সংবাদ শিরোনাম ::
২৭৭৯ কোটি টাকার প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে রাজিব দাশ সওজে টেন্ডার বাণিজ্যের ‘গডফাদার’ মনিরুজ্জামান মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন আউটলেট, ১০৮ হটস্পট চিহ্নিত : মির্জা ফখরুল ডেপুটি রেঞ্জার আবু সুফিয়ানের লোভনীয় পোস্টিং, রাঙ্গামাটিতে ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে বহাল ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এলএ শাখা-৫ এর কর্মচারী মিজানের বিপুল অবৈধ সম্পদের পাহাড় গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমারের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা ভারতে পাচারের অভিযোগ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মাসুদ রানার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালে সাড়ে ৭ কোটি টাকার টেন্ডারে নয়ছয়ের অভিযোগ তিন মহাদেশে স্মার্ট টেকনোলজির ব্যবসা, আড়ালে অর্থপাচারের অভিযোগ
সাবেক পূর্ত সচিব ওয়াছিউদ্দিনের অনিয়ম দুর্নীতি অপকর্ম পর্ব- ১

গুলশানে ৩শ’ কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি দখলে ভূমিদস্যু চক্রের সিন্ডিকেট

জমি-প্লট বা সরকারের অন্য কোন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আদালতে মামলা থাকলে সেক্ষেত্রে নিয়ম হলো, আদালতের সর্বশেষ পর্যায় পর্যন্ত সরকারি স্বার্থরক্ষার চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ কোন মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ হেরে গেলে উপরের আদালতে আপিল করতে হবে। এভাবে আপিল বিভাগের রায়ও সরকারের বিপক্ষে গেলে, এর বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে হবে। সরকারের জমি-জমা বা প্লটের মামলায় অতীতে দেখা গেছে রিভিউ পিটিশনের রায় সরকারের বিপক্ষে যাওয়ার পরও, এমনকি আদালত অবমাননার মামলায় আদেশের পরও সেই জমি বা প্লটের দখল সরকার ছাড়েনি। রাজউক এবং পূর্ত মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন মামলায় এ রকমের অনেক নজির রয়েছে। পরবর্তীতে নিম্ন আদালতে ভোগ দখলের মামলা করে সেই জমি বা প্লটের হস্তান্তর আটকে দিয়েছে সরকার।

অথচ গুলশান সিইএন(সি) ব্লকের ৯৮ নং সড়কের ৬ নং প্লটটির বিষয়ে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, মাত্র একটি আদালতের মামলার রায় সরকারের বিপক্ষে গেছে- তাও এখন থেকে ৪৭ বছর আগে ১৯৭৬ সালে। হাইকোর্টের সেই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার, পূর্ত মন্ত্রণালয় বা রাজউক কেউই আপিল করেনি। যা অত্যন্ত রহস্যজনক। প্লটটির বেসরকারি ভুয়া দাবিদার, অর্থাৎ যিনি এই মামলার বাদী তিনিও এই প্লট বুঝে পাওয়ার ব্যাপারে পরবর্তীতে আদালতে কোনো আবেদন করেননি। কনটেম্পট মামলাও দায়ের হয়নি। কারণ, পূনরায় আর কোনো মামলা দায়ের হলে আসল তথ্য বেরিয়ে আসবে এবং তাতে আদালতের রায় সরকার পক্ষেই যাবে। তাই উক্ত জালিয়াতচক্র আদালতে না গিয়ে নানা প্রক্রিয়ায় চেষ্টা-তদবির চালিয়ে গেছে গোপন সমঝোতায় প্লটটি হাতিয়ে নেয়ার উদ্দেশে। দীর্ঘদিন ধরে বড় অংকের অর্থ নিয়ে ধর্না দিয়েছে পূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউকে। আওয়ামী লীগ আমলের শেষের দিকে সৎ ও আদর্শবান কর্মকর্তা দাবিদার কাজী ওয়াছি উদ্দিন যখন পূর্ত সচিব পদে আসেন ওই সময় জালিয়াতচক্র আবার নতুনরূপে আবির্ভুত হয়। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন সরকারি এই মূল্যবান সম্পত্তিটি বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার জন্য রাজউকের প্রতি অনুশাসন দেন। ২০২৩ সালের জুনে তিনি অত্যন্ত গোপনে এ কাজটি করেন। এ সংক্রান্ত নথিটি তখনকার পূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের কাছে পাঠাননি, নিজেই তাতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে চিঠি জারির ব্যবস্থা করেন। যদিও এ সংক্রান্ত নথি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত অনুমোদিত হওয়ার অপরিহার্যতা রয়েছে। চিঠিটি জারি করা হয় অত্যন্ত গোপনে। কিন্তু পরবর্তীতে খবর প্রকাশিত হলে তোলপাড় বয়ে যায়। প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদও সচিবের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হন, কারণ তাকে না জানিয়েই এটি করা হয়েছে। তাই নথি তলব করেন তিনি। তাৎক্ষণিকভাবে নথিটিও আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীতে সচিবের তালাবদ্ধ বিশেষ আলমারী থেকে নথিটি উদ্ধার করা হয়।

সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন ছাড়াও সরকারি সম্পত্তি বেহাত করার এই অপকর্মে নেপথ্য থেকে জড়িত ছিলেন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই, সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমসহ গোপালগঞ্জের একটি প্রভাবশালী ভূমিদস্যু চক্র। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি সম্পক্তি বেহাত করার চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যাওয়ায় চক্রটি কর্তৃপক্ষের ওপরও চড়াও হয় তখন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী এই সম্পত্তিটির মূল্য ৩শ’ কোটি টাকারও বেশি। এটি সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তিটির তালিকাভুক্ত। কিন্তু ২০২৩ সালের জুনে সম্পত্তিটি বেসরকারি ভুয়া মালিকের হাতে ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, রাজউকের পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় উক্ত সম্পত্তিটি নেই। এই যুক্তি তুলে ধরে সরকারের অতি মূল্যবান এই সম্পত্তিটি চূড়ান্তভাবে বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অনুশাসন জারি করেছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাজউকের পরিত্যক্ত সম্পত্তির মূল তালিকায় উক্ত বাড়িটি ছিল। রাজউক সচিবেরই ২০১০ সালের এক পত্রে একথা উল্লেখ আছে। রাজউকের তখনকার সচিব মোহাম্মদ মোস্তফার স্বাক্ষরে উক্ত চিঠিটি ইস্যু হয়েছিল। চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল পূর্ত সচিব বরাবর। মন্ত্রণালয়ের নথিতেও এ চিঠিটি ছিল। পরবর্তীতে তা গায়েব করা হয়।

১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে গুলশান আবাসিক এলাকার সিইএন(সি) ব্লকের ৯৮ নং সড়কের এই ৬ নং প্লটটি সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে এ সম্পত্তিটি পূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হয়। এ সংক্রান্ত গেজেটের প্রমাণও আছে মন্ত্রণালয়ের নথিতে। অথচ সম্পত্তিটি বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে বলা হয়েছে, রাজউকের গেজেটে পরিত্যক্ত সম্পত্তির যে তালিকা তাতে উক্ত বাড়িটি নেই। ১৯৭৩ সালে দায়েরকৃত একটি রিট মামলার রায়কে এক্ষেত্রে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। হাইকোর্টে দায়েরকৃত ২৫১/১৯৭৩ নং ওই রিট মামলার রায় হয় ১৩/২/১৯৭৬ তারিখে। ওই রায়ে বলা হয়, গুলশান সিইএন(সি) ব্লকের ৯৮ নং সড়কের ৬ নং প্লটটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত নয়। আদতে হাইকোর্টের ওই মামলায় সরকার পক্ষ থেকে যথাযথ কাগজপত্র উপস্থাপন করা হয়নি। পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গেজেটের প্রমাণ পূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউক- উভয় স্থানেই ছিল। সরকার পক্ষ এ প্রমাণগুলো দাখিল করেননি। এ কারণে হাইকোর্টে ওই রায় সরকারের বিপক্ষে চলে যায়। এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রাজউক অথবা পূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আপিল করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও রহস্যজনকভাবে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনকি ১৯৭৬ সালের ওই রায় বাস্তবায়নের জন্য মামলার বাদি কে পি আসগর আলী কোনো আইনগত পদক্ষেপও নেননি। যদিও রায় বাস্তবায়নের জন্য কনটেম্পট মামলা দায়ের করাটা তার জন্য অপরিহার্য ছিল, যদি তিনি প্লটটির দাবিদার হন।

