রাজধানীর বনানী কাঁচাবাজারে আইন ভঙ্গ করে ৩৩টি দোকান বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনায় দায়ী হয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) মোহাম্মদ শওকত ওসমান। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বনানী কাঁচাবাজার মার্কেট ভবনের তিন পাশের দেয়াল সংলগ্ন খালি জায়গায় এই দোকান বরাদ্দ কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে ডিএনসিসির নিজস্ব নিয়ম এবং আইন অমান্য করে সম্পন্ন করা হয়েছে। ডিএনসিসির আইন অনুযায়ী, নতুন দোকান বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ১১ সদস্যবিশিষ্ট বরাদ্দ কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন। এই কমিটির মধ্যে রয়েছেন ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি বা পরিচালনা কমিটির নারী-পুরুষ সদস্য, সচিব, প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা, আইন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা। কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা। তবে বনানী কাঁচাবাজারের এই নতুন বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় বরাদ্দ কমিটি পাশ কাটানো হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, শওকত ওসমান প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা হিসেবে সরাসরি ফাইল উপস্থাপন করে ৩৩টি দোকান বরাদ্দ করেছেন। এই প্রক্রিয়ার ফলে বরাদ্দ কমিটি কোনও প্রকার আলোচনায় যুক্ত হয়নি, যা আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বেআইনি। তদন্তে জানা গেছে, নতুন বরাদ্দে মোট ৩৯টি দোকান তৈরি হচ্ছে, যার মধ্যে ৬টি দোকান স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্য সংরক্ষিত। ফলে, প্রকৃত বরাদ্দের চেয়ে অতিরিক্ত দোকান তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা এই দোকানগুলো অস্থায়ী বরাদ্দ হলেও পাকা ইট দিয়ে শক্তভাবে নির্মাণ করছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আশপাশের এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, এই অবৈধ দোকান নির্মাণের ফলে ফুটপাত ও সড়ক দখল হয়েছে, যা মানুষ চলাচল এবং নিরাপত্তার জন্য হুমকি। ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা বলেন, “সংস্থায় একটি অসাধু চক্র গড়ে উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আড়ালে ৩৯টি দোকান বরাদ্দে প্রায় ২ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। মোহাম্মদ শওকত ওসমান এই প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং আইন-কানুনকে এড়িয়ে বরাদ্দ দিয়েছেন।” বনানী কাঁচাবাজারে আইন অমান্য করে দোকান বরাদ্দের ঘটনা নতুন নয়। ২০১৬ সালের মার্চে মার্কেটে আগুন লাগার পর নিরাপত্তার কারণে দেয়াল সংলগ্ন ৩৩টি দোকান বাতিল করা হয়। কিন্তু দোকানদাররা তখনও সেখানে ব্যবসা চালিয়ে গিয়েছিলেন। ২০১৭ সালে দোকানদাররা বকেয়া ভাড়া পরিশোধের আবেদন জানায়। ২০১৯ সালে ডিএনসিসি অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়। একাধিক উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেও রহস্যজনক কারণে থেমে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালের জুলাইয়ে উচ্ছেদ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এই ঘটনায় মার্কেট ও আশপাশের ফুটপাত এবং পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে আসে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দোকানদাররা পুনরায় বরাদ্দের জন্য নগর ভবনে যাতায়াত শুরু করেন। তারা ২০১৬ সালের দোকান বাতিলের পর থেকে ২০২২ সালের উচ্ছেদ পর্যন্ত বিনা ভাড়ায় দোকান পরিচালনা করেছেন। তাদের এই প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে শওকত ওসমান কমিটিকে এড়িয়ে সরাসরি বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। বনানী কাঁচাবাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, “অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের সময়ে তৎকালীন মেয়র আমাদের ৩৩টি দোকান বরাদ্দ দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তা উচ্ছেদ করা হয়। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হিসাবে পুনরায় বরাদ্দের আবেদন করেছি এবং নিজ খরচে দোকান তৈরি করছি। কিন্তু শওকত ওসমান কমিটিকে পাশ কাটিয়ে এই বরাদ্দ দিয়েছেন।” স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আশপাশের জনগণ মনে করছেন, দেয়াল সংলগ্ন এই দোকান নির্মাণের ফলে আগুনের ঝুঁকি বেড়েছে এবং মার্কেটের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তারা বলছেন, “ফুটপাত ও সড়ক দখল হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে যাবে। আগের মতো মানুষের জন্য খোলা জায়গা থাকবে না।” ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমান বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য পূর্ববর্তী দোকান পুনর্বার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে কমিটিতে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়নি।” আইন অনুসারে, বরাদ্দ বাতিলের ৩০ দিনের মধ্যে জরিমানা সহ পুনঃবরাদ্দের আবেদন করতে হবে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ায় সম্পূর্ণ বরাদ্দ কার্যক্রম বেআইনি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শওকত ওসমানের এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রমাণ। একজন আইনজ্ঞ বলেন, “বরাদ্দ কমিটিকে এড়িয়ে সরাসরি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, শহরের নিরাপত্তা এবং জনস্বার্থকে হুমকির মধ্যে ফেলা হয়েছে।” একই সঙ্গে তিনি যোগ করেন, “বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য স্থান, নিরাপত্তা এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। এটি নগর ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অবহেলার পরিচয়।” নাগরিক ও ব্যবসায়ী সমাজের প্রশ্ন, কেন প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা নিজের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে আইন অমান্য করে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এই বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন এবং শহরের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থকে এভাবে ঝুঁকিতে ফেলেছেন। বনানী কাঁচাবাজারের আশপাশের শিক্ষার্থী, কর্মচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, “ফুটপাত দখল, পরিবেশ দূষণ এবং অগ্নি ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিন চলাচল কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমাদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য বিঘ্নিত হচ্ছে।” বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডিএনসিসি প্রশাসনকে তৎক্ষণাৎ এই বরাদ্দ প্রক্রিয়া পুনঃমূল্যায়ন করে বেআইনি দোকানগুলো উচ্ছেদ এবং আইন অনুসারে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। নগরবাসীও আশা করছেন, শওকত ওসমানের মতো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ডিএনসিসির কর্মকর্তাদের একাংশ স্বীকার করেছেন, “সংস্থায় এমন অসাধু চক্র গড়ে উঠেছে, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থে আইন ও নিয়মের তোয়াক্কা করছে না। নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের সেবা দেয়ার পরিবর্তে তারা লুটপাটে জড়িত।” বনানী কাঁচাবাজারে এই ঘটনা শুধু একটি অবৈধ দোকান বরাদ্দের গল্প নয়। এটি নগর প্রশাসনে দায়িত্বহীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইন অমান্য করার একটি প্রতিফলন। নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা, পরিবেশ ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার জন্য ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের উচিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা শওকত ওসমানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভুলের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সংবাদ শিরোনাম ::
প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমান
আইন অমান্য করে বনানী কাঁচাবাজারে বরাদ্দ ৩৩ দোকান
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০৩:০২:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ অক্টোবর ২০২৫
- ৯৪২ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ
























