মেহেরপুর গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল হাসানকে ঘিরে টেন্ডারবিহীনভাবে সরকারি কাজ বাস্তবায়নের অভিযোগ নিয়ে জেলায় যখন ব্যাপক আলোচনা চলছে, তখন সামনে আসতে শুরু করেছে আরও কিছু বিস্ময়কর তথ্য। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, স্থানীয় ঠিকাদার, নির্মাণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং গণপূর্ত বিভাগের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভিযোগের পরিধি শুধু ১৯টি প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা একটি অস্বচ্ছ কার্যপদ্ধতির মাধ্যমে সরকারি উন্নয়নকাজ পরিচালিত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় ঠিকাদারদের দাবি, মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। সরকারি ক্রয়বিধির মূল উদ্দেশ্য হলো সর্বনিম্ন ব্যয়ে সর্বোচ্চ মানের কাজ নিশ্চিত করা এবং সকল যোগ্য ঠিকাদারের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই কাজের তথ্য গোপন রাখা, নির্বাচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে কার্যাদেশ দেওয়া এবং প্রকল্পের তথ্য প্রকাশ না করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জেলার কয়েকজন প্রবীণ ঠিকাদার জানান, অতীতে গণপূর্ত বিভাগের অধিকাংশ কাজ ই-জিপি বা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হতো। ফলে কাজের গুণগত মান, ব্যয় এবং সময়সীমা নিয়ে স্বচ্ছতা থাকত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। তাদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করছেন এবং সাধারণ ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রকল্পে কাজ শুরুর আগেই সম্ভাব্য ব্যয় ও বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যে অসঙ্গতি তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পূর্ণাঙ্গ মতামত গ্রহণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। কয়েকটি দপ্তরের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে তারা শুধু কাজ চলমান অবস্থায় বিষয়টি জানতে পেরেছেন। কাজের প্রকৃত ব্যয়, নকশা বা অনুমোদিত পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না।
গণপূর্ত বিভাগের দায়িত্ব হচ্ছে সরকারি ভবন, দপ্তর, হাসপাতাল, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক স্থাপনার নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ। এ ধরনের কাজ সাধারণত নির্ধারিত বিধি অনুসরণ করে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে নিয়মিতভাবে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের চর্চা রয়েছে এবং দেশের অন্যান্য জেলাতেও ই-টেন্ডার ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ওয়েবসাইটে নিয়মিত দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নজির রয়েছে।
এমন বাস্তবতায় মেহেরপুরে টেন্ডার ছাড়া প্রায় আড়াই কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়নের অভিযোগ নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল হাসানের বিরুদ্ধে স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি কাজ বাস্তবায়নের অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রকল্প তদারকি। বিভিন্ন স্থানে কাজের সাইনবোর্ডে ব্যয়ের পরিমাণ, বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের নাম কিংবা কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা উল্লেখ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকল্প সম্পর্কে তথ্য জানা কঠিন হয়ে পড়ছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, সরকারি অর্থে পরিচালিত যেকোনো উন্নয়নকাজে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রে সেই মৌলিক তথ্যই অনুপস্থিত।
নির্মাণ খাতের একাধিক বিশেষজ্ঞের মতে, সরকারি কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে দুর্নীতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ প্রতিযোগিতাহীন পরিবেশে ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং জবাবদিহিতার অভাব দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে সংস্কার ও মেরামত প্রকল্পগুলোতে ব্যয়ের যথার্থতা যাচাই করা তুলনামূলক কঠিন হওয়ায় সেখানে অনিয়মের সুযোগ বেশি থাকে।
স্থানীয় সূত্রগুলো আরও অভিযোগ করেছে, কিছু প্রকল্পে একই ব্যক্তি বা একই গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন নামে কাজ পেয়েছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। তবুও বিষয়টি নিয়ে জেলায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব নয়।
জেলার ব্যবসায়ী সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি বলেন, সরকারি উন্নয়নকাজ স্থানীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজ হলে জেলার অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসার সুযোগ পায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ে। কিন্তু সীমিত কয়েকজন ব্যক্তি বারবার কাজ পেলে সেই সুফল বৃহত্তর অর্থনীতিতে পৌঁছায় না।
এদিকে প্রশাসনের ভেতরেও নীরব অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। একাধিক কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন যে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও অনেক সময় প্রকাশ্যে মন্তব্য করা সম্ভব হয় না। কারণ একই প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে কাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের চাপ ও জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়।
রফিকুল হাসানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ‘জরুরি প্রয়োজন’-এর যুক্তি। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, জরুরি প্রয়োজনের কারণেই কিছু কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হয়েছে। তবে কোন কোন প্রকল্পকে জরুরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, সেই সিদ্ধান্তের লিখিত ভিত্তি কী ছিল এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। অভিযোগকারীরা বলছেন, যদি সত্যিই জরুরি প্রয়োজন থেকে থাকে, তাহলে সেই অনুমোদনপত্র ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক।
গণপূর্ত বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্যও বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্ট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জানিয়েছেন, অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত নন এবং অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে। এই বক্তব্যের পর স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি কেবল মৌখিক অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রকল্পভিত্তিক নথি, ব্যয়, অনুমোদন এবং কার্যাদেশ যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পরিচালিত হবে।
বাংলাদেশে অতীতেও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে টেন্ডার অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত, বদলি কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে প্রকৌশলী ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
মেহেরপুরের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা। তারা বলছেন, অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা যাই হোক, প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত। কোন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কার মাধ্যমে কাজ হয়েছে, কোন প্রক্রিয়ায় কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে এবং কাজের গুণগত মান কেমন—এসব তথ্য প্রকাশ করলে বিতর্কের অনেকটাই দূর হবে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থামছে না। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে যদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হয়, তাহলে উন্নয়নকাজের প্রতি জনগণের আস্থা কমে যাবে। আবার কেউ কেউ বলছেন, অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়; বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন হওয়া প্রয়োজন।
জেলার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন একটাই—অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক অথবা অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো হোক। কারণ সরকারি অর্থ জনগণের অর্থ, আর সেই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
সব মিলিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল হাসানকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন শুধু একটি প্রশাসনিক বিতর্ক নয়; এটি সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা, উন্নয়নকাজের স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় পর্যায়ের জবাবদিহিতা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হলে শুধু একটি অভিযোগের নিষ্পত্তিই হবে না, বরং ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