বস্তুত, গুলশানের উক্ত প্লটটি যে পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত- এ ব্যাপারে যথেষ্ট প্রমাণাদি রয়েছে। রাজউক, পূর্ত মন্ত্রণালয় এবং এপিএমবি’র তালিকায় এ প্লটটি পরিত্যক্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিভিন্ন সময়ে চিঠি চালাচালি, অনুসন্ধান এবং তদন্তেও এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশ পিও-১৬/৭২ মূলে ১৯৭২ সালে এই প্লটটি সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের পত্র নং- এপি-২পি/৯- ৫৬/৭৩/৬৯৩ তাং-২৫/০৯/১৯৭৩ আদেশমূলে বড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। তখন শুরু থেকেই এই প্লটটির পেছনে একটি জালিয়াতচক্র লেগে যায়। ইতিপূর্বে অনেক চেষ্টা করেও প্লট হাতিয়ে নেওয়ার চক্রান্তে সফল হয়নি ভূমিদস্যু চক্রটি। আগের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব বা অন্য কোনো কর্মকর্তা এত গুরুতর অনিয়ম-অপকর্ম করতে সাহস না করলেও কাজী ওয়াছি উদ্দিন সেই সাহসটি দেখিয়েছেন, যিনি নিজেকে বরাবর সৎ এবং ভালো কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করে থাকেন।

অপকর্ম ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর সৎ দাবিদার সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন তাৎক্ষণিকভাবে বেকায়দায় পড়েন। তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসে শেখ সেলিমের নেতৃত্বাধীন ভূমিদস্যু চক্রটি। ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল হিসেবে কর্তৃপক্ষের ওপর হয়রানি-নিপীড়নও করা হয়।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

২৭৭৯ কোটি টাকার প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে রাজিব দাশ

সাবেক পূর্ত সচিব ওয়াছিউদ্দিনের অনিয়ম দুর্নীতি অপকর্ম পর্ব- ১

গুলশানে ৩শ’ কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি দখলে ভূমিদস্যু চক্রের সিন্ডিকেট

আপডেট সময় ১২:৪৫:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

জমি-প্লট বা সরকারের অন্য কোন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আদালতে মামলা থাকলে সেক্ষেত্রে নিয়ম হলো, আদালতের সর্বশেষ পর্যায় পর্যন্ত সরকারি স্বার্থরক্ষার চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ কোন মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ হেরে গেলে উপরের আদালতে আপিল করতে হবে। এভাবে আপিল বিভাগের রায়ও সরকারের বিপক্ষে গেলে, এর বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে হবে। সরকারের জমি-জমা বা প্লটের মামলায় অতীতে দেখা গেছে রিভিউ পিটিশনের রায় সরকারের বিপক্ষে যাওয়ার পরও, এমনকি আদালত অবমাননার মামলায় আদেশের পরও সেই জমি বা প্লটের দখল সরকার ছাড়েনি। রাজউক এবং পূর্ত মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন মামলায় এ রকমের অনেক নজির রয়েছে। পরবর্তীতে নিম্ন আদালতে ভোগ দখলের মামলা করে সেই জমি বা প্লটের হস্তান্তর আটকে দিয়েছে সরকার।

