ঢাকা ০৫:১৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেনের সহায়তা চেয়েছে ১১ দেশ : জেলেনস্কি রাজবাড়ীতে প্রথম ধাপে ফ্যামিলি কার্ডের টাকা পাচ্ছে ১২০১ পরিবার শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না ‘দেনা পাওনা’ ইরানে হামলায় অংশ না নেওয়ার ঘোষণা আমিরাতের আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে মাটি কেটে বিক্রি  নওগাঁর ধামইরহাটে ৯ মামলার সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি রূপগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ চুনারুঘাটে রমজান মাসে‘বান্নী পার্কে’অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ সার বিক্রিতে অতিরিক্ত মূল্য ও অবৈধ মজুদ বন্ধের কড়া নির্দেশ চকরিয়ায় মাতামুহুরি নদী থেকে দুই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফেরাত কামনায় কালিহাতীতে বিএনপির ইফতার ও দোয়া মাহফিল

রাষ্ট্রের ব্যর্থতাই খুন হয় সাংবাদিক তুহিন

  • মো. মামুন হোসেন
  • আপডেট সময় ০৬:২৯:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ অগাস্ট ২০২৫
  • ৮৫৪ বার পড়া হয়েছে

গাজীপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে। একই দিনে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে মারধর এমনকি ইট দিয়ে থেঁতলে নির্যাতন করা হয় আরেক সাংবাদিককে। রাজধানীর পাশে দেশের সর্ববৃহৎ এ নগরীতে প্রকাশ্য এমন বেপরোয়া ঘটনায় উদ্বিগ্ন সচেতন নাগরিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ।
সাংবাদিক তুহিন হত্যাকাণ্ডের পরপরই চাঁদাবাজির বিষয়টি চাউর হয়। বলা হয়, চাঁদাবাজির প্রতিবেদন করায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। সত্যিই কি চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড। ঘটনার সুলোক সন্ধানে জানা গেছে, ঘটনাটি সেরকম নয়। মূলত হানিট্র্যাপ থেকে ঘটনার সূত্রপাত। যে ঘটনার ভিডিও করায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তুহিন।
সাংবাদিক হত্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু প্রতিটি হত্যাই যেন নতুন করে আমাদের অসাড় রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখোশ উন্মোচন করে। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ‘আমার সংবাদ’ পত্রিকার প্রতিনিধি মো. তুহিন সরকারকে ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট রাতে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। যেভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে, তা শুধু বর্বরই নয়, ভয়ঙ্কর বার্তা বহন করে-এই দেশে সাংবাদিকতা করা মানে মৃত্যু ডেকে আনা।
তুহিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর পুলিশ বলেছে, ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’ থেকে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অথচ এলাকাবাসী, সহকর্মী ও পরিবার একবাক্যে বলছে, তুহিন একজন সৎ, সাহসী ও নির্ভীক সাংবাদিক ছিলেন, যিনি স্থানীয় দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, রাজনৈতিক অপকর্ম ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লিখতেন। তাহলে প্রশ্ন আসে, ব্যক্তি শত্রুতা কেন জন্ম নেবে? কী সেই কারণ, যা একজন তরুণ সংবাদকর্মীকে খুনের টার্গেটে পরিণত করল?
