ঢাকা ০৬:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
তালা ভেঙে বসতি, আড়াই–তিন বছর বিল বকেয়া; সংযোগ বিচ্ছিন্নে ‘নিরাপত্তার অজুহাত’ আকিজ সিমেন্টে ১৪৮ কোটি টাকার অনিয়ম কুমিল্লায় নারী উদ্যোক্তাদের স্যানিটারি ন্যাপকিন বিক্রয় বিষয়ক প্রশিক্ষণ রংপুর রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ জেলা পুলিশ নির্বাচিত ঠাকুরগাঁও বাঁধনের ওপর হামলা, সংসদে যা বললেন বিএনপির নারী এমপি ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে কোটালীপাড়ায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত দেশে ফিরলেই শেখ হাসিনাকে জেলে যেতে হবে: শামা ওবায়েদ লভ্যাংশ না নিয়ে আয়ের ওপর নেওয়া হয়েছে টাকা : সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গণতন্ত্র বাঁচাতে হলে গণমাধ্যমকেও বাঁচাতে হবে: রাষ্ট্রপতি
অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রে নকল স্টিকার

ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইশার) রিফিলের নামে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠান ও ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সংগ্রহ করে সেগুলোর ড্রাই কেমিক্যাল পাউডার পরিবর্তন না করেই পরিষ্কার করে ময়মনসিংহের ‘দ্য সেফ মার্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নকল স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি স্টিকারে রিফিল ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখও লিখা হয়েছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রিফিলকারীর স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তার ওপর আস্থা রেখে তারা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলো রিফিলের জন্য দিয়ে থাকেন। এ জন্য প্রতিটি যন্ত্রের বিপরীতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হলেও দেওয়া হয় না কোনো ভাউচার। ফলে যন্ত্রের ভেতরের রাসায়নিক আদৌ পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, তা তারা জানতে পারেন না।

মোহনগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, কামরুজ্জামান সুমনের মূল কর্মস্থল পাশের খালিয়াজুরী উপজেলা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে। স্টেশনটি বর্তমানে চালু না থাকায় তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মোহনগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দায়িত্বও পালন করছেন। ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে তিনি দুই উপজেলার স্টেশন অফিসারের দায়িত্বে রয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিসের নিয়ম অনুযায়ী, ডিজেল-পেট্রোল-এলপিজি বিক্রির প্রতিষ্ঠান, কারখানা, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এসব প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা তদারকি ও ফায়ার লাইসেন্সের বিষয়টিও ফায়ার সার্ভিসের আওতাভুক্ত। মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঁচ শতাধিক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

মোহনগঞ্জ বাজারের ২০-২৫ জন ব্যবসায়ী জানান, প্রতিবছর অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ড্রাই কেমিক্যাল পাউডারের মেয়াদ শেষ হলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে যন্ত্র নিয়ে যান। পরে টাকা নিয়ে রিফিল করা হয়েছে জানিয়ে সেগুলো ফেরত দেওয়া হয়। যন্ত্রের গায়ে ‘দ্য সেফ মার্ট’ লেখা স্টিকার থাকে। সেখানে রিফিলের তারিখ ও পরবর্তী মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখও উল্লেখ করা হয়। তবে এসব স্টিকার আসল কি না, তা কখনো যাচাই করেননি তারা। কারণ, ফায়ার সার্ভিসের লোকজনই বিষয়টি দেখভাল করছেন— এই বিশ্বাস থেকেই তারা নিশ্চিন্ত ছিলেন।

মোহনগঞ্জের মাইলোড়া এলাকার রাবেয়া এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার আইনুল হক বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে দুটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রয়েছে। কয়েক মাস আগে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সেগুলো নিয়ে গিয়ে রিফিল করে ফেরত দেন। দুটি যন্ত্রের জন্য ২ হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হলেও কোনো ভাউচার দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের লোকজন নিয়ে যায়, আবার তারাই রিফিল করে দিয়ে যায়। তাই আমরা তাদের ওপরই ভরসা করি। আসল-নকল যাচাই করার কথা কখনো মাথায় আসেনি।

