বিয়ের প্রতিশ্রুতি, প্রেমের সুযোগ নিয়ে পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি এবং ২ কোটি ৩২ লাখ ১১ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) সহকারী কমিশনার (এসি) মো. সোহেলউদ্দিন প্রিন্সের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে বিচারিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ঘিরে সৃষ্ট এই অভূতপূর্ব মামলায় আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬ (অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ) ও ৪২০ (প্রতারণা) ধারায় অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। মামলার বাদী মোসা. তানজিনা সাথী নিজে একজন সাময়িক বরখাস্তকৃত সহকারী কর কমিশনার। দুজনই ৩৬তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার (৯ জুন) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তার ইভার আদালত আসামিপক্ষের অব্যাহতির (Discharge) আবেদন খারিজ করে মামলাটির আনুষ্ঠানিক ট্রায়াল বা সাক্ষ্যগ্রহণের নির্দেশ প্রদান করেন।
মামলার নথি ও তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে ৩৬তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সহকারী পুলিশ কমিশনার সোহেলউদ্দিন প্রিন্সের সঙ্গে সহকারী কর কমিশনার তানজিনা সাথীর পরিচয় হয়। সহকর্মী হিসেবে শুরু হওয়া সেই পরিচয় দ্রুতই প্রেম ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্কে রূপ নেয়। সম্পর্কের একপর্যায়ে সোহেলউদ্দিন তাঁকে বিয়ের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন এবং তানজিনার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, বিয়ের প্রতিশ্রুতি ও পারস্পরিক বিশ্বাসের সুবাদে বিভিন্ন অজুহাত ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনের কথা বলে তানজিনার কাছ থেকে দফায় দফায় মোট ২ কোটি ৩২ লাখ ১১ হাজার টাকা গ্রহণ করেন সোহেলউদ্দিন। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও তিনি তানজিনাকে বিয়ে করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান এবং গৃহীত বিশাল অঙ্কের অর্থ ফেরত দিতে অস্বীকার করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর তানজিনা সাথী ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন।
আদালতের নির্দেশে সিআইডি (পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ) দীর্ঘ তদন্ত পরিচালনা করে। আর্থিক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব ও লিখিত নথিপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সিআইডি আদালতে প্রাথমিক সত্যতা উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। গত ৯ জুন শুনানিকালে আসামি সোহেলউদ্দিন প্রিন্স সশরীরে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর আইনজীবী বেকসুর অব্যাহতির আবেদন জানালেও রাষ্ট্রপক্ষ ও বাদীর আইনজীবীর যুক্তিতর্ক শেষে আদালত তা প্রত্যাখ্যান করে অভিযোগ গঠন করেন। উল্লেখ্য, এই বিসিএস পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাঁর নিজের স্ত্রীর দায়ের করা একটি যৌতুক মামলাও বর্তমানে বিচারিক আদালতে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী, কেবল অভিযোগ গঠন বা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলই আসামির চূড়ান্ত অপরাধের প্রমাণ নয়; ফৌজদারি আইনে নিরপেক্ষ সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই আদালতের ওপর চূড়ান্ত রায় নির্ভর করছে।
প্রশাসনিক ও আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ক্যাডার কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের জের ধরে এমন বিশাল অঙ্কের অর্থের লেনদেন এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ফৌজদারি বিচার শুরু হওয়া প্রশাসনিক অঙ্গনে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার জন্য এক বিরাট সংকেত। দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারার অধীনে অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের সুস্পষ্ট কাগজপত্র, ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহারের প্রমাণ, অর্থ হস্তান্তরের পেছনের উদ্দেশ্য এবং বিয়ের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে অর্থের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক প্রমাণের গুরুদায়িত্ব বাদীর ওপর বর্তায়। একই সঙ্গে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হওয়ায় বিভাগীয় শৃঙ্খলা বিধিমালা এবং ফৌজদারি মামলার রায়ের আলোকেই অভিযুক্তদের পেশাগত ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।
ঢাকার সিএমএম আদালতে দণ্ডবিধির আওতায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলাটি এখন বিচারিক নিষ্পত্তির চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করল। পরবর্তী নির্ধারিত কার্যদিবসে সাক্ষীদের তলব করে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করবেন আদালত। একদিকে বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়া বরখাস্তকৃত নারী কর কর্মকর্তার আইনি সুরক্ষার দাবি, অন্যদিকে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার আত্মপক্ষ সমর্থনের সাংবিধানিক অধিকার—সব মিলিয়ে আদালতের নিরপেক্ষ সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারিক রায়ই নির্ধারণ করবে এই চাঞ্চল্যকর মামলার শেষ পরিণতি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