তুহিন হত্যা নিয়ে রাষ্ট্রের ভূমিকা আবার প্রশ্নের মুখে। রাষ্ট্র বলতে আমরা বুঝি সরকার, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার ব্যবস্থা। অথচ প্রতিবার সাংবাদিক খুন হলে এই রাষ্ট্র অদৃশ্য থাকে। নিন্দা জানায় কয়েকজন, তদন্তে নামে পুলিশ, কিছুদিন সংবাদপত্রে তোলপাড় হয়, তারপর সব থেমে যায়। আমরা দেখেছি, সাগর-রুনি হত্যার ১৩ বছরেও বিচার হয়নি। ২০২৩ সালে খুলনার সাংবাদিক রুবেল হত্যার বিচার কই? ২০২৪ সালে কুমিল্লার রিপন, নারায়ণগঞ্জের রিয়াজ, কক্সবাজারের বাবুল—সবাই একই পরিণতির শিকার। এর চেয়েও ভয়াবহ বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুনের বিচার হয়নি, কেস ধামাচাপা পড়ে গেছে, কিংবা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় আসামিরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
সাংবাদিক তুহিনের মতো সংবাদকর্মীরা আসলে সমাজের আয়না। তারা যা দেখেন, তা তুলে ধরেন। তারা সমাজের সমস্যা, অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ—সব কিছু জনগণের সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ দেশের শাসনব্যবস্থা আজ এমন এক জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে, যেখানে সত্য বলা মানে ক্ষমতার রোষানলে পড়া। সাংবাদিকরা যখনই সত্যকে তুলে ধরেন, তখনই তাদের বিরুদ্ধে শুরু হয় মামলা, হুমকি, হামলা, এবং শেষ পর্যন্ত জীবননাশের মতো অপরাধ।
তুহিনের ক্ষেত্রে ঠিক এটাই ঘটেছে। তিনি স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন। তথ্য অনুসন্ধানে তিনি বারবার হুমকি পেতেন। পরিবার জানিয়েছে, হত্যার আগের দিনও তাকে মোবাইলে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এমন হুমকি অনেক সাংবাদিকই পান, কিন্তু খুব কমই রাষ্ট্র তাদের সুরক্ষা দিতে এগিয়ে আসে। রাষ্ট্র কি জানত না, তুহিন ঝুঁকিতে ছিলেন? যদি জানত, তাহলে তাকে সুরক্ষা দেওয়া হয়নি কেন? আর যদি না-ই জানত, তাহলে তথ্য ব্যবস্থা, গোয়েন্দা নজরদারি ও রাষ্ট্রীয় সজাগতা এত দুর্বল কেন?
এই হত্যাকাণ্ড আবারও প্রমাণ করল-বাংলাদেশে সাংবাদিকতা আজ ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। ২০২৫ সালের আগেই ১২ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, আর নিগ্রহ, হয়রানি, মামলা, হামলার সংখ্যা শত ছাড়িয়েছে। যারা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারান, তারা কেবল কোনো পত্রিকার কর্মী নন, তারা রাষ্ট্রের দায়ে নিয়োজিত নাগরিক। কারণ তথ্য জানার অধিকার নাগরিকের মৌলিক অধিকার-আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে যারা জীবন দেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখা যাক
Committee to Protect Journalists (CPJ) অনুযায়ী ১৯৯২ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট ২৩ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন ।
ইউনেস্কো বলছে ২০০৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত, মোট ২৬ জন সাংবাদিক বা ব্লগার নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১১টি মামলার তদন্ত এখনও অনির্দিষ্ট ।
২০২৪ সালের পরিস্থিতিReporters Without Borders (RSF) জানায়, ২০২৪ সালে ৫ জন সাংবাদিক হত্যা হয়েছে, যাদের মধ্যে পাঁচজনই একই সময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময়“মনসুন বিপ্লব”এর সময় নিহত ।
আরও সংক্রান্ত প্রতিবেদনে লক্ষ্য করা যায়, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত ৬ জন সাংবাদিক নিহত হয় এসব হত্যাকাণ্ড সংবিধান রক্ষায় আন্দোলনরত সময় সংঘটিত ছিল ।
দীর্ঘমেয়াদে (১৯৯২ু২০২২) ২৩-২৬ জন
বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যার আলোচিত ঘটনা :
১১ ফেব্রুয়ারী ২০১২ সালে সাগর-রুনি দম্পতিকে বাসায় ঢুকে রাতের বেলায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১২ বছরের বেশী পেরিয়ে গেলেও আমরা এখনও সেটার বিচার পাইনি। এই দম্পতি হত্যার প্রতিবেদন জমা পড়ে ১০০ বারেরও বেশী।
২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারী মানিক সাহা হত্যার কথা মনে নাই অনেকেরই। খুলনার মানিক সাহা দৈনিক সংবাদ ও বিবিসি বাংলার সাংবাদিক। বোমা হামলা হত্যা করা হয় তাকে। ধারণা করা হয় রাজনৈতিক সন্ত্রাস জড়িত ছিল। বিচার পায়নি।
দূর্নীতির রিুদ্ধে রিপোর্ট করায় ২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর ধারালো ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয় ময়মনসিংহের স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক মিজানুর রহমানকে। তার বিচারও পাইনি আমরা
২০০১ সালে সিরাজগঞ্জের সাংবাদিক দীপক সাহা রাজনৈতিক দূর্নীতির খবর করায় হত্যা করা হয়। রাজনৈতিক কারনে সেখানেও বিচার পায়নি ভূক্তভোগী পরিবার