ফারহা এন্টারপ্রাইজের মালিক রেজাউল হকও একই ধরনের অভিযোগ করেন।
শাহ জালাল (র.) ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মাহবুব আলম সেলিম জানান, তার প্রতিষ্ঠানের দুটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কামরুজ্জামান সুমন নিয়ে গিয়ে রিফিল করে দিয়েছেন। এ জন্য টাকা দেওয়া হয়েছে, তবে কোনো ভাউচার পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, তিনি ময়মনসিংহ থেকে রিফিল করেন, নাকি নিজেই স্টিকার লাগিয়ে দেন— আমরা জানি না। আমরা তো তার ওপর ভরসা করি। যদি রিফিল না করে পুরোনো কেমিক্যাল রেখে দেওয়া হয়, তাহলে আগুন লাগলে সেটা কোনো কাজেই আসবে না। বিষয়টি তদন্ত হওয়া দরকার।

সরেজমিনে মিলেছে ‘সেফ মার্টের’ স্টিকার
গত দুই দিনে মোহনগঞ্জ পৌরশহরের কয়েকটি ডিজেল-পেট্রোল বিক্রির প্রতিষ্ঠান এবং অন্তত ২০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ডিজেল-পেট্রোল বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে থাকা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সরেজমিনে দেখা হয়। প্রায় সব কটি যন্ত্রেই ‘দ্য সেফ মার্ট’ লেখা স্টিকার দেখা গেছে। স্টিকারগুলোতে রিফিলের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ রয়েছে। কয়েকটি স্টিকারে রিফিলকারীর স্বাক্ষরও ছিল না।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের কাছেও রিফিলের কোনো ভাউচার পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে অন্তত ১০টি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের স্টিকারের ছবি ‘দ্য সেফ মার্ট’-এর স্বত্বাধিকারী ও ফায়ার সার্ভিসের সাবেক কর্মকর্তা দুলাল মিয়াকে পাঠানো হয়। ছবিগুলো দেখে তিনি জানান, এর মধ্যে মাত্র দুটি সিলিন্ডার তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে রিফিল করা হয়েছে। বাকি সিলিন্ডারগুলোর স্টিকার তাদের প্রতিষ্ঠানের নয় বলে দাবি করেন তিনি।

দুলাল মিয়া বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ড্রাই কেমিক্যাল আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। কেউ যদি রিফিল না করে এমন স্টিকার লাগিয়ে থাকে, তাহলে তা প্রতারণা। এমন কাজ হয়ে থাকলে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মোহনগঞ্জ পৌরশহরের একটি ডিজিটাল প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান থেকে ‘দ্য সেফ মার্টের’ স্টিকার হুবহু নকল করে ছাপিয়ে নিয়েছেন। পরে ওই স্টিকার অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।

নওহাল এলাকার দুই বাসিন্দা দাবি করেন, তাদের সামনেই সুমন ওই দোকান থেকে স্টিকার ছাপিয়েছেন। দোকানের কর্মচারী প্রথমে রাজি না হলেও পরে তাকে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হয় বলে তারা জানান। নকল স্টিকার তৈরির একটি প্রিন্ট কপিও তারা প্রতিবেদকের কাছে দিয়েছেন।

তবে ওই প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনার প্রথমে স্টিকার ছাপানোর বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে প্রমাণ দেখানো হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রিফিলের জন্য ১ হাজার, ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের সংখ্যাও আলাদা— কোনো প্রতিষ্ঠানে ১০টি, কোথাও পাঁচটি, কোথাও দুটি, আবার ছোট প্রতিষ্ঠানে একটি করে রয়েছে।

আদর্শ ল্যাবের ইমরান হোসেন বলেন, প্রতি সিলিন্ডার রিফিলের জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। কোনো ভাউচার দেওয়া হয়নি।

মডেল ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মনির হোসেন বলেন, আমরা রিফিলের টাকা ফায়ার সার্ভিসের লোকজনকে দিই। তারা নিয়ে গিয়ে রিফিল করে স্টিকার লাগিয়ে দিয়ে যান। নতুন একটি সিলিন্ডারও তাদের কাছ থেকে ৭ হাজার টাকা দিয়ে নিয়েছি।

রোকেয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক রুবেল মিয়াসহ আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।

এদিকে কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে এর আগেও মাদক সেবনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সালে রংপুরে স্টেশন অফিসারের দায়িত্বে থাকার সময় তার ফেনসিডিল সেবনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। একই সময়ে ফায়ার সার্ভিসের সরকারি মালামাল বিক্রির অভিযোগও ওঠে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পেয়েছিল।

