সংবাদ শিরোনাম ::
ফরিদপুরে নিখোঁজের তিনদিন পর কাশবন থেকে ৯ বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার, আটক ৫ ভোলাহাটে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মাঝে “সখিনা-কলিম” মেধা প্রণোদনা বৃত্তি প্রকল্প বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠিত ভোলাহাটে বিনামূল্যে কৃষকদের মাঝে বীজ ও সার বিতরণ উদ্বোধন! পরকীয়া ও পারিবারিক কলহের জেরে ফতুল্লায় স্বামীকে গলাকেটে হত্যার অভিযোগ স্ত্রীর বিরুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার কোচের পদ থেকে পদত্যাগ করলেন হং নাশকতার মামলায় যুব মহিলা লীগ নেত্রী কারাগারে বিরোধী দলের আসনে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থে‌কে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ আমরাও চাই শেখ হাসিনা দেশে আসুক, মামলা লড়ুক : চিফ প্রসিকিউটর গরম কমার সুখবর দিল আবহাওয়া অফিস কসবায় ইটবোঝাই ট্রাক খাদে উল্টে নিহত ২, আহত ৫

বিমানবন্দরে ই-গেট আছে, কার্যকর ব্যবহার নেই

শরীয়তপুরের আমিনুল ইসলাম মালয়েশিয়ায় পাম বাগানে শ্রমিকের কাজ করেন। ছুটিতে দেশে আসেন ফেব্রুয়ারিতে। ছুটি শেষে ফেরত যাচ্ছিলেন। সম্প্রতি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন গেটে আমিনুলের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘জানতাম, বিমানবন্দরের ই-গেট দিয়ে পাসপোর্ট স্ক্যান করলেই ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ। এখন ই-গেট পার হওয়ার পরও পুলিশের বিশেষ শাখার কাউন্টারে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। ই-গেট থেকেও নানা ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে।’

একই অভিজ্ঞতা কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের বাদশা আলীরও। ২১ বছর সৌদি আরব আছেন। মার্চে বোনের বিয়ে উপলক্ষে দেশে আসেন। ফিরতি পথে ই-গেট পার হয়েও ইমিগ্রেশন ডেস্কের সামনের কাউন্টারে দীর্ঘ লাইনে পড়েন তিনি।

শুধু আমিনুল কিংবা বাদশা আলী নন; ই-পাসপোর্ট থেকেও অনেক যাত্রী এমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। আধুনিক যাত্রীসেবার অংশ হিসেবে দ্রুত ইমিগ্রেশন করতে ই-গেট বসানো হলেও সরকারি দুই সংস্থার সমন্বয়হীনতায় তা কাজে আসছে না। ই-গেটে পাসপোর্ট স্ক্যান করার পরও যাত্রীদের ইমিগ্রেশন ডেস্কে গিয়ে আবার যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এতে অপচয় হচ্ছে সময়।
২০১৮ সালে জার্মান কোম্পানি ভেরিডোজের সঙ্গে ই-পাসপোর্ট প্রকল্পের চুক্তি করে সরকার। ২০২২ সালে উদ্বোধনের পর থেকে দেশে এক কোটি ৬৫ লাখ এবং বিদেশে ১০ লাখ বাংলাদেশি ই-পাসপোর্ট পেয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ই-গেট চালু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে চার লাখ ৫৮ হাজার ৫০৮, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৫৫ হাজার ৮৯৯ এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ৪১ হাজার ৬৫১ যাত্রী যাতায়াত করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ই-গেটে পাসপোর্ট স্ক্যান করার সঙ্গে সঙ্গে গেট খুলে যায়।
এরপর যাত্রী ই-গেটের মনিটরে তাকালে পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য যাচাই হয়। এ প্রক্রিয়া শেষে যাত্রীকে যেতে হয় ইমিগ্রেশন পুলিশের ডেস্কে। সেখানে আবার তাঁর তথ্য যাচাই করা হয়। ছবি তোলা ও প্রয়োজনীয় ভ্রমণ-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখার পর পাসপোর্টে বহির্গমন সিল দেওয়া হয়।

ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, ই-গেট ও ইমিগ্রেশন পুলিশের সার্ভারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা নেই। এ জন্য ই-গেট পার হয়েও যাত্রীকে আবার ইমিগ্রেশন ডেস্কে যেতে হচ্ছে।

জানা যায়, সাধারণত বিদেশগামী যাত্রীর নাম-পরিচয়, পাসপোর্ট, ভিসা নম্বরসহ ২১ ধরনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিললে তিনি ই-গেটের চার ধাপ পেরোতে পারবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে বিমানবন্দরে দায়িত্বরত অন্য কোনো কর্মকর্তার সহযোগিতা তাঁর লাগার কথা নয়। ই-গেটই বলে দেবে যাত্রীর সব তথ্য ঠিক আছে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, যাত্রীদের দ্রুত ও আধুনিক ইমিগ্রেশন সেবা দিতে ২০২৩ সালের ১৭ জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ই-গেট চালু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও দুটি স্থলবন্দরে মোট ৪৪টি ই-গেট স্থাপন করা হয়। শাহজালালে ২৬, শাহ আমানতে ছয়, ওসামানীতে ছয়, বেনাপোল স্থলবন্দরে চার ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে দুটি ই-গেট রয়েছে। ই-পাসপোর্ট প্রকল্পে বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ২৪৬ জন ও সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদের ২৩ কর্মকর্তা আছেন।

কেন ই-গেটের সুফল যাত্রীরা পাচ্ছেন না– এমন প্রশ্নে ইমিগ্রেশন পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ই-গেটে যাত্রীর বিদেশযাত্রার সরকারি আদেশ, শ্রম ভিসায় যাদের জনশক্তি, তাদের কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সনদ, গন্তব্যস্থলের ঠিকানা বা নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই যাত্রীদের ইমিগ্রেশনে এসবির ডেস্কে গিয়ে এসব তথ্য যাচাই করতে হয়। এ জন্য পুরোপুরি ই-গেটের মাধ্যমে যাত্রীর ইমিগ্রেশন শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (আইকাও) তথ্যে, ১১৯ দেশে ই-পাসপোর্ট রয়েছে। তবে সেবা চালু আছে ৯২ দেশে। এসব দেশের মধ্যে ২৫টিতে ই-গেট চালু রয়েছে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের আরেক কর্মকর্তা জানান, ই-গেট পরিচালনায় ২০২২ সালে পুলিশের বিশেষ শাখার ৩৯ সদস্যকে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাত ও ই-পাসপোর্ট প্রকল্পের তিনজন প্রশিক্ষণ নেন। জানা যায়, বর্তমানে প্রশিক্ষণ পাওয়া একজনও শাহজালালে দায়িত্বে নেই। সেখানে অন্য দুই কর্মকর্তা দায়িত্বে আছেন।

ই-পাসপোর্ট প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নুরুস ছালাম বলেন, ই-গেট কার্যকর রাখতে সচেষ্ট রয়েছি। দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একজন যাত্রীর ই-গেট পার হয়ে বিমানবন্দর ছাড়তে যত তথ্য সন্নিবেশিত থাকার কথা, তার সবই রয়েছে। এর পরও কেন ই-গেটের সুফল যাত্রীরা পাচ্ছেন না– বলতে পারছি না। আমাদের দিক থেকে কোনো সমস্যা দেখছি না।

এদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চলতি সপ্তাহের মধ্যে ই-গেট চালু করা হবে। এ সপ্তাহের মধ্যে যাতে ই-গেট চালু করা যায়, সে চেষ্টা করা হচ্ছে। যাদের ই-পাসপোর্ট রয়েছে, তারা পাসপোর্ট দেখিয়ে ই-গেট দিয়ে ঢুকতে পারবেন।সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে উপদেষ্টা এ কথা জানান।