তুহিন হত্যার দায় তাই রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। শুধু হত্যাকারীদের খুঁজে বের করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। হত্যাকারীদের উৎস, মদদদাতা, রাজনৈতিক সংযোগ, পুলিশি ব্যর্থতা, গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা—সবকিছুর তদন্ত হওয়া উচিত। প্রয়োজনে উচ্চ পর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা দরকার, যারা তুহিন হত্যাকাণ্ডের পেছনের আসল চক্রকে বের করে আনবে।
এখানে একটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া জরুরি: সাংবাদিক হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা একটা ধারাবাহিকতা। আর এই ধারাবাহিকতার উৎস হলো—রাষ্ট্রের দায়হীনতা, বিচারহীনতা ও ভীতিকর রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতিতে সাংবাদিককে হুমকি দিলে কিছু হয় না, মারলে মামলা হয় না, হত্যা করলেও বিচার হয় না—সেই সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
সাংবাদিক হত্যার বিচার না হওয়া মানে সত্যের কণ্ঠরোধ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মৃত্যু, এবং সর্বোপরি গণতন্ত্রের গলা চেপে ধরা। বাংলাদেশ যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক হতে চায়, তবে গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। আর তা নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার দায় নিতে হবে, প্রয়োজনে আলাদা সাংবাদিক সুরক্ষা আইন করতে হবে, সাংবাদিকদের হুমকির অভিযোগগুলোর দ্রুত তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা যদি সত্যিই সাংবাদিক তুহিন হত্যার বিচার চাই, তবে শুধু ‘দোষীদের গ্রেপ্তার’ দাবি করলেই চলবে না। আমাদের প্রশ্ন তুলতে হবে—এই হত্যাকাণ্ড ঘটার পরিবেশ তৈরি হলো কীভাবে? তুহিন যাদের বিরুদ্ধে লিখতেন, তারা এত সাহস পেল কীভাবে? রাষ্ট্র তাদের শেল্টার দিল কিনা? প্রশাসন, পুলিশ বা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব এতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত কিনা? তুহিন হত্যাকাণ্ড যেন আরেকটি স্ট্যাটিস্টিক হয়ে না যায়-এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা চাই, রাষ্ট্র কার্যকরভাবে তদন্ত করুক, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিক এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো সংবাদকর্মী হত্যার শিকার না হন, সেই নিশ্চয়তা দিক। এমন এক সমাজ গড়ার জন্য যেখানে সত্য বলাটা অপরাধ না, বরং সাহসিকতার সম্মান হবে। তুহিনের রক্ত শুধু তার পরিবারের আহাজারি নয়, তা গোটা সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়ার জন্য যথেষ্ট। যদি এই হত্যার বিচার না হয়, তবে আমরা শুধু একজন সাংবাদিক হারালাম না, হারালাম গণতন্ত্রের এক অমূল্য স্তম্ভ।

লেখক- বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেনের সহায়তা চেয়েছে ১১ দেশ : জেলেনস্কি

রাষ্ট্রের ব্যর্থতাই খুন হয় সাংবাদিক তুহিন

আপডেট সময় ০৬:২৯:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৮ অগাস্ট ২০২৫

গাজীপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে। একই দিনে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে মারধর এমনকি ইট দিয়ে থেঁতলে নির্যাতন করা হয় আরেক সাংবাদিককে। রাজধানীর পাশে দেশের সর্ববৃহৎ এ নগরীতে প্রকাশ্য এমন বেপরোয়া ঘটনায় উদ্বিগ্ন সচেতন নাগরিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ।
সাংবাদিক তুহিন হত্যাকাণ্ডের পরপরই চাঁদাবাজির বিষয়টি চাউর হয়। বলা হয়, চাঁদাবাজির প্রতিবেদন করায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। সত্যিই কি চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড। ঘটনার সুলোক সন্ধানে জানা গেছে, ঘটনাটি সেরকম নয়। মূলত হানিট্র্যাপ থেকে ঘটনার সূত্রপাত। যে ঘটনার ভিডিও করায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন তুহিন।
সাংবাদিক হত্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু প্রতিটি হত্যাই যেন নতুন করে আমাদের অসাড় রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখোশ উন্মোচন করে। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ‘আমার সংবাদ’ পত্রিকার প্রতিনিধি মো. তুহিন সরকারকে ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট রাতে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। যেভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে, তা শুধু বর্বরই নয়, ভয়ঙ্কর বার্তা বহন করে-এই দেশে সাংবাদিকতা করা মানে মৃত্যু ডেকে আনা।
তুহিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর পুলিশ বলেছে, ‘ব্যক্তিগত শত্রুতা’ থেকে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। অথচ এলাকাবাসী, সহকর্মী ও পরিবার একবাক্যে বলছে, তুহিন একজন সৎ, সাহসী ও নির্ভীক সাংবাদিক ছিলেন, যিনি স্থানীয় দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ভূমিদস্যুতা, রাজনৈতিক অপকর্ম ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লিখতেন। তাহলে প্রশ্ন আসে, ব্যক্তি শত্রুতা কেন জন্ম নেবে? কী সেই কারণ, যা একজন তরুণ সংবাদকর্মীকে খুনের টার্গেটে পরিণত করল?