তখন সুমনের বক্তব্য ছিল, তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ফেনসিডিল সেবন করানো হয়েছিল। পরে তাকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে- তখন উপর মহলে বিপুল টাকা খরচ করে শাস্তি এড়িয়ে বদলিতেই বিষয়টি সমাধান করেছেন সুমন।

বর্তমানে মোহনগঞ্জে যোগদানের পরও তার বিরুদ্ধে ইয়াবা সেবনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি। তাদের দাবি, স্টেশন ও আশপাশের দোকানে বসে তাকে ইয়াবা সেবন করতে দেখেছেন তারা।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে মোহনগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার কামরুজ্জামান সুমন বলেন, আমরা রিফিল করার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নিই না। যাদের এসব যন্ত্র রয়েছে, তারা আমাদের কাছে রিফিলের বিষয়ে পরামর্শ চাইলে আমরা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের কথা বলে দিই। পরে তারা নিজেরাই সেখানে গিয়ে রিফিল করে আনেন।

নকল স্টিকার ছাপানোর অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তার ভাষ্য, আমরা কখনো দুই নম্বরি কাজ করি না।

মেয়াদোত্তীর্ণ কেমিক্যাল দিয়ে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কার্যকর হবে না— এমন কথা স্বীকার করে সুমন বলেন, যাদের কাছে রিফিল করা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রয়েছে, তাদের জিজ্ঞাসা করেন কাজ করছে কি না। কাজ করলেই হলো।

তার বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা এড়িয়ে যান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নেত্রকোনা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মো. জাকির হোসেন বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা সাধারণত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রিফিলের বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তা রিফিল করে।

তিনি বলেন, অবৈধভাবে স্টিকার ছাপিয়ে রিফিলের নামে প্রতারণা করা অপরাধ। অভিযোগের তথ্য-প্রমাণগুলো আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালে তদন্ত করে দেখা হবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হবে।

কামরুজ্জামান সুমনের আগের মাদক সেবনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘটনাটি শুনেছি। এ-সংক্রান্ত সংবাদ দেখিনি।

অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মতো জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম রিফিলের নামে যদি সত্যিই পুরোনো রাসায়নিক রেখে দেওয়া হয়, তাহলে তা শুধু আর্থিক প্রতারণা নয়, অগ্নিকাণ্ডের সময় শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রোগী ও কর্মচারীর নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তালা ভেঙে বসতি, আড়াই–তিন বছর বিল বকেয়া; সংযোগ বিচ্ছিন্নে ‘নিরাপত্তার অজুহাত’

অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রে নকল স্টিকার

ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ

আপডেট সময় ০৫:৫৪:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইশার) রিফিলের নামে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠান ও ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সংগ্রহ করে সেগুলোর ড্রাই কেমিক্যাল পাউডার পরিবর্তন না করেই পরিষ্কার করে ময়মনসিংহের ‘দ্য সেফ মার্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নকল স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি স্টিকারে রিফিল ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখও লিখা হয়েছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রিফিলকারীর স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তার ওপর আস্থা রেখে তারা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলো রিফিলের জন্য দিয়ে থাকেন। এ জন্য প্রতিটি যন্ত্রের বিপরীতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হলেও দেওয়া হয় না কোনো ভাউচার। ফলে যন্ত্রের ভেতরের রাসায়নিক আদৌ পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, তা তারা জানতে পারেন না।

মোহনগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, কামরুজ্জামান সুমনের মূল কর্মস্থল পাশের খালিয়াজুরী উপজেলা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে। স্টেশনটি বর্তমানে চালু না থাকায় তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মোহনগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দায়িত্বও পালন করছেন। ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে তিনি দুই উপজেলার স্টেশন অফিসারের দায়িত্বে রয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিসের নিয়ম অনুযায়ী, ডিজেল-পেট্রোল-এলপিজি বিক্রির প্রতিষ্ঠান, কারখানা, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এসব প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা তদারকি ও ফায়ার লাইসেন্সের বিষয়টিও ফায়ার সার্ভিসের আওতাভুক্ত। মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঁচ শতাধিক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

