বিপরীতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করেন তিনি।
অর্থবছরের শেষ সপ্তাহে কাগুজে কাজের মহোৎসব : সরকারি হিসাববিজ্ঞানে নির্ধারিত নিয়ম হলো-যে কোনো প্রকল্পের কাজের প্রাক্কলন, অনুমোদন, দরপত্র, ও বাস্তবায়ন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হতে হয়। কিন্তু অর্থবছরের শেষ দিকে (জুন মাসের মধ্যে) নতুন বরাদ্দ পেলে বাস্তব কাজ শেষ করা প্রায় অসম্ভব। কারণ কাজের নকশা, অনুমোদন, এবং উপকরণ সরবরাহ-সবকিছু সময়সাপেক্ষ। কিন্তু তদন্তে জানা গেছে, মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগে অর্থবছরের শেষ সপ্তাহে একের পর এক বিল নিষ্পত্তি করা হয়। ৩০ জুনের মধ্যেই বহু প্রকল্পের বিল সম্পূর্ণ পরিশোধ করা হয়, যদিও সেই সময় প্রকল্পগুলোর কাজ শুরুই হয়নি বা অর্ধেক পর্যায়ে ছিল। গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন- “অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে যেভাবে বিল দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। এই কাজগুলো জুনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব নয়। তারপরও কাগজে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল ছাড় করা হয়েছে।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজে কাগুজে সংস্কার : প্রকৌশলী মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের অনিয়মের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেরামত ও সংস্কার কাজে। অভিযোগ অনুসারে, হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে কয়েক কোটি টাকার কাজ বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর বড় অংশই বাস্তবে সম্পন্ন হয়নি।
সূত্রমতে, বরাদ্দের তালিকায় ছিল- জরুরি বিভাগের নিচতলায় ট্রায়াঙ্গেল রুম, ক্যাজুয়ালিটি ডাক্তার রুম ও টয়লেট পুনঃবিন্যাসে ৪০ লাখ টাকা, মূল ভবনের ৩য় তলায় কেবিন টয়লেট, স্যানিটারি ফিটিংস ও রং করণে ৪০ লাখ টাকা, রেডিওলজি বিভাগে টয়লেট জোন ও রোগীদের অপেক্ষাগার স্থাপনে ২০ লাখ টাকা, পুরনো গ্যাস লাইন পরিবর্তনে ২০ লাখ টাকা, স্টাফ কোয়ার্টার মেরামতে ৩০ থেকে ৩২ লাখ টাকা, ইন্টার্নি হোস্টেলের বাথরুম সংস্কারে ৪০ লাখ টাকা, ওটি ভবনের জানালা-দরজা নবায়ন ও টয়লেট সংস্কারে ২০ লাখ টাকা ইত্যাদি।
কিন্তু হাসপাতালে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন-“এই কাজগুলোর অনেকই কাগজে শেষ দেখানো হয়েছে। বাস্তবে পুরো কাজ হয়নি। কেউ গিয়ে যাচাই করলে সহজেই বোঝা যাবে।” একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, “কাজের পরিমাণের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাবের কোনো মিল নেই। কিছু জায়গায় শুধু রং করা হয়েছে, কিন্তু পুরো টাকা বিল দেওয়া হয়েছে।”
মিটফোর্ড হাসপাতালেও একই কৌশল : শুধু ঢাকা মেডিকেল নয়, একই চিত্র দেখা গেছে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড হাসপাতাল)-এর ক্ষেত্রেও। হাসপাতালের ১১ তলা ভবনের নিচতলায় জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড ও ল্যাব সংস্কারের নামে প্রায় ৩০ লাখ টাকার কাজের বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যদিও বাস্তবে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তাছাড়া গাইনী ও সার্জারি বিভাগের টয়লেট ব্লকে বেসিন স্থাপন, নিউরোলজি বিভাগের কক্ষ সংস্কার এবং সিসিইউ ওয়ার্ড সম্প্রসারণের নামে আরও কয়েকটি কাজের বিল পরিশোধ করা হয়-মোট ৯০ লাখ টাকারও বেশি। হাসপাতালের এক প্রকৌশল সহকারী বলেন, “এই কাজগুলোর বেশিরভাগই জুন মাসের মধ্যে শুরুই হয়নি। কিন্তু বিল কেটে নেওয়া হয়েছে।”
অগ্রিম বিলের নামে অনিয়ম বৈধ করার ফাঁদ : তদন্তে জানা গেছে, প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম অসম্পূর্ণ কাজের বিল জুনের শেষ সপ্তাহেই পরিশোধ করে ফেলেন। এরপর কয়েক মাস পর ঠিকাদারদের কাছ থেকে ‘কাজ সম্পন্নের প্রত্যয়নপত্র’ সংগ্রহ করেন। গণপূর্তের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, এই পদ্ধতিতে কাগজে কাজ বৈধ দেখানো হয়-যদিও বিলের অর্থ অনেক আগেই ঠিকাদারকে দেওয়া হয়ে গেছে। একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “এটা পুরনো কৌশল। জুন মাসে বিল দিয়ে ফেলা হয়, পরে জুলাই-আগস্টে প্রত্যয়নপত্র যোগ করা হয়। কাগজে সব ঠিকঠাক দেখায়, কিন্তু বাস্তবে সরকারের ক্ষতি হয় কোটি কোটি টাকার।”
প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আরও বিতর্ক : গণপূর্ত অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বরাবরই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য আলোচিত। একসময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় তিনি রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে পদায়নে সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অধিদফতরের ভেতরে তাকে অনেকেই “প্রভাবশালী প্রকৌশলী” হিসেবে চেনেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঠিকাদার নিয়োগে কমিশন আদায় করেন এবং পছন্দের লোকদের কাজ পাইয়ে দেন। ঠিকাদার মহলে তার নাম মানেই “বিনা তদারকিতে বিল ছাড়”-এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। একজন ঠিকাদার বলেন, “তার অফিসে কাজ পেতে হলে কমিশন দিতে হয়। কাজ না করলেও বিল মেলে, শুধু ভাগ বুঝে দিতে হয়।”
