ঢাকা ০৫:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বোরহানউদ্দিনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে দুই ভাইয়ের মৃত্যু, বাঁচলেন বাবা শিশু চুরির সন্দেহে পিটুনিতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিহত ১, আটক ১ সরকারি কর্মকর্তাদের অফিসকক্ষে জাতীয় পতাকা প্রদর্শনে নির্দেশনা সাগরে নামার আগেই ঋণের জালে জেলেরা দেড় কোটি ঘুষে ১৫ কোটি বিল: বরিশাল গণপূর্তে চলছে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের মহাজালিয়াতি রাজশাহীতে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ১, পলাতক আরেকজন জাল সনদে চাকরিতে ঢুকে নজরুল ইসলাম এখন প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ! হরমুজে জাহাজ চলাচল করলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার হুমকি ইরানের অবৈধ মোবাইল ফোন বন্ধে ১ জানুয়ারি থেকে চালু হচ্ছে এনইআইআর সাজেক নিয়ে কী হচ্ছে, প্রশ্ন শফিকুর রহমানের

হাজার টাকার চাকুরে জাকিরের শতকোটি টাকার অঢেল সম্পদের সাম্রাজ্য!

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের (জিসিসি) অঞ্চল-৫-এর রাজস্ব কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. জাকির হোসেনের চাকরিজীবনের সূচনা হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৪৭৫ টাকা মাসিক বেতনে। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় সরকারি চাকরিতে অতিবাহিত করার পর তার দৃশ্যমান সম্পদ, ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা ও জীবনযাপন নিয়ে এখন তৈরি হয়েছে নানামুখী বিতর্ক ও প্রশ্ন। রাজধানীর উত্তরা ও গাজীপুরের টঙ্গীতে ফ্ল্যাট, আলিশান বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের মহার্ঘ্য গাড়িসহ বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তার বৈধ আয় ও অর্জিত সম্পদের সামঞ্জস্যতা নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার মধুপুর গ্রামের মো. মোহাব্বত আলীর ছেলে মো. জাকির হোসেন ১৯৯৩ সালের ২৫ অক্টোবর রামগঞ্জ পৌরসভায় কর নির্ধারক পদে স্থায়ী ভিত্তিতে যোগ দেন। তৎকালীন নথি অনুযায়ী, চাকরিতে তার প্রথম বেতন ছিল মাত্র ১ হাজার ৪৭৫ টাকা। এর দুই বছর পর, ১৯৯৫ সালের ১ আগস্ট তিনি কর নির্ধারক হিসেবে তৎকালীন টঙ্গী পৌরসভায় যোগ দেন, যেখানে তার মূল বেতন দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৫ টাকা। পরবর্তীতে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন গঠিত হলে বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে তিনি অঞ্চল-৫-এর রাজস্ব কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে তার বর্তমান প্রাপ্ত বেতন আনুমানিক ৪৮ হাজার টাকা।

সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগের মূল দায়িত্ব অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অর্থসামগ্রিক। হোল্ডিং ট্যাক্স বা গৃহকর নির্ধারণ ও আদায়, বকেয়া কর সংগ্রহ, নতুন হোল্ডিং নম্বর প্রদান, বাজার ও দোকান থেকে রাজস্ব আদায় এবং বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ড ফি সংগ্রাহকের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ এই বিভাগের অধীনে সম্পাদিত হয়। এমন একটি পদে আসীন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা আর্থিক অনৈতিকতার অভিযোগ ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু রাজধানীর উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর রোডের একটি সাততলা ভবন। সেখানকার দ্বিতীয় তলায় পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ফ্ল্যাট তার মালিকানাধীন বলে দাবি অভিযোগকারীদের। প্রায় ১ হাজার ৯৫০ বর্গফুটের এই দুটি ফ্ল্যাটের একটিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন জাকির হোসেন এবং অপরটি ভাড়া দেওয়া রয়েছে। বর্তমান বাজারে দুটি ফ্ল্যাটের সম্মিলিত মূল্য আনুমানিক দুই কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। এছাড়া টঙ্গীর দেওড়া এলাকায় জমিসহ একটি ছয়তলা ভবন রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। ২০০১ সালে দেওড়া এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণের কথা জাকির হোসেন নিজেই স্বীকার করেছেন।

স্থাবর সম্পদের পাশাপাশি টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকায় ‘জাকিয়া টাইলস অ্যান্ড স্যানিটারি’ নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নথিপত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি তার স্ত্রী জাহানারা বেগমের নামে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে জাকির হোসেন নিজেই এর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় কোনো ব্যক্তি বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকতে পারেন না। ফলে এই ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা স্পষ্ট বিধিমালা লঙ্ঘনের আওতায় পড়ে।

যানবাহন ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রে অভিযোগকারীদের আঙুল তার ব্যবহৃত সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসের (ঢাকা মেট্রো-গ-৩৯-৯৩৭১) দিকে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৫০ লাখ টাকার বেশি। গাজীপুর ও তার আশপাশের বিভিন্ন স্থানে জাকির হোসেন ও তার স্ত্রীর নামে আরও অঘোষিত সম্পত্তি রয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

