পোশাকে-আশাকে সাধারণ আর দশটা সরকারি কর্মচারীর মতোই মনে হয় তাঁকে। পদমর্যাদায় তিনি ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের (ডিসি অফিস) ভূমি অধিগ্রহণ অনুবিভাগের শাখা-৫-এর একজন তৃতীয় শ্রেণীর অফিস সহকারী। তবে এই অতি সাধারণ অবয়বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভিন্ন রূপ। ভূমি অধিগ্রহণের মতো স্পর্শকাতর শাখায় দায়িত্ব পালনের সুবাদে তৈরি করেছেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ঘুষ, দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি গড়ে তুলেছেন শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের এক বিশাল পাহাড়। এই ‘মহাপ্রভাবশালী’ কর্মচারীর নাম মিজানুর রহমান ওরফে মিজান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান ও চন্দ্রিমা মডেল টাউন এলাকায় মিজানের নামে-বেনামে একাধিক বিলাসবহুল সুউচ্চ আবাসিক ভবন রয়েছে। সরকারের একজন সামান্য বেতনভুক্ত কর্মচারী হয়েও কীভাবে তিনি একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ করলেন, তা নিয়ে এলাকায় রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর মালিকানাধীন ও নির্মিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ভবনের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
* **কলেজ পার্ক (১০ তলা):** ঢাকা উদ্যানের ২ নম্বর রোডের ২৫ ও ২৭ নম্বর হোল্ডিংয়ে অবস্থিত এই রাজকীয় অ্যাপার্টমেন্টের একটি ফ্ল্যাটে সপরিবারে বসবাস করেন মিজান। কোটি টাকা খরচ করে ইন্টেরিয়র ডিজাইন করা এই ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকারও বেশি।
* **আদর্শ নিবাস (১০ তলা):** ঢাকা উদ্যানের ডি ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ১৪ ও ১৬ নম্বর হোল্ডিংয়ে অবস্থিত এই বহুতল ভবনটি মিজানের মালিকানাধীন অন্যতম বড় প্রজেক্ট।
* **ঢাকা উদ্যান সিটি সেন্টার (১২ তলা):** ঢাকা উদ্যানের এ ব্লকের ২ নম্বর রোডের ৫৮ নম্বর হোল্ডিংয়ে নির্মিত হয়েছে এই সুউচ্চ ভবনটি।
* **চন্দ্রিমা মডেল টাউনের প্রজেক্ট:** চন্দ্রিমা মডেল টাউনে তাঁর একচ্ছত্র মালিকানায় ও পার্টনারশিপে রয়েছে ‘এভিনিউ পার্ক’, ‘মাধবীলতা’ ও ‘প্রত্যাশা প্যালেস’সহ একাধিক বিলাসবহুল ভবন।
এছাড়াও, বর্তমানে ঢাকা উদ্যানের ৩ নম্বর রোডের ৬ নম্বর বাড়িসহ আরও কয়েকটি ভবনের নির্মাণকাজ পুরোদমে চলছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাঁর একটি ভবনের নিচতলায় থাকা ১২টি দোকান থেকেই প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের ভাড়া তোলেন মিজান।
অভিযোগ রয়েছে, মিজান অত্যন্ত চতুরতার সাথে তাঁর এই অবৈধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন। তিনি প্রথমে নিজে জমি কেনেন এবং ভবন নির্মাণ শুরু করেন। পরবর্তীতে আইনি জটিলতা এড়াতে এবং অবৈধ অর্থের উৎস আড়াল করতে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ‘শেয়ার’ বিক্রি করেন এবং শেয়ারহোল্ডারদের নামেই ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি করে রাখেন।
মিজানের নির্মাণাধীন একটি ভবনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ইসমাইল জানান, “১০ তলা এই ভবনের সব ফ্ল্যাটই ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। এছাড়া মিজান স্যারের আরও সাত-আটটি বাড়ি আছে।”
ভবনগুলোর নির্মাণকাজের বড় অংশ বাস্তবায়ন করেন আল-আমিন নামের এক ঠিকাদার। মিজানের ভবনে স্যানিটারি মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করা জাহাঙ্গীর জানান, তিনি নিজেই মিজানের ৮-৯টি ভবনে কাজ করেছেন এবং এখনও কিছু ভবনে কাজ চলমান রয়েছে। মিজানের বিশ্বস্ত সহযোগী রবিউল ইসলাম (হুজুর) জানান, ভবনগুলোতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও উন্নত মানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, যা কোনো সাধারণ কর্মচারীর পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব।
অনুসন্ধানে মিজানের এই বিপুল অর্থবিত্তের পেছনে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক যোগসূত্রের তথ্য মিলেছে। জানা গেছে, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ভোলা-২ আসনের সাবেক বিতর্কিত এমপি আলী আজম মুকুলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত লোক ছিলেন এই মিজান। সংশ্লিষ্টদের তীব্র ধারণা, সাবেক এমপি মুকুলের অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ মিজানের কাছেই গচ্ছিত রাখা হতো এবং সেই টাকা সাদা করতেই মিজানের মাধ্যমে আবাসন খাতে বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে। মূলত এমপির রাজনৈতিক আশ্রয় ও ক্ষমতার দাপটেই মিজান ডিসি অফিসে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন।
একজন সাধারণ অফিস সহকারী কীভাবে সরকারি বেতনের সম্বল নিয়ে রাজধানীর বুকে এমন শত কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন, তা নিয়ে খোদ ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কর্মচারীদের মুখে মুখে এখন মিজানের দুর্নীতির গল্প।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মিজানের এই লাগামহীন দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদের পাহাড় এবং সাবেক এমপির অর্থ পাচারের নেটওয়ার্ক নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। খুব শীঘ্রই তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। এদিকে মিজানের এই অবৈধ সম্পদের বিষয়ে জানতে তার সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সংবাদ শিরোনাম ::
ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এলএ শাখা-৫ এর কর্মচারী মিজানের বিপুল অবৈধ সম্পদের পাহাড়
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০২:০৮:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
- ৫১২ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ



















