দুদকের চার্জশিটভুক্ত কর্মকর্তাদের প্রশ্রয়, বদলি বাণিজ্য ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রশাসন শাখার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (প্রশাসন-২) এ এ মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে ঘুষ, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ এবং দুদকের চার্জশিটভুক্ত কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক প্রশ্রয় দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন।
অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার চার্জশিটভুক্ত ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রশাসনিকভাবে সুরক্ষা দিয়ে চাকরিতে বহাল রাখার পেছনেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে।
দুদকের মামলার আসামিদের ঘিরে বিতর্ক
সূত্র জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ে দীর্ঘদিন কর্মরত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের দায়ের করা মামলায় সাবেক সহকারী পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ শরিফুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
একই মামলার আরেক আসামি অলিউল্লাহ প্রধান বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলা কৃষি অফিসে কর্মরত রয়েছেন। অন্যদিকে, ভুয়া বিল-ভাউচার কেলেঙ্কারির অভিযোগে আলোচিত ক্যাশিয়ার জাহিদ হাসানের বিরুদ্ধেও দুদকের চার্জশিট ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কর্মকর্তাকে প্রশাসনিকভাবে সুরক্ষা দিচ্ছেন অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মাসুম বিল্লাহ।
বদলি আদেশ অমান্যের অভিযোগ
ডিএই সূত্রে জানা গেছে, দুদকের মামলার চার্জশিটভুক্ত জাহিদ হাসানকে সম্প্রতি ময়মনসিংহে বদলি করা হলেও তিনি এখনো খামারবাড়িতেই দায়িত্ব পালন করছেন। একইভাবে ক্যাশ সরকারের দায়িত্বে থাকা হাবিবুর রহমানকেও চাঁদপুরে বদলির আদেশ দেওয়া হলেও তিনি আগের কর্মস্থলেই রয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, বদলি আদেশ কার্যকর না করার পেছনে আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক প্রভাব কাজ করেছে। এমনকি নতুন পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে না দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
ঘুষের বিনিময়ে বদলি বাতিলের অভিযোগ
খামারবাড়ির একাধিক সূত্রের দাবি, বদলি আদেশ বাতিল বা স্থগিতের আশ্বাস দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে জনপ্রতি দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়।
এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে চিহ্নিত ও তদন্তে অভিযুক্ত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুনরায় লাভজনক কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘সেকেন্ড ডিজি’ হিসেবে পরিচিতি
খামারবাড়ির অভ্যন্তরে প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্তে মাসুম বিল্লাহর প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য, মহাপরিচালকের পর প্রশাসনে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে তাঁকে দেখা হয়। অনেকে তাঁকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘সেকেন্ড ডিজি’ বলেও উল্লেখ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখানো হয়। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা বদলিতেও তাঁর একক প্রভাব রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
টেন্ডার ও পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগ
সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটে আদেশ প্রকাশ না করে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে বদলির কপি দেওয়া হয়েছে এবং এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে।
এছাড়া সুবিধাজনক পদায়ন ও কর্মস্থল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি গাড়ির অপব্যবহারের অভিযোগ
মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে সরকারি গাড়ির অপব্যবহার, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার এবং চালকদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তিনি নিয়মিত প্রশাসনিক কাজের বাইরে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন।
এ কারণে একাধিক চালক তাঁর গাড়ি চালাতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিভাগীয় ব্যবস্থা সুপারিশের পরও বহাল
একাধিক সূত্র জানায়, সরকারি কাজে বাধা, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, বদলি বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম এবং সরকারি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তাঁর বিরুদ্ধে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছিল।
কৈফিয়তের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তাঁকে ঢাকার বাইরে বদলি, সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে অদৃশ্য কারণে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
পাবনায় দায়িত্ব পালনের সময়ও অভিযোগ
সূত্র জানায়, খামারবাড়িতে যোগদানের আগে পাবনার সদর ও চাটমোহর উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, কৃষি প্রণোদনা বিতরণে অনিয়ম এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে অতীতে দায়ের হওয়া একাধিক অভিযোগ প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে কার্যকর তদন্তের মুখ দেখেনি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এ বিষয়ে মাসুম বিল্লাহর বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে যুক্ত করা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