অজানা উৎসে বিপুল সম্পদ : তদন্তে উঠে এসেছে, সরকারি চাকরির সীমিত বেতনে চললেও মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের রয়েছে বিপুল সম্পদ। রাজধানীর গুলশান, মোহাম্মদপুর, বসুন্ধরা ও মিরপুর এলাকায় তার নামে বা পরিবারের নামে একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে।
বিশদভাবে জানা গেছে- গুলশান এলাকায় দুটি ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুরে দুটি ছয়তলা বাড়ি, বসুন্ধরার ডি ব্লকে তিন কাঠার প্লট ও একটি ফ্ল্যাট, রামপুরায় ছয়তলা ভবন, মিরপুরের পল্লবীতে বাড়ি (রোড নং ঈ/০৫, বাড়ি ৮৯), উত্তরায় স্ত্রী’র নামে দুটি ফ্ল্যাট (মূল্য আনুমানিক ৮৫ লাখ টাকা), স্ত্রীর নামে কোটি টাকার দুটি এফডিআর।
অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, তার শাশুড়ির ব্যাংক অ্যাকাউন্টেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেন, এ টাকা তারিকুল ইসলামের মাধ্যমেই সেখানে গেছে।
বিদেশে অর্থ পাচারের গুঞ্জন : গণপূর্ত অধিদফতরের ভেতরে আলোচনা চলছে যে, প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম নিকটাত্মীয় ও বন্ধুর নামে বিদেশে টাকা পাচার করেছেন। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকলেও কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, তিনি নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং ব্যাংক ট্রান্সফারের বাইরে অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ করেন বলে সন্দেহ রয়েছে।
অধিদফতরের এক সূত্র বলেন, “তার হাতে বিপুল নগদ অর্থ ঘোরাফেরা করে। অফিসে অনেক সময় দেখা যায়, ঠিকাদাররা কাজের কথা বলার আগে ‘সিরিয়াসলি’ কিছু বুঝে নিতে আসে।”
দুদক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে দাবি : যদিও এখনো দুদকে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা হয়নি, তবুও গণপূর্ত অধিদফতরের ভেতরে অনেকেই চান বিষয়টি শিগগিরই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তের আওতায় আসুক। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যদি এই ঘটনাগুলোর প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সরকারি অর্থ আত্মসাতের একটি বড় সিন্ডিকেটের কার্যক্রম প্রকাশ পাবে। গণপূর্ত অধিদফতরের একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী বলেন, “এই ধরনের অনিয়ম শুধু একজনের নয়। কিন্তু তারিকুল ইসলাম যেভাবে বরাদ্দের টাকা বিল পরিশোধ করেছে, তা পুরো সিস্টেমের দুর্বলতা প্রকাশ করে। দুদক যদি এখনই অনুসন্ধান শুরু করে, তবে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে।”
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণপূর্ত অধিদফতরে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরেই স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা ও তদারকি দুর্বল হওয়ায় নির্বাহী প্রকৌশলীরা প্রায়ই ইচ্ছামতো কাজের ব্যয় দেখান। অর্থ বছরের শেষে ‘থোক বরাদ্দ’ নামের একটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে বহু প্রকল্পে অনিয়ম করা হয়।
একজন অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেন, “গণপূর্তের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো-অর্থ ছাড়ের আগে মাঠ পর্যায়ে কাজ যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে কাজ শেষ না হলেও বিল পরিশোধ করা যায়।”
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অর্থ যদি হাসপাতালের উন্নয়ন না ঘটিয়ে ব্যক্তির পকেটে যায়, তবে তা শুধু দুর্নীতি নয়, জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা-এমন মন্তব্য করেছেন সচেতন নাগরিকরা।
ঢাকার এক নাগরিক বলেন, “হাসপাতালের টয়লেট, পানি পড়া ছাদ আর জরুরি বিভাগের ভাঙা দেয়াল আজও ঠিক হয়নি। অথচ কোটি টাকার কাজের বিল মিটে গেছে-এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ।” গণপূর্ত অধিদফতরের ভেতরে কেউ কেউ বলছেন, এই অনিয়ম নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হলে একাধিক কর্মকর্তা জড়িত থাকার প্রমাণও মিলবে। মেডিকেল কলেজ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তাহলে এটি হবে সরকারি অর্থ আত্মসাতের একটি বড় উদাহরণ। স্বাস্থ্যসেবা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এ ধরনের অনিয়ম শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি নয়, বরং সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। সরকারি দায়িত্বে থেকে যিনি রাষ্ট্রের অর্থ ব্যবস্থাপনার রক্ষক, তিনিই যদি সেই অর্থ আত্মসাতে জড়িত হন-তাহলে সেটি কেবল অনৈতিক নয়, রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল বলে মনে করেন অনেকে।
সংবাদ শিরোনাম ::
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কোটি টাকার বরাদ্দ আত্মসাৎ
গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী তারিকুল ইসলামের সম্পদের পাহাড়
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১১:২৯:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর ২০২৫
- ৬৩৬ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ
























