দেশের কৃষি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর সরকার উদ্যোগ নেয় উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন, শক্তি সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি সার কারখানা নির্মাণের। ২০২০ সালের ১০ মার্চ ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। যার দায়িত্ব পায় সিসি সেভেন নামে একটি চীনা এবং জাপানের মিৎসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। দুই প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই মাস আগেই এর কাজ পুরোপুরি শেষ হয়ে পরীক্ষামূলক সার উৎপাদন করছে কারখানাটি।
নবনির্মিত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় পরিবহন সুবিধার লক্ষ্যে ঘোড়াশাল রেলস্টেশনের সঙ্গে কারখানার সংযোগের জন্য একটি রেললাইন নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। কিন্তু এই প্রকল্পটি বাতিল করার জন্য চক্রান্ত শুরু করেছে একটি সিন্ডিকেট। তারা শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব এবং বিসিআইসির চেয়ারম্যানকে ভুল বুঝিয়ে রেললাইন নির্মাণের প্রকল্পটি বাতিল করার জন্য নানা পথে চেষ্টা চালাচ্ছে। ঘোড়াশাল রেলস্টেশনের সঙ্গে কারখানার সংযোগের রেললাইন নির্মাণের কাজ বন্ধ করতে পারলে লাভ হবে সড়কপথের ক্যারিং ঠিকাদারদের, আর লোকসান হবে সরকারের।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পের ডিপিপিতে সড়কপথে ৪০%, নদীপথে ৩০% এবং রেলপথে ৩০% সার পরিবহনের উল্লেখ রয়েছে। রেলের মাধ্যমে সার পরিবহন করলে সরকারের সাশ্রয় হয় মোটা অঙ্কের টাকা। অন্যদিকে সড়ক পরিবহনের মাধ্যমে সার পরিবহন করলে ব্যয় হয় দ্বিগুণ পরিমাণ টাকা। এ ছাড়া পথিমধ্যে প্রায়ই ট্রাকসহ সার গায়েব হয়ে যায়। এতে করে কৃষকরা সময়মতো সার পায় না। দেখা দেয় সার সংকট। সরকার পড়ে বেকায়দায়।
ইতিপূর্বে সড়কপথে সার পরিবহন করতে গিয়ে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার সার গায়েব হয়ে যায়। এ ঘটনায় দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। মামলা দায়েরের পর সংশ্লিষ্ট পরিবহন ঠিকাদারের ঠিকানা হয় কারাগার।
প্রশ্ন হলো—রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প কেন বাতিল করতে হবে? এখানে কার স্বার্থ জড়িত? কারা এই অভিসন্ধির নাটের গুরু? এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানার সড়কপথে সার বিপণনে একটি শক্তিশালী পরিবহন ঠিকাদার সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা চায় না যে রেলপথে সার পরিবহন হোক। কেননা—৩০% সার যদি রেলপথে পরিবহন হয় এবং ৩০% সার যদি নৌপথে পরিবহন হয়, তবে তাদের উপার্জন কমে যাবে। পথিমধ্যে ট্রাকসহ সার গায়েব করে দিতে পারবে না। এ কারণেই তারা একটি সিন্ডিকেট গঠন করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। আর তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন প্রকল্পের পিডি মো. সাইদুর রহমান। যে কারণে তিনি রেললাইন নির্মাণকাজে বাধার সৃষ্টি করছেন। সড়ক পরিবহন ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলছেন। এমনকি বিসিআইসির চেয়ারম্যানকেও ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছেন।
এ বিষয়ে রেললাইন প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান যে, রেললাইন নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। ইতিমধ্যেই ২০% কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৬০% কাজের যাবতীয় ম্যাটেরিয়াল প্রস্তুত আছে। দুই মাসের মধ্যে বাকি কাজ শেষ হবে, ইনশাআল্লাহ।
প্রকল্পের কাজ বাতিলের বিষয়ে একাধিক সূত্রের দাবি: একটি স্বার্থান্বেষী মহল চায় না যে ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় পরিবহন সুবিধার লক্ষ্যে ঘোড়াশাল রেলস্টেশনের সঙ্গে কারখানার সংযোগের জন্য রেললাইন নির্মিত হোক। তাই তারা শিল্প মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব এবং বিসিআইসির চেয়ারম্যানকে ভুল বুঝিয়ে ফায়দা হাসিল করতে চাইছে। এই সিন্ডিকেটটির উদ্দেশ্য মহৎ নয়, বরং দেশের ও সরকারের জন্য ক্ষতিকারক। রেলের মাধ্যমে সার পরিবহন হলে তারা পথিমধ্যে সার লোপাট করতে পারবে না বলেই রেললাইন নির্মাণে বাধা দিচ্ছে।