সিলেটে উদাসীন কর্তৃপক্ষ; চট্টগ্রামে যাত্রীরা
সিলেট ব্যুরো জানায়, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থাপিত ছয়টি ই-গেট শুধু নামেই রয়েছে। যাত্রীদের মধ্যে ব্যবহার করার বিষয়ে সচেতনতা দূরে থাক, এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ ই-গেটের পূর্ণাঙ্গ গ্রোগ্রাম সেটআপ করেনি। ফলে ই-পাসপোর্ট পড়তে পারছে না ই-গেট। বেশির ভাগ যাত্রী সনাতন পদ্ধতিতে ইমিগ্রেশন সারতে বাধ্য হচ্ছেন।

সরেজমিন বিমানবন্দরের বহির্গমন ও আন্তঃগমনের প্রবেশমুখে তিনটি করে ছয়টি ই-গেট দেখা যায়। তবে যাত্রী তেমন নেই। যাত্রীরা জানান, ই-গেট ব্যবহারের পর ফের সনাতন পদ্ধতিতে ইমিগ্রেশন করতে হয় বলে সবাই আগের পদ্ধতিই বেছে নিচ্ছেন।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, গত ১৪ মে ২২১, ১৫ মে ১৩৯, ১৬ মে ১২২ ও ১৭ মে মাত্র ৯৮ যাত্রী ই-গেট ব্যবহার করেছেন বহির্গমনে। আন্তঃগমনে একজনও এটি ব্যবহার করেননি।
বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমেদ বলেন, ছয়টির মধ্যে বহির্গমনের তিনটি বেশি ব্যবহার হচ্ছে। ই-গেটের অনেক প্রোগ্রাম ইনস্টলেশন না থাকায় ব্যবহার কম হচ্ছে। সব গ্রোগ্রাম একীভূত হলে যাত্রীরা সুফল পাবেন।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, শাহ আমানত বিমানবন্দরে গড়ে দিনে চার হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করেন। তাদের মধ্যে ই-পাসপোর্টধারীদের তুলনামূলক দ্রুত ইমিগ্রেশন হচ্ছে। কিন্তু ই-গেট ব্যবহারের পরও যাচাই-বাছাইয়ের নামে ইমিগ্রেশন পুলিশের সদস্যরা অনেককে হয়রানি করছেন। আবার সার্ভার ও সিস্টেমে ত্রুটির কথা বলে বন্ধ রাখা হচ্ছে সেবা। ফলে যাত্রীদের মধ্যে ই-গেট ব্যবহারের আগ্রহ কম।

সম্প্রতি কাতার থেকে চট্টগ্রামে আসা সুরাইয়া আক্তার বলেন, ই-গেট দ্রুত পার হলেও পর্যাপ্ত বেল্ট না থাকায় পণ্য হাতে পেতে দেরি হয়। আবার যাচাই-বাছাইয়ের নামে ইমিগ্রেশন পুলিশ হয়রানি করে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী ফরিদুল আলম বোর্ডিং শেষে ই-গেটে গেলেন। ২০ সেকেন্ডে গেট পার হলেও তথ্য যাচাইয়ের জন্য তাঁকে আবার মুখোমুখি হতে হলো সনাতন পদ্ধতির। কোনো কারণ ছাড়াই কেটে গেল ২০ মিনিট। ই-গেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাত্রীর সব তথ্য যাচাই হওয়ার পরও কেন সনাতন পদ্ধতির চেকিং– এ প্রশ্নের উত্তর না পেয়েই দুবাইগামী ফ্লাইট ধরতে ছুটলেন ফরিদুল।

বিমানবন্দরের মুখপাত্র ও জনসংযোগ কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ জানান, ছয়টি ই-গেটে দেশের পাশাপাশি বিদেশি যাত্রীরা দ্রুত ইমিগ্রেশন করতে পারছেন। তবে ব্যবহারের হার খুবই কম; মোট যাত্রীর মাত্র ৪ শতাংশ। ই-গেট ব্যবহার করলেও যাচাইয়ের প্রয়োজনে ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে যেতে হলে যাত্রীদের সময় কিছুটা বেশি লাগে। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে যাচাইয়ের পর আবার কেন সনাতন পদ্ধতি– প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন।