তুহিন হত্যা নিয়ে রাষ্ট্রের ভূমিকা আবার প্রশ্নের মুখে। রাষ্ট্র বলতে আমরা বুঝি সরকার, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার ব্যবস্থা। অথচ প্রতিবার সাংবাদিক খুন হলে এই রাষ্ট্র অদৃশ্য থাকে। নিন্দা জানায় কয়েকজন, তদন্তে নামে পুলিশ, কিছুদিন সংবাদপত্রে তোলপাড় হয়, তারপর সব থেমে যায়। আমরা দেখেছি, সাগর-রুনি হত্যার ১৩ বছরেও বিচার হয়নি। ২০২৩ সালে খুলনার সাংবাদিক রুবেল হত্যার বিচার কই? ২০২৪ সালে কুমিল্লার রিপন, নারায়ণগঞ্জের রিয়াজ, কক্সবাজারের বাবুল—সবাই একই পরিণতির শিকার। এর চেয়েও ভয়াবহ বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুনের বিচার হয়নি, কেস ধামাচাপা পড়ে গেছে, কিংবা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় আসামিরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
সাংবাদিক তুহিনের মতো সংবাদকর্মীরা আসলে সমাজের আয়না। তারা যা দেখেন, তা তুলে ধরেন। তারা সমাজের সমস্যা, অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ—সব কিছু জনগণের সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ দেশের শাসনব্যবস্থা আজ এমন এক জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে, যেখানে সত্য বলা মানে ক্ষমতার রোষানলে পড়া। সাংবাদিকরা যখনই সত্যকে তুলে ধরেন, তখনই তাদের বিরুদ্ধে শুরু হয় মামলা, হুমকি, হামলা, এবং শেষ পর্যন্ত জীবননাশের মতো অপরাধ।
তুহিনের ক্ষেত্রে ঠিক এটাই ঘটেছে। তিনি স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন। তথ্য অনুসন্ধানে তিনি বারবার হুমকি পেতেন। পরিবার জানিয়েছে, হত্যার আগের দিনও তাকে মোবাইলে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এমন হুমকি অনেক সাংবাদিকই পান, কিন্তু খুব কমই রাষ্ট্র তাদের সুরক্ষা দিতে এগিয়ে আসে। রাষ্ট্র কি জানত না, তুহিন ঝুঁকিতে ছিলেন? যদি জানত, তাহলে তাকে সুরক্ষা দেওয়া হয়নি কেন? আর যদি না-ই জানত, তাহলে তথ্য ব্যবস্থা, গোয়েন্দা নজরদারি ও রাষ্ট্রীয় সজাগতা এত দুর্বল কেন?
এই হত্যাকাণ্ড আবারও প্রমাণ করল-বাংলাদেশে সাংবাদিকতা আজ ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। ২০২৫ সালের আগেই ১২ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, আর নিগ্রহ, হয়রানি, মামলা, হামলার সংখ্যা শত ছাড়িয়েছে। যারা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারান, তারা কেবল কোনো পত্রিকার কর্মী নন, তারা রাষ্ট্রের দায়ে নিয়োজিত নাগরিক। কারণ তথ্য জানার অধিকার নাগরিকের মৌলিক অধিকার-আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে যারা জীবন দেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখা যাক
Committee to Protect Journalists (CPJ) অনুযায়ী ১৯৯২ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মোট ২৩ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন ।
ইউনেস্কো বলছে ২০০৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত, মোট ২৬ জন সাংবাদিক বা ব্লগার নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১১টি মামলার তদন্ত এখনও অনির্দিষ্ট ।
২০২৪ সালের পরিস্থিতিReporters Without Borders (RSF) জানায়, ২০২৪ সালে ৫ জন সাংবাদিক হত্যা হয়েছে, যাদের মধ্যে পাঁচজনই একই সময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময়“মনসুন বিপ্লব”এর সময় নিহত ।
আরও সংক্রান্ত প্রতিবেদনে লক্ষ্য করা যায়, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত ৬ জন সাংবাদিক নিহত হয় এসব হত্যাকাণ্ড সংবিধান রক্ষায় আন্দোলনরত সময় সংঘটিত ছিল ।
দীর্ঘমেয়াদে (১৯৯২ু২০২২) ২৩-২৬ জন
বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যার আলোচিত ঘটনা :
