ঢাকা ১০:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সাংবাদিকরা সমাজের দর্পন -ভিসি ড.এস.এম হেমায়েত জাহান যে কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাওয়ে জার্সি পরতে বাধ্য হচ্ছে আর্জেন্টিনা চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য সব বোর্ডে চলবে এইচএসসি পরীক্ষা : আন্তঃশিক্ষা বোর্ড ব্রুনাই শ্রমবাজারে হাইকমিশনার নওরিন আহসানকে ঘিরে বিতর্ক জুলাইয়ের ১২ দিনে রেমিট্যান্স এলো ১৩২ কোটি ডলার শাড়ি নিয়ে প্রতারণার মামলায় তানজিন তিশাকে আদালতে হাজিরের নির্দেশ বিয়েবাড়িতে খাসির বদলে মুরগির মাংস দেওয়ায় তুমুল মারামারি নেপালে আবার কেন জেন-জি বিক্ষোভ, নেপথ্যে কী? আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডকে সমর্থন ট্রাম্প প্রশাসনের! রাতারাতি বড় কোন পরিবর্তন করা সম্ভব নয়: আইএমএফকে অর্থমন্ত্রী
১৫ দিনের কোর্সে ৫৭,৫০০ টাকা ভাতা নিয়ে প্রশ্ন

ভোলায় সমাজসেবা প্রশিক্ষণে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ

  • রিয়াজ ফরাজী
  • আপডেট সময় ০৭:৫১:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
  • ৫২৪ বার পড়া হয়েছে
ভোলা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি’-এর আওতায় আয়োজিত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণকে ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ-বাণিজ্য এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে নির্বাচিতদের মধ্যে আত্মীয়স্বজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রশিক্ষণ শেষে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে আদায়ের অভিযোগ এবং মাত্র ১৫ দিনের প্রশিক্ষণের বিপরীতে জনপ্রতি ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা সরকারি ভাতা প্রদান নিয়ে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কর্মসূচির আওতায় বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, ড্রেস মেকিং, টেইলারিং ও বিউটিফিকেশন, ইলেকট্রিক্যাল, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হেয়ার কাটিং, হস্তশিল্প, বেসিক ডাইভিং, মোবাইল, টিভি, ফ্রিজ ও এসি সার্ভিসিংসহ বিভিন্ন ট্রেডে মোট ১১৩ জন আবেদন করেন। আবেদনকারীদের মধ্যে ৭ জন ছিলেন মুসলিম এবং বাকিরা হিন্দু সম্প্রদায়ের।
পরবর্তীতে ১১ জুন মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় এবং বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ট্রেডে ২৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়। ১৬ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ১৫ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে দৈনিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা এবং ৫০ হাজার টাকার চেকসহ মোট ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হয়।
তবে অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠে, নির্বাচিত অধিকাংশ প্রশিক্ষণার্থী ভোলা সদর উপজেলার নিতাই চন্দ্র দাস এবং লালমোহন উপজেলার তপন কুমারের আত্মীয়স্বজন। একই পরিবারের একাধিক সদস্যও প্রশিক্ষণে সুযোগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সাধারণ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অনেকেই এ প্রশিক্ষণের বিষয়ে জানতে পারেননি, কারণ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি যথাযথভাবে প্রচার করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী দালাল চক্র প্রশিক্ষণে সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এবং প্রশিক্ষণ শেষে সরকারি ভাতা পাওয়ার পর জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে আদায় করেছে। এ ঘটনায় জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকারের নামও অভিযোগে এসেছে। তবে এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া একটি অডিও কথোপকথনে প্রশিক্ষণার্থী রত্না রানী ও তার স্বামী সজলের বক্তব্যে দাবি করা হয়, প্রশিক্ষণ শেষে নিতাই চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে একটি চক্র প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নিয়েছে। রত্না রানী জানান, তিনি তার মামা ধীরেন চন্দ্র দাসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণে সুযোগ পেয়েছেন এবং তাকেও টাকা দিতে হবে বলে জানানো হয়েছিল।
দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের লেজপাতা গ্রামের প্রশিক্ষণার্থী মিঠুন চন্দ্র মণ্ডল বলেন, প্রশিক্ষণ শেষে কত টাকা পেয়েছেন এবং কাউকে টাকা দিয়েছেন কি না—এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলতে তাদের নিষেধ করা হয়েছে। তার দাবি, সমাজসেবা অফিস এবং এক আত্মীয় তাকে এ বিষয়ে মুখ না খুলতে বলেছেন।
লালমোহন উপজেলার সীমা রানী অভিযোগ করেন, সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দেওয়ার কথা বলে তপন চন্দ্র তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। পরে প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে তিনি সেই টাকা ফেরত পান। তার দাবি, আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও একইভাবে টাকা নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে নিতাই চন্দ্র দাস বলেন, তার সংগঠন থেকে ১৮ জন আবেদন করলেও মাত্র ৬ জন সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচিতদের কেউ কেউ তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় হলেও তিনি কাউকে প্রভাব খাটিয়ে সুযোগ করে দেননি। ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।অন্যদিকে ধীরেন চন্দ্র দাস বলেন, আবেদনপত্র জমা দেওয়ার জন্য অফিসিয়াল ফি হিসেবে ২০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। নির্বাচিতরা যোগ্যতার ভিত্তিতেই সুযোগ পেয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকার বলেন, “সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন করা হয়েছে। প্রচারের জন্য উপজেলা ও শহর সমাজসেবা কার্যালয় এবং ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা করা হয়েছে। অনিয়ম বা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ সঠিক নয়।”
এদিকে সচেতন মহলের প্রশ্ন, কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনের মতো একটি বিষয়ে মাত্র ১৫ দিনের প্রশিক্ষণে প্রকৃত দক্ষতা অর্জন কতটা সম্ভব। তাদের দাবি, বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সাংবাদিকরা সমাজের দর্পন -ভিসি ড.এস.এম হেমায়েত জাহান

