ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজই হলো অতিরিক্ত লাভের আশায় কাজে অনিয়ম করা, আর ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ হলো পুলিশের মতো পাহারা দিয়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে মানসম্মত কাজটি আদায় করা। গ্রামের ভাষায় একটা কথা আছে, “ক্ষেতে বেড়া দিয়েছি, ক্ষেত যেন ছাগলে না খায়, কিন্তু বেড়াই যদি ক্ষেত খায়, তাহলে এর প্রতিকার কী?” সরেজমিনে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা মডেল মসজিদের নির্মাণকাজে যে দৃশ্যমান অনিয়ম দেখা গেল, তাতে করে বলাই যায়, ‘চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি’ প্রবাদটির সঙ্গে মিলে যায় হাতিয়া মডেল মসজিদের নির্মাণকাজের অবস্থা।
অভিযোগ উঠেছে, আল্লাহর ঘর পবিত্র মসজিদ নির্মাণে নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের কিছু অসাধু (প্রকৌশলী) কর্মকর্তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার কারণে মসজিদটির নির্মাণকাজে নিম্নমানের ইট, বালি, পাথর দিয়ে কাজ চালিয়ে গেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সরেজমিনে অনুসন্ধানে হাতিয়ায় যাওয়ার পর এই মসজিদটির নির্মাণকাজের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে তথ্য অধিকার আইনের ‘ক’ ফরমে আবেদন করা হয়। এ ছাড়া বর্তমান নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবিবের কাছে সরাসরি গিয়ে আলোচনা করে তথ্যের জন্য আবেদন করা হয়। আবেদন করার কয়েক মাস পার হলেও নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগ থেকে হাতিয়া উপজেলা মডেল মসজিদ নির্মাণকাজের কোনো তথ্য সরবরাহ করেননি নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবিব কিংবা তাঁর দপ্তর। এমনকি এই বিষয়ে নোয়াখালী গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীকে অসংখ্যবার কল দিলেও তিনি ফোনকলটি রিসিভ না করায় তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলেও তিনি কোনো রিপ্লাই দেননি।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, মসজিদটির নির্মাণকাজ তদারকির সরেজমিন দায়িত্বে ছিলেন নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. তাজুল ইসলাম। তাজুল ইসলাম তাঁর অনিয়মের দায় এড়াতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবিবের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে পরামর্শ দেন। নির্বাহী প্রকৌশলী উপস্থিত থাকা অবস্থায় মসজিদটির নির্মাণকাজ চলমান থাকলেও তিনিও অনিয়মের দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। নির্বাহী প্রকৌশলী তথ্য অনুসন্ধানের স্বার্থে তথ্য চেয়ে আবেদন করার পরও অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তথ্য সরবরাহ করেননি। এমনকি তিনি কখনো মোবাইল কলটিও রিসিভ করেননি।
সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে দেখা যায়, সর্বশেষ কাজের অংশ হিসেবে মসজিদটিতে এ যাবৎকালীন যতগুলো ইট ব্যবহার হয়েছে, প্রতিটি ইটই ছিল নিম্নমানের। এখন চলমান কাজে নিম্নমানের ইট-বালু ব্যবহার দৃশ্যমান দেখা যায়।
সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে ঠিকাদারের লোকজন জানান, নম্বরবিহীন ইটই নাকি হাতিয়ার এক নম্বর ইট হিসেবে গণ্য হয়। সরেজমিনে রাজমিস্ত্রিরা জানান, নির্মাণকাজের শুরু থেকে এই মডেল মসজিদটিতে যতগুলো ইট ব্যবহার করা হয়েছে, সবই নাকি নিম্নমানের ইট ছিল। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, আল্লাহর ঘর মসজিদটিতে ইট, বালু, পাথরসহ নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাতিয়া মডেল মসজিদটিতে কাজের শুরু থেকেই অনিয়ম করা হয়েছে। তাঁদের ভাষ্যমতে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকদের তো দোষ আছেই। তার চেয়ে বেশি খারাপ হলো ইঞ্জিনিয়াররা। তাঁরা নিয়মিত মসজিদটির কাজ তদারকি না করার কারণে কাজের মান একেবারে নিম্নমানের হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ওসমান মিয়া ভালো লোক নন। তিনি মসজিদটি নির্মাণে যতগুলো ইট, বালু, পাথর ব্যবহার করেছেন, প্রতিটি নির্মাণসামগ্রীই ছিল নিম্নমানের। স্থানীয় এলাকার লোকজন জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ওসমান মিয়া যদি ভালো লোকই হতেন, তাহলে তিনি কখনো মসজিদের কাজে নিম্নমানের ইট, বালু, পাথর ব্যবহার করতেন না।
আল্লাহর ঘর মসজিদ নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারসহ নিম্নমানের কাজের বিরুদ্ধে যথাযথ দাপ্তরিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