অথচ গুলশান সিইএন(সি) ব্লকের ৯৮ নং সড়কের ৬ নং প্লটটির বিষয়ে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, মাত্র একটি আদালতের মামলার রায় সরকারের বিপক্ষে গেছে- তাও এখন থেকে ৪৭ বছর আগে ১৯৭৬ সালে। হাইকোর্টের সেই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার, পূর্ত মন্ত্রণালয় বা রাজউক কেউই আপিল করেনি। যা অত্যন্ত রহস্যজনক। প্লটটির বেসরকারি ভুয়া দাবিদার, অর্থাৎ যিনি এই মামলার বাদী তিনিও এই প্লট বুঝে পাওয়ার ব্যাপারে পরবর্তীতে আদালতে কোনো আবেদন করেননি। কনটেম্পট মামলাও দায়ের হয়নি। কারণ, পূনরায় আর কোনো মামলা দায়ের হলে আসল তথ্য বেরিয়ে আসবে এবং তাতে আদালতের রায় সরকার পক্ষেই যাবে। তাই উক্ত জালিয়াতচক্র আদালতে না গিয়ে নানা প্রক্রিয়ায় চেষ্টা-তদবির চালিয়ে গেছে গোপন সমঝোতায় প্লটটি হাতিয়ে নেয়ার উদ্দেশে। দীর্ঘদিন ধরে বড় অংকের অর্থ নিয়ে ধর্না দিয়েছে পূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউকে। আওয়ামী লীগ আমলের শেষের দিকে সৎ ও আদর্শবান কর্মকর্তা দাবিদার কাজী ওয়াছি উদ্দিন যখন পূর্ত সচিব পদে আসেন ওই সময় জালিয়াতচক্র আবার নতুনরূপে আবির্ভুত হয়। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন সরকারি এই মূল্যবান সম্পত্তিটি বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার জন্য রাজউকের প্রতি অনুশাসন দেন। ২০২৩ সালের জুনে তিনি অত্যন্ত গোপনে এ কাজটি করেন। এ সংক্রান্ত নথিটি তখনকার পূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের কাছে পাঠাননি, নিজেই তাতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে চিঠি জারির ব্যবস্থা করেন। যদিও এ সংক্রান্ত নথি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত অনুমোদিত হওয়ার অপরিহার্যতা রয়েছে। চিঠিটি জারি করা হয় অত্যন্ত গোপনে। কিন্তু পরবর্তীতে খবর প্রকাশিত হলে তোলপাড় বয়ে যায়। প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদও সচিবের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হন, কারণ তাকে না জানিয়েই এটি করা হয়েছে। তাই নথি তলব করেন তিনি। তাৎক্ষণিকভাবে নথিটিও আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীতে সচিবের তালাবদ্ধ বিশেষ আলমারী থেকে নথিটি উদ্ধার করা হয়।

সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন ছাড়াও সরকারি সম্পত্তি বেহাত করার এই অপকর্মে নেপথ্য থেকে জড়িত ছিলেন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই, সংসদ সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমসহ গোপালগঞ্জের একটি প্রভাবশালী ভূমিদস্যু চক্র। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি সম্পক্তি বেহাত করার চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যাওয়ায় চক্রটি কর্তৃপক্ষের ওপরও চড়াও হয় তখন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী এই সম্পত্তিটির মূল্য ৩শ’ কোটি টাকারও বেশি। এটি সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তিটির তালিকাভুক্ত। কিন্তু ২০২৩ সালের জুনে সম্পত্তিটি বেসরকারি ভুয়া মালিকের হাতে ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, রাজউকের পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় উক্ত সম্পত্তিটি নেই। এই যুক্তি তুলে ধরে সরকারের অতি মূল্যবান এই সম্পত্তিটি চূড়ান্তভাবে বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অনুশাসন জারি করেছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাজউকের পরিত্যক্ত সম্পত্তির মূল তালিকায় উক্ত বাড়িটি ছিল। রাজউক সচিবেরই ২০১০ সালের এক পত্রে একথা উল্লেখ আছে। রাজউকের তখনকার সচিব মোহাম্মদ মোস্তফার স্বাক্ষরে উক্ত চিঠিটি ইস্যু হয়েছিল। চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল পূর্ত সচিব বরাবর। মন্ত্রণালয়ের নথিতেও এ চিঠিটি ছিল। পরবর্তীতে তা গায়েব করা হয়।

