সংবাদ শিরোনাম ::
মৌলভীবাজার সীমান্তে বিজিবির অভিযান ৩ বিদেশি পিস্তলসহ বিস্ফোরক উদ্ধার নিখোঁজের তিনদিন পর মিলল ইব্রাহিমের মরদেহ  ব্রাহ্মণপাড়া বাড়ির পাশের খালে ডুবে শিশুর মৃত্যু, এলাকায় শোকের ছায়া শিক্ষার মানোন্নয়নে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ: ব্রাহ্মণপাড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেকচার ডায়াস ও বেঞ্চ বিতরণ প্রতাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীর অপহরণের চেষ্টার প্রতিবাদে মানববন্ধন, মহাসড়কে যানজট উপজেলা ও জেলায় প্রথম হয়ে জাতীয় পর্যায়ে পাংশার কাজী আব্দুল মাজেদ একাডেমি দেশে গাঁজাখোরের সংখ্যা ৬১ লাখ! ঝিনাইগাতীতে ‘পার্টনার কংগ্রেস-২০২৬ দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত ভোলাহাটে আইন শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক ও অন্যান্য সভা অনুষ্ঠিত!  খাল দখলের থাবায় বিপন্ন ভোলা-জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

খাল দখলের থাবায় বিপন্ন ভোলা-জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

  • রিয়াজ ফরাজী 
  • আপডেট সময় ০৪:৫৭:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
  • ৫১২ বার পড়া হয়েছে
এক সময় যে খাল দিয়ে চলাচল করত বড় বড় মালবাহী নৌকা, বোট ও স্টিমার, সেই ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক খালগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে। অবৈধ দখল, বর্জ্য ফেলা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে ভোলা শহর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলার খালগুলো দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
পরিবেশবিদ ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এভাবে খাল ধ্বংস হতে থাকলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়, জলাবদ্ধতা এবং জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।
সরেজমিনে ভোলা পৌর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খালের দুই তীরজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। কোথাও খালের ভেতর পাইলিং করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, কোথাও আবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পাকা দালান তুলে সংকুচিত করা হয়েছে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ। এছাড়া বাজার ও আবাসিক এলাকার বর্জ্য, প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলে খালগুলোকে কার্যত ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত করা হয়েছে। এছাড়াও বোরহানউদ্দিন উপজেলায় অসংখ্য অবৈধ ভাবে স্থাপনা তৈরি করে খাল দখল করে রাখা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান দেওয়ার কথা থাকলেও, কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভোলা পৌরসভাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে খাল দখলের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে বোরহানউদ্দিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খালের জায়গা দখল করে স্থায়ী ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। মাঝে মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে তেমন কোনো স্থায়ী সমাধান দেখা যাচ্ছে না।
খাল দখল ও দূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। অনেক এলাকায় দিনের পর দিন জমে থাকা পানিতে দুর্ভোগে পড়ছে বাসিন্দারা। পাশাপাশি কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপরও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ভোলা জেলা শাখার সভাপতি মোবাশ্বের উল্ল্যাহ চৌধুরী বলেন, “এক সময় এই খালগুলো ছিল মানুষের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খালের পানি ও মাছের ওপর নির্ভর করে বহু পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু এখন খালের ওপর দালান নির্মাণ করা হচ্ছে, ময়লা-আবর্জনা ফেলে পানিকে বিষাক্ত করে তোলা হচ্ছে। হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অনেক অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। রাজনৈতিক প্রভাব ও বিভিন্ন মহলের হস্তক্ষেপের কারণে দখলমুক্ত কার্যক্রম স্থায়ী ফল দিচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “ভোলা পৌরসভার আওতায় খালের জায়গায় শতাধিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।”
পরিবেশবাদী সংগঠন বিডি ক্লিনের ভোলা জেলার অতিরিক্ত সমন্বয়কারী মো. হারুন অর রশীদ শিমুল বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা ভোলা দ্বীপকে রক্ষা করতে হলে প্রাকৃতিক খালগুলো সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। খাল দখল ও ভরাটের প্রবণতা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে ভোলা ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের মুখে পড়বে। আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানিয়েছে প্রশাসন।
তবে স্থানীয়দের দাবি, অতীতেও একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও তা স্থায়ী ফল বয়ে আনেনি। কিছুদিন পর আবারও দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়েছে। ফলে এবার দৃশ্যমান ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরিবেশবিদদের মতে, খাল রক্ষা শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়, এটি ভোলার ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব রক্ষারও প্রশ্ন। তাই রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং খালগুলো দখলমুক্ত করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মৌলভীবাজার সীমান্তে বিজিবির অভিযান ৩ বিদেশি পিস্তলসহ বিস্ফোরক উদ্ধার