স্থলবন্দরে পাশ দিয়ে যান যাত্রীরা
বেনাপোল প্রতিনিধি জানান, বন্দরের ইমিগ্রেশনে ভারত থেকে আগত এবং বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে যেতে আগ্রহীদের জন্য দুটি করে চারটি ই-গেট আছে। সম্প্রতি দেখা যায়, বেশির ভাগ যাত্রী ই-গেট ব্যবহার না করে পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। পরে লাইনে দাঁড়িয়ে সনাতন পদ্ধতিতে ইমিগ্রেশন সারছেন।

রাজধানীর মতিঝিল থেকে আসা ব্যবসায়ী নুর হোসেন বলেন, ভারত যেতে ইমিগ্রেশনে গেলে কেউ ই-গেট ব্যবহারের জন্য কিছুই বলেননি। সেখানে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা ই-গেট ছাড়াই আমার ই-পাসপোর্টে ইমিগ্রেশন করে দেন।

পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, বাংলাবান্ধা বন্দরে দুটি ই-গেট চালু থাকলেও যাত্রীরা তেমন ব্যবহার করেন না। গত বছরের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের সাধারণ ও ভ্রমণ ভিসা জটিল হয়েছে। শিক্ষার্থী ও মেডিকেল ভিসায় সীমিত সংখ্যক মানুষ যাতায়াত করছেন। আগে দিনে দুই দেশের ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষ যাতায়াত করতেন। এখন তা নেমেছে ৪০-৫০ জনে।

তবে এসব যাত্রীও সনাতন পদ্ধতিতে ইমিগ্রেশন করছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ই-গেট ব্যবহারের পরও ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে যেতে হয়। এ জন্য প্রথমেই পুলিশের কাছে যাচ্ছি। ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, ই-গেট পার হতে পেরে ভেবেছিলাম ইমিগ্রেশন শেষ। কিন্তু পরে পুলিশ ডেকে নিয়ে আবারও সনাতন পদ্ধতিতে বহির্গমন সম্পন্ন করে ভারতে যেতে দিল। এখানে ই-গেট থাকা না-থাকা সমান।
বন্দরের ইমিগ্রেশন বর্ডার কন্ট্রোল সিস্টেমের কম্পিউটার অপারেটর রশিদ রানা বলেন, আমরা নিয়মিত যাত্রী চেক করছি। আসলে এখন যাত্রীই কম। ই-গেট স্থাপনের পর থেকে এ পর্যন্ত আট হাজার ২৫০ যাত্রী চেক করা হয়েছে।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফরিদপুরে নিখোঁজের তিনদিন পর কাশবন থেকে ৯ বছরের শিশুর মরদেহ উদ্ধার, আটক ৫

বিমানবন্দরে ই-গেট আছে, কার্যকর ব্যবহার নেই

আপডেট সময় ১১:০৬:৪৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫

শরীয়তপুরের আমিনুল ইসলাম মালয়েশিয়ায় পাম বাগানে শ্রমিকের কাজ করেন। ছুটিতে দেশে আসেন ফেব্রুয়ারিতে। ছুটি শেষে ফেরত যাচ্ছিলেন। সম্প্রতি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমন গেটে আমিনুলের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘জানতাম, বিমানবন্দরের ই-গেট দিয়ে পাসপোর্ট স্ক্যান করলেই ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ। এখন ই-গেট পার হওয়ার পরও পুলিশের বিশেষ শাখার কাউন্টারে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। ই-গেট থেকেও নানা ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে।’

একই অভিজ্ঞতা কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের বাদশা আলীরও। ২১ বছর সৌদি আরব আছেন। মার্চে বোনের বিয়ে উপলক্ষে দেশে আসেন। ফিরতি পথে ই-গেট পার হয়েও ইমিগ্রেশন ডেস্কের সামনের কাউন্টারে দীর্ঘ লাইনে পড়েন তিনি।

