ভোলার, বোরহানউদ্দিন উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘হাকিমুউদ্দিন ফাজিল মাদ্রাসার অফিস সহকারী কামাল উদ্দিন ওরফে মিরাজ এর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ভূয়া নাম ব্যবহার করে উপবৃত্তির টাকা সহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ সময় ধরে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ জানিয়ে আসছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
কামাল উদ্দিন ওরফে মিরাজ ২০২১ সালের শেষের দিকে হাকিমুউদ্দিন ফাজিল মাদ্রাসায় অফিস সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। তবে আইটিতে পারদর্শী থাকায় প্রিন্সিপাল তার হাতে উপবৃত্তি ও শিক্ষার্থীদের ভর্তি সেকশনে দায়িত্ব দেন। উপবৃত্তি এন্ট্রির কাজ তিনি সামলালেও অনুমোদনের জন্য প্রিন্সিপালের মোবাইল ফোনে ওটিপি কোড যেতো। তবে প্রিন্সিপাল বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে বিশ্বাস করে ওটিপি কোড দিয়ে দিতেন। তবে এই ব্যবস্হাকেই কাজে লাগিয়ে অফিস সহকারী কামাল উদ্দিন ওরফে মিরাজ ভূয়া শিক্ষার্থীদের নাম সিস্টেমে ঢুকিয়ে দেন। এবং অফিসের একটা চক্রের সহায়তায় নকল নথি জোগাড় করে সেইগুলো বৈধ প্রমাণ করেন। এই ভাবেই প্রতিনিয়ত অনিয়ম করে কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন অফিস সহকারী কামাল উদ্দিন।
ষষ্ঠ থেকে আলিম—সবখানে কারসাজি
পরিদর্শনে দেখা যায়, আলিম প্রথম বর্ষে প্রকৃত শিক্ষার্থী ছিলেন ৭৩ জন, উপবৃত্তি পান মাত্র ৪১ জন। অথচ সরকারি ওয়েবসাইটে দেখানো হয়েছে ১৩৩ জন এবং উপবৃত্তি পাচ্ছেন ৯৫ জন! শুধু এ শ্রেণিতেই চার বছরে ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকা তুলে নিয়েছেন কামাল।একইভাবে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী বাড়িয়ে চার বছরে ১৮ লাখ টাকা, নবম-দশম শ্রেণিতে একশতাধিক শিক্ষার্থী বাড়িয়ে ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে প্রায় তিন শতাধিক ভুয়া শিক্ষার্থীর নামে তোলা হয়েছে ৫০–৫৫ লাখ টাকা।
তদন্ত কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার রেজাউল করিম বলেন— “ঢাকা থেকে আসা পরিদর্শক দল প্রতিষ্ঠানটির উপবৃত্তি সংক্রান্ত অনিয়ম ধরেছে। প্রিন্সিপাল স্বীকার করেছেন পাসওয়ার্ড তার দায়িত্বে থাকার কথা। তবে অফিস সহকারির এমন কর্মকাণ্ড তার জানা ছিল না। এখন পুরো প্রক্রিয়া অনলাইন হওয়ায় কামাল উদ্দিন সুযোগ নিয়েছে। তিনি আরও বলেন— “কীভাবে নকল শিক্ষার্থীর নামে রেজিস্ট্রেশন কার্ড, রোল নম্বর ও অভিভাবকের তথ্য ব্যবহার করা হলো তা এখনো স্পষ্ট নয়। এর সঙ্গে প্রতারক চক্র জড়িত থাকার সম্ভাবনা প্রবল।”
গত আগস্টে মাসে ঢাকার পরিদর্শক দল বোরহানউদ্দিনে আসবে শুনে কামাল উদ্দিন ভুয়া নাম মুছে ফেলতে তড়িঘড়ি শুরু করেন। তবে নাম বাদ দিতে গিয়ে প্রকৃত শিক্ষার্থীদেরও নাম সিস্টেম থেকে উধাও করে ফেলেন তিনি। এতে শতাধিক শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি বন্ধ হয়ে যায় এবং অভিভাবকদের ক্ষোভ দেখা দেয়। পরে তদন্তকারীরা সরাসরি পরিদর্শন করে দেখেন—ওয়েবসাইটে উপবৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭৫০, কিন্তু বাস্তবে ছিলো মাত্র ৪৫০। তদন্তে আরও প্রমাণ মেলে ভুয়া নম্বর, নকল নথি ও প্রতারণার নানা কৌশলের।প্রিন্সিপালের দায় এড়ানো সম্ভব নয় মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আল আমিন বলেন— “অফিস সহকারি কামাল উদ্দিন আইডিতে দক্ষ থাকায় কার্যক্রম তার হাতে দিয়েছিলাম। OTP পাসওয়ার্ড আমার ফোনে আসতো, চাইলে তাকে দিতাম। দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে বুঝিনি। তদন্তে দোষ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দুই মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। স্থায়ীভাবে চাকরি হারাতে পারে।”
তবে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন—OTP ব্যবহার করে অনুমোদন দেওয়া এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও প্রিন্সিপাল নীরব ছিলেন। তাই নৈতিকভাবে তাকেও দায় এড়ানো কঠিন।
হঠাৎ কোটিপতি কামাল
মাত্র ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করলেও চার বছরের মাথায় কামাল উদ্দিন কোটিপতি বনে যান। বোরহানউদ্দিন পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে দোতলা বাড়ি (বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা) ও প্রায় ৩০ শতাংশ জমি রয়েছে তার নামে। স্থানীয়রা জানান, এর আগে তিনি বীমা কোম্পানি ও গ্রাম আদালতে চাকরির সময়ও অর্থ কেলেঙ্কারিতে জড়িত ছিলেন। সাংবাদিকরা এই বিষয়ে আরো গভীর পর্যবেক্ষণে তার বাড়িতে গিয়ে তার দেখা মিলেনি , হাতের মুঠো ফোনে একাধিকবার ফোন করো তাকে পাওয়া যায়নি।
সাময়িক বহিষ্কার, কিন্তু ক্ষোভ অটুট তদন্ত কমিটির সুপারিশে কামাল উদ্দিনকে দুই মাসের জন্য সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হলেও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ক্ষোভ কমেনি। তাদের প্রশ্ন—একজন অফিস সহকারী বছরের পর বছর কোটি টাকা আত্মসাৎ করলেন, অথচ মাদ্রাসার প্রধান জানলেন না, এটা কীভাবে সম্ভব?
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ—যেখানে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর কথা, সেখানে অন্ধকার দুর্নীতি গিলে খেল সরকারের কোটি কোটি টাকা।
রিয়াজ ফরাজি 























