অনুমোদন নেই, একাধিকবার নাকচ হয়েছে আবেদন, তাও তৈরি হয়ে গেছে প্ল্যান্ট। এবার অননুমোদিত সেই স্থাপনা চালুর বৈধতা পেতে ফের দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি (এসপিএল)। দফায় দফায় নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে চিঠি দিয়ে সহায়তা চাওয়া এবং তার ওপর ভিত্তি করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নতুন করে মতামত চাওয়ার প্রক্রিয়াটিকে কেন্দ্র করে উঠেছে নানা প্রশ্ন। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নেতিবাচক অবস্থান এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের কড়া সমালোচনার মুখেও বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চালানো হচ্ছে জোরালো তদবির।
ঘটনার পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরপরই অপরিশোধিত তেল আমদানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আবেদন জমা দেয় এসপিএল। তবে ‘বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি স্থাপন নীতিমালা-২০৩’ অনুযায়ী চূড়ান্ত অনুমোদন না থাকায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর আবেদনটি স্পষ্ট ভাষায় নাকচ করে দেয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ এসপিএল ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি সচিব বরাবর পুনরায় আবেদন জানায়, যেখানে তাদের বার্ষিক ১৫ লাখ মেট্রিক টন ক্ষমতাসম্পন্ন পরিবেশবান্ধব ইউরো-৫ স্ট্যান্ডার্ডের রিফাইনারি স্থাপনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়। পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৪ জুলাই সরাসরি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠিতে দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই প্ল্যান্ট সফলভাবে চালুর আকুতি জানায় তারা। এসব চিঠির ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি গত ১৮ অক্টোবর সিনিয়র সহকারী সচিব মো. এনামুল হকের স্বাক্ষরে বিপিসি চেয়ারম্যানের কাছে পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ ও মতামত চেয়ে আবারও চিঠি পাঠানো হয়, অথচ এই কর্মকর্তাই এর আগে এসপিএলের প্রথম আবেদনটি নাকচ করেছিলেন।
মন্ত্রণালয়ের বারবার মতামত চাওয়ার বিপরীতে বিপিসির অবস্থান বরাবরই নেতিবাচক। চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ের চিঠির প্রেক্ষিতে ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিপিসির ১০১৭তম বোর্ড সভায় বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়। বোর্ডের কার্যবিবরণীতে সরকারি ইআরএল ইউনিট-২ প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রাধিকার তুলে ধরে বলা হয়, প্রকল্পটি চালুর মাধ্যমে সরকারের তেল শোধন সক্ষমতা ৩ গুণ বাড়বে এবং এসপিএম প্রকল্পের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। ফলে এই মুহূর্তে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটিকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের সুযোগ দেওয়া যৌক্তিক নয় বলে একমত হন বিপিসির পরিচালকরা, যা পূর্বের ১৬ নভেম্বরের প্রস্তাব বাতিলের সিদ্ধান্তকেই সমর্থন করে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় বিতর্কের সৃষ্টি করেছে লাইসেন্স বা অনুমোদন পাওয়ার আগেই এসপিএলের কাঠামোগত প্ল্যান্ট তৈরি করে ফেলা। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে স্পষ্ট আইন লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম বিষয়টিকে সরকারের নীতিগত বিভ্রান্তি এবং অবৈধতাকে সুরক্ষার চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, কোনো অনুমোদন ছাড়া প্ল্যান্ট গড়ে তোলা একটি বড় অপরাধ এবং এজন্য সংশ্লিষ্টদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত; কোনো অবস্থাতেই রাষ্ট্র এমন বেআইনি পদক্ষেপকে অনুমোদন দিতে পারে না।
বর্তমানে পুরো বিষয়টি একটি রহস্যময় নীরবতার চাদরে ঢাকা পড়ে আছে। জ্বালানি বিভাগের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপের বিষয়ে বক্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও এসপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার কিংবা সিইও প্রণব কুমার সাহা কারোরই কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও নাম প্রকাশ করে কোনো কথা বলতে রাজি হননি এবং বিপিসির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামও এ নিয়ে মুখ খোলেননি, যা একটি চূড়ান্ত অবৈধ স্থাপনাকে আইনি রূপ দেওয়ার তৎপরতাকে আরও বেশি সন্দেহজনক করে তুলেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