১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে গুলশান আবাসিক এলাকার সিইএন(সি) ব্লকের ৯৮ নং সড়কের এই ৬ নং প্লটটি সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে এ সম্পত্তিটি পূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হয়। এ সংক্রান্ত গেজেটের প্রমাণও আছে মন্ত্রণালয়ের নথিতে। অথচ সম্পত্তিটি বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে বলা হয়েছে, রাজউকের গেজেটে পরিত্যক্ত সম্পত্তির যে তালিকা তাতে উক্ত বাড়িটি নেই। ১৯৭৩ সালে দায়েরকৃত একটি রিট মামলার রায়কে এক্ষেত্রে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। হাইকোর্টে দায়েরকৃত ২৫১/১৯৭৩ নং ওই রিট মামলার রায় হয় ১৩/২/১৯৭৬ তারিখে। ওই রায়ে বলা হয়, গুলশান সিইএন(সি) ব্লকের ৯৮ নং সড়কের ৬ নং প্লটটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত নয়। আদতে হাইকোর্টের ওই মামলায় সরকার পক্ষ থেকে যথাযথ কাগজপত্র উপস্থাপন করা হয়নি। পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গেজেটের প্রমাণ পূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউক- উভয় স্থানেই ছিল। সরকার পক্ষ এ প্রমাণগুলো দাখিল করেননি। এ কারণে হাইকোর্টে ওই রায় সরকারের বিপক্ষে চলে যায়। এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রাজউক অথবা পূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আপিল করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও রহস্যজনকভাবে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এমনকি ১৯৭৬ সালের ওই রায় বাস্তবায়নের জন্য মামলার বাদি কে পি আসগর আলী কোনো আইনগত পদক্ষেপও নেননি। যদিও রায় বাস্তবায়নের জন্য কনটেম্পট মামলা দায়ের করাটা তার জন্য অপরিহার্য ছিল, যদি তিনি প্লটটির দাবিদার হন।

বস্তুত, গুলশানের উক্ত প্লটটি যে পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত- এ ব্যাপারে যথেষ্ট প্রমাণাদি রয়েছে। রাজউক, পূর্ত মন্ত্রণালয় এবং এপিএমবি’র তালিকায় এ প্লটটি পরিত্যক্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিভিন্ন সময়ে চিঠি চালাচালি, অনুসন্ধান এবং তদন্তেও এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশ পিও-১৬/৭২ মূলে ১৯৭২ সালে এই প্লটটি সরকারের পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের পত্র নং- এপি-২পি/৯- ৫৬/৭৩/৬৯৩ তাং-২৫/০৯/১৯৭৩ আদেশমূলে বড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। তখন শুরু থেকেই এই প্লটটির পেছনে একটি জালিয়াতচক্র লেগে যায়। ইতিপূর্বে অনেক চেষ্টা করেও প্লট হাতিয়ে নেওয়ার চক্রান্তে সফল হয়নি ভূমিদস্যু চক্রটি। আগের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব বা অন্য কোনো কর্মকর্তা এত গুরুতর অনিয়ম-অপকর্ম করতে সাহস না করলেও কাজী ওয়াছি উদ্দিন সেই সাহসটি দেখিয়েছেন, যিনি নিজেকে বরাবর সৎ এবং ভালো কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করে থাকেন।

অপকর্ম ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর সৎ দাবিদার সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন তাৎক্ষণিকভাবে বেকায়দায় পড়েন। তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসে শেখ সেলিমের নেতৃত্বাধীন ভূমিদস্যু চক্রটি। ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল হিসেবে কর্তৃপক্ষের ওপর হয়রানি-নিপীড়নও করা হয়।