১৫ দিনের কোর্সে ৫৭,৫০০ টাকা ভাতা নিয়ে প্রশ্ন

ভোলায় সমাজসেবা প্রশিক্ষণে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগ

আপডেট সময় ০৭:৫১:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
ভোলা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত ‘অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি’-এর আওতায় আয়োজিত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণকে ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ-বাণিজ্য এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে নির্বাচিতদের মধ্যে আত্মীয়স্বজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রশিক্ষণ শেষে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে আদায়ের অভিযোগ এবং মাত্র ১৫ দিনের প্রশিক্ষণের বিপরীতে জনপ্রতি ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা সরকারি ভাতা প্রদান নিয়ে জেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কর্মসূচির আওতায় বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, ড্রেস মেকিং, টেইলারিং ও বিউটিফিকেশন, ইলেকট্রিক্যাল, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হেয়ার কাটিং, হস্তশিল্প, বেসিক ডাইভিং, মোবাইল, টিভি, ফ্রিজ ও এসি সার্ভিসিংসহ বিভিন্ন ট্রেডে মোট ১১৩ জন আবেদন করেন। আবেদনকারীদের মধ্যে ৭ জন ছিলেন মুসলিম এবং বাকিরা হিন্দু সম্প্রদায়ের।
পরবর্তীতে ১১ জুন মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় এবং বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন ট্রেডে ২৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়। ১৬ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ১৫ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে দৈনিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা এবং ৫০ হাজার টাকার চেকসহ মোট ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হয়।
তবে অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠে, নির্বাচিত অধিকাংশ প্রশিক্ষণার্থী ভোলা সদর উপজেলার নিতাই চন্দ্র দাস এবং লালমোহন উপজেলার তপন কুমারের আত্মীয়স্বজন। একই পরিবারের একাধিক সদস্যও প্রশিক্ষণে সুযোগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সাধারণ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অনেকেই এ প্রশিক্ষণের বিষয়ে জানতে পারেননি, কারণ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি যথাযথভাবে প্রচার করা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী দালাল চক্র প্রশিক্ষণে সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এবং প্রশিক্ষণ শেষে সরকারি ভাতা পাওয়ার পর জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে আদায় করেছে। এ ঘটনায় জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকারের নামও অভিযোগে এসেছে। তবে এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া একটি অডিও কথোপকথনে প্রশিক্ষণার্থী রত্না রানী ও তার স্বামী সজলের বক্তব্যে দাবি করা হয়, প্রশিক্ষণ শেষে নিতাই চন্দ্র দাসের নেতৃত্বে একটি চক্র প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নিয়েছে। রত্না রানী জানান, তিনি তার মামা ধীরেন চন্দ্র দাসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণে সুযোগ পেয়েছেন এবং তাকেও টাকা দিতে হবে বলে জানানো হয়েছিল।
দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নের লেজপাতা গ্রামের প্রশিক্ষণার্থী মিঠুন চন্দ্র মণ্ডল বলেন, প্রশিক্ষণ শেষে কত টাকা পেয়েছেন এবং কাউকে টাকা দিয়েছেন কি না—এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলতে তাদের নিষেধ করা হয়েছে। তার দাবি, সমাজসেবা অফিস এবং এক আত্মীয় তাকে এ বিষয়ে মুখ না খুলতে বলেছেন।
লালমোহন উপজেলার সীমা রানী অভিযোগ করেন, সমাজসেবা কর্মকর্তাকে দেওয়ার কথা বলে তপন চন্দ্র তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। পরে প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে তিনি সেই টাকা ফেরত পান। তার দাবি, আরও কয়েকজনের কাছ থেকেও একইভাবে টাকা নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে নিতাই চন্দ্র দাস বলেন, তার সংগঠন থেকে ১৮ জন আবেদন করলেও মাত্র ৬ জন সুযোগ পেয়েছেন। নির্বাচিতদের কেউ কেউ তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় হলেও তিনি কাউকে প্রভাব খাটিয়ে সুযোগ করে দেননি। ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।অন্যদিকে ধীরেন চন্দ্র দাস বলেন, আবেদনপত্র জমা দেওয়ার জন্য অফিসিয়াল ফি হিসেবে ২০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। নির্বাচিতরা যোগ্যতার ভিত্তিতেই সুযোগ পেয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকার বলেন, “সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন করা হয়েছে। প্রচারের জন্য উপজেলা ও শহর সমাজসেবা কার্যালয় এবং ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা করা হয়েছে। অনিয়ম বা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ সঠিক নয়।”
এদিকে সচেতন মহলের প্রশ্ন, কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনের মতো একটি বিষয়ে মাত্র ১৫ দিনের প্রশিক্ষণে প্রকৃত দক্ষতা অর্জন কতটা সম্ভব। তাদের দাবি, বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।