মোহনগঞ্জ বাজারের ২০-২৫ জন ব্যবসায়ী জানান, প্রতিবছর অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ড্রাই কেমিক্যাল পাউডারের মেয়াদ শেষ হলে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে যন্ত্র নিয়ে যান। পরে টাকা নিয়ে রিফিল করা হয়েছে জানিয়ে সেগুলো ফেরত দেওয়া হয়। যন্ত্রের গায়ে ‘দ্য সেফ মার্ট’ লেখা স্টিকার থাকে। সেখানে রিফিলের তারিখ ও পরবর্তী মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখও উল্লেখ করা হয়। তবে এসব স্টিকার আসল কি না, তা কখনো যাচাই করেননি তারা। কারণ, ফায়ার সার্ভিসের লোকজনই বিষয়টি দেখভাল করছেন— এই বিশ্বাস থেকেই তারা নিশ্চিন্ত ছিলেন।

মোহনগঞ্জের মাইলোড়া এলাকার রাবেয়া এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার আইনুল হক বলেন, তার প্রতিষ্ঠানে দুটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রয়েছে। কয়েক মাস আগে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সেগুলো নিয়ে গিয়ে রিফিল করে ফেরত দেন। দুটি যন্ত্রের জন্য ২ হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হলেও কোনো ভাউচার দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসের লোকজন নিয়ে যায়, আবার তারাই রিফিল করে দিয়ে যায়। তাই আমরা তাদের ওপরই ভরসা করি। আসল-নকল যাচাই করার কথা কখনো মাথায় আসেনি।

ফারহা এন্টারপ্রাইজের মালিক রেজাউল হকও একই ধরনের অভিযোগ করেন।
শাহ জালাল (র.) ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মাহবুব আলম সেলিম জানান, তার প্রতিষ্ঠানের দুটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কামরুজ্জামান সুমন নিয়ে গিয়ে রিফিল করে দিয়েছেন। এ জন্য টাকা দেওয়া হয়েছে, তবে কোনো ভাউচার পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, তিনি ময়মনসিংহ থেকে রিফিল করেন, নাকি নিজেই স্টিকার লাগিয়ে দেন— আমরা জানি না। আমরা তো তার ওপর ভরসা করি। যদি রিফিল না করে পুরোনো কেমিক্যাল রেখে দেওয়া হয়, তাহলে আগুন লাগলে সেটা কোনো কাজেই আসবে না। বিষয়টি তদন্ত হওয়া দরকার।

সরেজমিনে মিলেছে ‘সেফ মার্টের’ স্টিকার
গত দুই দিনে মোহনগঞ্জ পৌরশহরের কয়েকটি ডিজেল-পেট্রোল বিক্রির প্রতিষ্ঠান এবং অন্তত ২০টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ডিজেল-পেট্রোল বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে থাকা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র সরেজমিনে দেখা হয়। প্রায় সব কটি যন্ত্রেই ‘দ্য সেফ মার্ট’ লেখা স্টিকার দেখা গেছে। স্টিকারগুলোতে রিফিলের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ রয়েছে। কয়েকটি স্টিকারে রিফিলকারীর স্বাক্ষরও ছিল না।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের কাছেও রিফিলের কোনো ভাউচার পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে অন্তত ১০টি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের স্টিকারের ছবি ‘দ্য সেফ মার্ট’-এর স্বত্বাধিকারী ও ফায়ার সার্ভিসের সাবেক কর্মকর্তা দুলাল মিয়াকে পাঠানো হয়। ছবিগুলো দেখে তিনি জানান, এর মধ্যে মাত্র দুটি সিলিন্ডার তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে রিফিল করা হয়েছে। বাকি সিলিন্ডারগুলোর স্টিকার তাদের প্রতিষ্ঠানের নয় বলে দাবি করেন তিনি।

দুলাল মিয়া বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ড্রাই কেমিক্যাল আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। কেউ যদি রিফিল না করে এমন স্টিকার লাগিয়ে থাকে, তাহলে তা প্রতারণা। এমন কাজ হয়ে থাকলে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মোহনগঞ্জ পৌরশহরের একটি ডিজিটাল প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান থেকে ‘দ্য সেফ মার্টের’ স্টিকার হুবহু নকল করে ছাপিয়ে নিয়েছেন। পরে ওই স্টিকার অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।