প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘রেললাইন প্রকল্পের কাজ বন্ধ করার তো প্রশ্নই ওঠে না। কাজ চলমান আছে। আমরা বিসিআইসি থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো চিঠি ইস্যু করিনি। আর সেই ক্ষমতাও আমাদের নেই। আমরা প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চালাচ্ছি।’
বিসিআইসির বর্তমান চেয়ারম্যান ড. মো. মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলার জন্য তার মোবাইল ফোনে কল দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
উল্লেখ্য, ১২ নভেম্বর নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় জিপিইউএফএফ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নবনির্মিত ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানার উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই কারখানায় বার্ষিক ৯,২৪,০০০ মেট্রিক টন সার উৎপাদন হবে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল কর্পোরেশন জানায়, কারখানাটি ৩০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। ১১০ একর জমিতে ১৫,৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কারখানাটির দৈনিক সার উৎপাদন হবে ২,৮০০ মেট্রিক টন।
মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকার ৪,৫৮০ কোটি ২১ লাখ টাকা দিয়েছে এবং ১০,৯২০ কোটি টাকা জাইকা, এইচএসবিসি এবং ব্যাংক অব টোকিও মিত্সুবিশি ইউএফজে লিমিটেড থেকে ব্যবসায়িক ঋণ প্রকল্পের মাধ্যমে পেয়েছে।
কারখানার দুটি বাষ্পীয় গ্যাস জেনারেটর ৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম এবং প্ল্যান্টটি চালানোর জন্য ২৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এটি বাংলাদেশের প্রথম সার কারখানা, যেখানে প্রাথমিক পর্যায়ে ফ্লু গ্যাস থেকে পরিবেশদূষণকারী আহরণ করা হবে এবং ক্যাপচার করা কার্বন-ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করে ইউরিয়া সারের উৎপাদন বৃদ্ধি করা হবে (প্রায় ১০%)।
কারখানাটি চালুর পর এখানে কর্মসংস্থান হবে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের। কারখানাটিতে প্রতিবছর প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার টন ইউরিয়া সার উৎপাদন হবে, যা দেশের মোট ইউরিয়া চাহিদার ৩৫ শতাংশ। ১১০ একর জমির ওপর নির্মিত এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। দেশের অভ্যন্তরে সারের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমাতে চায় বাংলাদেশ সরকার এই কারখানার মাধ্যমে।
জিপিইউএফএফ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিন দশকের পুরোনো কারখানাটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য নতুন করে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন এবং প্রকল্পের শুরু থেকেই বিদেশি বিশেষজ্ঞদের দ্বারা যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল প্রস্তুত করা হয়েছে। পরিবহন সুবিধার লক্ষ্যে ঘোড়াশাল রেলওয়ে স্টেশনের সঙ্গে কারখানার সংযোগের জন্য একটি রেললাইন নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই কারখানার কার্যক্রম শুরু হলে সার আমদানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। কারণ দেশের মোট বার্ষিক ২৬ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় কারখানাগুলো একসঙ্গে ১৯.২৪ লাখ মেট্রিক টন সার উৎপাদন করবে।
ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রজেক্টের জেনারেল ম্যানেজার (অপারেশন) এ এস এম মোসলেহ উদ্দিন জানান, ‘কারখানাটিতে বিশ্বের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করায় ৩০ বছরের মধ্যে কোনো কিছুতে হাত দিতে হবে না। সেইসঙ্গে বাংলাদেশের প্রকৌশলীরাও ফার্টিলাইজার সেক্টরে এখন অনেক অভিজ্ঞ। যার কারণে কারখানায় যে কোনো সমস্যা হলে আমরা সমাধান করতে সক্ষম। দুই মাস আগে কারখানাটি চালু হওয়ায় ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত সার উৎপাদন হবে। ১১০ একর জমির ওপর নির্মিত এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এখান থেকে বছরে উৎপাদন হবে প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার টন ইউরিয়া সার। প্রতিদিন ২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদনে সক্ষম দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ অত্যাধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর এই সার কারখানাটি।’
বিশেষ প্রতিবেদক 
























