*ফান্ডের টাকা গায়েব, জমি দখল।
*গাছ বিক্রি ও নিয়োগ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার নানকর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক (অবসরপ্রাপ্ত) প্রধান শিক্ষক আঃ মোন্নাফ মন্ডল এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন আলীর বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তাদের এই বেপরোয়া দুর্নীতির কারণে ঐতিহ্যবাহী এই নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, যার ফলে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে স্থানীয় এলাকাবাসী ও অভিভাবকদের মাঝে। এই দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং বিদ্যালয়ের সম্পদ উদ্ধারের দাবিতে সম্প্রতি জোনাল উপ-পরিচালক (জুপ-পরিচালক), রংপুর অঞ্চল বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও অভিভাবকবৃন্দ।
অভিযোগের বিবরণ থেকে জানা যায়, নানকর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আঃ মোন্নাফ মন্ডল গত ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এ অবসরে গেলেও বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়েননি। সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান কাগজপত্র নিজের জিম্মায় রেখে শিক্ষক ইয়াছিন আলীকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে তিনি সকাল-সন্ধ্যা বিদ্যালয়ে খবরদারি ও প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছেন। এমনকি অবসরে যাওয়ার পরেও বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাবের অপারেটর পরিবর্তন না করে দুজনে যৌথ যোগসাজশে উপবৃত্তি ও টিউশন ফির ৮০,০০০/- (আশি হাজার) টাকা ব্যাংক থেকে তুলে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

সবচেয়ে বড় জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে বিদ্যালয়ের জমি ও নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে। ১৯৯৮ সালের ৩ আগস্ট আঃ মোন্নাফ মন্ডল বিদ্যালয়ের কাছে ৫০ শতক জমি বিক্রি করে রেজিস্ট্রি দলিল করে দিলেও, দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে সেই জমি স্কুলকে বুঝিয়ে না দিয়ে নিজেই ভোগদখল করছেন। এ ছাড়া গত ০২/০২/২০২৪ ইং তারিখে নিয়মবহির্ভূতভাবে চতুর্থ শ্রেণির দুইজন কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে ২০ লক্ষ টাকা ডোনেশন বাবদ হাতিয়ে নিয়েছেন সাবেক এই প্রধান শিক্ষক। অন্যদিকে, ২০০০ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত অপর এক কর্মচারীকে দীর্ঘ ২৬ বছরেও এমপিওভুক্ত না করায় তিনি বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন আলী ও সাবেক প্রধান শিক্ষকের খামখেয়ালিপনায় পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সাবেক প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে বিদ্যালয়ের জেনারেল ফান্ডের সমস্ত টাকা গোপনে তুলে আত্মসাৎ করেন, যার ফলে বর্তমানে স্কুলের তহবিল সম্পূর্ণ শূন্য। শুধু তাই নয়, ম্যানেজিং কমিটির কোনো অনুমোদন ছাড়াই বিদ্যালয়ের মাঠের বহু মূল্যবান ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ কেটে তা বাজারে বিক্রি করে টাকা পকেটে পুরেছেন আঃ মোন্নাফ মন্ডল ও ইয়াছিন আলী। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দকৃত টিউশন ফির লক্ষ লক্ষ টাকাও তারা দুজনে মিলে আত্মসাৎ করে আসছেন বলে ভুক্তভোগী শিক্ষকেরা জানিয়েছেন।
এদিকে বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত আক্রোশবশত বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন অত্যন্ত জনপ্রিয় মৌলভী শিক্ষক আবুল কাশেমকে ভুয়া ও মিথ্যা অভিযোগে শ্রেণির পাঠদান থেকে বিরত রেখেছেন এই দুই শিক্ষক। অভিভাবকেরা বারবার ওই মৌলভী শিক্ষকের ক্লাসে ফেরার দাবি জানিয়ে আবেদন করলেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইয়াছিন আলী তা আমলে নেননি। উল্টো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারীকে শিক্ষকের চেয়ারে বসিয়ে অফিসের কাজ করানো হচ্ছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক পদমর্যাদার চরম অবমূল্যায়ন।
মিঠাপুকুরের নানকর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এলাকাবাসী ও অভিভাবকদের পক্ষে দায়েরকৃত অভিযোগে জোর দাবি জানানো হয়েছে যে, অনতিবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের সুষ্ঠু তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের বেদখল হওয়া জমি উদ্ধার, গাছ বিক্রির টাকা ও নিয়োগ বাণিজ্যের ডোনেশনের টাকা প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডে ফেরত আনা, বঞ্চিত মৌলভী শিক্ষক আবুল কাশেমকে দ্রুত ক্লাসে ফেরানো এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের টিউশন ফির বকেয়া টাকা পরিশোধের জন্য প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
এ বিষয়ে রংপুর অঞ্চলের জোনাল উপ-পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শহীদুল ইসলাম বিশেষ প্রতিনিধি 





















