কুমিল্লা জেলা শিক্ষা অফিসার মো: রফিকুল এর বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম, বিভিন্ন সময় অফিসে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে উঠেছে। তাঁর স্বেচ্ছাচারিতায় অতিষ্ট হয়ে পড়েছেন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক সমাজ। বিতর্কিত এই কর্মকর্তার ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তার ভাইয়ের সম্পৃক্ততাসহ দাপ্তরিক বিভিন্ন অনিয়ম-অপরাধে অভিযুক্ত এ কর্মকর্তার নিয়োগ ও পদায়নে নানা অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে রফিকুল ইসলামের অতীত কর্মকান্ডের তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এরপরও তাকে কেন গুরুত্বপূর্ণ এ পদে রাখা হয়েছে তা নিয়ে ক্ষোভে ফূঁসছেন কুমিল্লা জেলার সুশীলসহ শিক্ষক সমাজ। তাদের প্রশ্ন, স্বৈরাচারের দোসর, আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী মো: রফিকুল ইসলামের খুঁটির জোর কোথায়?
সম্প্রতি এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শিক্ষা উপদেষ্টা,শিক্ষা সচিব ও মহাপরিচালক মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং চেয়ারম্যান দুর্নীতি দমন কমিশন বরাবরে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী কায়সার কামাল।
লিখিত অভিযোগে বলেন, কুমিল্লা জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ রফিকুল ইসলাম সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন খুঁটিনাটি ভুলত্রুটি শনাক্ত করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে মোটা অংকের ঘুষ আদায় করছেন। আবার ঘুষের টাকা আদায়ের জন্য কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের মিথ্যা অভিযোগে নাজেহালও করেছেন। পড়াশুনার দিক থেকে কুমিল্লা জেলার ছেলে-মেয়েরা অনেক এগিয়ে থাকলেও জেলা শিক্ষা অফিসারের অনিয়ম-দুর্নীতির কারনে বোর্ড পরীক্ষায় জেলাটি সেরা হতে পারছে না।
সরকারের এমপিওভূক্তি ঘোষণার কারণে- জেলা শিক্ষা অফিসার, জেলার শিক্ষকদের বিভিন্ন ধরনের অজুহাত নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশে কালক্ষেপন করছেন। যার ফলে লেখা পড়ার মান উন্নয়নে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমপিও ভুক্তকরার আদেশ উপেক্ষা করা নিয়েও তাল বাহানা করে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করতে চেয়েছেন।
ইতোপূর্বে জেলার সকল শিক্ষা কার্যক্রম সঠিকভাবেই চলছিল সাম্প্রতিক এ দুর্নীতিবাজ শিক্ষা অফিসারের কারণে নাজেহাল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি নিয়মিত অফিসের দায়িত্ব পালন করছেন না। দুর্নীতির টাকায় ঢাকায় আলিশান ফ্ল্যাট কিনে বসবাস করছেন। তার ব্যাংক একাউন্ট স্থাবর অস্থাবর সম্পদের বিষয়টি তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে অপকর্মসহ দুর্নীতির সকল রহস্য। তবে সাবেক কর্মস্থল ময়মনসিংহ জেলায় ও হয়েছেন বিতর্কিত।
ময়মনসিংহের অপকর্ম : অনুসন্ধান বলছে , ময়মনসিংহের সাবেক জেলা শিক্ষা অফিসার রফিকুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানটিতে বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অতিউচ্ছ্বাসিত ভূমিকা পালন করছেন। তিনি ময়মনসিংহ জেলায় শিক্ষা অফিসার পদে তিন বছরের অধিক দায়িত্বরত ছিলেন এবং জনসম্পৃক্ততা ছিল । স্বার্থান্বেষী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে জনস্বার্থে অন্যত্র বদলি করা সমীচীন বলে তদন্ত কর্মকর্তারা দৃঢ়ভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
২০১৯ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমটির প্রতিবেদনের পরও তিনি আরো চার বছর ময়মনসিংহে স্বপদে বহাল ছিলেন। এখন ২০২৫ সাল। সেই রফিকুল ইসলাম এখন কুমিল্লা জেলা শিক্ষা অফিসার। একইসঙ্গে উপ-পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
জানা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে শিক্ষা মন্ত্রাণালয় রফিকুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করার সুনির্দিষ্ট ধারা উল্লেখসহ প্রস্তাব পাঠাতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দিয়েছিল। এছাড়াও রফিকুলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করার অভিযোগনামা ও অভিযোগ বিবরনী পাঠাতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু স্বৈরাচার শেখ হাসিনার শাসনামলে অধিদপ্তরের সরকারি মাধ্যমিক শাখার আওয়ামী পন্থী সিন্ডিকেট মোটা অংকের ঘুষ খেয়ে সেই ফাইলটি গায়েব করে ফেলেছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৫ মার্চ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. শাহীনুর ইসলাম স্বাক্ষরিত তাগিদপত্র অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পৌঁছালেও অদ্যাবধি কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, রফিকুল ইসলাম ২০১৮ সালে ময়মনসিংহ জেলা শিক্ষা অফিসার থাকাকালে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যে লিপ্ত হন। শিক্ষা মন্ত্রালয়ের ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্যমতে, ত্রিশাল উপজেলার কাটাখালী উমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে।
ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রফিকুল ইসলামের সহযোগিতায় ছিলেন-তৎকালীন ত্রিশাল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকজন।
জানা যায়, মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে ত্রিশাল উপজেলার কাটাখালী উমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ তদন্তে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের অধ্যক্ষকে আহ্বায়ক করে দুই সদস্যর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে মাধ্যামিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের এক আদেশে এ তথ্য জানা গেছে।
অভিযোগ ছিলো, রফিকুলের সিন্ডিকেট এবং ওই স্কুলটির প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সহকারী গ্রন্থাগারিক ও নিম্নমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগে বাণিজ্য করে আর্থিক লাভবান হয়েছেন। নিয়োগ বাণিজ্যের প্রতিবাদে ম্যানেজিং কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য পদত্যাগ করেছিলেন। এ নিয়োগের সময় প্রতিষ্ঠানটির নিয়োগ সংক্রান্ত মামলা চলমান ছিলো। কিন্তু জেলা প্রশাসকের সুপারিশ মানা হয়নি।
২০১৯ সালের ১৮ মার্চ আনন্দ মোহন কলেজের অধ্যক্ষ মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠান। মহাপরিচালক ওই প্রতিবেদনটি শিক্ষা সাচিবকে পাঠান ওই বছরের ২২ আগস্ট। প্রতিবেদনে জেলা শিক্ষা অফিসার রফিকুল ইসলামের কাছে নিয়োগ, ম্যানেজিং কমিটিসহ কয়েকটি বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগ জমা দিলেও তা তদন্ত না করার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
নিম্নমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ওই পদে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ প্রমাণ পায় কমিটি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ম্যানেজিং কমিটির পাঁচজন সদস্য পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগও প্রমাণিত হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়,বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির শূণ্যপদ পূরণ না করে কমিটি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে যা উদ্দেশ্য প্রণোদিত হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, প্রধান শিক্ষক হিসেবে মো: আফাজ উদ্দিনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি ধানীখোলা ওসমানীউ উচ্চ বিদ্যালয়ের শরীর চর্চ্চা শিক্ষক এবং শিক্ষা জীবনে দুইটি তৃতীয় বিভাগ রয়েছে। সভাপতির আপন চাচাতো ভাই হওয়ায় স্বজন প্রীতির অভিযোগ রয়েছে। নিম্নমান সহকারী পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে সভাপতির আপন ছোট ভাই শহীদুর রহমানকে।
এদিকে অভিযুক্ত রফিক মনোহরদী উপজেলার একটি রাজনৈতিক দলের সাবেক ক্যাডার ছিলেন এবং তার বড় ভাই প্রয়াত শফিকুল ইসলাম কেন্দ্রীয় সাবেক নেতা। তিনি ডা. মিলন হত্যার় অন্যতম আসামি। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি পুত্র মুন্না হত্যার অন্যতম আসামি। এছাড়াও রফিকুল ইসলামের নামে নরসিংদী সদর থানায় এবং নরসিংদীর বিজ্ঞ মাজিস্ট্রেট আদালতে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রফিকের একজন সাবেক সহকর্মী গণমাধ্যম কে বলেন, ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনকালিন তার দাপটে কোণঠাসা থাকতো অফিসের অন্য সহকর্মীরা। নিয়োগ-বদলি নিয়ে নানা অনিয়ম ও সেচ্ছাচারিতায় লিপ্ত থাকলেও তার দাপুটে আচরণে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি। তবে তার বিরুদ্ধে এসব অনিয়মের বিভাগীয় তদন্তে কুকর্মের প্রমান পাওয়া গেলেও পদোন্নতি অব্যহত রয়েছে এটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।
এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা জেলা শিক্ষা অফিসার রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। এ বিষয়গুলো তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
উল্লেখ্য যে,কুমিল্লা জেলার অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকবৃন্দ দুর্নীতিবাজ এই আওয়ামী দোসর-কুমিল্লা জেলা শিক্ষা অফিসার মো: রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় সুষ্ঠু তদন্ত করে অধিষ্টিত পদ থেকে অপসারণ করার দাবী জানিয়েছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