শুধু আমিনুল কিংবা বাদশা আলী নন; ই-পাসপোর্ট থেকেও অনেক যাত্রী এমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। আধুনিক যাত্রীসেবার অংশ হিসেবে দ্রুত ইমিগ্রেশন করতে ই-গেট বসানো হলেও সরকারি দুই সংস্থার সমন্বয়হীনতায় তা কাজে আসছে না। ই-গেটে পাসপোর্ট স্ক্যান করার পরও যাত্রীদের ইমিগ্রেশন ডেস্কে গিয়ে আবার যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এতে অপচয় হচ্ছে সময়।
২০১৮ সালে জার্মান কোম্পানি ভেরিডোজের সঙ্গে ই-পাসপোর্ট প্রকল্পের চুক্তি করে সরকার। ২০২২ সালে উদ্বোধনের পর থেকে দেশে এক কোটি ৬৫ লাখ এবং বিদেশে ১০ লাখ বাংলাদেশি ই-পাসপোর্ট পেয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ই-গেট চালু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে চার লাখ ৫৮ হাজার ৫০৮, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৫৫ হাজার ৮৯৯ এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ৪১ হাজার ৬৫১ যাত্রী যাতায়াত করেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ই-গেটে পাসপোর্ট স্ক্যান করার সঙ্গে সঙ্গে গেট খুলে যায়।
এরপর যাত্রী ই-গেটের মনিটরে তাকালে পাসপোর্টের ছবির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য যাচাই হয়। এ প্রক্রিয়া শেষে যাত্রীকে যেতে হয় ইমিগ্রেশন পুলিশের ডেস্কে। সেখানে আবার তাঁর তথ্য যাচাই করা হয়। ছবি তোলা ও প্রয়োজনীয় ভ্রমণ-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখার পর পাসপোর্টে বহির্গমন সিল দেওয়া হয়।

ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, ই-গেট ও ইমিগ্রেশন পুলিশের সার্ভারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা নেই। এ জন্য ই-গেট পার হয়েও যাত্রীকে আবার ইমিগ্রেশন ডেস্কে যেতে হচ্ছে।

জানা যায়, সাধারণত বিদেশগামী যাত্রীর নাম-পরিচয়, পাসপোর্ট, ভিসা নম্বরসহ ২১ ধরনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিললে তিনি ই-গেটের চার ধাপ পেরোতে পারবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে বিমানবন্দরে দায়িত্বরত অন্য কোনো কর্মকর্তার সহযোগিতা তাঁর লাগার কথা নয়। ই-গেটই বলে দেবে যাত্রীর সব তথ্য ঠিক আছে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, যাত্রীদের দ্রুত ও আধুনিক ইমিগ্রেশন সেবা দিতে ২০২৩ সালের ১৭ জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ই-গেট চালু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও দুটি স্থলবন্দরে মোট ৪৪টি ই-গেট স্থাপন করা হয়। শাহজালালে ২৬, শাহ আমানতে ছয়, ওসামানীতে ছয়, বেনাপোল স্থলবন্দরে চার ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে দুটি ই-গেট রয়েছে। ই-পাসপোর্ট প্রকল্পে বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ২৪৬ জন ও সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদের ২৩ কর্মকর্তা আছেন।

কেন ই-গেটের সুফল যাত্রীরা পাচ্ছেন না– এমন প্রশ্নে ইমিগ্রেশন পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, ই-গেটে যাত্রীর বিদেশযাত্রার সরকারি আদেশ, শ্রম ভিসায় যাদের জনশক্তি, তাদের কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সনদ, গন্তব্যস্থলের ঠিকানা বা নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই যাত্রীদের ইমিগ্রেশনে এসবির ডেস্কে গিয়ে এসব তথ্য যাচাই করতে হয়। এ জন্য পুরোপুরি ই-গেটের মাধ্যমে যাত্রীর ইমিগ্রেশন শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (আইকাও) তথ্যে, ১১৯ দেশে ই-পাসপোর্ট রয়েছে। তবে সেবা চালু আছে ৯২ দেশে। এসব দেশের মধ্যে ২৫টিতে ই-গেট চালু রয়েছে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের আরেক কর্মকর্তা জানান, ই-গেট পরিচালনায় ২০২২ সালে পুলিশের বিশেষ শাখার ৩৯ সদস্যকে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাত ও ই-পাসপোর্ট প্রকল্পের তিনজন প্রশিক্ষণ নেন। জানা যায়, বর্তমানে প্রশিক্ষণ পাওয়া একজনও শাহজালালে দায়িত্বে নেই। সেখানে অন্য দুই কর্মকর্তা দায়িত্বে আছেন।