খাল দখলের থাবায় বিপন্ন ভোলা-জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

আপডেট সময় ০৪:৫৭:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
এক সময় যে খাল দিয়ে চলাচল করত বড় বড় মালবাহী নৌকা, বোট ও স্টিমার, সেই ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক খালগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে। অবৈধ দখল, বর্জ্য ফেলা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কারণে ভোলা শহর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলার খালগুলো দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
পরিবেশবিদ ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এভাবে খাল ধ্বংস হতে থাকলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়, জলাবদ্ধতা এবং জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।
সরেজমিনে ভোলা পৌর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খালের দুই তীরজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা। কোথাও খালের ভেতর পাইলিং করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, কোথাও আবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পাকা দালান তুলে সংকুচিত করা হয়েছে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ। এছাড়া বাজার ও আবাসিক এলাকার বর্জ্য, প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলে খালগুলোকে কার্যত ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত করা হয়েছে। এছাড়াও বোরহানউদ্দিন উপজেলায় অসংখ্য অবৈধ ভাবে স্থাপনা তৈরি করে খাল দখল করে রাখা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান দেওয়ার কথা থাকলেও, কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভোলা পৌরসভাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে খাল দখলের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিশেষ করে বোরহানউদ্দিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খালের জায়গা দখল করে স্থায়ী ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। মাঝে মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে তেমন কোনো স্থায়ী সমাধান দেখা যাচ্ছে না।
খাল দখল ও দূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। অনেক এলাকায় দিনের পর দিন জমে থাকা পানিতে দুর্ভোগে পড়ছে বাসিন্দারা। পাশাপাশি কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপরও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ভোলা জেলা শাখার সভাপতি মোবাশ্বের উল্ল্যাহ চৌধুরী বলেন, “এক সময় এই খালগুলো ছিল মানুষের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খালের পানি ও মাছের ওপর নির্ভর করে বহু পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু এখন খালের ওপর দালান নির্মাণ করা হচ্ছে, ময়লা-আবর্জনা ফেলে পানিকে বিষাক্ত করে তোলা হচ্ছে। হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অনেক অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। রাজনৈতিক প্রভাব ও বিভিন্ন মহলের হস্তক্ষেপের কারণে দখলমুক্ত কার্যক্রম স্থায়ী ফল দিচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “ভোলা পৌরসভার আওতায় খালের জায়গায় শতাধিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।”
পরিবেশবাদী সংগঠন বিডি ক্লিনের ভোলা জেলার অতিরিক্ত সমন্বয়কারী মো. হারুন অর রশীদ শিমুল বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা ভোলা দ্বীপকে রক্ষা করতে হলে প্রাকৃতিক খালগুলো সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। খাল দখল ও ভরাটের প্রবণতা বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে ভোলা ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের মুখে পড়বে। আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানিয়েছে প্রশাসন।
তবে স্থানীয়দের দাবি, অতীতেও একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও তা স্থায়ী ফল বয়ে আনেনি। কিছুদিন পর আবারও দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়েছে। ফলে এবার দৃশ্যমান ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরিবেশবিদদের মতে, খাল রক্ষা শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়, এটি ভোলার ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব রক্ষারও প্রশ্ন। তাই রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং খালগুলো দখলমুক্ত করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।