১১ ফেব্রুয়ারী ২০১২ সালে সাগর-রুনি দম্পতিকে বাসায় ঢুকে রাতের বেলায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১২ বছরের বেশী পেরিয়ে গেলেও আমরা এখনও সেটার বিচার পাইনি। এই দম্পতি হত্যার প্রতিবেদন জমা পড়ে ১০০ বারেরও বেশী।
২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারী মানিক সাহা হত্যার কথা মনে নাই অনেকেরই। খুলনার মানিক সাহা দৈনিক সংবাদ ও বিবিসি বাংলার সাংবাদিক। বোমা হামলা হত্যা করা হয় তাকে। ধারণা করা হয় রাজনৈতিক সন্ত্রাস জড়িত ছিল। বিচার পায়নি।
দূর্নীতির রিুদ্ধে রিপোর্ট করায় ২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর ধারালো ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয় ময়মনসিংহের স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক মিজানুর রহমানকে। তার বিচারও পাইনি আমরা
২০০১ সালে সিরাজগঞ্জের সাংবাদিক দীপক সাহা রাজনৈতিক দূর্নীতির খবর করায় হত্যা করা হয়। রাজনৈতিক কারনে সেখানেও বিচার পায়নি ভূক্তভোগী পরিবার
তুহিন হত্যার দায় তাই রাষ্ট্র এড়াতে পারে না। শুধু হত্যাকারীদের খুঁজে বের করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। হত্যাকারীদের উৎস, মদদদাতা, রাজনৈতিক সংযোগ, পুলিশি ব্যর্থতা, গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা—সবকিছুর তদন্ত হওয়া উচিত। প্রয়োজনে উচ্চ পর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা দরকার, যারা তুহিন হত্যাকাণ্ডের পেছনের আসল চক্রকে বের করে আনবে।
এখানে একটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া জরুরি: সাংবাদিক হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা একটা ধারাবাহিকতা। আর এই ধারাবাহিকতার উৎস হলো—রাষ্ট্রের দায়হীনতা, বিচারহীনতা ও ভীতিকর রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতিতে সাংবাদিককে হুমকি দিলে কিছু হয় না, মারলে মামলা হয় না, হত্যা করলেও বিচার হয় না—সেই সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।
সাংবাদিক হত্যার বিচার না হওয়া মানে সত্যের কণ্ঠরোধ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মৃত্যু, এবং সর্বোপরি গণতন্ত্রের গলা চেপে ধরা। বাংলাদেশ যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক হতে চায়, তবে গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। আর তা নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্রকে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার দায় নিতে হবে, প্রয়োজনে আলাদা সাংবাদিক সুরক্ষা আইন করতে হবে, সাংবাদিকদের হুমকির অভিযোগগুলোর দ্রুত তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা যদি সত্যিই সাংবাদিক তুহিন হত্যার বিচার চাই, তবে শুধু ‘দোষীদের গ্রেপ্তার’ দাবি করলেই চলবে না। আমাদের প্রশ্ন তুলতে হবে—এই হত্যাকাণ্ড ঘটার পরিবেশ তৈরি হলো কীভাবে? তুহিন যাদের বিরুদ্ধে লিখতেন, তারা এত সাহস পেল কীভাবে? রাষ্ট্র তাদের শেল্টার দিল কিনা? প্রশাসন, পুলিশ বা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব এতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত কিনা? তুহিন হত্যাকাণ্ড যেন আরেকটি স্ট্যাটিস্টিক হয়ে না যায়-এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা চাই, রাষ্ট্র কার্যকরভাবে তদন্ত করুক, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিক এবং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো সংবাদকর্মী হত্যার শিকার না হন, সেই নিশ্চয়তা দিক। এমন এক সমাজ গড়ার জন্য যেখানে সত্য বলাটা অপরাধ না, বরং সাহসিকতার সম্মান হবে। তুহিনের রক্ত শুধু তার পরিবারের আহাজারি নয়, তা গোটা সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়ার জন্য যথেষ্ট। যদি এই হত্যার বিচার না হয়, তবে আমরা শুধু একজন সাংবাদিক হারালাম না, হারালাম গণতন্ত্রের এক অমূল্য স্তম্ভ।

লেখক- বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি