ঢাকা ০৭:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ফিলিস্তিনের মসজিদে আগুন ,সন্দেহ ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে জঙ্গল সলিমপুরের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে মাস্টারপ্ল্যান জনসেবায় গোহালাকান্দার চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন পূজার ছুটিতে ১০ দিন বন্ধ বেরোবি, ক্যাম্পাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আদালত চত্বরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, আইভীর আইনজীবীসহ গ্রেপ্তার ৩ চাকরির জন্য রাশিয়ায় নিয়ে নামানো হয় যুদ্ধে, প্রথম দিনেই প্রাণ হারান ১৭ বাংলাদেশি ভারতের আন্দোলন বাংলাদেশকে দেখে অনুপ্রাণিত: নেহা বোরা আত্রাইয়ে শীতকালীন সবজির সমাহার, চড়া দামে অসন্তুষ্ট ক্রেতারা মনোহরগঞ্জে বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্পে সেবা পেলেন তিন শতাধিক মানুষ ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সনদের আহ্বান বাংলাদেশের

রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণে এখনো আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তারা, উঠছে দুর্নীতির অভিযোগ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভের মুখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে রাজনীতি, প্রশাসন, সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত। পাল্টে যাচ্ছে চিরচেনা রূপ। এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী ঘরানার সুবিধাভোগী কর্মকর্তাগণ রাতারাতি দল পরিবর্তনের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। দখলে রেখেছেন রেলওয়ের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।

আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের বাজেট পায় রেলওয়ে। যার ৯০ শতাংশ নতুন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল। এই অর্থ তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের লুটপাটের সহযোগী হিসেবে ছিলেন রেলের আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তাগণ। এদের প্রভাবে রেলের অন্য ঘরানার বাকি কর্মকর্তারা ছিলেন একপ্রকার অসহায়, বঞ্চিত ও নির্যাতিত।

রেলের আওয়ামী ঘরানার কিছু কর্মকর্তার প্রভাব ও দখল কেমন ছিল, তার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো—

রেলওয়েতে আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হলেন তাবাসসুম বিনতে ইসলাম—যুগ্ম মহাপরিচালক (মেকানিক), রেলভবন। তাবাসসুম প্রায় ১৬ জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। তাঁর এই পদে আসার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিলেন তৎকালীন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। এ ছাড়া শামসুজ্জামান যখন রেলের মহাপরিচালক ছিলেন, তখন তাবাসসুম ছিলেন রেলের অলিখিত রানী তথা রেলরানি। তৎকালীন সময়ে রেলমন্ত্রী সুজন ও ডিজি শামসুজ্জামান তাবাসসুমকে রেলের বদলি, পদোন্নতি থেকে শুরু করে টেন্ডার বাণিজ্য পর্যন্ত সব কাজের ব্ল্যাঙ্ক চেক দেওয়ার মতো ক্ষমতা দিয়েছিলেন।

তাবাসসুমের এই ক্ষমতার উৎস ছিল তাঁর স্বামী প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন হায়দার—যুগ্ম সচিব হিসেবে বর্তমানে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে আছেন। জসিম একসময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক ছিলেন এবং ২০০৯-পরবর্তী প্রতিটি অবৈধ নির্বাচনে আওয়ামী লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করেন। জসিমের ভয়ে রেলের সিনিয়র কর্মকর্তারাও তাঁকে ম্যাডাম বলে সম্বোধন করেন। এ ছাড়া তাবাসসুম গত ১৫ বছরে প্রায় ৪০টির অধিক দেশে সরকারি ভ্রমণ করেন। তাঁর দেশে-বিদেশে শতকোটির অধিক সম্পদ আছে। জসিম উদ্দিনের প্রভাবে সম্প্রতি তাবাসসুম তাঁর সিনিয়র সব কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে ৩ নম্বর স্কেলে পদোন্নতি নেন। সম্প্রতি তাবাসসুম ২ নম্বর স্কেলের পদে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য তাঁর চেয়ে ৯ ব্যাচ সিনিয়র, অত্যন্ত মেধাবী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) পার্থ সরকারকে স্থায়ী বরখাস্ত করার জন্য সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও কয়েকজন সদস্যকে তাঁর স্বামী জসিম ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব নিশাত রসুলের মাধ্যমে ম্যানেজ করেন। সরকারি আদেশ দেখুন।

আওয়ামী ঘরানার ও তাবাসসুম সিন্ডিকেটের একজন প্রভাবশালী সদস্য এবং সরঞ্জাম বিভাগের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় লুটেরা হলেন আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি ছিলেন সাবেক রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের ভাগ্নি-জামাই। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর নূরুল ইসলাম সুজন রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার দিনে আনোয়ার চট্টগ্রামে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে ৫ মণ মিষ্টি বিতরণ করেন। শ্বশুর মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে আনোয়ার সব সময় একই সঙ্গে ২-৩টি পদের দায়িত্ব পালন করতেন।

এখনো চট্টগ্রামে তিনি পরিচালক ইনভেন্টরি কন্ট্রোলের পাশাপাশি সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক/পূর্ব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আনোয়ার প্রায় ১৫ বছর যাবৎ চট্টগ্রাম সরঞ্জাম বিভাগে বিভিন্ন লাভজনক পদে কর্মরত আছেন। এই দীর্ঘ সময়ে একই সঙ্গে ২-৩টি পদের দায়িত্ব পালন করায় তিনি কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছেন। সম্প্রতি সরঞ্জাম বিভাগের সবচেয়ে বড় পদ প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক, পাহাড়তলী পদে পদোন্নতির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা যাচ্ছে।

তাবাসসুম সিন্ডিকেটের সরকারদলীয় আরও একজন কর্মকর্তা হচ্ছেন প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা সলিমুল্লাহ বাহার। বিগত সরকার রেলওয়েতে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। এই বিশাল অঙ্কের টাকায় রেলওয়েতে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা পরিকল্পনা দপ্তরে প্রায় ১৫ বছর ধরে কর্মরত আছেন। রেলওয়েতে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের টাকা হরিলুটের জন্য অবসরপ্রাপ্ত এবং চাকরিরত কর্মকর্তাদের একটি সিন্ডিকেট আছে। প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা এই সিন্ডিকেটের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাঁর কাজই হলো এই সিন্ডিকেটের স্বার্থ পূরণে সর্বদা নিজেকে পূর্ণভাবে নিয়োজিত করা। তাঁর সূক্ষ্ম পরিকল্পনায় প্রকল্পের টাকা লুটের নানা কৌশলে তিনি সদা ব্যস্ত। এই সিন্ডিকেটের মূল লক্ষ্যই থাকে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো। কারণ, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো মানেই প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো, আর ব্যয় বাড়ানো মানেই হাজার কোটি টাকায় সিন্ডিকেটের পকেট ভারী।

তদুপরি, প্রকল্পের টাকা লুটের আরেকটি ফাঁদ হলো ভেরিয়েশন অর্ডার এবং ইনিয়ে-বিনিয়ে নতুন আইটেম অন্তর্ভুক্ত করে সংশোধিত ডিপিপি প্রণয়ন। ফলে প্রকল্পের খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। রেলের কর্মকর্তারাই নাকি প্রকল্পের কাজ শেষ হোক, এ বিষয়ে আন্তরিক নন। যে কারণে রেলওয়ের কোনো প্রকল্পই ১৫ বছরের আগে শেষ হয় না। অর্থাৎ, রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেটের প্রত্যক্ষ মদদে প্রকল্প শেষ হয়েও শেষ হয় না। সিন্ডিকেটের চাহিদার প্রধান উদ্দেশ্য থাকে দেশের কাজে লাগুক বা না লাগুক, যেকোনো কৌশলে রাষ্ট্রের টাকা লুটপাট করার নতুন নতুন ফাঁদ তৈরি করা। এই টাকার ভাগ সরকারের সব মহলে যায়। যার প্রধান দায়িত্বে ছিলেন রেলের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা সলিমুল্লাহ বাহার। এ ছাড়া রেলভবনে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় গাড়িচালক নিয়োগে তিনি বড় ধরনের দুর্নীতি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া, প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পরিকল্পনায় অনেক ব্যস্ত। তিনি নিজে ২-৩টি পাজেরো স্পোর্টস গাড়ি ব্যবহার করে দেশের টাকা লুট করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অত্যন্ত কঠোর আওয়ামী ঘরানার আরও একজন কর্মকর্তা হলেন আবু জাফর মিয়া। ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানায় বাড়ি হওয়ায় তিনি ক্ষমতার প্রভাব দেখাতে শুরু করেন। প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব), চট্টগ্রাম হিসেবে পদায়িত হওয়ার পর থেকে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নেন। তিনি তাঁর এই লুটপাটের জন্য চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতার সহায়তা নেন। তিনি কোনো পূর্তকাজের টেন্ডার আহ্বান করার পরে সব টেন্ডারের ইস্টিমেট বা প্রাক্কলন তাঁর পার্টনার ওই শীর্ষ নেতাকে বলে দিতেন। এর ফলে ওই নেতার মনোনীত ঠিকাদার ছাড়া অন্য কেউ এই টেন্ডারে অংশ নিতেন না বা নেওয়ার সাহস পেতেন না।

সরকারের অত্যন্ত বিশ্বস্ত কর্মকর্তা হওয়ায় তাঁকে ভারতের পূর্বাঞ্চলে করিডোর হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্মিত আখাউড়া-আগরতলা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। জানা যায় যে, শেখ হাসিনার সঙ্গে জাফর যতবার দেখা করতেন, ততবারই তাঁর পদধূলি মাথায় নিতেন। তাঁর পদে কোনো কর্মকর্তা আসার চিন্তা করলেই তাঁকে বিএনপি-জামায়াত হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর পদায়ন ঠেকিয়ে দিতেন। এই কর্মকর্তা গেটকিপার নিয়োগে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিজের এলাকায় শত শত বিঘা জমি ক্রয়ের পাশাপাশি তিনি অবৈধ অর্থের বড় একটি অংশ বিদেশে পাচার করেছেন বলে তথ্য আছে।

আওয়ামী ঘরানার আরও একজন কর্মকর্তা হলেন তাপস কুমার দাস, যিনি বর্তমানে প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী/পূর্ব, চট্টগ্রাম হিসেবে কর্মরত আছেন। এই কর্মকর্তা চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের এক নেতা বাবরের ছত্রচ্ছায়ায় ব্যাপক লুটপাট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাপসের বাড়ি বাগেরহাট হওয়ায় তিনি হাসিনার নিকটাত্মীয় শেখ হেলাল ও শেখ জুয়েলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ফলে রেলের বিভিন্ন প্রাইজ পোস্টিং পেতে তাঁকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি এবং এসব পদে পদায়িত হয়ে হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর এই লুটপাটের টাকা তিনি প্রতিবেশী ইন্ডিয়ায় পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায় যে, তাপস দাস অত্যন্ত গরিব ঘরের ছেলে ছিলেন। খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরে তাঁর পড়াশোনা চালানোর মতো কোনো টাকা তাঁর ছিল না। বর্তমানে কোটি কোটি টাকার মালিক এই তাপস।

এই পাঁচ কর্মকর্তা ছাড়াও রেলওয়েতে আরও অনেক আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তা আছেন। যা আমরা পরবর্তীতে প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করব।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফিলিস্তিনের মসজিদে আগুন ,সন্দেহ ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে

রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণে এখনো আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তারা, উঠছে দুর্নীতির অভিযোগ

আপডেট সময় ১১:৪৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভের মুখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। যার প্রভাব পড়েছে রাজনীতি, প্রশাসন, সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত। পাল্টে যাচ্ছে চিরচেনা রূপ। এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী ঘরানার সুবিধাভোগী কর্মকর্তাগণ রাতারাতি দল পরিবর্তনের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। দখলে রেখেছেন রেলওয়ের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।

আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের বাজেট পায় রেলওয়ে। যার ৯০ শতাংশ নতুন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল। এই অর্থ তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের লুটপাটের সহযোগী হিসেবে ছিলেন রেলের আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তাগণ। এদের প্রভাবে রেলের অন্য ঘরানার বাকি কর্মকর্তারা ছিলেন একপ্রকার অসহায়, বঞ্চিত ও নির্যাতিত।

রেলের আওয়ামী ঘরানার কিছু কর্মকর্তার প্রভাব ও দখল কেমন ছিল, তার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো—

রেলওয়েতে আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হলেন তাবাসসুম বিনতে ইসলাম—যুগ্ম মহাপরিচালক (মেকানিক), রেলভবন। তাবাসসুম প্রায় ১৬ জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। তাঁর এই পদে আসার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিলেন তৎকালীন রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন। এ ছাড়া শামসুজ্জামান যখন রেলের মহাপরিচালক ছিলেন, তখন তাবাসসুম ছিলেন রেলের অলিখিত রানী তথা রেলরানি। তৎকালীন সময়ে রেলমন্ত্রী সুজন ও ডিজি শামসুজ্জামান তাবাসসুমকে রেলের বদলি, পদোন্নতি থেকে শুরু করে টেন্ডার বাণিজ্য পর্যন্ত সব কাজের ব্ল্যাঙ্ক চেক দেওয়ার মতো ক্ষমতা দিয়েছিলেন।

তাবাসসুমের এই ক্ষমতার উৎস ছিল তাঁর স্বামী প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন হায়দার—যুগ্ম সচিব হিসেবে বর্তমানে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে আছেন। জসিম একসময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক ছিলেন এবং ২০০৯-পরবর্তী প্রতিটি অবৈধ নির্বাচনে আওয়ামী লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করেন। জসিমের ভয়ে রেলের সিনিয়র কর্মকর্তারাও তাঁকে ম্যাডাম বলে সম্বোধন করেন। এ ছাড়া তাবাসসুম গত ১৫ বছরে প্রায় ৪০টির অধিক দেশে সরকারি ভ্রমণ করেন। তাঁর দেশে-বিদেশে শতকোটির অধিক সম্পদ আছে। জসিম উদ্দিনের প্রভাবে সম্প্রতি তাবাসসুম তাঁর সিনিয়র সব কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে ৩ নম্বর স্কেলে পদোন্নতি নেন। সম্প্রতি তাবাসসুম ২ নম্বর স্কেলের পদে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য তাঁর চেয়ে ৯ ব্যাচ সিনিয়র, অত্যন্ত মেধাবী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) পার্থ সরকারকে স্থায়ী বরখাস্ত করার জন্য সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও কয়েকজন সদস্যকে তাঁর স্বামী জসিম ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব নিশাত রসুলের মাধ্যমে ম্যানেজ করেন। সরকারি আদেশ দেখুন।

আওয়ামী ঘরানার ও তাবাসসুম সিন্ডিকেটের একজন প্রভাবশালী সদস্য এবং সরঞ্জাম বিভাগের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় লুটেরা হলেন আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি ছিলেন সাবেক রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের ভাগ্নি-জামাই। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর নূরুল ইসলাম সুজন রেল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার দিনে আনোয়ার চট্টগ্রামে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে ৫ মণ মিষ্টি বিতরণ করেন। শ্বশুর মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে আনোয়ার সব সময় একই সঙ্গে ২-৩টি পদের দায়িত্ব পালন করতেন।

এখনো চট্টগ্রামে তিনি পরিচালক ইনভেন্টরি কন্ট্রোলের পাশাপাশি সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক/পূর্ব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আনোয়ার প্রায় ১৫ বছর যাবৎ চট্টগ্রাম সরঞ্জাম বিভাগে বিভিন্ন লাভজনক পদে কর্মরত আছেন। এই দীর্ঘ সময়ে একই সঙ্গে ২-৩টি পদের দায়িত্ব পালন করায় তিনি কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছেন। সম্প্রতি সরঞ্জাম বিভাগের সবচেয়ে বড় পদ প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক, পাহাড়তলী পদে পদোন্নতির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা যাচ্ছে।

তাবাসসুম সিন্ডিকেটের সরকারদলীয় আরও একজন কর্মকর্তা হচ্ছেন প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা সলিমুল্লাহ বাহার। বিগত সরকার রেলওয়েতে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। এই বিশাল অঙ্কের টাকায় রেলওয়েতে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা পরিকল্পনা দপ্তরে প্রায় ১৫ বছর ধরে কর্মরত আছেন। রেলওয়েতে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের টাকা হরিলুটের জন্য অবসরপ্রাপ্ত এবং চাকরিরত কর্মকর্তাদের একটি সিন্ডিকেট আছে। প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা এই সিন্ডিকেটের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাঁর কাজই হলো এই সিন্ডিকেটের স্বার্থ পূরণে সর্বদা নিজেকে পূর্ণভাবে নিয়োজিত করা। তাঁর সূক্ষ্ম পরিকল্পনায় প্রকল্পের টাকা লুটের নানা কৌশলে তিনি সদা ব্যস্ত। এই সিন্ডিকেটের মূল লক্ষ্যই থাকে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো। কারণ, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো মানেই প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো, আর ব্যয় বাড়ানো মানেই হাজার কোটি টাকায় সিন্ডিকেটের পকেট ভারী।

তদুপরি, প্রকল্পের টাকা লুটের আরেকটি ফাঁদ হলো ভেরিয়েশন অর্ডার এবং ইনিয়ে-বিনিয়ে নতুন আইটেম অন্তর্ভুক্ত করে সংশোধিত ডিপিপি প্রণয়ন। ফলে প্রকল্পের খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। রেলের কর্মকর্তারাই নাকি প্রকল্পের কাজ শেষ হোক, এ বিষয়ে আন্তরিক নন। যে কারণে রেলওয়ের কোনো প্রকল্পই ১৫ বছরের আগে শেষ হয় না। অর্থাৎ, রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেটের প্রত্যক্ষ মদদে প্রকল্প শেষ হয়েও শেষ হয় না। সিন্ডিকেটের চাহিদার প্রধান উদ্দেশ্য থাকে দেশের কাজে লাগুক বা না লাগুক, যেকোনো কৌশলে রাষ্ট্রের টাকা লুটপাট করার নতুন নতুন ফাঁদ তৈরি করা। এই টাকার ভাগ সরকারের সব মহলে যায়। যার প্রধান দায়িত্বে ছিলেন রেলের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা সলিমুল্লাহ বাহার। এ ছাড়া রেলভবনে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় গাড়িচালক নিয়োগে তিনি বড় ধরনের দুর্নীতি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া, প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পরিকল্পনায় অনেক ব্যস্ত। তিনি নিজে ২-৩টি পাজেরো স্পোর্টস গাড়ি ব্যবহার করে দেশের টাকা লুট করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অত্যন্ত কঠোর আওয়ামী ঘরানার আরও একজন কর্মকর্তা হলেন আবু জাফর মিয়া। ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানায় বাড়ি হওয়ায় তিনি ক্ষমতার প্রভাব দেখাতে শুরু করেন। প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব), চট্টগ্রাম হিসেবে পদায়িত হওয়ার পর থেকে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নেন। তিনি তাঁর এই লুটপাটের জন্য চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতার সহায়তা নেন। তিনি কোনো পূর্তকাজের টেন্ডার আহ্বান করার পরে সব টেন্ডারের ইস্টিমেট বা প্রাক্কলন তাঁর পার্টনার ওই শীর্ষ নেতাকে বলে দিতেন। এর ফলে ওই নেতার মনোনীত ঠিকাদার ছাড়া অন্য কেউ এই টেন্ডারে অংশ নিতেন না বা নেওয়ার সাহস পেতেন না।

সরকারের অত্যন্ত বিশ্বস্ত কর্মকর্তা হওয়ায় তাঁকে ভারতের পূর্বাঞ্চলে করিডোর হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্মিত আখাউড়া-আগরতলা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। জানা যায় যে, শেখ হাসিনার সঙ্গে জাফর যতবার দেখা করতেন, ততবারই তাঁর পদধূলি মাথায় নিতেন। তাঁর পদে কোনো কর্মকর্তা আসার চিন্তা করলেই তাঁকে বিএনপি-জামায়াত হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁর পদায়ন ঠেকিয়ে দিতেন। এই কর্মকর্তা গেটকিপার নিয়োগে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিজের এলাকায় শত শত বিঘা জমি ক্রয়ের পাশাপাশি তিনি অবৈধ অর্থের বড় একটি অংশ বিদেশে পাচার করেছেন বলে তথ্য আছে।

আওয়ামী ঘরানার আরও একজন কর্মকর্তা হলেন তাপস কুমার দাস, যিনি বর্তমানে প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী/পূর্ব, চট্টগ্রাম হিসেবে কর্মরত আছেন। এই কর্মকর্তা চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের এক নেতা বাবরের ছত্রচ্ছায়ায় ব্যাপক লুটপাট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাপসের বাড়ি বাগেরহাট হওয়ায় তিনি হাসিনার নিকটাত্মীয় শেখ হেলাল ও শেখ জুয়েলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ফলে রেলের বিভিন্ন প্রাইজ পোস্টিং পেতে তাঁকে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি এবং এসব পদে পদায়িত হয়ে হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর এই লুটপাটের টাকা তিনি প্রতিবেশী ইন্ডিয়ায় পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায় যে, তাপস দাস অত্যন্ত গরিব ঘরের ছেলে ছিলেন। খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরে তাঁর পড়াশোনা চালানোর মতো কোনো টাকা তাঁর ছিল না। বর্তমানে কোটি কোটি টাকার মালিক এই তাপস।

এই পাঁচ কর্মকর্তা ছাড়াও রেলওয়েতে আরও অনেক আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তা আছেন। যা আমরা পরবর্তীতে প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করব।