নওহাল এলাকার দুই বাসিন্দা দাবি করেন, তাদের সামনেই সুমন ওই দোকান থেকে স্টিকার ছাপিয়েছেন। দোকানের কর্মচারী প্রথমে রাজি না হলেও পরে তাকে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হয় বলে তারা জানান। নকল স্টিকার তৈরির একটি প্রিন্ট কপিও তারা প্রতিবেদকের কাছে দিয়েছেন।

তবে ওই প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনার প্রথমে স্টিকার ছাপানোর বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে প্রমাণ দেখানো হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রিফিলের জন্য ১ হাজার, ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের সংখ্যাও আলাদা— কোনো প্রতিষ্ঠানে ১০টি, কোথাও পাঁচটি, কোথাও দুটি, আবার ছোট প্রতিষ্ঠানে একটি করে রয়েছে।

আদর্শ ল্যাবের ইমরান হোসেন বলেন, প্রতি সিলিন্ডার রিফিলের জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। কোনো ভাউচার দেওয়া হয়নি।

মডেল ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মনির হোসেন বলেন, আমরা রিফিলের টাকা ফায়ার সার্ভিসের লোকজনকে দিই। তারা নিয়ে গিয়ে রিফিল করে স্টিকার লাগিয়ে দিয়ে যান। নতুন একটি সিলিন্ডারও তাদের কাছ থেকে ৭ হাজার টাকা দিয়ে নিয়েছি।

রোকেয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক রুবেল মিয়াসহ আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।

এদিকে কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে এর আগেও মাদক সেবনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সালে রংপুরে স্টেশন অফিসারের দায়িত্বে থাকার সময় তার ফেনসিডিল সেবনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। একই সময়ে ফায়ার সার্ভিসের সরকারি মালামাল বিক্রির অভিযোগও ওঠে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পেয়েছিল।

তখন সুমনের বক্তব্য ছিল, তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ফেনসিডিল সেবন করানো হয়েছিল। পরে তাকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে- তখন উপর মহলে বিপুল টাকা খরচ করে শাস্তি এড়িয়ে বদলিতেই বিষয়টি সমাধান করেছেন সুমন।

বর্তমানে মোহনগঞ্জে যোগদানের পরও তার বিরুদ্ধে ইয়াবা সেবনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি। তাদের দাবি, স্টেশন ও আশপাশের দোকানে বসে তাকে ইয়াবা সেবন করতে দেখেছেন তারা।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে মোহনগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার কামরুজ্জামান সুমন বলেন, আমরা রিফিল করার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র নিই না। যাদের এসব যন্ত্র রয়েছে, তারা আমাদের কাছে রিফিলের বিষয়ে পরামর্শ চাইলে আমরা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের কথা বলে দিই। পরে তারা নিজেরাই সেখানে গিয়ে রিফিল করে আনেন।

নকল স্টিকার ছাপানোর অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তার ভাষ্য, আমরা কখনো দুই নম্বরি কাজ করি না।

মেয়াদোত্তীর্ণ কেমিক্যাল দিয়ে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কার্যকর হবে না— এমন কথা স্বীকার করে সুমন বলেন, যাদের কাছে রিফিল করা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রয়েছে, তাদের জিজ্ঞাসা করেন কাজ করছে কি না। কাজ করলেই হলো।

তার বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা এড়িয়ে যান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নেত্রকোনা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মো. জাকির হোসেন বলেন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা সাধারণত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রিফিলের বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পরে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তা রিফিল করে।

তিনি বলেন, অবৈধভাবে স্টিকার ছাপিয়ে রিফিলের নামে প্রতারণা করা অপরাধ। অভিযোগের তথ্য-প্রমাণগুলো আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালে তদন্ত করে দেখা হবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হবে।

কামরুজ্জামান সুমনের আগের মাদক সেবনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘটনাটি শুনেছি। এ-সংক্রান্ত সংবাদ দেখিনি।

অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের মতো জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম রিফিলের নামে যদি সত্যিই পুরোনো রাসায়নিক রেখে দেওয়া হয়, তাহলে তা শুধু আর্থিক প্রতারণা নয়, অগ্নিকাণ্ডের সময় শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রোগী ও কর্মচারীর নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।