ই-পাসপোর্ট প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নুরুস ছালাম বলেন, ই-গেট কার্যকর রাখতে সচেষ্ট রয়েছি। দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একজন যাত্রীর ই-গেট পার হয়ে বিমানবন্দর ছাড়তে যত তথ্য সন্নিবেশিত থাকার কথা, তার সবই রয়েছে। এর পরও কেন ই-গেটের সুফল যাত্রীরা পাচ্ছেন না– বলতে পারছি না। আমাদের দিক থেকে কোনো সমস্যা দেখছি না।

এদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চলতি সপ্তাহের মধ্যে ই-গেট চালু করা হবে। এ সপ্তাহের মধ্যে যাতে ই-গেট চালু করা যায়, সে চেষ্টা করা হচ্ছে। যাদের ই-পাসপোর্ট রয়েছে, তারা পাসপোর্ট দেখিয়ে ই-গেট দিয়ে ঢুকতে পারবেন।সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে উপদেষ্টা এ কথা জানান।

সিলেটে উদাসীন কর্তৃপক্ষ; চট্টগ্রামে যাত্রীরা
সিলেট ব্যুরো জানায়, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থাপিত ছয়টি ই-গেট শুধু নামেই রয়েছে। যাত্রীদের মধ্যে ব্যবহার করার বিষয়ে সচেতনতা দূরে থাক, এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ ই-গেটের পূর্ণাঙ্গ গ্রোগ্রাম সেটআপ করেনি। ফলে ই-পাসপোর্ট পড়তে পারছে না ই-গেট। বেশির ভাগ যাত্রী সনাতন পদ্ধতিতে ইমিগ্রেশন সারতে বাধ্য হচ্ছেন।

সরেজমিন বিমানবন্দরের বহির্গমন ও আন্তঃগমনের প্রবেশমুখে তিনটি করে ছয়টি ই-গেট দেখা যায়। তবে যাত্রী তেমন নেই। যাত্রীরা জানান, ই-গেট ব্যবহারের পর ফের সনাতন পদ্ধতিতে ইমিগ্রেশন করতে হয় বলে সবাই আগের পদ্ধতিই বেছে নিচ্ছেন।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, গত ১৪ মে ২২১, ১৫ মে ১৩৯, ১৬ মে ১২২ ও ১৭ মে মাত্র ৯৮ যাত্রী ই-গেট ব্যবহার করেছেন বহির্গমনে। আন্তঃগমনে একজনও এটি ব্যবহার করেননি।
বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমেদ বলেন, ছয়টির মধ্যে বহির্গমনের তিনটি বেশি ব্যবহার হচ্ছে। ই-গেটের অনেক প্রোগ্রাম ইনস্টলেশন না থাকায় ব্যবহার কম হচ্ছে। সব গ্রোগ্রাম একীভূত হলে যাত্রীরা সুফল পাবেন।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, শাহ আমানত বিমানবন্দরে গড়ে দিনে চার হাজার যাত্রী আসা-যাওয়া করেন। তাদের মধ্যে ই-পাসপোর্টধারীদের তুলনামূলক দ্রুত ইমিগ্রেশন হচ্ছে। কিন্তু ই-গেট ব্যবহারের পরও যাচাই-বাছাইয়ের নামে ইমিগ্রেশন পুলিশের সদস্যরা অনেককে হয়রানি করছেন। আবার সার্ভার ও সিস্টেমে ত্রুটির কথা বলে বন্ধ রাখা হচ্ছে সেবা। ফলে যাত্রীদের মধ্যে ই-গেট ব্যবহারের আগ্রহ কম।

