সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোতে তীব্র জনবল সংকটের মধ্যে ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে জোর তাগিদ দিয়েছে জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। একই সঙ্গে প্রবাসীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সৌদি আরবে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জনবল বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিগত সরকারের অপপ্রচার মোকাবিলায় নতুন কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদ ভবনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির তৃতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি পর্যালোচনা ও নীতিগত আলোচনা করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী।
বৈঠকের প্রথম আলোচ্যসূচি অনুযায়ী, আগের দ্বিতীয় বৈঠকের কার্যবিবরণী নিশ্চিত করা এবং সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। পরে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম কমিটিকে জানান, আগের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে অবৈধভাবে বিদেশ গমন ও মানবপাচার রোধে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ। কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আলোচিত ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়ে কমিটিকে সর্বশেষ তথ্য জানানো হয়।
এ ছাড়া গত ১৫ অক্টোবর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের বিষয়টি পর্যালোচনা করেন কমিটির সদস্যরা। ওই পরিদর্শনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগ সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছিল। একই সঙ্গে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) নির্বাহী কমিটির এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের সদস্য পদে স্থায়ী কমিটির সভাপতির প্রার্থিতার পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্বাচনী প্রচার-সংক্রান্ত সহযোগিতার বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়।
বৈঠকে সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনগুলোর কার্যক্রম এবং তীব্র জনবল সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়। বর্তমানে সৌদি আরবে বাংলাদেশের তিনটি মিশন রয়েছে—রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস, জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল এবং জেদ্দায় ইসলামি সহযোগিতা সংস্থায় (ওআইসি) বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন।
রিয়াদ দূতাবাসের মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষাসহ বিভিন্ন পররাষ্ট্র কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অথচ দূতাবাসের কূটনৈতিক, শ্রম ও কল্যাণ, বাণিজ্যিক, প্রেস, প্রতিরক্ষা, অর্থনৈতিক এবং পাসপোর্ট ও ভিসাসহ বিভিন্ন শাখায় রাষ্ট্রদূতের অধীনে মাত্র ১৪ জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে, জেদ্দার কনস্যুলেট জেনারেলে বিপুলসংখ্যক প্রবাসীকে কনস্যুলার সেবা দেওয়া, শ্রমিকদের কল্যাণ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও হজ ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত রয়েছেন মাত্র ১১ জন কর্মকর্তা। এ ছাড়া ওআইসিতে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে স্থায়ী প্রতিনিধির সঙ্গে মাত্র একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন।
সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বৈঠকে বলা হয়, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি বিদেশে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালে তাঁর উদ্যোগে ২১৭ জন কর্মী পাঠানোর মধ্য দিয়ে যে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল, তা বর্তমানে ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে।
তবে বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর কল্যাণ, অধিকার রক্ষা ও প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সেবা নিশ্চিত করার তুলনায় মিশনগুলোর বর্তমান জনবল অত্যন্ত অপ্রতুল। সীমিত জনবল নিয়ে এত বিস্তৃত দায়িত্ব পালন মিশনগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকার যখন শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, সৌদি আরবে বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধি এবং দেশে সৌদি বিনিয়োগ আকর্ষণে কাজ করছে, তখন এ সংকট আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বৈঠকে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মোকাবিলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়েও আলোচনা হয়। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম কমিটিকে মন্ত্রণালয়ের গৃহীত আধুনিক কূটনৈতিক কৌশল সম্পর্কে অবহিত করেন।
সভাপতির অনুমতিক্রমে বিবিধ বিষয়েও আলোচনা হয়। এ সময় উপস্থিত সদস্যরা জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় উত্থাপন করেন। সবশেষে কমিটির সভাপতি গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো পুনর্ব্যক্ত করেন এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বৈঠকের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক 























