কারাগার—শব্দটি সাধারণত বেদনা, বিচ্ছেদ ও বন্দিত্বের প্রতীক। কিন্তু কখনো কখনো এই সীমাবদ্ধ প্রাচীরের ভেতরেই জন্ম নেয় নতুন উপলব্ধি, গড়ে ওঠে গভীর মানবিক সম্পর্ক, আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন রচিত হয় নীরব আলোচনায়। আমার জীবনের এমনই কিছু স্মৃতিময় মুহূর্ত জড়িয়ে আছে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এএনএম এহসানুল হক মিলন-এর সঙ্গে কাটানো সময়কে ঘিরে।
শিক্ষামন্ত্রী জীবনের এক কঠিন অধ্যায়ে প্রায় ৪৪৯ দিন চাঁদপুর, কুমিল্লা ও রংপুর কারাগারে অতিবাহিত করেছেন। এর মধ্যে দীর্ঘ সময় তিনি কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। সেই সময় তাঁর সান্নিধ্যে এসে আমি একজন রাজনীতিককে নয়, একজন চিন্তাশীল, মানবিক এবং শিক্ষানুরাগী মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম।
কারাগারের পরিবেশে নানা বিষয়ে আমাদের আলোচনা হতো। শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজ, সাহিত্য, রাষ্ট্র ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ—সবই ছিল সেই আলাপের বিষয়। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, “শিক্ষাই একটি জাতিকে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।” তিনি মনে করতেন, শিক্ষা ব্যবস্থায় যুগোপযোগী পরিবর্তন আনা ছাড়া জাতির কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাঁর সেই দূরদর্শী চিন্তা আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
সেই সময় কারাগারে উপস্থিত ছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। আমি প্রায়ই নিজের লেখা কবিতা তাঁদের শুনাতাম। একদিন আমার একটি কবিতার পঙ্ক্তি তিনি আন্তরিকভাবে সংশোধন করে দেন। একজন প্রবীণ রাজনীতিকের সাহিত্যপ্রেম ও নির্মোহ পরামর্শ আজও আমার হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে।
শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক ও প্রাণবন্ত। কখনো আকাশপথের উন্নয়নের কথা বলতেন, কখনো স্থলপথের অবকাঠামো নিয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরতেন। জীবনের নানা স্মৃতি, হাসি-আনন্দ আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁর কথায় ফুটে উঠত। সাধারণ খাবার—সুপ, মুড়ি মাখা—ভাগাভাগি করে খেতে খেতে কত যে কথা, কত যে স্বপ্নের আলোচনা হয়েছে, আজ সেসবই স্মৃতির অমূল্য সম্পদ।
একদিন তিনি স্নেহভরে বলেছিলেন, “তুমি আমার পিএস ২ হবে।” আমি বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলাম, “মহোদয়, আমি সংবাদকর্মী হিসেবেই থাকতে চাই।” তখন তিনি হাসিমুখে বলেছিলেন, “কবি, সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সংবাদকর্মী হতে পারাটাই বড় সার্থকতা। তবে সেই কলম চলতে হবে সত্যের সন্ধানে।
এই একটি বাক্য আমার সাংবাদিকতা জীবনের অন্যতম বড় প্রেরণা হয়ে আছে। সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং জাতির প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা আমি সেই কথার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছি। আজও যখন কলম হাতে নিই, তাঁর সেই উপদেশ আমাকে দিকনির্দেশনা দেয়।
মানুষকে বিচার করার আগে তার আদর্শ, চিন্তা ও কর্মকে মূল্যায়ন করা জরুরি। কারাগারের দিনগুলোতে আমি যে মানুষটিকে দেখেছি, তিনি ছিলেন শিক্ষা, নৈতিকতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে গভীরভাবে ভাবনাশীল একজন ব্যক্তিত্ব। শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, নকলমুক্ত ও যুগোপযোগী করার স্বপ্ন তিনি বারবার ব্যক্ত করতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আলোকিত মানুষই পারে আলোকিত রাষ্ট্র গড়তে।
আজ সময় অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু কারাগারের সেই দিনগুলো, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পরামর্শ, শিক্ষামন্ত্রীর অনুপ্রেরণামূলক কথাগুলো এবং সাধারণ মুহূর্তের অসাধারণ স্মৃতিগুলো আজও আমার হৃদয়ে অক্ষয় হয়ে আছে।
জীবনের কিছু স্মৃতি সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না; বরং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কারাগারের সেই স্মৃতিময় দিনগুলোও আমার কাছে তেমনই এক অমূল্য অধ্যায়—যেখানে শিখেছি সত্যের প্রতি অঙ্গীকার, শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ।
— শহীদুল ইসলাম
সাংবাদিক ও সাহিত্যকর্মী
সংবাদ শিরোনাম ::
কারাগারের স্মৃতিময় দিনগুলিতে শিক্ষামন্ত্রী
-
শহীদুল ইসলাম সাংবাদিক ও সাহিত্যকর্মী - আপডেট সময় ১২:২২:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
- ৫১৩ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ


