সম্প্রতি কাতার থেকে চট্টগ্রামে আসা সুরাইয়া আক্তার বলেন, ই-গেট দ্রুত পার হলেও পর্যাপ্ত বেল্ট না থাকায় পণ্য হাতে পেতে দেরি হয়। আবার যাচাই-বাছাইয়ের নামে ইমিগ্রেশন পুলিশ হয়রানি করে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী ফরিদুল আলম বোর্ডিং শেষে ই-গেটে গেলেন। ২০ সেকেন্ডে গেট পার হলেও তথ্য যাচাইয়ের জন্য তাঁকে আবার মুখোমুখি হতে হলো সনাতন পদ্ধতির। কোনো কারণ ছাড়াই কেটে গেল ২০ মিনিট। ই-গেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাত্রীর সব তথ্য যাচাই হওয়ার পরও কেন সনাতন পদ্ধতির চেকিং– এ প্রশ্নের উত্তর না পেয়েই দুবাইগামী ফ্লাইট ধরতে ছুটলেন ফরিদুল।

বিমানবন্দরের মুখপাত্র ও জনসংযোগ কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ জানান, ছয়টি ই-গেটে দেশের পাশাপাশি বিদেশি যাত্রীরা দ্রুত ইমিগ্রেশন করতে পারছেন। তবে ব্যবহারের হার খুবই কম; মোট যাত্রীর মাত্র ৪ শতাংশ। ই-গেট ব্যবহার করলেও যাচাইয়ের প্রয়োজনে ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে যেতে হলে যাত্রীদের সময় কিছুটা বেশি লাগে। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে যাচাইয়ের পর আবার কেন সনাতন পদ্ধতি– প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন।

স্থলবন্দরে পাশ দিয়ে যান যাত্রীরা
বেনাপোল প্রতিনিধি জানান, বন্দরের ইমিগ্রেশনে ভারত থেকে আগত এবং বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে যেতে আগ্রহীদের জন্য দুটি করে চারটি ই-গেট আছে। সম্প্রতি দেখা যায়, বেশির ভাগ যাত্রী ই-গেট ব্যবহার না করে পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। পরে লাইনে দাঁড়িয়ে সনাতন পদ্ধতিতে ইমিগ্রেশন সারছেন।

রাজধানীর মতিঝিল থেকে আসা ব্যবসায়ী নুর হোসেন বলেন, ভারত যেতে ইমিগ্রেশনে গেলে কেউ ই-গেট ব্যবহারের জন্য কিছুই বলেননি। সেখানে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা ই-গেট ছাড়াই আমার ই-পাসপোর্টে ইমিগ্রেশন করে দেন।

পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, বাংলাবান্ধা বন্দরে দুটি ই-গেট চালু থাকলেও যাত্রীরা তেমন ব্যবহার করেন না। গত বছরের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের সাধারণ ও ভ্রমণ ভিসা জটিল হয়েছে। শিক্ষার্থী ও মেডিকেল ভিসায় সীমিত সংখ্যক মানুষ যাতায়াত করছেন। আগে দিনে দুই দেশের ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষ যাতায়াত করতেন। এখন তা নেমেছে ৪০-৫০ জনে।

তবে এসব যাত্রীও সনাতন পদ্ধতিতে ইমিগ্রেশন করছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ই-গেট ব্যবহারের পরও ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে যেতে হয়। এ জন্য প্রথমেই পুলিশের কাছে যাচ্ছি। ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, ই-গেট পার হতে পেরে ভেবেছিলাম ইমিগ্রেশন শেষ। কিন্তু পরে পুলিশ ডেকে নিয়ে আবারও সনাতন পদ্ধতিতে বহির্গমন সম্পন্ন করে ভারতে যেতে দিল। এখানে ই-গেট থাকা না-থাকা সমান।
বন্দরের ইমিগ্রেশন বর্ডার কন্ট্রোল সিস্টেমের কম্পিউটার অপারেটর রশিদ রানা বলেন, আমরা নিয়মিত যাত্রী চেক করছি। আসলে এখন যাত্রীই কম। ই-গেট স্থাপনের পর থেকে এ পর্যন্ত আট হাজার ২৫০ যাত্রী চেক করা হয়েছে।