অভিযোগের এই ইতিহাস কেবল সাম্প্রতিক সময়ের নয়। ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গাজীপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে জিসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে প্রথম লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। ওই অভিযোগে টঙ্গী পৌরসভায় দায়িত্ব পালনকালে বাড়িঘরের কর নির্ধারণে অনিয়ম করে অবৈধ অর্থ উপার্জন, অভ্যন্তরীণ বদলি এবং অসদাচরণের জন্য একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) পাওয়ার বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছিল। এমনকি সালনা অঞ্চলে দায়িত্বরত অবস্থায় টঙ্গী এলাকার কর নির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং স্থানীয় সরকার ও রাজস্ব অডিটে তার বিরুদ্ধে আর্থিক আপত্তি ওঠার তথ্যও উক্ত অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়। ওই নথিতে বিদেশে মেয়েকে পড়াশোনা করানো, যুক্তরাষ্ট্রে ফ্ল্যাট কেনা এবং উত্তরার ফ্ল্যাট ও গাড়ির ছবি পর্যন্ত যুক্ত করা হয়েছিল। তবে উক্ত অভিযোগ জমা পড়ার পর দুদকের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

সম্পদ অনুসন্ধানের পাশাপাশি জাকির হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। একটি ছবিতে তাকে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগের আমলে নিজেকে দলটির অনুসারী দাবি করা জাকির হোসেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি ঘরানার পরিচয় দিতে শুরু করেছেন।

এসব অভিযোগের মুখোমুখি করা হলে জাকির হোসেন টঙ্গীর দেওড়ায় ২০০১ সালে জমি কিনে বাড়ি বানানোর সত্যতা স্বীকার করেন। তবে উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের ফ্ল্যাট দুটি এবং ‘জাকিয়া টাইলস অ্যান্ড স্যানিটারি’ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার দাবি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। ব্যবহৃত বিলাসবহুল মাইক্রোবাসের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কথা না বলে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং পরবর্তীতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও আর কথা বলেননি। ২০২০ সালে দুদকে জমা পড়া অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে সংস্থাটি নিয়ে তিনি আপত্তিকর মন্তব্য করেন। তবে রাজস্ব অডিটে উত্থাপিত আর্থিক আপত্তির বিষয়ে তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ছিল, তিনি যথাসময়ে সকল আপত্তির উপযুক্ত লিখিত জবাব দিয়েছেন।

চাকরির শুরুতে সামান্য বেতনে জীবন শুরু করা একজন সরকারি কর্মচারীর বর্তমান স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা এবং জীবনযাত্রার মানের সাথে তার আইনি আয়ের দৃশ্যমান ব্যবধান দূর করতে নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানের দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বোরহানউদ্দিনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে দুই ভাইয়ের মৃত্যু, বাঁচলেন বাবা

হাজার টাকার চাকুরে জাকিরের শতকোটি টাকার অঢেল সম্পদের সাম্রাজ্য!

আপডেট সময় ১২:৫০:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের (জিসিসি) অঞ্চল-৫-এর রাজস্ব কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. জাকির হোসেনের চাকরিজীবনের সূচনা হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৪৭৫ টাকা মাসিক বেতনে। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় সরকারি চাকরিতে অতিবাহিত করার পর তার দৃশ্যমান সম্পদ, ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা ও জীবনযাপন নিয়ে এখন তৈরি হয়েছে নানামুখী বিতর্ক ও প্রশ্ন। রাজধানীর উত্তরা ও গাজীপুরের টঙ্গীতে ফ্ল্যাট, আলিশান বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের মহার্ঘ্য গাড়িসহ বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তার বৈধ আয় ও অর্জিত সম্পদের সামঞ্জস্যতা নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার মধুপুর গ্রামের মো. মোহাব্বত আলীর ছেলে মো. জাকির হোসেন ১৯৯৩ সালের ২৫ অক্টোবর রামগঞ্জ পৌরসভায় কর নির্ধারক পদে স্থায়ী ভিত্তিতে যোগ দেন। তৎকালীন নথি অনুযায়ী, চাকরিতে তার প্রথম বেতন ছিল মাত্র ১ হাজার ৪৭৫ টাকা। এর দুই বছর পর, ১৯৯৫ সালের ১ আগস্ট তিনি কর নির্ধারক হিসেবে তৎকালীন টঙ্গী পৌরসভায় যোগ দেন, যেখানে তার মূল বেতন দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৫ টাকা। পরবর্তীতে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন গঠিত হলে বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে তিনি অঞ্চল-৫-এর রাজস্ব কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে তার বর্তমান প্রাপ্ত বেতন আনুমানিক ৪৮ হাজার টাকা।

সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগের মূল দায়িত্ব অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অর্থসামগ্রিক। হোল্ডিং ট্যাক্স বা গৃহকর নির্ধারণ ও আদায়, বকেয়া কর সংগ্রহ, নতুন হোল্ডিং নম্বর প্রদান, বাজার ও দোকান থেকে রাজস্ব আদায় এবং বিজ্ঞাপন ও সাইনবোর্ড ফি সংগ্রাহকের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ এই বিভাগের অধীনে সম্পাদিত হয়। এমন একটি পদে আসীন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা আর্থিক অনৈতিকতার অভিযোগ ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু রাজধানীর উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর রোডের একটি সাততলা ভবন। সেখানকার দ্বিতীয় তলায় পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ফ্ল্যাট তার মালিকানাধীন বলে দাবি অভিযোগকারীদের। প্রায় ১ হাজার ৯৫০ বর্গফুটের এই দুটি ফ্ল্যাটের একটিতে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন জাকির হোসেন এবং অপরটি ভাড়া দেওয়া রয়েছে। বর্তমান বাজারে দুটি ফ্ল্যাটের সম্মিলিত মূল্য আনুমানিক দুই কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। এছাড়া টঙ্গীর দেওড়া এলাকায় জমিসহ একটি ছয়তলা ভবন রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। ২০০১ সালে দেওড়া এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণের কথা জাকির হোসেন নিজেই স্বীকার করেছেন।

স্থাবর সম্পদের পাশাপাশি টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকায় ‘জাকিয়া টাইলস অ্যান্ড স্যানিটারি’ নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। নথিপত্র অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি তার স্ত্রী জাহানারা বেগমের নামে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে জাকির হোসেন নিজেই এর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় কোনো ব্যক্তি বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকতে পারেন না। ফলে এই ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা স্পষ্ট বিধিমালা লঙ্ঘনের আওতায় পড়ে।

যানবাহন ও অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রে অভিযোগকারীদের আঙুল তার ব্যবহৃত সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসের (ঢাকা মেট্রো-গ-৩৯-৯৩৭১) দিকে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৫০ লাখ টাকার বেশি। গাজীপুর ও তার আশপাশের বিভিন্ন স্থানে জাকির হোসেন ও তার স্ত্রীর নামে আরও অঘোষিত সম্পত্তি রয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।

অভিযোগের এই ইতিহাস কেবল সাম্প্রতিক সময়ের নয়। ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গাজীপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে জিসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে প্রথম লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। ওই অভিযোগে টঙ্গী পৌরসভায় দায়িত্ব পালনকালে বাড়িঘরের কর নির্ধারণে অনিয়ম করে অবৈধ অর্থ উপার্জন, অভ্যন্তরীণ বদলি এবং অসদাচরণের জন্য একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) পাওয়ার বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছিল। এমনকি সালনা অঞ্চলে দায়িত্বরত অবস্থায় টঙ্গী এলাকার কর নির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং স্থানীয় সরকার ও রাজস্ব অডিটে তার বিরুদ্ধে আর্থিক আপত্তি ওঠার তথ্যও উক্ত অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়। ওই নথিতে বিদেশে মেয়েকে পড়াশোনা করানো, যুক্তরাষ্ট্রে ফ্ল্যাট কেনা এবং উত্তরার ফ্ল্যাট ও গাড়ির ছবি পর্যন্ত যুক্ত করা হয়েছিল। তবে উক্ত অভিযোগ জমা পড়ার পর দুদকের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

সম্পদ অনুসন্ধানের পাশাপাশি জাকির হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের বিষয়টিও সামনে এসেছে। একটি ছবিতে তাকে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেলের সঙ্গে দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগের আমলে নিজেকে দলটির অনুসারী দাবি করা জাকির হোসেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি ঘরানার পরিচয় দিতে শুরু করেছেন।

এসব অভিযোগের মুখোমুখি করা হলে জাকির হোসেন টঙ্গীর দেওড়ায় ২০০১ সালে জমি কিনে বাড়ি বানানোর সত্যতা স্বীকার করেন। তবে উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরের ফ্ল্যাট দুটি এবং ‘জাকিয়া টাইলস অ্যান্ড স্যানিটারি’ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার দাবি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। ব্যবহৃত বিলাসবহুল মাইক্রোবাসের উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কথা না বলে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং পরবর্তীতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও আর কথা বলেননি। ২০২০ সালে দুদকে জমা পড়া অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে সংস্থাটি নিয়ে তিনি আপত্তিকর মন্তব্য করেন। তবে রাজস্ব অডিটে উত্থাপিত আর্থিক আপত্তির বিষয়ে তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ছিল, তিনি যথাসময়ে সকল আপত্তির উপযুক্ত লিখিত জবাব দিয়েছেন।

চাকরির শুরুতে সামান্য বেতনে জীবন শুরু করা একজন সরকারি কর্মচারীর বর্তমান স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা এবং জীবনযাত্রার মানের সাথে তার আইনি আয়ের দৃশ্যমান ব্যবধান দূর করতে নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানের দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।